page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

হামাসের টানেল নিয়ে আতঙ্কিত ইজরাইল!

আমেরিকান স্যাটেলাইট ইজরাইল-গাজা সীমান্তে প্রাথমিকভাবে ৬০টি টানেল খুঁজে পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তাদের ধারণা স্যাটেলাইটে ধরা পড়ে নি এমন আরো অসংখ্য টানেল রয়েছে। এই টানেলগুলি ইজরাইলের উপকূলীয় অঞ্চলের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাটির নিচ দিয়ে এঁকেবেঁকে প্রবেশ করেছে। টানেলগুলি আবিষ্কৃত হওয়ার ঘটনাটি ইজরাইলের জন্য আতঙ্কের বলে দাবি করেছে ইজরাইল। হঠাত করে আবিষ্কৃত টানেলগুলি ইজরাইল-হামাস যুদ্ধকেও প্রভাবিত করেছে। এখানে থাকছে এই টানেল নিয়ে ইজরাইলের এখনকার অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া।

যুদ্ধে টানেলের ব্যবহার
যুদ্ধে টানেলের ব্যবহার নিকট অতীতের কোনো ঘটনা নয়। প্রাচীন কাল থেকেই যুদ্ধে কৌশল হিসাবে টানেল বা সুড়ঙ্গ ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

প্রথম শতাব্দীতে জার্মানিক বাহিনী যখন রোমানদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে পেরে উঠছিল না তখন তারা পরিখা খনন করে। এই পরিখগুলি ছিল টানেল দিয়ে যুক্ত। তাদের এই কৌশল সফল হয়েছিল।
রোমানরা এর বিরুদ্ধে কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে নি। এখন হামাসের টানেল নিয়ে ইজরাইলের অবস্থা অনেকটা এরকম।

কয়েক শতাব্দী পরে ২৫৬ সালে সাসানিয়ানরা বর্তমান সিরিয়া যে স্থানে, সেখানে রোমান দুর্গে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। তখন তারা দেয়ালের নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ তৈরি করে। এর ফলে রোমানরা সতর্ক হয়ে সাসানিয়ান টানেলটির দিকে আরেকটি টানেল তৈরি করে। সাসানিয়ানরা তখন টানেলের মধ্যে সালফার দিয়ে সালফার ডাই অক্সাইড গ্যাস তৈরি করে টানেলটি বন্ধ করে দেয়। এটা ইতিহাসের প্রথম রাসায়নিক যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। রোমানরা এতে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যায়। এবং সাসানিয়ানরা দুর্গের দখল নিতে সক্ষম হয়।

গাজা-ইজরাইল টানেলের ভিতরে সাংবাদিকদের জন্যে পোজ দিচ্ছেন ইজরাইলি সেনা কর্মকর্তা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ মাইনার হিসেবে বিশেষজ্ঞ টানেলিং কোম্পানিগুলিকে নিয়োগ দেয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের পরিখা বা ট্রেঞ্চগুলি ধ্বংস করা। তাদের খুব বিখ্যাত অপারেশনটিতে তারা মেসিনসে জার্মান পরিখার নিচে ২২ টি মাইন রাখে। ১৯১৭ সালের ৭ জুন সেগুলির মধ্যে ১৯টি বিস্ফোরিত হয়। এ ঘটনায় দশ হাজার জার্মান সৈন্য মারা গিয়েছিল।

টানেলগুলি যে ধরনের
এই টানেল বা সুড়ঙ্গগুলি মসৃণ নয়। ফিলিস্তিনের গেরিলা বাহিনী হামাস এর আগে মিশর-গাজা সীমান্তে টানেল তৈরি করেছিল। মিশর-গাজা সীমান্তে টানেলের ব্যবহার শুরু হয় ১৫ বছরেরও বেশি আগে। এই সুড়ঙ্গগুলি দিয়ে বিভিন্ন সময়ে অবরুদ্ধ এলাকায় অস্ত্র, লোকজন, বিভিন্ন সামগ্রী আনা-নেওয়া করা হতো।

