আগামী কয়েক মাস বা বছরে কী হবে তা নিয়ে অযথা চিন্তাভাবনা না করে আপনার পরবর্তী পদক্ষেপটি কী হবে তা নিয়ে মাথা ঘামানোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।  

ওভারথিংকিং বা অযথা অথবা অতিরিক্ত চিন্তা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে উঠতে পারে। কর্মক্ষেত্রে চিন্তাভাবনা করে, পরিবেশ-পরিস্থিতি-সম্ভাবনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু কারো কারো ক্ষেত্রে অতি মাত্রায় চিন্তাভাবনা দুশ্চিন্তায় পরিণত হতে পারে, ফলে জন্ম নেয় মানসিক চাপ।

এই মানসিক চাপ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে। যাদের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে তাদের বলা হয় সেন্সিটিভ স্ট্রাইভারস বা হাই-এচিভার্স। গবেষণায় দেখা যায়, সংবেদনশীল ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের মানসিক প্রক্রিয়াকরণের কাজে নিযুক্ত অংশের নিউরোক্যামিকেল ও ব্রেইন সার্কিট তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয়। এর মানে হল, তাদের মস্তিষ্ক শুধুমাত্র বেশি তথ্যই গ্রহণ করে না, সেইসাথে এইসব তথ্যকে অনেক বেশি জটিল উপায়ে বিচার বিশ্লেষণ করে।

যেকোনো বিষয় বা সমস্যা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পাওয়ার জন্যে হাই-এচিভার্সরা প্রশংসনীয়। তবে, একই সাথে তাদের সহজেই মানসিক চাপ ও অবসাদের কবলে পড়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে, যেহেতু কর্মক্ষেত্রে এরা বেশি সময় ও মানসিক শ্রম ব্যয় করে।

অযথা কিংবা অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তা থেকে বের হয়ে আসা সহজ নয়। যারা এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন, হচ্ছেন বা অদূর ভবিষ্যতে হতে পারেন তাদের জন্যে নিচের এই ৫টি টিপস বা পরামর্শ:

 

১. পারফেকশনিজম থেকে দূরে থাকুন

পারফেকশনিজম দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলির একটি। কারণ এটি অযথা চিন্তাভাবনার ওপর নির্ভর করে। যেমন, পারফেকশনিজম আপনার মনে এমন একটি ধারণার জন্ম দিতে পারে যে আপনি যদি “সঠিক” সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন তবে আপনি পুরোপুরি ব্যর্থ। অথবা এমন ধারণা নিয়ে আসতে পারে যে আপনাকে অবশ্যই সমস্ত কিছু জানতে হবে, প্রতিটি ঘটনার সম্ভাব্য পরিণতি অনুমান করতে হবে এবং কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে বিস্তারিত পরিকল্পনা করতে হবে। প্রতিটি  কাজ ও সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য ফলাফল আগে থেকেই অনুধাবন করতে গেলে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।

এই ধরনের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে নিজেকে এই প্রশ্নগুলি করতে পারেন:

  • কোন সিদ্ধান্তটি আমার অগ্রাধিকারের ওপর সবচেয়ে বড় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে?
  •  পরিচিত মানুষদের মধ্যে আমি কাদের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখব না কি রাখব না, এবং এদের মধ্যে কোন এক বা দুইজনের সাথে আমি সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক রাখতে চাই?
  • আজ আমি এমন কোন কাজটি করতে পারি যা আমাকে আমার লক্ষ্যের কাছে নিয়ে যাবে?
  • এই মুহূর্তে আমার যা জানা আছে এবং আমার কাছে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে, আমার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে?

আগামী কয়েক মাস বা বছরে কী হবে তা নিয়ে অযথা চিন্তাভাবনা না করে আপনার পরবর্তী পদক্ষেপটি কী হবে তা নিয়ে মাথা ঘামানোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

 

২. সব সমস্যার পিছনে সমান সময় ব্যয় করবেন না 

কিছু সিদ্ধান্ত আছে যা আপনার জন্যে প্রয়োজনীয়। আবার অনেক সমস্যা আছে যার পিছনে সময় নষ্ট করার কোনো মানে নেই। কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ভেবে দেখুন এতে আপনার কোন কোন লক্ষ্য, অগ্রাধিকার বা আপনার পরিচিতজনদের মধ্যে কারা এতে প্রভাবিত হবে। এটি আপনাকে কোনটি প্রয়োজনীয় এবং কোনটি অর্থহীন তা বুঝতে সাহায্য করবে।

একইভাবে, আপনি যদি যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে খুব বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে থাকেন, তাহলে ১০-১০-১০ পরীক্ষাটি করে দেখতে পারেন। পরীক্ষাটি সহজ। যখন আপনার মনে হবে আসছে দিনগুলিতে আপনার মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল, তখন আপনি ভেবে দেখতে পারেন আজ থেকে ১০ সপ্তাহ, ১০ মাস অথবা ১০ বছর পরে এই সিদ্ধান্তটি নিয়ে আপনি কেমন অনুভব করবেন?

