page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

নিউ জার্মান ক্লাসিক দি হোয়াইট রিবন (২০০৯) নিয়ে মিখায়েল হানেকে – ইন্টারভিউ

ইউরোপের অঁতর সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রকারদের একজন মিখায়েল হানেকে। (অঁতর সিনেমা ইউরোপের সিনেমার একটি ধারা, যেখানে সিনেমা নির্মাণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত অন্য শিল্পীদের স্বরকে ছাপিয়ে সিনেমা মূলত তার পরিচালকের চিন্তা, দর্শন ও নান্দনিকতার প্রকাশ হয়ে ওঠে।) ১৯৮৯ সালে হানেকের প্রথম চলচ্চিত্র দি সেভেন্থ কনটিনেন্ট নির্মাণের আগে টেলিভিশন এডিটর এবং থিয়েটার ও টিভি পরিচালক হিসেবে তিনি প্রায় দুই দশক কাজ করেন । নৃশংসতার পাঠ ফানি গেইমস (১৯৯৭), আলফ্রেড জেলিনেক-এর উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ন দি পিয়ানো টিচার (২০০১) এবং থ্রিলার ক্যাশ (২০০৫) ইত্যাদি চলচ্চিত্রসমূহে ১৯৪২ সালে অস্ট্রিয়ায় জন্ম নেয়া হানেকে শিকড়বিহীন মধ্যবিত্ত জীবনের অন্তঃসারশূন্যতা এবং পুরুষতন্ত্রের ত্রুটিসমূহের মুখোশ উন্মোচন করেন। ২০০৯ সালে দি হোয়াইট রিবন এবং ২০১২ সালে আমোর ছবির জন্য তিনি কান এর  পালমে দোর পুরস্কার লাভ করেন। হানেকের চলচ্চিত্র দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলে। ২০০৯ সালে নেয়া এই সাক্ষাৎকারটিতে হানেকে সমান্তরালে তার অন্যান্য ছবি নিয়ে কথা বললেও মূলত দি হোয়াইট রিবন নিয়ে কথা বলেন। জার্মান সাপ্তাহিক দি স্পিগাল-এর অনলাইন সংস্করণ থেকে সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করা হয়েছে। – চিংখৈ অঙোম

ribbon960fullb
দি হোয়াইট রিবন

সাক্ষাৎকার: ফিলিপ এমকি ও লার্স-ওলাভ বায়ার অনুবাদ: চিংখৈ অঙোম

প্রথম পর্ব: প্রত্যেকটা চলচ্চিত্রই তার দর্শককে ধর্ষণ করে

প্রশ্ন: দি হোয়াইট রিবন এর মতো শকিং একটা সিনেমার জন্য আপনি কান এর পালমে দোর জিতলেন। হলিউডে রিপ্রেজেন্ট করার জন্য জার্মানি এখন এমনকি একজন অস্ট্রিয়ান হিসেবেই আপনাকে অস্কারে পাঠাচ্ছে। আমরা আশা করছি অস্কার এর বিচারকরা আপনার এই ছবির নিষ্ঠুরতা হজম করতে পারবে এবং তাদেরকে মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে না।

গোল্ডেন গ্লোব ২০১৩ হাতে মাইকেল হানেকে; Photo by Kevork Djansezian/NBC – © 2013 Kevork Djansezian/NBC – Image courtesy gettyimages.com

গোল্ডেন গ্লোব ২০১৩ হাতে মাইকেল হানেকে; Photo by Kevork Djansezian/NBC – © 2013 Kevork Djansezian/NBC – Image courtesy gettyimages.com

