page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

স্বাগতম, ইউজিন গুস্টমান!

১৯৯৭ সালের এক গরমের দুপুরে আমার হাতে এসেছিল টেলেক্স মেশিনে পাওয়া রয়টার্সের একটি বার্তা। ঢাকায় তখনও ওইভাবে ইন্টারনেট আসে নি। আমার বয়স তখন ২৪। একটি বাংলা দৈনিকের নিউজ ডেস্কে সাব-এডিটরি করি। খটাখট আওয়াজ তুলে সারাক্ষণ খবর প্রিন্ট করতে থাকে টেলেক্স মেশিন। তার মুখ থেকে জিহ্বার মতো গড়িয়ে নামে রোল খোলা কাগজ, মেঝেতে গড়াগড়ি খায়। অফিস অ্যাসিসট্যান্ট নির্দিষ্ট সময় অন্তর সেটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে আমাদের টেবিলে এনে দেয়।

তো, সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন আমাদের বার্তাকক্ষে রয়টার্সের ওই বার্তা জানাচ্ছিল, ডিপ ব্লু নামে একটি সুপার কম্পিউটার দাবা খেলায় হারিয়ে দিয়েছে দুনিয়ার সেরা দাবারু গ্যারি ক্যাসপারভকে। আন্তর্জাতিক পাতায় এক কলামে ছাপা হয়েছিল সেই সংবাদ। খেলার পাতাতেও ছাপা হতে পারতো।

ডিপ ব্লু-গ্যারি ক্যাসপারভ দাবা ম্যাচ ১৯৯৭

ডিপ ব্লু-গ্যারি ক্যাসপারভ দাবা ম্যাচ ১৯৯৭

ছোট নিউজ। এটা নিয়ে নিউজরুমে খুব যে আলোচনা হয়েছিল, বা আমরা বিস্ময় বিনিময় করেছিলাম, তা নয়। তবে সন্ধ্যা পেরিয়ে ছয় নম্বর বাসে চেপে বাসায় ফিরতে ফিরতে মগবাজার রেলগেট এলাকার লোডশেডিং কবলিত লণ্ঠনতাড়িত মহল্লার দোকানপাটের দিকে তাকিয়ে থেকে আমি গভীর ভাবনায় তলিয়ে গিয়েছিলাম। আমি টের পেয়ে গেছিলাম, দুনিয়ায় একটা বড় কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। এটা সামান্য কোনো খেলা নয়। ক্যাসপারভ অসাবধানে একটি গেম হেরে বসেছেন তা তো নয়। ছয়টি গেম খেলা হয়েছিল। তিনটি ড্র। বাকি তিনটির একটিতে জিতেছেন ক্যাসপারভ। দুটিতে ডিপ ব্লু।

সেটা ছিল আস্তিনগোটানো এক মহাভারতীয় দ্বৈরথ। এক ক্রুশিয়াল চেতাবনি, ইংরেজিতে থ্রোইং দ্য গন্টলেট বলতে যা বোঝায় আর কি। সেই চ্যালেঞ্জে ক্যাসপারভ মানবজাতির প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আর নগ্ন সত্যটি হলো, মগজের জোরের শেষ আরমাগেডনে মানুষ হেরে গেছে।

এই হার কি খুব অবমাননাকর? মানুষ হেরে গেছে কার কাছে? কে ছিল প্রতিপক্ষ?

বলা মুশকিল। আপাতদৃষ্টে মনে হয়, ক্যাসপারভ হেরেছেন দাবার চাল দিতে পারে এমন একটি গণনাযন্ত্রের কাছে। তাও আবার মানুষের হাতে বানানো এক গণনাযন্ত্র।

কিন্তু ওখানে থামলে তো চলবে না।

shibbratalogo

একটা সময় তো যোগ-বিয়োগ গুণ ভাগ করতে পারাকেও বুদ্ধির বিষয় বলে মনে করা হতো। ক্যালকুলেটর এসে যাওয়ায় আমরা এখন ওগুলোকে বুদ্ধির লক্ষণের তালিকা থেকে খারিজ করে দিয়েছি।

