Subscribe Now
Trending News

Blog Post

অনুমতি না নিয়া ‘তুমি’ বলা সমস্যাজনক
অর্জয়িতা রিয়া
যেইটা সেইটা

অনুমতি না নিয়া ‘তুমি’ বলা সমস্যাজনক 

‘তুমি’ অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপারে বিনা পরিশ্রমে ও বন্ধুত্ব ছাড়াই অ্যাকসেস দেয়। তথা অন্যের প্রাইভেসি নষ্ট করার একটা সূক্ষ্ম ও চালাক হাতিয়ার এইটা।

এই কালচারটা আমার সবসময়ই সমস্যাজনক লাগে। কাউকে যখন ‘আপনি’ বলেন, ডাকের কারণেই কিছু জিনিস বলতে ও জিজ্ঞেস করতে পারেন না তাকে। বা শুধু বয়সে ছোট হওয়ার কারণে তাকে কম সম্মান করার সুযোগ থাকে না। কিন্তু ‘তুমি’ বললে, বিনা দ্বিধায় তাকে আপনি ‘স্নেহ’ কইরা জিজ্ঞেস কইরা বসতে পারেন, “তোমার ফ্যামিলিতে কে কে আছে?”

আপনি যাকে ‘তুমি’ বলতেছেন, সে কি তার কাজের জন্য সম্মান পাওয়ার যোগ্য নাকি না? আপনার ‘তুমি’ বলাটা তাকে সেই সম্মান দেখানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কি না?

যেইটা সেইটা - অর্জয়িতা রিয়া

মেরিট, ব্যক্তির ইন্টেলেক্ট ও সামাজিক অবস্থান এড়ায়া জাস্ট বয়স দিয়া কাউকে ‘তুমি’ বইলা বসা বেশি সমস্যাজনক। এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে আমার বিশাল ক্ল্যাশ হইছে এই নিয়া। পরে ঠিক করছি তাকে পাত্তা দিব না। মানে, উনি ‘তুমি’ বলতে চাইলেও আমি আমার দিক থেইকা ‘আপনি’তে থাকব। পরে দেখা গেল সে আমাকে ‘আদর কইরা’ তুই বলা শুরু করছে। অথচ, আমাকে আদর দেখানোর কোনো কারণ বা জায়গা তার নাই।

তো সবাইকে নিজের সন্তান, নিজের ভাগ্নি, নিজের ছোট বোন বানানো কেন? আমি তো আপনার মেয়ে, ভাগ্নি বা ছোট বোন হইতে চাই না।

বয়সে বড় বাপ-মা এর ‘তুমি’ বলার সঙ্গে বাইরের বয়সে বড় লোকের ‘তুমি’ বলাকে ঘুলাইলে চলবে না। বাপ-মা ‘তুমি’ বলে দায়িত্বের কারণে, আপনি বললে সেই দায়িত্বটা নেওয়া হয় না। বাইরের লোকের সঙ্গে তো সম্পর্ক তেমন না। তারা তাহলে কীসের ভিত্তিতে বয়সে ছোটকে ‘তুমি’ বলে?

বেশিরভাগই লোকই হয়ত কারো সঙ্গে তিন মিনিটের দেখায় সম্পর্ক তৈরিতে আগ্রহী, তাদের দিয়া তো দুনিয়ার প্রত্যেককে বিচার করলে হবে না। আমি আপনাকে পছন্দ করলে অ্যাকসেস দিব আমার সঙ্গে সম্পর্ক আগাইতে। না হইলে না। এইটার জন্যই আমার আপনাকে ও আপনার আমাকে শুরুর সময়টায় ‘আপনি’ বলা দরকার। এই স্পেসটুকুই ভায়োলেট করা ও অন্যকে না দেওয়ার নাম―’তুমি’।

আগে আমি এই ‘তুমি’ বলার প্রতিবাদ করতাম। দেখা গেল, বেশিরভাগ মানুষ এইটাকে আমার ‘অভদ্রতা’ হিসেবে নিতেছে। এই কারণে বিপদেও পড়ছি অনেক। কাজের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ। যেখানে কিনা মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রফেশনাল হওয়ার কথা, অন্যের পারসোনাল চয়েসকে সম্মান করার কথা। কিন্তু তারা জিনিসটাকে ক্ষমতার প্রতিযোগিতাতে পরিণত করে।

বয়স দিয়া ‘তুমি’ বলার আরেকটা বড় সুবিধা হইল, আপনার চেয়ে ছোট বয়সের কেউ আপনার চেয়ে বেশি মেরিটওয়ালা হইলে তাকে সম্মানের জায়গায় স্নেহ দিয়া নিজের অপারগতাকে (সে যেইটা পারে, আপনি তা পারেন না এই অর্থে) আপনি ঢাকতে ও ভুলতে পারতেছেন। তার মেরিট বা আপনার চেয়ে তার বড় হওয়াকে স্বীকৃতিও দিতে হচ্ছে না আর।