হানেকে: নিষ্ঠুরতা?! আমার এই ফিল্ম অসাধারণ একটা ভালোবাসার গল্প বলে, এবং একদমই নিষ্ঠুর নয় সেটা। এই ছবির অনেকগুলি মুহূর্তই ভালোবাসায় ভরা। কিন্তু আমার ব্যাপারে সবার একটা স্টেরিওটাইপ ধারণা যে আমি শুধু আমাদের ভেতরের অন্ধকার অংশগুলির গল্পই বলি। আসলে আমি মানুষকে অনেক ভালোবাসি, কিন্তু সবার ভালোবাসা পাওয়ার মতো সবচাইতে যোগ্যতম মানুষটিরও কোনো নিশ্চয়তা নেই যে সে সারাজীবন একই রকম থাকবে। আমরা যে কেউ অপ্রত্যাশিত যে কোনো কিছুই করে ফেলতে পারি। জাস্ট সেরকম উপযুক্ত কোনো পরিস্থিতিতে থাকলেই হয়। প্রশ্ন: দি হোয়াইট রিবন একটা জার্মান গ্রামের গল্প, ১৯১৩-১৪ সাল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রাক্কাল, যেখানে রহস্যময়ভাবে সহিংস কাণ্ডকারখানা ঘটতে থাকে। গ্রামের মানবসম্পর্ক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, এমন একটা সিচুয়েশন। এখানে কোনো নায়ক নেই, কোনো নির্বাণ নেই। মানবতা সম্বন্ধে এমনই নেগেটিভ ধারণা আপনার?

হানেকে: মানবতা সম্পর্কে আমার ধারণা মোটেই নেগেটিভ না। তবে আমরা যে দুনিয়ায় বাস করি সেটাতে বিশৃঙ্খলা আর নৈরাজ্যেরই আধিপত্য। আর ড্রামার উদ্দেশ্যই দ্বন্দ্ব দেখানো, এটা আমার বিশ্বাস, এবং আমি এই ব্যাপারটাকে খুব সিরিয়াসলি দেখি।

প্রশ্ন: আপনার সিনেমার পুরুষগুলো ডিস্টার্বড — অসৎ, নিষ্ঠুর আর দুর্বল। শৈশবে আপনি বাবাকে পান নি, আপনি বড় হয়েছেন আপনার মা, দাদি আর আন্টির কাছে।

হানেকে: বাবার অভাব আমি কোনোদিনই ফিল করি নি আসলে। উল্টো, ছোটোবেলা থেকেই পুরুষ জাতিকে আমার ঝামেলার মনে হতো। ফলে আমি যখন ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করা শুরু করি, অনেক ঝামেলা পোহাতে হয় আমাকে। পুরুষ অভিনেতাদেরকে ডিল করতে আমার ঘাম ঝরত, ঝগড়া-হাঙ্গামা লেগেই থাকত। প্রশ্ন: এইজন্যই কি আপনার সিনেমায় নারীর আধিক্য?

ছবিতে স্কুল শিক্ষক ও ইভা

ছবিতে স্কুল শিক্ষক ও ইভা

হানেকে: এইটা সরলীকরণ, একটা আর্টকে তার আর্টিস্টের সাইকোলজি দিয়ে বিচার করার মতো। যেমন, হানেকের মাথায় গণ্ডগোল আছে, সো তার ফিল্মকে গুরুত্ব দেয়ার দরকার নেই। এভাবে ভেবে দর্শক আসলে সিনেমার ছুঁড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জটাকে মোকাবেলা না করে পালায়। যদিও আমি এটা শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, তবুও বলি, পাবলিক বেশিরভাগ এরকম ভাবে, লাইক “হানেকে কী রকম মানুষ, যে এইরকম ফিল্ম বানায়?” প্রশ্ন: খুবই যুক্তিসংগত প্রশ্ন। হোয়াইট রিবনে তো বাচ্চাগুলো পর্যন্ত কী ভয়ংকর রকমের ঠাণ্ডা মাথার নিষ্ঠুর।

হানেকে: বাচ্চারা নিষ্পাপ এটা আমি বিশ্বাস করি না। ইন ফ্যাক্ট, কেউই এটা সিরিয়াসলি বিশ্বাস করে না। বাচ্চারা যখন স্যান্ডবক্সে বালিঘর বানিয়ে খেলে, তাদের সাইকোলজি খেয়াল করবেন! বাচ্চাদের ব্যাপারে যে রোমান্টিক একটা ধারণা, সেটা আসলে তাদের বাবা-মায়ের ইচ্ছার একটা প্রতিফলন কেবল। প্রশ্ন: কিন্তু মানব সভ্যতার ভিত্তি যে ফ্যামিলি, আপনার সিনেমায় সেই ফ্যামিলিকেও আপনি কতগুলো বোবা বোবা নিষ্ঠুর জোম্বি-ভূতের যৌথতা হিসেবে দেখান। এটা কীভাবে আসলো?