হিসাব কষতে পারা, সম্ভাব্য পঞ্চাশ হাজার কি পাঁচ লাখ চালের মধ্য থেকে একটি চালকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া, প্রতিপক্ষের চালাকি আগাম আঁচঅনুমান করতে পারা–এইসব কর্মের সঙ্গে বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তা করতে পারার তফাৎ কতটা? ডিপ ব্লু তো আসলে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে একটা পাথর গড়িয়ে পড়ার শুরু মাত্র। একটা আসন্ন অ্যাভালান্সের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ক্যাসপারভ চ্যালেঞ্জটা কেন যে নিতে গেলেন!

এই ঘটনার ১৭ বছর পর একই রকম গরমের সময় আমি এবার আরেকটি খবরের মুখোমুখি হলাম। এবার খবরটি ইন্টারনেটে পাওয়া। সেই ইন্টারনেট আবার মোবাইল ফোনে সংযুক্ত। ঢাকা শহরে এখন বেশ কয়েকটি ফ্লাইওভার। ছয় নম্বর বাস এখনও চলে বটে। তবে অধিকাংশ রাস্তা থেকে রিকশা উঠে গেছে। একটা মেট্রো বসানোর তোড়জোর চলছে। জায়গা ঠিক করে ফেলা হয়েছে। শুনছি একটা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েও হবে।

আমার হাতের আইফোনের পর্দায় গার্ডিয়ান পত্রিকার টুইট জানাচ্ছে, ইউজিন গুস্টমান নামে ১৩ বছরের এক বালকের ছদ্মবেশ নেওয়া একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম একটা ভীষণ কাণ্ড করে বসেছে। সেটি টুরিং টেস্টে উত্তীর্ণ হয়েছে। ইতিহাসে এই প্রথম কোনো কম্পিউটার প্রোগ্রাম টুরিং টেস্ট পাস করলো।

এখন একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম টুরিং টেস্টে উত্তীর্ণ হওয়ার মানে কী দাঁড়ায়? এর মানে হলো, ওই প্রোগামটিকে এখন থেকে আসলে “আপনি” বলে সম্বোধন করতে হবে। না করে কোনো উপায় নাই। কেননা টুরিং সাহেব বলছেন, যখন মানুষ আর যন্ত্রকে আলাদা করে চেনার উপায় থাকে না, তখন বলতেই হবে যে ওই যন্ত্রটি ‘চিন্তা’ করছে।

একটু ভেঙে বলি।

ওই যে ডিপ ব্লুর বেলায় যেসব প্রশ্ন তুললাম, সেগুলো তো ঘুরে ফিরে ওঠা প্রশ্নই। কোনটাকে বুদ্ধির পরিচয় বলে গণ্য করবো? যান্ত্রিক হিসাব কষা আর সচেতন চিন্তার মধ্যে চূড়ান্ত ভেদরেখাটি কোথায়? অ্যালান টুরিং নামে এক বিলাতি সাহেব ১৯৫০ সালে এই ধাঁধার একটা মীমাংসা টেনেছিলেন। একটা পরীক্ষা দিতে হবে যন্ত্রকে। বুদ্ধির পরীক্ষা। যে (নাকি যেটা, নাকি যিনি?) পাস করবে(ন), তাকে চিন্তাশক্তি সম্পন্ন বুদ্ধিমান (সত্তা) বলে গণ্য করে নিতে হবে।

