page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

‘সেক্স’ এর বাংলা কী হইতে পারে (২)

(আগের পর্বের লিংক)

সেদিন দেখলাম ডেইলি স্টার তাদের শুক্রবারের আয়োজন ‘দ্য স্টার’-এর কভার স্টোরি করেছে দেশী পোশাক পরা নিয়ে।

তাদের স্টোরির শিরোনাম ছিল ‘দেশী ইজ দ্য নিউ সেক্সি’। তাদের এ আলাপে সেক্সি শব্দটার অর্থ দাঁড়ায় আকষর্ণীয়, সুন্দর বা এরকম কিছু একটা। কেউ যদি ভাবেন এর অর্থ তারা রমণীয় করেছেন তো ভুল হবে। কিম্বা যদি বলেন যৌন আবেদনময়ী হয়ে উঠবেন দেশী পোশাকে, তাহলেও যথাযথ বাংলা হচ্ছে না।

এর কারণ প্রথমত, তারা নারীদের জন্যই এমন কোনো প্রস্তাবনা হাজির করেন নাই। দ্বিতীয়ত, এমন কিছু ভাবাটা ডেইলি স্টার যা বলতে চায় তাকে অগ্রাহ্য করে নিজের মত তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার শামিল।

তারা যা বলতে চায় সেক্সি বিষয়ে, সেটা আমলে নিলে মনে হয় যে তারা মনোহরণ বোঝাতে চাইছে। সিডাকশান বা সিডাকটিভ যার বাংলা মনোহর হলেই সুবিধা, দেশী শাড়িতেও নিজেকে সেই রূপে সাজিয়ে তোলা সম্ভব।

salahuddins1

যে ‘পাখি ড্রেস’ মনোহরণ করে নিচ্ছে এই এলাকার মানুষজনের তারাও মনোহরী হয়ে উঠতে পারে নিজের দেশের পোশাকে। এখানে ‘সেক্সি’ কথাটার মানে এই। যৌনতা না। যৌনতা একেবারে পাঠ্যপুস্তক থেকে উঠে আসা একটা শব্দ। যা বৈজ্ঞানিক থাকাটাকে জরুরি করে তোলে।

ব্যক্তির মনে যে ‘সেক্স’ বিরাজ করে তাকে এই যৌনতা দিয়ে বোঝা যাবে না–তা আমি আগেই বলেছি। বরং এই শব্দ আমাদের এখানকার কামের সুশিলীকরণ ঘটায়। ইংরেজরা যেমন বলে ‘লাভ মেকিং’, নারী-পুরুষের কামকর্মকে তারা লাভ মেকিং বলে। মানে কামের উপর তারা একটা ভালোবাসার পবিত্র পোশাক পড়াতে চায়, রুচিশীল করে তুলতে চায়।

sexi2

নীরদ চন্দ্র চৌধুরী তার বাঙালি জীবনে রমণী বইয়ে এমন কথা আমারও আগে বলে গিয়েছিলেন। ডেইলি স্টারের সেক্স এসব আলাপেরও দূর। এখানে কামের নামগন্ধও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আসলে।

ঠিক তেমনি আড়ং বলছে তারা মোটিফ হিসেবে ‘ঐতিহ্য’কে রাখতে চয় সব কিছুতে। যে কারণে তাদের বিজ্ঞাপনে বাঙালি চানাচুরওয়ালা, বক, নদী, পানি, ফুল এসব থাকে হয়তো।

আড়ং তার নিজের বিষয়ে যে প্রস্তাবনা হাজির করে তাকে অস্বীকার বা আড়াল করে নিজের মেধা ও মননের কারসাজিতে আড়ঙকে বিনির্মাণের চেষ্টা গলদপূর্ণ বুদ্ধিজীবীতা। আখেরে এতে ব্যবসায়ীর লাভ বেশি। সে আলাপের বিস্তার এখানে ঘটবে না। আমার নজর কেবল ‘সেক্স’-এ। এসব বিজ্ঞাপনে সেক্স খুঁজে পাচ্ছেন কেন সমালোচকেরা, সেদিকে।