হানেকে: আমার সাইকোলজিতে আবার উঁকি মারার আগে বলি শোনেন, আমার তিন-নারীর ফ্যামিলি নিয়ে আমি বেশ খুশি ছিলাম। কিন্তু বাচ্চা থাকতেই আমি মানুষে মানুষে যোগাযোগহীনতার সংকটটা ধরে ফেলি। আমি বলি নীল, আপনি শোনেন সবুজ, কারণ আপনার সেন্সরগুলা অন্যভাবে সেটআপ করা। এটা এমনকি কখনও কখনও ইন্টারভিউয়েও হয়, রাইট? সবারই এই অভিজ্ঞতা হয়, আর সেটার শুরু ফ্যামিলি থেকেই। প্রশ্ন: কঠোর প্রটেস্ট্যান্ট শাসনে বেড়ে ওঠা শিশুরা পরবর্তীতে অথরিটির দাস হিসেবে বেড়ে ওঠে, আপনার ফিল্মে আপনি এমনই দেখিয়েছেন।

দি হোয়াইট রিবনে অ্যানা চরিত্রে  Roxane Duran

দি হোয়াইট রিবনে অ্যানা চরিত্রে Roxane Duran

ছবিতে ডাক্তারের মেয়ে অ্যানা – Roxane Duran

হানেকে: ঠিক তাই, এই শিশুগুলিকে আদেশ পালনে অভ্যস্ত করে গড়ে তোলা হয়েছে। অথরিটিকে মেনে নিতেই হবে, দাঁত কামড়ে সহ্য করে হলেও। এডুকেশনের অর্থ সবসময়ই ব্যক্তি স্বাধীনতাকে বশ করে নেয়া যাতে করে সে সমাজের প্রতিবাদহীন নীরব অংশ হয়ে যায়। সিনেমার বাচ্চাগুলি তাদের বাবা-মার সন্তান লালনপালনের ধারণা এবং পদ্ধতিটাকে ধ্রুবজ্ঞানে পরিণত করে, যদিও সেটা তাদের কোনো খুশি বা আনন্দ দেয় না।

প্রশ্ন: এবং ২০ বছর পরে যখন এই শিশুগুলি বড় হয়, তখন তারাই হয়ে ওঠে জার্মান ফ্যাসিবাদের ভিত্তি। এরকম ইঙ্গিতই কি দিতে চান নি?

হানেকে: চাইলে সেভাবে দেখতেই পারেন। গ্রামটার নাম যে ইচওয়াল্ড, এটা কোনো কাকতাল না। যখন নিয়মের কঠোরতা তার চূড়ায় পৌঁছায় আর যখন একটা আইডিয়া আইডিয়োলজিতে পরিণত হয়, তখন সেটা — যারা সেই আইডিয়োলজি মানে না — তাদের জন্য ভয়ঙ্কর একটা জিনিস হয়ে ওঠে। সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের বীজ কীভাবে বপণ করা হয়, জার্মান ফ্যাসিবাদকে একটা উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করে এই ফিল্ম সেটাই দেখিয়েছে; সেই সন্ত্রাসবাদ ডান কিংবা বাম যেকোনো পন্থা থেকেই আসুক, কিংবা সেটা ধর্মীয় বা পলিটিক্যালি যেকোনো ভাবেই মোটিভেটেড হোক। পাবলিক যখনই অসহায়, অখুশি এবং লাঞ্ছিত, তাদের হাতে আপনি যে খড়কুটাই দিবেন অস্তিত্বের জন্য তারা সেটাই আঁকড়ে ধরবে।

প্রশ্ন: আপনার সিনেমা এই সংকটগুলির কোনো সমাধানও তো দেয় না। দর্শকদের আপনি একটা নৈরাশ্যের পরিণতিতে ঠেলে দিয়ে ভাগেন।

হানেকে: এটা আপনার ব্যক্তিগত অভিমত বা আবেগ। আবেগের সামনে সব যুক্তিই খোঁড়া। কিন্তু সব ইন্টারপ্রিটেশনও এক একটা আলাদা সত্য, কারণ সেটা গ্রহীতার চেতনায় সত্য — যেমন এই ক্ষেত্রে এটা আপনার চেতনায় সত্য। সো, এভাবে ভাবলে, এই ফিল্মে আপনিও কন্ট্রিবিউট করলেন।

