page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

হেয়ারস্টাইল

manosh2012 a

আমার দাড়ি গজাতে একই-ক্লাসে-পড়া অনেকের খেকেই বেশ খানিক বেশি সময়ই লেগেছে। আর আমার চুল ছিল লোকের ভাষায় রেশমী। আমি সেই বহুদিন আগেই আমার যে চেহারাটা ভেবে রেখেছিলাম তাতে আমার রেশমী চুল বড় হয়ে বাবড়ি বাবড়ি হবে, আর মুখে একমুখ ভর্তি দাড়ি থাকবে।

মনে মনে, হয়তো, তখনকার ভারতীয় মারকুটে ব্যাটসম্যান সন্দ্বীপ প্যাটেল-এর চেহারার নমুনা সামনে থেকে থাকবে। কিংবা হয়তো একবার বা দু’বার টিভিতে-দেখা উঁচা-লম্বা কবীর বেদীও হয়ে থাকতে পারেন। তবে আসলে তাও না। সাদাকালো টিভিতে কোনো এক অনিচ্ছুক প্রতিবেশীর বাড়িতে আধখানা মর্জিনা-আবদাল্লা দেখেছিলাম। সেখানে আবদাল্লার দাড়ি-চুলই আমার সব থেকে ঠিক মনে হয়। সন্দ্বীপ কিংবা কবীর দুজনকেই বেশি-বেশি পরিপাটি মনে হয়েছিল। আমি আরো কম পরিপাটি দাড়িচুলে আমার চেহারা আবদাল্লাতেই সাব্যস্ত করেছিলাম মোটামুটি।

manoshchy logo 1

পরে জেনেছিলাম ওই আবদাল্লার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন দেবরাজ রায়। আবদাল্লা হওয়া ছাড়াই দিব্যি তাঁর দাড়ি ছিল। যদিও আবদাল্লার জন্য ওই দাড়ি ব্যবহার করতে পারেন নাই। হয়ত দীনেন গুপ্ত দেন নাই। নিজের অল্প অল্প দাড়ি তিনি সম্ভবত ব্যবহার করতে পেরেছিলেন সত্যজিৎ রায়-এর প্রতিদ্বন্দ্বী-তে। এখানে দেবরাজ রায়কে দেখার পর আমার আর সন্দেহই থাকল না কী ধরনের চুলদাড়িওয়ালা মুখ আমার একখানা চাই। দেবরাজ রায়ের টিকোলো নাক, টানাটানা চোখ, কোঁকড়া আভাসওয়ালা চুল। ওসবের কাছাকাছিও কিছু নাই আমার। কিন্তু মোটামুটি তাঁর চুলদাড়িতেই আমার ভবিষ্যৎ আমি কল্পনা করে নিয়েছিলাম।

কিন্তু মুস্কিল হল দাড়ি যখন একটু একটু চোখে পড়ার মতো হয়েছে, চুল তদ্দিনে বুঝিয়ে দিতে শুরু করেছে যে বিশেষ লম্বা কাল মাথায় থাকা হবে না। বড় বেদনার সঙ্গে, আমি মেনে নিলাম, চুলদাড়ির তোলপাড় নিয়ে আমার থাকা হবে না। এরপর সময় গড়িয়েছে। আমি হেয়ারস্টাইল বলতে বেছে নিলাম যতদিন পর্যন্ত চুল বড় হতে থাকুক, থাক না! তারপর একদিন নাপিতের কাছে গিয়ে আমি মাথা মুড়িয়ে আসতাম। একদম ন্যাড়া মাথা। সেই ন্যাড়া থেকে লম্বাচুলই আমার ‘ফ্যাশন’ বহুকাল। দু’য়েকবার আমি নিজেই কাজটা করার চেষ্টা করেছিলাম। দাড়ি যেহেতু কামাতাম না, আমার রেজরগুলো পড়েই থাকত। তো দু’য়েকবার আমি তা দিয়ে মাথা মোড়ানোর চেষ্টা করে রক্তাক্ত হয়ে গেলাম। তারপর থেকে আর চেষ্টা করি না।