আমার মনে হচ্ছে, পশ্চিমা ভোজবাজির রঙ চোখ থেকে মুছতে না পারাটা একটা গুবলেট পাকিয়ে রাখছে। একই সঙ্গে সুশীল বা পরিশীলিতও থাকতে চান তারা। মানে এনলাইটেন্ড থাকতে চান। যে কারণে যৌনতা শব্দটা ব্যবহার করেন, কাম ব্যবহার করেন না।

অন্যান্য শব্দের আলাপ তো বাদই দিলাম। এসব কায়কারবার খুব দেখা গেছে রোমান্টিক এসথেটিকস চেপে বসছিল যখন এ এলাকার নারী-পুরুষের শারীরিক সম্পর্কের ওপর।

তো ‘বিশালবক্ষা’ নারীর ফুটবল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকাটার মধ্যে সেক্স পাওয়া যায় কোথায়? মনে মনে? এই মনের দায় তো আর কোনো নারীর অবিজ্ঞাপিতভাবে অমন টিশার্ট পরে দাঁড়িয়ে থাকাকে দেয়া যাবে না।

‘অবলোকনকাম চরিতার্থতার প্লেজার’ কীভাবে গঠিত হয়। আপসে আপ আসে? আকাশ থেকে নাজেল হয়? ফলে এর বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না? এ কেমন যুক্তি হলো? নিজের ‘নফসের’ দোষ কি অন্যের উপর চাপানোটা ঠিক কাজ হয়!

নফসের নিয়ন্ত্রণ তো ব্যক্তির নিজের হাতে। এটা একটা মানবিক বা প্রাচ্যীয় বোধ বা ভাব এখানে চালু আছে। কিন্তু সমালোচকদের ফতোয়া শুনলে মনে হবে যে বিজ্ঞাপনের ‘শয়তান’কে দূর করার জন্য জিহাদের দরকার খুব।

যেমন যারা বন্যার সঙ্গে আড়ঙের বিজ্ঞাপনের তুলনামূলক আলোচনা করলেন, তাদের বন্যাকে এমন পানি বা তাতে দাঁড়িয়ে থাকাদের দিয়েই কেন বুঝতে হলো?

Arong_1_192725107

তারা নিজেদের দেখাদেখিকে এতটা সীমিত করে রাখলেন কেন? দেখা এবং তাকানোর গুণগত ব্যবধান আছে। তাকালেই দেখা হয় না।

ইদানিং কালে আমি বেশ কয়েকবার পর্তুগিজ লেখক হোসে সারামাগোর কথা বলেছি। এবারও বলব। তার দুটো নামকরা উপন্যাস ব্লাইন্ডনেস এবং সিয়িং। দুটো উপন্যাসেই ‘দেখা’ ব্যাপারটাকে নতুন করে বোঝার সুযোগ আছে।

ব্লাইন্ডনেসে কোনো শহরের সব মানুষ অন্ধ হয়ে যায়। অন্ধ হয়ে তারা কালো দেখে না, দেখে সাদা। সাদা আলোয় তাদের আর কিছুই দেখা হয় না। চোখ হারানো নাগরিকেরা অবশ্য নিজেদের স্বভাব, আচরণ, রাষ্ট্র ব্যবস্থা, বিশ্বাস, আচার এসবকে তখন ভালোভাবে দেখতে পান। তাকিয়ে থাকার নামে তারা যাকে দেখত বলে ভাবত, এখন অন্ধ হয়ে তারা আসল দেখাকে দেখল।

সিয়িং-এও এমনটা বলতে চেয়েছেন লেখক। সেখানে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নাগরিকেরা ভোট দিতে গিয়ে দেখে ব্যালট পেপার সাদা। মানে খালি চোখে তারা যে মার্কার দিকে তাকাত, সেগুলো উধাও। তারা দেখল যে কাউকে, ব্যালট পেপারের কোথাও একটা টিপসই দিলেই চলছে। আ্যসথেটিক্যাল বা রিলিজিয়াস ব্যবধান হয়তো মার্কাগুলোর থাকে। কিন্তু পলিটিক্যালি দে আর সেম অর নট অ্যাজ সারামাগোস ডিজায়ার। সারামাগো হাইলি সেক্যুলার ঔপন্যাসিক। সেটা এখনকার আলোচ্য নয়।