দি হোয়াইট রিবন

দি হোয়াইট রিবন দি হোয়াইট রিবন

.jpg” width=”580″ height=”326″ /> দি হোয়াইট রিবন[/caption]

প্রশ্ন: এটা দাবির মতো শোনালো।

হানেকে: কিন্তু দর্শক হিসেবে আপনার আর কোনো পথ খোলা নেই। তাবৎ দুনিয়ার সব ফিল্মেই আপনার অংশগ্রহণ আছে, এমনকি যে ফিল্মগুলি আপনার প্রিজুডিসগুলিকে আরো পাকাপোক্ত করে, সেগুলিতেও। ফিল্মের মাধ্যমে আমি কেবল আপনার ভেতরের মুক্তির ইচ্ছাটুকুকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করি। তবে আপনি চাইলে আমার ফিল্মের মাঝপথেই হল ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারেন। আমার কোনো আপত্তি নেই। ফানি গেইমস এর আমেরিকান ভার্সনের প্রদর্শনী চলাকালীন সময়ে তো…

প্রশ্ন: …যেখানে ধর্ষকামী দুই তরুণ এক পরিবারকে নৃশংসভাবে অত্যাচার করে…

হানেকে: …অনেকেই ওয়াকআউট করে। আমি বুঝতে পারি আমার ফিল্ম সফল, কারণ সহিংসতার এক ধরনের নির্দিষ্ট রুচিতে অভ্যস্ত ভোক্তাদের মজাটা আমি নষ্ট করতে পেরেছি।

প্রশ্ন: দর্শক হল ছেড়ে বেড়িয়ে গেলেই আপনি সেটাকে সঙ্গত বা আপনার সাফল্য ভাবেন? আপনার দর্শকদের প্রতি এটা তো অদ্ভুত বিচার।

হানেকে: ফানি গেইমস এর বিষয়টা একটু আলাদা। এটা কষে একটা চড় বসানোর জন্যই বানানো হয়েছিলো।

প্রশ্ন: আমরা মুভি দেখতে যাবো কেন তাহলে, গালে এরকম একটা চড় খাওয়ার জন্য?

হানেকে: এটা একটা অস্বস্তি মাত্র! একটা চড় মানে দর্শককে চমকে দেয়া, যেন হঠাৎ করে সে সবকিছুকে একটু অন্য চোখে দেখা শুরু করে। আর তা না হলে সে তার প্রত্যাশায় অনড় থাকবে। এবং সেটা পূর্ণ না হওয়ায় হতাশ হবে এবং ওয়াকআউট করবে। আপনি যদি অস্বস্তিতে পড়তে না চান, তাহলে মূলধারার চলচ্চিত্র দেখতে পারেন।

প্রশ্ন: যদি বলি মুভি থিয়েটার থেকে আমরা অস্বস্তিবোধ করে বাড়ি ফিরতে চাই না।

অফিসিয়াল ট্রেইলার – ইউটিউব ভিডিও

হানেকে: আমার বিশ্বাস ড্রামার উদ্দেশ্য কাউকে স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে দেয়া নয়। এটা কখনই এমন ছিলো না, এমনকি সেই গ্রিক ট্র্যাজেডির সময় থেকেও না। প্রত্যেকটা সিনেমাই আসলে ম্যানিপ্যুলেটিভ, এবং তার দর্শককে ধর্ষণ করে। সো, প্রশ্নটা এমন: আমি কেন আমার দর্শককে ধর্ষণ করি? আমার ক্ষেত্রে, আমি তাকে আরো চিন্তার খোরাক জোগানোর জন্য ধর্ষণ করতে চেষ্টা করি, যেন সে চিন্তার দিক থেকে মুক্ত হয় এবং ম্যানিপ্যুলেশনের এই খেলায় তার রোলটুকু ধরতে পারে। তার বুদ্ধিমত্তায় আমার ভরসা আছে। একটা আদর্শ ফিল্ম আসলে হওয়া উচিত স্কি জাম্প এর মতো। ওড়ার সুযোগটুকু তার করে দেয়া উচিত, এবং তার উচিত ঝাঁপ দেয়ার সিদ্ধান্তটা পুরোপুরিই তার দর্শকের উপর ছেড়ে দেয়া।