টানেলগুলি বেশ প্রশস্ত। এই টানেল দিয়ে গাড়ির মত বড় আকৃতির জিনিসও স্থানান্তরিত করা সম্ভব হয়েছে। পরে টানেলগুলি পণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা শুরু হয়। তখন হামাস সরকার এই টানেল পথে পণ্য আমদানির উপর কর আরোপ করে। মিশর সেনাবাহিনী হামাস সমর্থক মুসলিম ব্রাদারহুডকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার পর মিশরের নতুন সরকার এই টানেলগুলি বন্ধ করে দেয়।
২০০১ সাল থেকে ইজরাইলি বর্ডার পোস্টে আক্রমণ করার জন্য ফিলিস্তিনিরা এই টানেলগুলি ব্যবহার করত। তবে এসব টানেল দিয়ে খুব বেশি হামলা তখন হয় নি। কারণ ফিলিস্তিনিরা আরো অনেক সহজ উপায়েই হামলা করতে পারত।

গাজা-ইসরাইল সীমান্তের কাছে একটি টানেলের উৎস আবিষ্কারের পরে ইজরাইলি সৈন্যরা

২০০৬ সালে ফিলিস্তিনিরা নতুন কৌশল অবলম্বন করে। গাজা-ইজরাইল সীমান্তের একটি বর্ডার পোস্টের পিছনে একটি টানেলের মুখ দিয়ে হঠাৎ করে ফিলিস্তিনি আক্রমণকারীরা উঠে আসে। এতে ইজরাইলের সৈন্যরা চমকে যায়। এ ঘটনায় দুজন ইজরাইলি সেনা নিহত হয়। একজন আহত হয় এবং গিলাদ শালিত নামে একজনকে অপহরণ করে ফিলিস্তিনি বাহিনী।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, টানেল তৈরির ব্যাপারে হামাসের ভালো দক্ষতা রয়েছে।

হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পরে এইসব টানেলের সাথে সংযোগ রেখে মাটির নিচে কংক্রিটের বাঙ্কার তৈরি করে।

ইজরাইলি বাহিনী যেসব টানেল আবিষ্কার করেছে সেগুলির ছাদ এবং দেয়াল কংক্রিটের। কোনো কোনো টানেল ৯০ ফুটেরও বেশি গভীর এবং দৈর্ঘ্যে এক মাইলেরও বেশি। এই টানেলগুলি ইজরাইলের অভ্যন্তরে আবাসিক এলাকার খুব কাছেই শেষ হয়েছে।

ইজরাইলি বাহিনী দাবি করেছে তারা টানেলের ভিতর বিদ্যুতের তার, টেলিফোন লাইন, কপিকল এবং বিস্ফোরক দ্রব্য ও অস্ত্রের মজুদের সন্ধান পেয়েছে। অনেক টানেল থেকে বহু শাখা টানেল বের হয়েছে। প্রতিটি টানেলের অনেকগুলি করে বের হওয়ার পথ রয়েছে। আবিষ্কৃত ২৩টি টানেলের সব মিলিয়ে ৬৬টি বের হওয়ার রাস্তা আছে।

মাটির নিচে ফিলিস্তিনি টানেলের এই জটিল বিন্যাসের সাথে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় দক্ষিণ ভিয়েতনাম জঙ্গলে তৈরি করা ভিয়েত কং টানেলের মিল রয়েছে। কিন্তু এই টানেলগুলির ফিনিশিং সেগুলির তুলনায় অনেক ভালো।

গাজা-মিশর সীমান্তে নির্মিত স্মাগলিং টানেল ২০০৯

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই টানেলগুলি তিন ধরনের। প্রথমটি ইকোনমিক, কয়েকশ টানেল মিশরের ভিতিওরে প্রবেশ করেছে। মিশর সরকার এগুলি বন্ধ করে না দেয়া পর্যন্ত হামাস এই টানেলগুলি দিয়ে রকেট, বন্দুক এবং অন্যান্য সরঞ্জাম আনা নেওয়া করেছে।