এমনকি এই দুই উপন্যাসের গুরুতর রাজনৈতিক আলাপের দিকে না গিয়ে শুধু দেখা অর্থে যে দর্শন তা ছেঁকে তোলার কথা বলছি।

যখন বলব দেখা, তখন তাকানোর সঙ্গে একটা রাজনৈতিক আবেদন যুক্ত হয়। ‘আমি দেখছি’ কথাটার সঙ্গে ‘কী দেখছেন’ শর্তটা যুক্ত হয়ে যায় এমনিতেই। আর যখন দেখার বিবরণ দেয়া শুরু করেন বক্তা তখন তিনি নিজে তাতে যুক্ত হয়ে পড়েন। নিজের কিছু গুণাগুণ তার সেই দেখায় মিশে যায়।

এখন যারা আড়ঙের বিজ্ঞাপনের পানিতে বন্যা দেখতে পেলেন, সেটা তাদের দেখতে পাওয়া। আমার মত, সেটা তাদের সংকীর্ণ দেখা। বন্যা নেসেসারি না এসব বিজ্ঞাপনে।

বন্যার দুর্ভোগের জন্য দায়ী রাষ্ট্র তা এই ছবিতে নাই। যে ভূ-রাজনীতি এখানে অসময়ে বন্যা তৈরি করে তাও নাই। সেসব নিষ্পত্তিতে যখন সমালোচকেরা পিছিয়ে তখন তারা বিজ্ঞাপনের উপর নৈতিক দায় চাপাচ্ছেন। নৈতিক আবদারের বাইরে তাদের দাবি-দাওয়ায় আর কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। শিল্প সমালোচনাও না। পশ্চিমা রোমান্টিসিজমকে আড়ং যে পণ্যায়নের উপায় হিসেবে বেছে নিচ্ছে সেসব নিয়ে কথা পেলাম না।

নদী, জল, ফুলের সঙ্গে এখানকার মানুষের যে জীবনের সম্পর্ক, প্রাত্যহিকতার যোগ আছে–সেসব নিয়ে আলোচনা করলে কাজের কাজ কিছু একটা হয়ত হতো। কিন্তু ছবি সরাও, এ ছবি অবমাননাকর এমন হা-হুতাশমূলক রিঅ্যাকশনারি অ্যাক্টিভিজমেই নিজেদের শ্রম ব্যয় করছেন অনেকে।

আড়ং তাদের উপস্থাপনায় যে ‘ঐতিহ্যে’র কথা বলছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেত, তাদের যে আধুনিকতার প্রস্তাবনা তা নিয়ে আলাপ করা যেত। কিন্তু তা না করে যৌনতার অভিযোগ তোলাটা অবদমিত মনেরই প্রকাশ ঘটায় না?

আমার মনে হয় ভাষা খুঁজে না পাওয়ার একটা সমস্যা এখানে আছে। সমালোচনার নতুন নতুন ভাষা তৈরি করতে হবে। নইলে ভজঘট অবস্থা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। যেখানে যৌনতা নাই, সেখানে যৌনতা, যেখানে বন্যা নাই সেখানে বন্যা আরোপ করে মেধার শ্রমের অপচয়ের অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।

আগামি পর্বে ‘বডি’ মানে আধুনিক জমানায় ব্যক্তির শরীর বিষয়ে আলাপের ইচ্ছা আছে। যৌনতা পুঁজিবাদে এসে কত রঙ ঢঙ করতে পারে সে সবের হদিস বাংলায় খুব একটা নাই। পাশাপাশি অন্য আলাপ তো থাকছেই।

(চলবে)

সালাহ উদ্দিন শুভ্রের আরো লেখা  »

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।