দ্বিতীয় অংশ: আমরা সবাই ভয়ের মোহে আচ্ছন্ন

প্রশ্ন: আপনার বেশিরভাগ সিনেমাতেই কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত থাকে না। মানে, গল্পের এইটা কে করল টাইপ প্রশ্নগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়। শেষপর্যন্ত আমরা একটা অমীমাংসিত গোলকধাঁধায় আটকা পড়ি। তো আর্ট যদি কিছু না করে কেবল গোলকধাঁধা পয়দা করে…

হানেকে: …তাহলে বলব আপনি সবকিছু খুব সহজেই পেতে চান। এই ফিল্মগুলোতে যা যা ঘটে তার সবকিছুরই একটা যৌক্তিক ব্যাখ্যা অবশ্যই আছে। এখন সেটা কী কী, সেটা বলতে বললে তো আর…

প্রশ্ন: তাহলে আপনি উত্তরগুলি জানেন বলছেন?

হানেকে: অফকোর্স জানি। কিন্তু উত্তরগুলো জেনে আপনার কী লাভ হবে? যদি আমার কথা বলেন, দর্শক হিসেবে আমি সহজ সমাধানগুলোর চাকচিক্যে ধোঁকা খেতে চাই না। আমি জানি এগুলি আসল সমাধান না। দুনিয়া অতো সোজা না। সত্যি কথা বলতে কী, বইপত্তর আর সিনেমা থেকে আমার মনে গেঁথে আছে এবং থাকে আসলে শুধু সেগুলি যেগুলি আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিলো।

দি হোয়াইট রিবন (২০০৯)

দি হোয়াইট রিবন (২০০৯)

প্রশ্ন: মানে ধরুন, শুধু রোগ নির্ণয় করাটুকুই কি যথেষ্ট আর্টের জন্য?

হানেকে: এই করাটাই তো অনেক করা। আমার ফিল্মগুলি আসলে একটা রিঅ্যাকশান। যে ছবিগুলো অলরেডি আছে সেগুলির। আর মূলধারার ছবিওয়ালারা সব গর্দভ, আমি সেটা বলছি না। আমি যে অন্ধকার খাদগুলি দেখি, তারাও সেগুলি দেখে, কিন্তু তারা সেগুলি ইচ্ছে করেই ইগনোর করে, কারণ এগুলি দেখিয়ে ঝামেলা করতে চায় না তারা। প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে সমর্থন করে যে ছবিগুলি সেগুলির বিক্রি ভালো, দর্শক সেগুলি ভালো খায়।

প্রশ্ন: তাই! হালের কমার্শিয়াল হরর ফিল্মগুলিও তো অস্বস্তিকর আর ডিস্টার্বিং দৃশ্যে ভরা। এবং শয়তানগুলি সিনেমা শেষে বেঁচেও থাকে, যাতে পরের পর্ব বানানো যায়।

হানেকে: কিন্তু সেটা আলাদা। এই ছবিগুলো সহিংসতা, মানে ভায়োলেন্সকে অবাস্তব করে দেখায়, ফলে সেটা ভোগ্য হয়, লোকে খেতে পারে। এটা ধরুন, ঘোস্ট ট্রেন বা ভূতের ট্রেনে চড়ার মতো। আমি আরাম করে নিজেকে ভয় পেতে দিচ্ছি, কিন্তু আমি জানি যে আমার কিচ্ছু হবে না। আমার মনে আছে যখন কুয়েনটিন টারানটিনোর পাল্প ফিকশন বের হয়, আমি ইয়াং পোলাপাইনে ভরা একটা ম্যাটিনি শোতে বসে ছিলাম। একটা ছেলের খুলি উড়িয়ে দেয়ার সেই বিখ্যাত দৃশ্যটা থিয়েটারের দর্শকদের মধ্যে তুমুল শোরগোল সৃষ্টি করে। তাদের কাছে সেইটা জোস্ একটা ব্যাপার লেগেছিলো আর হাসতে হাসতে তাদের প্রায় মরে যায় যায় অবস্থা হয়েছিলো।

প্রশ্ন: আর আপনার?