বিয়ের পর আমার ন্যাড়া করা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আমার গিন্নি আমার ন্যাড়া-মাথা নিয়ে কোনো আগাম আপত্তি করেন নি। তাঁর করবারও কথা নয়। মানে করবার মতো মানুষ তাঁকে মনে হয় নাই আমার। তুচ্ছ চুল থাকা না-থাকা নিয়ে গুরুতর স্ত্রী-অধিকার প্রয়োগ না করেও তিনি সুখী থাকবার উপায় জানেন বোধহয়। তাছাড়া, স্বামীর ক্রমশ বিলীয়মান চুলের মাথা আর ন্যাড়া মাথা এ দুয়ের ভিতর বাছাই করে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারা চাট্টিখানি কথা নয়। ফলে আমার স্ত্রীকে এ বিষয়ে বিজ্ঞ-নিরপেক্ষই মনে হয় আমার। কিন্তু তারপরও আমার ন্যাড়ামাথা বন্ধ হবার যোগাড়।

পয়লাতে আমি লক্ষ্য করলাম বিয়ের পর যুগল ফোটো তুলতে হয়, ঐচ্ছিকভাবে বা ইচ্ছানিরপেক্ষভাবে। এর মধ্যে ক্যামেরাতে দুনিয়ায় বিপ্লব হয়ে গেছে, সেলফোন সমেত। সার্বভৌম ন্যাড়া মাথা যত মর্যাদাকর আর দৃষ্টিসুখকর দেখায়, যুগলফোটোতে কল্পনায় আমার নিজের কাছেই তা আর লাগল না। এসব করতে করতে আমার আর ন্যাড়া করা হয় না।

manosh 7

স্ত্রী বন্যা মীর্জার সঙ্গে লম্বা চুলের মানস চৌধুরী

দীর্ঘকাল লম্বাচুল অধ্যায়ের পর (অবশ্য সম্মুখচাঁদি খালি অবস্থাতেই) সেদিন গেলাম পাড়ার দোকানে। পাড়ার যে দোকানটা আমি চিনি সেটাতে কোনো এক কারণে সেদিন তিনজনের সিরিয়াল পড়েছে। কাতর মুখে আরেকটা দোকানের খোঁজ জানতে চাইলে কেশশিল্পী আমাকে খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে আরেকটা দোকানের খোঁজ দিয়ে দিলেন। পাশের রাস্তাতে ঢুকে সেই দোকান পেয়ে দেখি সেখানে জনা তিনেক খেলাধুলার মুডে আছেন। কাউকেই ঠিক খদ্দের মনে হল না। কিন্তু কে কোন কাজের লোক তা বোঝা যায় না।

আমি কোনো চেয়ারে বসতে পারি কিনা জিজ্ঞেস করাতেই যিনি খুব উৎসাহী হয়ে প্রথম চেয়ারটাই দেখিয়ে দিলেন তাঁকে আমার এই কাজের লোকই মনে হল। আমি বললাম একদম প্রায় চান্দিদেখা ছাঁট দিয়ে ছোট বানাতে। প্রাথমিক তদন্ত সেরে প্রথম মিনিটেই আমার চুলের হাল বা বেহাল দেখে প্রায় স্বগতোক্তির মত করে তিনি জানান দিলেন যে এমনভাবে সামনের চুলগুলো রেখে দেবেন যে আমার টাক ঢেকে দেয়া যাবে। আমি সম্ভাব্য ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’ পদ্ধতি কল্পনা করে আতঙ্কিত হয়ে বললাম ‘আহা, এসেই না বললাম একদম আর্মিমার্কা বানিয়ে দেন?! টাক আর ভুড়ি কি ঢেকে রাখা যায় নাকি?’

এবারে আমার কেশশিল্পী বা কেশহীনতার শিল্পীকে বিষণ্ন শোনাল। “হু, তা ঠিক!” পাশের জন আরও গাঢ়ভাবে একই কথা বলাতে আমি সচকিত হলাম। কোনো এক কারণে আসার পর থেকে এই এক মিনিট বা তার কিছু বেশি সময়ে লক্ষ্যই করি নাই যে বিধান বা তাঁর কলিগ কীভাবে এই বয়সেই বড় বড় দুটো ভুড়ি নিয়ে বসে আছে। আমি আসলে ঢুকবার পর থেকে, ন্যায্য কারণেই, ওদের বাহারী চুল আর তার দারুণ কাট দেখছিলাম। এক্ষণে এই যুগলের ভুড়ি আবিষ্কার করার পর অহেতু বিব্রত হয়ে পড়ে কিছু একটা নতুন বলার চেষ্টা করে বলে বসলাম “ওহো! আপনাদের ভুড়ি তো আমি আগে দেখি নাই। তাহলে এই কথা বলতাম না।” বিধান শীলকে তখন রীতিমত দুঃখিত দেখাল। বিড় বিড় করে এরপর বলতে থাকলেন যে এইটা আর কমে না।