দ্বিতীয় ধরনের টানেলগুলি হামাসের হাই কমান্ডের সার্ভিসের জন্য বানানো হয়েছিল। আল মনিটর সংবাদ প্রকাশ করেছে, হামাসের একেবারে নিম্ন পদস্থ আমলা থেকে সর্বোচ্চ সিনিয়র নেতাদের প্রত্যেকের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের উপর যে টানেল ন্যস্ত করা হয়েছে তারা সে টানেলের প্রতিটি রুট নিঁখুতভাবে জানে। সবচেয়ে সিনিয়র নেতার জন্য নির্দিষ্ট টানেল ছিল।

আর তৃতীয় ধরনের টানেলগুলি ইজরাইলে আক্রমণ করার জন্য। এই টানেলগুলি দিয়ে হামাস সৈন্যরা গাজা সীমান্তের নিচ দিয়ে ইজরাইলের অভ্যন্তরে যেতে পারবে।

গাজায় কোনো কোনো বিল্ডিং এর ভিতর থেকে টানেলগুলি শুরু হয়েছে। বিল্ডিং এর ভিতরে হওয়ায় টানেল খোঁড়ার সময় বাইরে থেকে আড়াল করা সম্ভব হয়েছে। এবং ভবনের ভিতরে হওয়ায় সবসময় উড়তে থাকা ইজরাইলি দ্রোন থেকেও রক্ষা পেয়েছে টানেলগুলির প্রবেশপথ।

ইজরাইলের মধ্যে ঠিক কোন জায়গায় কোন টানেলটি শেষ হয়েছে তা খুঁজে বের করা কঠিন। কারণ হামাসের পরিকল্পনা হলো একেবারে শেষ মুহূর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী টানেল আরো কয়েক ফুট খুঁড়ে শেষ মাথা থেকে আক্রমণ শুরু করা।

ইজরাইলের জন্য এই টানেলগুলি কতটা আতঙ্কের?
টানেল আবিষ্কৃত হওয়ার পরে ইজরাইল বলছে, হামাসের সৈন্যরা ইজরাইলের সৈন্যের ছদ্মবেশে টানেল দিয়ে ঢুকে পড়তে পারে। ইজরাইল তাদের আশঙ্কা জানিয়েছে, হামাস ছদ্মবেশে এই টানেল দিয়ে ঢুকে পড়ে ইজরাইলের সেনা সদস্যদের, এমনকি সাধারণ ইজরাইলি নাগরিকদেরকেও অপহরণ করতে পারে।

ইজরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে এই ধরনের অপারেশনের জন্য হামাস্য সৈন্যরা এখন তাদের সাথে ট্রাঙ্কুইলাইজার এবং হ্যান্ডকাফ রাখছে। হামাসের লক্ষ্য হবে এই ধরনের প্রতিটি বন্দির বিনিময়ে ইজরাইলের কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনিদের মুক্তি আদায় করা। এর মাধ্যমে মাহমুদ আব্বাসের সরকার যা করতে পারে নি অর্থাৎ ইজরাইলের দখলদারিত্ব প্রতিরোধ করতে চায় হামাস।

ইজরাইলি সেনাবাহিনীকে পিছন দিক দিয়ে আক্রমণ করতেও হামাস এইসব টানেল ব্যবহার করতে পারে বলে ইজরাইলের ধারণা।

ইজরাইল ডিফেন্স ফোর্স বা আইডিএফ বলেছে, এইসব সুড়ঙ্গ ইজরাইলি সিভিলিয়ানদের অপহরণ করা, ছদ্মবেশে অনুপ্রবেশ করে হত্যাযজ্ঞ চালানো এবং বিশৃংখলা তৈরি করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।
ইজরাইল সমর্থনকারী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ধারণা গাজাতে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ইজরাইলি সৈন্যদের পাশাপাশি আইডিএফের সৈন্যদেরকে অ্যামবুশ করার জন্যও হামাস এইসব সুড়ঙ্গ ব্যবহার করছে।

ইজরাইলি সৈন্যরা সম্প্রতি খুঁজে পেয়ে ধ্বংস করেছে এই টানেলটি। এটি গাজা থেকে ইজরাইল গিয়েছিল।

গত ২২ জুলাই, সোমবার অনুপ্রবেশকারীদের হাতে চারজন ইজরাইলি সেনা নিহত হয়েছে। তার আগে ২০ জুলাই শনিবার ইজরাইলি বাহিনীর হাতে দুজন ফিলিস্তিনি অনুপ্রবেশকারী নিহত হয়।