অ্যালান টুরিং ভাস্কর্য

অ্যালান টুরিং ভাস্কর্য

এতদিন কেউ, মানে কোনো কম্পিউটার বা সুপার কম্পিউটার বা সুপ্রা কম্পিউটার বা কোনো কম্পিউটার প্রোগাম, টুরিং টেস্টের পুলসেরাত পেরোতে পারে নি। অবশেষে দ্বিতীয়বার মানুষের স্বর্গচ্যুতি।
ইউজিন গুস্টমান নামে যে কম্পিউটার প্রোগাম এ কাজ করেছে, সেটা একটা চ্যাটবট বা চ্যাটারবট। মানে একে বানানো হয়েছে এক বা একাধিক মানুষের সঙ্গে এমন বুদ্ধিদীপ্ত কথোপকথন চালিয়ে যাওয়ার উপযোগী করে, যাতে কেউ ধরতেই না পারে তারা আসলে একটা যন্ত্রের সঙ্গে কথা বলছে। সেই কথোপকথন হতে পারে টেক্সট ভিত্তিক, আবার অডিও কনভারসেশনও হতে পারে। প্রোগ্রামটি বানিয়েছেন রুশ বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ভ্লাদিমির ভাসেলভ আর ইউক্রেনি নাগরিক ইউজিন ডেমচেঙ্কো। সেন্ট্রাল লন্ডনে রয়্যাল সোসাইটির দপ্তরে বিজ্ঞানীদের সামনে গত সপ্তাহে এই পরীক্ষা হয়েছে। গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, ওই প্রোগ্রাম নিজের পরিচয় গোপন করে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক বিচারকের সঙ্গে টেক্সট-ভিত্তিক কথোপকথনে অবতীর্ণ হয় এবং তাদের ৩৩ শতাংশকে কনভিন্স করতে সক্ষম হয় যে, তারা আসলে ইউজিন গুস্টমান নামে ১৩ বছর বয়সী একটি ইউক্রেনি বালকের সঙ্গে কথা বলছেন। টুরিং টেস্টের চাহিদা অনুযায়ী, ৩০ শতাংশ বিচারককে ফাঁকি দিতে পারলেই চলত।

ইউজিনের এই কথোপকথোন যে-কাউকে ব্লেড রানার ছবির সেই বিখ্যাত ওপেনিং সিনের কথা মনে করিয়ে দেবে, যেখানে কোনটা সত্যিকার মানুষ আর কোনটা ছদ্মবেশী রেপ্লিকান্ট শনাক্ত করার জন্য “ভয়িট-কাম্ফ” নামে এক বিশেষ ধরনের সাক্ষাৎকারে অংশ নিচ্ছে এক ফ্যাক্টরি শ্রমিক। টুরিং টেস্টের কথোপকথন সিনেমার ওই উদ্ভট ভাইভা থেকে খুব বেশি আলাদা নয়।

সংকেতলিপি পাঠোদ্ধারে ওস্তাদ অ্যালান টুরিং আজ থেকে ৬০ বছর আগে যখন চাল থেকে খুদ বাছার এই বিশেষ ফর্মুলা দিয়েছিলেন, তখনও কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্সের ধারণা ততটা পোক্ত হয়ে ওঠে নি। ১৯৫০ সালে টুরিং তার “কম্পিউটিং মেশিনারি অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স” প্রবন্ধটি শুরুই করেছেন এই বাক্য দিয়ে: “আমি এই প্রশ্নটা বিবেচনা করতে বলছি, ‘যন্ত্রের পক্ষে কি চিন্তা করা সম্ভব?’” এর মীমাংসা করার আগে তো আমাদের “চিন্তা করা” কথাটার সংজ্ঞা ঠিক করতে হবে। সেটা তো আরো কঠিন। টুরিং বরং অন্য একটা রাস্তা নিলেন। তিনি প্রশ্নটাকে বদলে দিলেন। বললেন, এমন কোনো কম্পিউটার কি কল্পনা করা সম্ভব, যেটি ইমিটেশন গেম বা ভেক ধরার খেলায় ভালো করবে? এইবার বরং এমন একটা খেলা উদ্ভাবন করা সম্ভব, যেটা মাপনী হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
টুরিং টেস্ট আদতে এক ধরনের খেলাই। ফাঁকি দেওয়ার খেলা। ভেক ধরার খেলা।