তখনও আসলে তাঁর নাম জানি না। পরে জানলাম। প্রথমে কলিগকে ‘চাচাত ভাই’ বললেও পরে জানালেন গ্রামের ছেলে। উত্তরাতে কেবল তাঁদের এলাকা থেকেই দেড়শ’ ‘শীল’ নাপিত বিভিন্ন দোকানে কাজ করে। দোকানের মালিক অন্যান্য লোক। ও কিছুদিন মিলিটারিদেরও চুল কেটে এসেছেন। সেটা চাকরি ছিল। পরে সেই চাকরি তাঁর কাকা নিয়ে নেন। বুঝলাম ওটা আসলে ইজারার মত কিছু একটা। আর উত্তরাতে এঁরা একজনের খোঁজে আরেকজন এসে দোকানের কাজ নিতে-নিতে এরকম অভিবাসন হয়েছে। এইসব রাজ্যের গল্প।

মাথায় ওড়না জড়ানো মানস চৌধুরী।

মাথায় ওড়না জড়ানো

ছোট চুলে

ছোট চুলে

আমি বিধানকে না বলে পারলাম না চুল না থাকলে বোধহয় কাটতে বেশি সময় লাগে। মনে মনে ভাবলাম এই থিওরি ও হয়ত মানবেন না। কিন্তু পরম পরিতোষের সঙ্গে ও জানালেন “একদম ঠিক কথা। চুল থাকলে তো ফচাং ফচাং করে যে কোনো কাট দেয়া যায়। আপনার তো যা করতে যাই টাক বাইরে যায়।” তারপর বললেন, হয়তো আমাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যই, “তারপরও এইরকম চুল নাই মাথায় দশ মিনিটে কাজ করে দিই। কাটফাটের তো কিছু নাই। কিন্তু আপনার সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগছে, সেইজন্য এক ঘণ্টা লাগায়ে দিলাম।” আমি চুলহীন জীবনে আমার কথার মূল্য বুঝতে পেরে কাটানো ঘণ্টাটির যথাসম্ভব একটা উচ্চ আর্থিক দামের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকলাম।

বিধান যে দোকানে কাজ করেন সেখানে লাগাতার ফোটো। যেমনটা থাকে আরকি। ক্রিকেট তারকা জাদেজা, ধোনি, ধাওয়ান, ফুটবল তারকা বেকহ্যাম, সিনেমা তারকা সালমান। আরও কারা কারা এখন মনে পড়ছে না। সবাই পুরুষ। সবাই তারকা। সবারই মাথাভর্তি নানারকম চুল। এগুলোর সবই বাজার থেকে কেনা পোস্টার। সহজ ফ্রেইমে বাঁধানো। শেষ দুটো ফোটোগ্রাফ। ওই পোস্টারের মাপেরই। বিধানের। আর তার কলিগের। মাথা ভর্তি ডিজাইন করা চুল।

আমার মাথা প্রায় শেষ তখন। বুঝতে পারছি। বিধানকে বললাম: “চুল-নাই মাথা কাটতে আপনার এত কষ্ট। তো পোস্টারে সব চুলঅলা লোক কেন? যাদের চুল নাই তারা তো এইসব এত্ত এত্ত চুলের মাথা ছবিতে দেখে উৎসাহ পাবে না। তাদের তো বোঝা দরকার চুল না থাকাও একটা বিষয়। এবং সেটা ঠিকঠাক করে কাটতে হয়। সেটাও ফ্যাশন হয়। আপনি দু’চারটা টাকঅলা মাথার ছবি বড় করে লাগান।”

বিধানকে আর একটুও অসন্তুষ্ট মনে হল না। প্রায় উত্তেজনাহীন কিন্তু দারুণ উৎসাহী গলায় বলল “ঠিক তো। আপনি আপনার একটা বড় ফটো প্রিন্ট করে নিয়ে আসবেন?”

উত্তরা, ২২, ২৩, ২৭ জানুয়ারি ২০১৫

Tagged with:

About Author

মানস চৌধুরী
মানস চৌধুরী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টারি করে নির্বাহ করি। গল্প, কলাম ইত্যাদি লিখি। সুযোগ পেলে পর্দায় অভিনয়ও করি।