হানেকে: আমার মন খারাপ হয়েছিল। আমার মনে হয়েছে এটা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। আমি ভায়োলেন্স সইতে পারি না। যে কোনো ধরনের ফিজিকাল ভায়োলেন্সে আমার এলার্জি। আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। তো এটাকে কনজিউমেবল করে এভাবে পরিবেশন করাটা অন্যায়। মানে এই যে এটাকে সবার হাসির একটা ব্যাপার বানিয়ে খাওয়ানো। প্রশ্ন: এটা আপনার মুখ থেকে শুনছি! আপনার ফিল্মগুলিও তো সহিংসতায় ভরা।

হানেকে: কিন্তু কখনোই সেটা দেখানো হয় না, এবং কখনোই সেটা আকর্ষণের মূল হয় না। এটা বীভৎস একটা ব্যাপার আসলে। বরং দর্শকের কল্পনা নিয়ে খেলাটা বেশি কঠিন আর বুদ্ধিবৃত্তিক লাগে আমার কাছে। দর্শকের এই ফ্যান্টাসি দৃশ্যমান যে কোনো দৃশ্যের চাইতে সবসময়ই বেশি পাওয়ারফুল। কাঠের মেঝে শব্দ করে ভাঙতে থাকাটা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা দৃশ্যমান কোনো ভূতের চাইতে বেশি ভয়ঙ্কর।

প্রশ্ন: অন্যভাবে বললে, যদি আমরা মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ থাকতাম এবং যদি আমাদের মনে কোনো ভয় না থাকত…

হানেকে: …তাহলে ঐ মানুষটার সাথে যে কোনো ভাবেই হোক দেখা করতে চাইতাম আমি…

প্রশ্ন: …তাহলে কি আমরা আপনার সিনেমা নিঃসঙ্কোচে দেখতে পারতাম কারণ আপনি যেই ভয় ইশারা করছেন সেটা আমাদের মাঝে প্রকাশিত হতো না?

হানেকে: আপনি যে মানুষগুলোর কথা বলছেন বাস্তবে আসলে এরকম কারও অস্তিত্ব নেই। আমি বিশ্বাস করি যে আমরা সবাই ভয়ের মোহে আচ্ছন্ন। মানুষের অস্তিত্বের একটা মৌলিক শর্ত এটা।

প্রশ্ন: আপনার ভয়গুলি কী কী?

দি হোয়াইট রিবন (২০০৯)

দি হোয়াইট রিবন (২০০৯)

হানেকে: নির্দিষ্ট করে বললে সেগুলির কোনোটাই মৌলিক না। অসুস্থতার ভয়, ব্যথার ভয়। প্রিয় কাউকে হারিয়ে ফেলার ভয়। মৃত্যুভয়।

প্রশ্ন: তো মানুষের যদি অলরেডি এতগুলি ভয় থাকে পাওয়ার মতো, সিনেমার কি তাদেরকে আরো কিছু অপশন হাতে ধরিয়ে দিতেই হবে?

হানেকে: শুনুন, পিয়ের পাওলো পাসোলিনির সালো, অর দি ১২০ ডেইজ অফ সডোম, যেটা ফ্যাসিস্ট ইতালির যৌন অবদমিত পিপলের গল্প, এটা আমাকে এমন ভয় পাইয়ে দিয়েছিলো যে আমি দুই সপ্তাহ অসুস্থ ছিলাম। পুরোই বিধ্বস্ত। আজ পর্যন্ত এটা দ্বিতীয়বার দেখার মতো সাহস করে উঠতে পারি নি। এরকম ভয় আর জীবনেও পাই নি আমি। এবং এরকম এত গভীরভাবেও কখনো উপলব্ধি করি নি।

প্রশ্ন: আপাতদৃষ্টিতে আধুনিক মধ্যবিত্ত সমাজেও তো এরকম ভয় পাইয়ে দেয়ার মতো শূন্যতা অনেক, যেখানে আপনি বারবার ফিরে গেছেন গল্পের রসদ খুঁজতে।

হানেকে: এটাই সবচেয়ে ভালো জানি আমি। নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি এই গল্পগুলি। তাছাড়া আমার ছবির দর্শকেরাও মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণীরই, ফলে তাদের জন্যও এটা সহজ হয়। মানে আমার ফিল্মের চরিত্রগুলিকে আইডেন্টিফাই করাটা।