ইজরাইল টানেল-হামলা প্রতিরোধ করবে যেভাবে
এই টানেল-হামলা প্রতিরোধ করার জন্য এখনো কোনো প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে নি বলে জানিয়েছে ইজরাইল। প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে অনেক আধুনিক সুবিধা ইজরাইলের থাকলেও টানেল শনাক্ত করার মত প্রযুক্তি ইজরাইলের কাছে নেই। টানেল কোথা থেকে শুরু হয়েছে এবং ইজরাইলের অভ্যন্তরে টানেলের শেষ মুখ কোথায় তা বের বের করতে পারছে না বলে দাবি করছে ইজরাইল।

তাই টানেলের প্রবেশমুখ খুঁজে পাওয়ার জন্য গাজার প্রত্যেকটি বিল্ডিং-এ তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে ইজরাইলি সেনাবাহিনী।

কোনো অনুপ্রবেশকারী যাতে ইজরাইলে ঢুকতে না পারে এজন্য ইজরাইলের সেনাবাহিনী সীমান্তে কড়া নজর রেখেছে। ইজরাইল সীমান্তের কাছে বসবসকারী ফিলিস্তিনীদেরকে বারবার বলে দেওয়া হয়েছে তারা যেন ঘর থেকে কিছুদিন বাইরে না বের হয়।

হঠাৎ করে টানেল আবিষ্কারের পর যুদ্ধ বিষয়ে ইজরাইলের অবস্থান
যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি দিয়েও ১৭ জুলাই গাজায় ইজরাইলের সেনাবাহিনী স্থল অভিযান শুরু করে।

এ ব্যাপারে ইজরাইল বলেছে, ১৭ জুলাই তারা স্থল অভিযান শুরু করার আগে এক সপ্তাহ আক্রমণ স্থগিত রাখতে চেয়েছিল এবং হামাসকে তাদের মনোভাব পরিবর্তন করার জন্য দুই সপ্তাহ সময় দিয়েছিল কিন্তু হামাস তা অগ্রাহ্য করেছে।

টানেল আবিষ্কার করার পর ইজরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আইডিএফকে নির্দেশ দিয়েছেন যত বেশি সম্ভব টানেল যেন তারা ধ্বংস করে।

নেতানিয়াহু বলেছেন, যতদিন লক্ষ্য অর্জিত না হবে ততদিন অপারেশন চলবে।

ইজরাইলের বক্তব্য হলো, যেহেতু গত দুইবারের সংঘর্ষের চেয়ে এবারের সংঘর্ষে তাদের নিহত সেনাসংখ্যা বেশি তাই তারা এই জীবনদান বৃথা যেতে দিবে না। সে কারণে টানেল আতঙ্ক সম্পূর্ণ নিরসন না করা পর্যন্ত তাদের কথিত এ যুদ্ধ তারা থামাতে চায় না।

ইজরাইল বলেছে, যদি এ যুদ্ধ থেমে যায় তাহলে গাজায় আইডিএফের অপারেশন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।


(Joining the tunnel diggers in the Gaza Strip — ডয়চে ভেলে ভিডিও ২০০৯)

ইজরাইল আরো বলেছে, এই যুদ্ধ কোনো ঐচ্ছিক ব্যাপার নয়, এই যুদ্ধ প্রয়োজন।

যুদ্ধে একতরফাভাবে শুধু ফিলিস্তিনি মানুষ নিহত হচ্ছে এমন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইসারায়েলের বক্তব্য, হামাস প্রতিটি ইজরায়য়েলির মৃত্যুতে বিজয়োল্লাস করে এবং প্রতিটি ফিলিস্তিনির মৃত্যুকে ইজরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা গড়ে তুলতে ব্যবহার করে।

আন্তর্জাতিক চাপ এই পরিস্থিতিতে কোনো প্রভাব ফেলছে কিনা?
ইজরাইল স্থল অভিযান শুরু করার পর থেকেই যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য ইজরাইলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। ২০ জুলাই রবিবার প্রেসিডেন্ট ওবামা দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ করার আহবান জানিয়েছেন। জাতিসঙ্ঘ এই পরিস্থিতিতে একটি জরুরী বৈঠক আহবান করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট জন কেরি দ্রুত এই সংকট নিরসনের জন্য কায়রো গিয়েছেন।