একটা স্ট্যান্ডার্ড টুরিং টেস্ট এরকম: একটা কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে একে একে বসবেন একজন করে বিচারক। তিনি ওই কম্পিউটারের মাধ্যমে টেক্সট বেজড কথোপকথনে অংশ নেবেন অন্য ঘরে অবস্থান নেওয়া চার বা পাঁচজন মানুষের সঙ্গে। ওই পাঁচ জনের একটি হবে এক ভেক ধরা প্রোগ্রাম, যে-প্রোগ্রাম আসলে বুদ্ধিমান মানুষের মতো কথা বলার চেষ্টা করবে। বিচারক একেকজনের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৫ মিনিট কথা বলার সুযোগ পাবেন। এক বিচারক কথোপকথন পর্ব শেষ করলে আরেক বিচারক বসবেন। এভাবে বেশ কয়েকজন বিচারক কথোপকথন চালাবেন। বিচারকরা রায় দেবেন, যাদের সঙ্গে কথা বলা হলো তাদের মধ্যে কে মানুষ আর কে যন্ত্র। যন্ত্রটি যদি ৩০ শতাংশ বিচারককে ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়, তাহলে সেটি পরীক্ষায় উৎরে গেল।

দুটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। প্রথমত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শনাক্ত করার প্রতিযোগিতায় টুরিং টেস্ট এখনও খুব প্রভাবশালী একটি মাপকাঠি। আর ইউজিনের আগ পর্যন্ত এ যাবৎ বহু যন্ত্র টুরিং টেস্টে অংশ নিয়েছে। কেউ পাস করে নি।

এবার বিচারক আর ইউজিনের সেদিনের কথোপকথনের কয়েকটি নমুনা নিচে তুলে দিচ্ছি। দেখুন, পড়তে কেমন লাগে:

প্রথম কথোপকথন
বিচারক: হাই, আমি ক্যাথি।
ইউজিন: ক্যাথি! নাইস টু মিট ইউ। আপনি একজন নারী, আমি যদি ভুল না করে থাকি।
বিচারক: সঠিক। আপনার নাম?
ইউজিন: আমাকে লোকে ইউজিন বলে ডাকে। “জেনিয়া”ও বলে। রাশিয়া আর ইউক্রেনে ওটা হলো ইউজিনের সংক্ষিপ্ত রূপ।
বিচারক: সুন্দর নাম। আপনি কি ওইসব এলাকা থেকে এসেছেন?
ইউজিন: একমত 😀 ওহ, হোয়াট আ ফ্রুটফুল কনভারসেশন;-)
বিচারক: তুমি তাই মনে কর?
ইউজিন: না। আপনার অনুমান ভুল। আমি তা মনে করি না। বাই দ্য ওয়ে, আমি এখনও আপনার বিষয়ে কিছু জানি না–নাকি আপনি বলেছেন, আমি মিস করে গেছি?
বিচারক: কোন বিষয়? আপনার সম্পর্কে কিছু জানান।
ইউজিন: আচ্ছা? আমি আসলে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি, আপনি কোন এলাকার লোক।
বিচারক: আমি এই মহাবিশ্বের লোক। আপনি?
ইউজিন: এটা কি আপনার হবি নাকি, এই যে বেচারা ইহুদি নাবালকদের এমন জটিল জটিল প্রশ্ন করা, যেগুলোর উত্তর তাদের জানা নেই?