প্রশ্ন: আমার মনে হয় না ব্যাপারটা অতো সোজা, কারণ আপনার সিনেমার চরিত্রগুলি খুবই প্যাথেটিক। মধ্যবিত্তকে এতো সাফার কেন করান আপনি? আপনার এক ছবিতে এক পরিবারের সবাই একসাথে সুইসাইড করে, আরেকটাতে খুন হয়। আর যখন আপনি কোনো সুখী মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি দেখান, শেষমেশ দেখা যায় তারাও একটা আতংকের মধ্যেই থাকে, যেমন “ক্যাশ”-এ।

কান উৎসব ২০০৯-এ  সিনেমার প্রিমিয়ারে শিল্পী ও কুলাকুশলীদের সাথে মিখায়েল হানেকে

কান উৎসব ২০০৯-এ সিনেমার প্রিমিয়ারে শিল্পী ও কুলাকুশলীদের সাথে মিখায়েল হানেকে

হানেকে: আমরা আসলে আমাদের সম্পদপ্রাচুর্য রক্ষা করতে গিয়ে নিজেদেরকেই একটা জেলে পুরে রাখি। “ফানি গেইমস”-এর মূল চরিত্রগুলি যেমন তাদের নিজেদের দুনিয়ারই এক একজন কয়েদি। চোর-ডাকাতের হাত থেকে নিজেদের বিত্ত-বৈভব বাঁচানোর জন্য যে নিরাপত্তা দেয়াল গড়ে তোলে, শেষমেশ দেখা গেল সেই দেয়ালেই বন্দি তারা।

প্রশ্ন: আপনার মধ্যবিত্ত সত্তা নিয়ে আপনি কি নাখোশ তাহলে? তেমনই শোনাচ্ছে কিন্তু!

হানেকে: না না! এরকম সুবিধা অবঞ্চিত ভাবে বেড়ে উঠতে পারাটা সৌভাগ্যের। আমার সেই কৃতজ্ঞতাবোধ আছে। কিন্তু আমরা এরকম প্রচুর মানুষকে দেখি যারা তৃতীয় বিশ্ব থেকে এসেছে এবং তারা আমাদের মতো হতে চাচ্ছে। আমরা কিন্তু তাদেরকে ঠেকাতে চাই। আমরা আসলে নিজেদের ভাগ কমাতে চাই না। বা তাতে ভয় পাই। আর ভয়টাই তো খুব দ্রুত সহিংসতার দিকে পা বাড়ায়। “ক্যাশ”-এর একটা চরিত্র বলে: “আমরা যা যা করি সেগুলি নিয়ে ভাবো যাতে কোনো কিছুই হারাতে হয় না আমাদের।” আমাদের সোসাইটির প্রেক্ষিতে এটা খুব ইমপোর্টেন্ট একটা কথা।

প্রশ্ন: তো আপনি কি খুব ভালো? কিংবা অন্তত একটু আলাদা?

হানেকে: না। আর সবার মতো আমি নিজেও আসলে খুব ভীতু আর আত্মকেন্দ্রিক। ধরেন, কোনো ইমিগ্রেন্ট যদি আমার দরজায় দাঁড়িয়ে বলে, আমার তো অনেক খালি রুম, সে আমার এখানে থাকতে পারবে কি না। আমি কি তাকে থাকতে দিব মনে হয়? না। আমি তো মহাপুরুষ নই। আমার ফিল্মে আমি একধরনের স্কেপটিসিজম চর্চা করি আসলে — অপর মানুষের ব্যাপারে, আমার নিজের ব্যাপারে। প্রশ্ন: ইন্টারভিউ এর জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ।

ইন্টারভিউর বাইরে

নিউ ইয়র্ক ফিল্মোৎসব ২০০৯-এ দি হোয়াইট রিবন পর্যালোচনায় হানেকে। প্রশ্নকারী মার্কিন পরিচালক Darren Aronofsky

 

হানেকের কয়েকটি ছবির সারসংক্ষেপ

দি হোয়াইট রিবন

wribbon1 প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পূর্বমুহূর্ত। জার্মানির উত্তরাঞ্চলের ছোট্ট একটি কাল্পনিক গ্রাম ইচওয়াল্ড। তাতে একের পর এক ঘটতে থাকে রহস্যময় সব সহিংস ঘটনা। বিভৎস সব মৃতদেহ পাওয়া যায় কিছুদিন পর পর। শাসনের শৃঙ্খলে অবদমিত চেতনা কীভাবে নিষ্ঠুরতায় পরিণত হয়, তা নিয়ে এই ছবি। পালমে দোর, কান ২০০৯ / জার্মান ভাষা / সাদাকালো / ১৪৪ মিনিট / ২০০৯