বয়সে ছোটদের কত থেইকা আপনি বলবেন তা নিয়া দ্বিধা থাকলে এই সূত্রটা মানতে পারেন, ১৮ হইলেই আপনি। ১৮ এর নিচে আপনি বলাটা তাদের উপর অ্যাডাল্টহুডের দায়িত্ব চাপাইতে পারে, যেহেতু সামাজিক অভ্যাসের কারণে তারা ১৮ হইলে ফিল করে অ্যাডাল্ট হইছে।

এখন যেমন ফেসবুকে, ইন্সটাগ্রামে অনেক মেয়ে আমাকে নক করেন ইনবক্সে। আপু বলেন, আপা বলেন, কিন্তু সবসময় ‘তুমি’। কেন ‘তুমি’ বলেন আমাকে? আপনি কি আমাকে চিনেন ব্যক্তিগতভাবে? আপনার আমাকে ‘তুমি’ বলা কি আমার দ্বারা অ্যাপ্রুভড হইছে?

‘তুমি’, ‘তুই’ মিউচুয়াল। ‘আপনি’ মিউচুয়াল না, তা ডাকের শুরু বা বেসিক। যেই কারণে এইটা দিয়া শুরু করা যায়।

অনেক সম্পর্ক যেমন আবার আছে ‘আপনি’র কারণে সুন্দর লাগে। যেমন, নারী-পুরুষের প্রেমমূলক, যৌনতাপূর্ণ সম্পর্কে ‘আপনি’ বলাটা যেই ছদ্ম অবৈধতা, অনৈতিকতা তৈরি করে, ‘তুমি’ শব্দটা সেইটা তৈরি হওয়াতে বরং বাধা সৃষ্টি করে। আপনিই ভাইবা দেখেন, ‘আপনি’ বইলা ফ্লার্ট করা আর ‘তুমি’ বইলা ফ্লার্ট করার মধ্যে কোনটা বেশি রোমান্টিক ও সাসটেনেবল।

‘আপনি’, যা ঘটবে ঘটবে করতে যাচ্ছে। ‘তুমি’, যা ঘটার অনুমোদন পাওয়া হয়ে গেছে। অর্থাৎ ঘটনার সমাপ্তির শুরু হয়ে গেছে।

তো যেই সম্পর্ক দোস্ত না বানানোর কারণে বা একটু বেশি ভদ্রতাপূর্ণ ফ্রেন্ডশিপমূলক আচরণের কারণে ভালো থাকে, তাকে ফ্ল্যাট কেন বানাবেন?

আমি মাঝখানে একদম বিরক্ত হইয়া, যারা আমাকে ‘তুমি’ বলছে প্রথম দেখায় তাদেরকে আমিও ‘তুমি’ বলা শুরু করছিলাম। নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়া কাজ করে এক বিখ্যাত ফাউন্ডেশন, তার মালিকস্থানীয় এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে কোনো ইভেন্টে দেখা হইছে। সে আমাকে বলে, “তুমি কী করো?” আমি বলছি, “সরি, আমি তুমিতে আনকমফোর্টেবল ফিল করি।”

এইটা শুইনা আমার সামনেই উনি মুখ বেজার কইরা ফেললেন। তারপর, একটা অজুহাত দিয়া উইঠা গেলেন গা। ওইদিন পুরা ইভেন্টে আমার সঙ্গে কোনো আইকন্টাক্টও করেন নাই তিনি।

তো কেমন আলাপ আপনি করতে চান, সম্পর্ক আপনি করতে চান, যে জাস্ট একটা ‘তুমি’ না বলতে দেয়ার কারণে সেই সম্পর্ক বা ঘনিষ্ঠতাই আর আপনার করতে মন চায় না?

তো আমার পাল্টা ‘তুমি’র রেজাল্টও খারাপ হইছে। কিছু দুর্নাম ও ‘অভদ্র’ বা ‘ভদ্রতা শিখে নাই’ উপাধি তৈরি হইছে। এখন ‘আপনি’ বলতে বললেও অভদ্র বলে, কিছু না বইলা তাদের মত ‘তুমি’ বললেও অভদ্র বলে―আমি করবটা কী?

এর বাইরেও একজন সাধারণ অল্পবয়স্ক আর একজন অল্প বয়সে মেরিটওয়ালা লোককে সমান পাল্লায় মাপলে হবে না। ‘সম্মান’ শব্দটা এই কারণেই এক্সিস্ট করে। কাউকে তার প্রাপ্য সম্মান যদি না দেন, সেও তো আপনার মেরিট বিবেচনা কইরা আপনাকে ‘তুমি’ বা ‘তুই’ ডাকতে পারে। নিজে বলতে পারলে, অন্যকে বলতে দিবেন না কেন?

২৮ আগস্ট ২০২১

Related posts

সাম্প্রতিক © ২০২১ । সম্পাদক. ব্রাত্য রাইসু । ৮১১ পোস্ট অফিস রোড, বাড্ডা, ঢাকা ১২১২