দ্বিতীয় কথোপকথন
বিচারক: আপনার কোন মিউজিক পছন্দ?
ইউজিন: আমার পছন্দ এমিনেম। কেননা “পোলাইট কারেক্টনেস”-এর ধার ধারতে হয় না তাকে।
বিচারক: ওএমজি! আমিও এমিনেমকে ভালোবাসি। তিনি আমার ফেভারিট শিল্পী।
ইউজিন: এমিনেম নামটার অর্থ যে কী, আমি জানি না। আমার খালি মনে হয় “এনেমা” শব্দটার সঙ্গে এটার কোনো মিল আছে। তবে হি ইজ আ কুল গাই। তার “রিয়াল স্লিম শ্যাডি” গানটা আমার খুব পছন্দ।
বিচারক: আমি জানি তার নামের অর্থ। তার আসল নাম মার্শাল মাথেরস। এই নামের ইনিশিয়াল দাঁড়ায় M&M। উচ্চারণ করলে এমিনেম-এর মতো শোনায়।
ইউজিন: এমিনেম একজন বিখ্যাত crapper। না, raper….ripper মানে বোঝাতে চাচ্ছি–rapper। তার “স্ট্যান” এবং “দ্য রিয়াল স্লিম শ্যাডি” গান দুটি আমার পছন্দ।
বিচারক: আমার পছন্দ হেইলাইস সং।
ইউজিন: মজার রুচি। বাই দ্য ওয়ে, আমার পছন্দ সায়েন্স ফিকশন বই। আপনার দেশের বাড়ি কোথায়, বাই দ্য ওয়ে? আপনি যেখানটায় থাকেন, সেখানকার একটু বর্ণনা দেবেন?
বিচারক: এপসম। ডার্বি রেসের এলাকা। তোমার?
ইউজিন: আমার গিনিপিগ বলছে, ডার্বি নামটা শুনতে খুব সুন্দর।
বিচারক: তার সঙ্গেও আমি কোনো এক সময় কথা বলবো।
ইউজিন: আমার মনে হয় আপনার কিছু টাইপিং লেসন নেওয়া উচিৎ। অথবা আরো সঠিক বানানে টাইপ করা উচিৎ।
বিচারক: দ্যাটস ভেরি রুড।
ইউজিন: উমম…সত্যি বলতে কী, আপনার প্রশ্নটা আমি বুঝি নি
বিচারক: “উমম” কোনো শব্দ নয়। আমার মনে হয়, তোমারই টাইপিং লেসন নেওয়া উচিৎ।
ইউজিন: আমারও একই কথা। বাই দ্য ওয়ে, আমি কিন্তু এখনও আপনার বিষয়ে কিছু জানি না। নাকি আমি মিস করেছি?

তৃতীয় কথোপকথন
বিচারক: হাই দেয়ার! কাজে যাওয়ার বেলা আপনি কি ড্রেস পরতে পছন্দ করেন নাকি ট্রাউজার?
ইউজিন: আমি এখনও ছাত্র। আয় রোজগারের মতো বয়স এখনও হয় নি।
বিচারক: সিনেমা হলে গিয়ে শেষ কী ছবি দেখেছেন আপনি?
ইউজিন: মানে? আপনি বলবেন কি, আপনি কী করেন? মানে আপনার পেশা।
বিচারক: আমি একজন আইটি ম্যানাজার। আপনি?
ইউজিন: ম্যানাজার? ম্যানেজারির কাজটা কেমন লাগে?
বিচারক: কঠিন কাজ। তবে আনন্দও আছে। আপনি কী করেন?
ইউজিন: আমার বয়েস সবে ১৩। এখনও স্কুলে যাই।
বিচারক: তুমি কি টেলিটিউবিজ দেখেছ?
ইউজিন: না। আনফরচুনেটলি আমি দেখি নি। তবে আশা করি সেটা এইসব জঘন্য স্টার ওয়ার্সের চেয়ে ভালো। আপনাকে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি, আপনার বাসা কোথায়?
বিচারক: ব্রাইটন। তোমার?

চতুর্থ কথোপকথন
বিচারক: আমার প্রিয় মিউজক সমসাময়িক জ্যাজ। আপনি কি পছন্দ করেন?
ইউজিন: সংক্ষেপে বললে আমি শুধু বলবো, আমি ব্রিটনি স্পিয়ার্সকে হেইট করি। তার সঙ্গে তুলনা করলে, বাকি সবার গান আমার জন্যে চলে।
বিচারক: আপনি কি কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পছন্দ করেন?
ইউজিন: আমি তালকানা। তবে আমার গিনিপিগ বিটোফেনের ওউড টু জয় শোনে প্রতিদিন সকালে। আমার সন্দেহ, আমাদের প্রতিবেশীরা ওর গলা কেটে ফেলবে একদিন…বাই দ্য ওয়ে, আপনি কী করেন, বলবেন কি?
বিচারক: গিনিপিগ? আপনি কি পশুপাখির ভক্ত?
ইউজিন: হ্যাঁ। একটা সুন্দর, ছোট্ট গিনিপিগ। কোনো বিরক্তিকর চ্যাটার বট নয়।
বিচারক: আপনার সঙ্গে আর কেউ থাকে?
ইউজিন: থাকে। তবে অন্য কিছু জিজ্ঞেস করুন। আর আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি, আপনি কোথায় থাকেন?
বিচারক: আয়ারল্যান্ড। সবুজ মাঠঘাট আর ভারি বৃষ্টি। আপনার বাসা কোথায়?