ফানি গেইমস

funny-games-1997

f2007 ধর্ষকামী দুই তরুণের বিনোদনের খোরাক হয়ে ওঠা এক পরিবারের কাহিনী ফানি গেইমস। এক ছেলে সহ তিনজনের ছোট্ট পরিবার ঘটনাক্রমে বন্দি হয় দুই তরুণের। হত্যার ভয় দেখিয়ে তাদেরকে দিয়ে নানারকম উদ্ভট খেলা খেলানোয় মেতে ওঠে এই দুই তরুণ। বেঁচে থাকতে চাইলে খেলতেই হবে এই খেলা। অন্য কোনো পথ খোলা নেই তাদের। কান মনোনয়ন ১৯৯৭ / জার্মান ও ফ্রেঞ্চ / রঙিন / ১০৯ মিনিট / ১৯৯৭ ফানি গেমস ইউ এস (২০০৭)

ক্যাশ

cache কোনো এক রহস্যময় প্রেরক ধারাবাহিকভাবে একটি করে ভিডিওটেপ রেখে যায় তাদের দরজার সামনে। তাদের বাসার সামনের খোলা জায়গাটুকুর ভিডিও দেখা যায় তাতে একটানা অনেকক্ষণ। প্রাথমিকভাবে নিরীহ থাকলেও ক্রমেই ইঙ্গিতময় হয়ে ওঠে সবকিছু। পুলিশ সহায়তা করে না তাদেরকে। কোনো সরাসরি হুমকির ইশারা না থাকায়। এমনই এক রহস্যে আতংকিত এক দম্পতির গল্প ক্যাশ। সেরা পরিচালক, কান ২০০৫ / ফ্রেঞ্চ / রঙিন / ১১৮ মিনিট / ২০০৫

দি সেভেন্থ কনটিনেন্ট

sevenc ইউরোপের এক দম্পতি সিদ্ধান্ত নেয় অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমাবার। চাকরি ছেড়ে দেয় দুজনই। প্রথমে সন্দিহান থাকলেও তাদের একমাত্র মেয়েকেও শেষমেষ সাথে নেয়ারই সিদ্ধান্ত নেয় তারা। তারপর তারা শান্তভাবে ভাঙতে থাকে ঘরের সমস্ত আসবাব। এবং সবশেষে একে একে হত্যা করে নিজেদের। অস্ট্রিয়ায় ঘটে যাওয়া এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সত্যি ঘটনাকে আশ্রয় করে বানানো এই ফিল্ম হানেকের বানানো প্রথম চলচ্চিত্র। ব্রোঞ্জ, লোকার্নো, ১৯৮৯ / জার্মান / রঙিন / ১০৪ মিনিট / ১৯৮৯

দি পিয়ানো টিচার

piano-t আলফ্রেড জেলিনেকের নোবেল বিজয়ী উপন্যাস দি পিয়ানো টিচার-এর চলচ্চিত্রায়ন এই ছবি, চল্লিশোর্ধ্ব এক নারী পিয়ানো প্রশিক্ষকের যৌন অবদমনের গল্প। যে প্রেমে পড়ে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের। তাদের এই অসম বয়সের প্রেম, ঈর্ষা, ক্ষমতায়নের দ্বৈরথ, এগুলি নিয়েই এই ছবি। যেখানে মর্ষকামী এই পিয়ানো টিচারের কাঙ্ক্ষিত ফ্যান্টাসির বাস্তবায়ন তাকে উপলব্ধি করায় ফ্যান্টাসি ও বাস্তবতার সূক্ষ্ণ পার্থক্য। গ্র্যাঁ প্রিঁ, কান, ২০০১ / ফ্রেঞ্চ / রঙিন / ১২০ মিনিট / ২০০১

Flag Counter

About Author

চিংখৈ অঙোম
চিংখৈ অঙোম

সিলেটবাসী, মনিপুরিভাষী। মনিপুরি ও বাংলায় কবিতা ও কাহিনী লিখি ও অনুবাদ করি। সিনেমা বানাই। কপিরাইটার ছিলাম। এখন সাহিত্য পড়াই।