ইজরাইল প্রচারণা চালাচ্ছে সাধারণ ফিলিস্তিনি নাগরিকদের হতাহত করা কিংবা হত্যার সাথে তাদের সম্পর্ক নেই।

কিন্তু ইজরাইলি হামলায় বহু ফিলিস্তিনি শিশু ও সাধারণ নাগরিক হত্যার বিষয়টি আর আড়ালে নেই। এ কারণে ইজরাইলের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন কমে গেছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলি বলছে, নেতানিয়াহু কতদিন এই চাপ সামলাতে পারবেন তা পরিষ্কার না।

আর অন্যদিকে ইজরাইল বলছে যুদ্ধ বন্ধ না করার দায় হামাসের । ইজরাইলের এবং ইজরাইলের আন্তর্জাতিক সমর্থকদের দাবি, ইজরাইল চাইলেও হামাস যুদ্ধ বন্ধ করতে চাচ্ছে না।

ইজরাইল এবং ইজরাইল সমর্থক মিডিয়া বলছে টানেলগুলি ব্যবহার করে হামাস জীবিত অবস্থায় ইজরাইলি সেনাদের অপহরণ করার কৌশল অবলম্বন করবে।

টানেল নিয়ে সাধারণ ইজরাইলি নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া যেমন
প্রকৃতপক্ষে ইজরাইলের অভ্যন্তরে কোনো যুদ্ধ বা সংঘর্ষ ঘটছে না। ২০০৯ ও ২০১২ সালেও হামাসের সাথে সংঘর্ষ ঘটেছিল গাজায়, ইজরাইলে নয়। ২০০৬ সালে লেবাননের সাথে যুদ্ধ হয়েছিল লেবাননে, ইজরাইলের ভূখণ্ডে কোনো যুদ্ধ হয় নি।

ইজরাইলে হামাস রকেট নিক্ষেপ করলেও ইজরাইলের পথেঘাটে যুদ্ধের কোনো চিহ্ন নেই। প্রকৃত যুদ্ধের ময়দান ইজরাইলের বাইরে।

পশ্চিম তীরে ইজরাইলের নিরাপত্তা জোরদার হওয়ার কারণে বাইরে থেকে প্রতিপক্ষের জন্য ইজরাইলে প্রবেশ করা কঠিন।

কিন্তু টানেল আবিষ্কৃত হওয়ার পর ইজরাইলের অভ্যন্তরে হামাসের সৈন্যদের অনুপ্রবেশ করার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইজরাইলের জন্য এটা আতঙ্কের যে যুদ্ধ ইজরাইলের মূল ভূখণ্ডে চলে আসতে পারে।
এই আশঙ্কাকে ইজরাইলের অধিবাসীদের জন্য এখন আতঙ্কের কারণ হিসেবে বিবেচনা করছে ইজরাইল সরকার।

১৯৭৪ সালে একবার ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা লেবানন সীমান্ত দিয়ে ইজরাইলে ঢুকে মালুত শহরের একটি স্কুল থেকে ১০০ জনের বেশি শিশু জিম্মি করেছিল। ইজরাইলি বাহিনী সেসময় ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের ঠেকাতে স্কুল বিল্ডিং-এ হামলা চালায়। এবং সে ঘটনায় তখন ২৫ জন ইজরাইলি নিহত হয়।


(হামাস আল-আকসা টিভি প্রযোজিত এবং জুলাই ৭, ২০১৪ তে প্রচারিত ‘দি অর্চারড অব ডেথ’ সিনেমার অংশবিশেষ। এখানে দেখা যায় হামাস সৈন্যরা একজন ইজরায়েলি সৈন্যকে অপহরণ করে। এবং সেই সৈন্যটির সঙ্গীরা যখন তাকে খুঁজছিল তখন তাকে হামাসের খোঁড়া বিশেষ টানেলের মধ্যে লুকিয়ে রাখে হামাস সৈন্যরা।)