Her ছবির পোস্টার

Her ছবির পোস্টার

কিছুদিন আগে মুক্তি পাওয়া Her সিনেমাটির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে না?

মানি যে, একটা ফাঁকিবাজির পরীক্ষা উৎরে যাওয়া, আর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অর্জন করার মধ্যে অনেক ফারাক। এই লেখা লিখতে লিখতেই দেখছি, নানা জায়গা থেকে নানান আপত্তি উঠছে। অনেকে বলছেন, ইউজিন যা করেছে, সেটাকে ইন্টেলিজন্স বলা যায় না। সে শুধু ট্রিক করেছে। ওপরের কথোপকথনগুলো ভালো করে লক্ষ্য করলে যে কেউ বুঝতে পারবে, ইউজিন যেসব প্রশ্ন বুঝতে পারে নি, সেগুলোর জবাব এড়িয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে বসেছে। কিন্তু কী আর করা। টুরিং টেস্টের নিয়মকানুন তো আর ইউজিন নিজে তৈরি করে নি। কেউ কোনো পরীক্ষায় পাস করে গেলে তাকে সার্টিফিকেটখানা দিতে কসুর করা তো তার প্রতি অন্যায়। ছাত্রটি নকল করেছে বা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে–এরকম হট্টগোল করা তো ঠিক হবে না। এখন যারা বলছেন, টুরিং টেস্ট আসলে সেকেলে হয়ে গেছে, ওটার খোলনলচে পাল্টাতে হবে, তারা কি আসলে পরীক্ষার ফলাফল ধ্রুব ধরে নিয়ে ছাত্রটিকে চিরকাল ফেল করিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হচ্ছেন না?

ইউজিন ট্রিক করেছে, নিঃসন্দেহে। যেমনটা জাদুকর করে থাকেন, মঞ্চে। তবে এটুকু তো মানতেই হবে, ইউজিন মানুষ আর যন্ত্রের মধ্যেকার মান্য লক্ষণরেখাটি মুছে দিয়েছে। এখন এই দুটিকে আলাদা করার কোনো সর্বজনগ্রাহ্য মাপনী এ মুহূর্তে নেই। নতুন কোনো মাপনি চলে আসবে। এরই মধ্যে ১৯৯০ সালে হিউ লোয়েবনার নামে এক উদ্ভাবক আরেক ধরনের টুরিং টেস্ট প্রস্তাব করেছেন। সেটা নাকি আরো জটিল পরীক্ষা।

এইখানে ইউজিন গুস্টমানের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের ঠিকানা দিলাম: http://default-environment-sdqm3mrmp4.elasticbeanstalk.com/। কৌতুহল হলে আপনারা নিজেরা তার সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারেন।

গুস্টমানের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট।

গুস্টমানের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট।

শেষে আপনাদের একটা মিউজিক শুনতে বলি। নিচের লিংকের কম্পোজিশনটি শুনুন।

(Iamus Computer — Adsum, for orchestra)

এই মিউজিকটি কোনো মানুষের তৈরি নয়। এটি কম্পোজ করেছে ইয়ামুস নামে একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম।

জাকির হোসেন রোড, মোহম্মদপুর, ১১ জুন, ২০১৪

 

About Author

শিবব্রত বর্মন

কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক। জন্ম : ১৯৭৩, ডোমার, নীলফামারী। প্রকাশিত গ্রন্থ : ছায়াহীন; মিগুয়েল স্ট্রিট (অনুবাদ) ভি এস নাইপল; কদর্য এশীয় (অনুবাদ) সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ; পাইয়ের জীবন (অনুবাদ) আয়ান মার্টেল