পরবর্তীতে ইজরাইল কর্তৃক পশ্চিম তীর ও গাজা দখলের কারণে ১৯৮৭ সালে হামাস গঠিত হয়। হামাসকে সমর্থন দেয় ও সহযোগিতা করে মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড। ১৯৮৯ সালে হামাস ইজরাইলে প্রথম হামলা চালায় ও একজন সেনা সদস্য হত্যা করে ও একজন সেনা সদস্য অপহরণ করে।

ইজরাইল নিশ্চিতভাবেই যুদ্ধের আগে এই টানেলগুলি সম্পর্কে সচেতন ছিল। প্রথমত, যুদ্ধে টানেলের ব্যবহার একটি প্রাচীন কৌশল। অথচ ইজরাইল বলেছে গত সপ্তাহে তাদের সৈন্যরা গাজায় স্থল অভিযান শুরুর আগ পর্যন্ত তারা টানেল নেটওয়ার্কের সম্ভাবনা অনুমান করে নি। ইজরাইলের এ বক্তব্যকে কেউ কেউ দেখছেন নিরাপত্তার ব্যর্থতা হিসাবে, বলেছেন এর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
কিন্তু তার আগেই ইজরাইল ঘোষণা দিয়েছে টানেল ধ্বংস করা জরুরী।

গাজার একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মকাহিমার আবুসাদা বলেছেন, হামাসের মূল দাবি অর্থাৎ দীর্ঘকালীন যুদ্ধবিরতি এবং গাজা সীমান্ত মুক্ত করে দিলে হামাস হয়ত এটা গ্রহণ করবে। তিনি বলেন, যদি দীর্ঘকালীন যুদ্ধবিরতি হয় এবং গাজা দখলমুক্ত হয় তাহলে হামাসের আর ওই টানেলগুলির প্রয়োজন কী?

তিনি আরো বলেন, ফিলিস্তিনিদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্যটি টানেলগুলি বন্ধ করার বিনিময়ে সামনে আনা উচিৎ। আবুসাদা বলেন, ব্যাপারটি এ রকম না যে হামাস এই টানেলগুলির মাধ্যমে ফিলিস্তিন স্বাধীন করবে। তিনি বলেন, এই সংঘর্ষ বারবার চলতেই থাকবে যদি না এই সংঘর্ষের মূল সমস্যার সমাধান করা হয়।

টানেল নিয়ে হামাসের বক্তব্য
হামাসের মুখপাত্র মুশির আল-মাসরি এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, জায়োনিস্ট শত্রুরা টানেলগুলি ধ্বংস করতে স্থলযুদ্ধ ঘোষণা করেছে, কিন্তু আমরা বলছি আল-কাসেম বিগ্রেডের হাজার হাজার মুজাহিদিন যারা নিজেদের আঙুলের নখ দিয়ে এইসব টানেল খুড়েছে, আর জায়োনিস্ট শত্রুরা এসব টানেলের মাত্র এক ভগ্নাংশের সন্ধান পেয়েছে, আল্লাহর ইচ্ছায় তারা এরকম আরো অনেক টানেল খুড়বে।


(হামাস মুখপাত্র মুসশির আল-মাসরির টিভি বক্তব্য – ইজরাইল মাত্র কিছু টানেলে পৌঁছতে পেরেছে – ইউটিউব ভিডিও)

সম্মানিত স্বাধীন মানুষজন, আমাকে নিশ্চিত করতে দিন, যুদ্ধ যদি থেমেও যায় তাহলে আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা সামরিক ক্ষয়ক্ষতি পুনরুদ্ধার করবে। আমাকে পুনরায় নিশ্চিত করতে দিন, আমাদের ফিলিস্তিনি জনগণ রক্তে যে মূল্য দিয়েছে তা সত্ত্বেও এবং জায়নিস্ট সন্ত্রাসীদের ধ্বংস মেশিনের এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি স্বত্ত্বেও দুটি ছুটির দিন পেয়েছে – ঈদ উল ফিতর এবং বিজয় দিবসের ছুটি। আমাদের প্রতিরোধ বাহিনী দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং তা বিজয়ের মুহূর্ত পর্যন্ত পৌঁছবে।

 

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক
সাম্প্রতিক ডেস্ক