এমন হতে পারে যে আপনার মনে হবে এই সিদ্ধান্তটি এতই অবান্তর যে কিছু দিন পরে আপনার মনেই হবে না যে এটি কোনো বড় ব্যাপার ছিল। আপনার উত্তরগুলি আপনাকে সমস্যা যাচাইয়ের এবং পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় অনুপ্রেরণা জাগাতে সহায়তা করতে পারে।

 

৩. ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের উপরে ভরসা রাখুন

ইনটুইশন, বা অন্তর্দৃষ্টি, বা আপনার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় একটি মানসিক প্যাটার্ন ম্যাচিং গেমের মতো কাজ করে। মস্তিষ্ক একটি পরিস্থিতি বিবেচনা করে, আপনার সমস্ত অভিজ্ঞতা দ্রুত পর্যালোচনা করে এবং তারপরে পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী সেরা সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করে।

এই স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াটি যৌক্তিক চিন্তার চেয়ে দ্রুত কাজ করে। এর মানে হল, যখন হাতে সময় কম থাকে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত হাতের কাছে থাকে না তখন আপনার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বা অন্তর্দৃষ্টি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে ওঠে।

প্রকৃতপক্ষে, গবেষণায় দেখা যায় যে বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার সাথে অন্তর্দৃষ্টি জুড়ে দিলে আপনি আরও ভাল, দ্রুত এবং আরো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। শুধুমাত্র যৌক্তিক বিচারবুদ্ধির উপর নির্ভর না করে এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আপনার আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যাবে।

একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, গাড়ির ক্রেতাদের মধ্যে যারা শুধুমাত্র সাবধানী বিচার বিশ্লেষণের উপর নির্ভর করেন তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত বিষয়ে সন্তুষ্ট থাকার হার এক চতুর্থাংশ। অন্যদিকে, যারা গাড়ি কেনার সময় ইনটুইশনের উপর নির্ভর করেন তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে ৬০ শতাংশ সময়েই সন্তুষ্ট থাকেন। এর কারণ হলো ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভর করলে মস্তিষ্ক অযথা চিন্তা করার সুযোগ কম পায়, ফলে দ্রুত ও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

 

৪. সিদ্ধান্ত গ্রহণের চাপ কমিয়ে আনুন 

সকালের নাস্তায় কী খাবেন থেকে শুরু করে একটি ইমেইলের উত্তরে কী লিখবেন এমন অসংখ্য সিদ্ধান্ত আপনাকে প্রতিদিন নিতে হয়। এই প্রতিটি সিদ্ধান্তই আপনার মানসিক ও সংবেদন ক্ষমতাকে হ্রাস করে। আপনি যখন অবসন্ন থাকেন তখন আপনার অযথা চিন্তা বেশি করার সম্ভাবনা থাকে। তাই আপনি ছোটখাটো সিদ্ধান্তগুলিকে যত বেশি ছাড় দিতে পারবেন, তত বেশি আপনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে মনোযোগ ও পরিশ্রম ব্যয় করতে পারবেন।

আপনার মস্তিষ্কের শক্তি সংরক্ষণের জন্য পরিকল্পনা এবং নিয়মকানুন তৈরি করুন। একই ভাবে, কিছু সিদ্ধান্ত পুরাপুরি বাদ দেওয়ার সুযোগগুলি খুঁজতে থাকুন। যেমন, নিজের জন্যে সবচেয়ে ভালো কাজগুলি বাছাই করুন। অতিরিক্ত  এবং অদরকারি মিটিং এড়িয়ে চলুন।

 

৫. সৃষ্টিশীল সীমাবদ্ধতা তৈরি করুন 

পার্কিনসনের সূত্রের কথা হয়ত শুনে থাকবেন। এই সূত্র অনুযায়ী, কাজ তত সময়ই চলে যত সময় আমরা এটি করতে থাকি।

সহজ কথায়, আপনি যদি একটি প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে নিজেকে এক মাস সময় দেন তবে এটি শেষ করতে আপনার পুরো এক মাস সময় লাগবে। কিন্তু আপনার হাতে যদি কেবল এক সপ্তাহ সময় থাকে, তাহলে এই একই কাজটিই আপনি খুব অল্প সময়ে শেষ করবেন।

একই ব্যাপার দেখা যায় অতি পরিশ্রমীদের ক্ষেত্রে। অযথা চিন্তাকে আমরা যত সময় দেই তত সময় ধরেই এটি কার্যকর থাকে। অন্য কথায়, আপনি যদি নিজেকে এক ঘণ্টার একটি কাজ শেষ করার জন্যে এক সপ্তাহ সময় দেন, তাহলে আপনি অযথাই অপরিসীম সময় ও শক্তির অপচয় করবেন।

আপনি সৃজনশীল সীমাবদ্ধতার মাধ্যমে নিজের কাছে নিজের দায়বদ্ধতা তৈরি করতে পারেন। ফলাফল স্বরূপ, অযথা চিন্তা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে শক্তি ও সময় অপচয়ের প্রবণতাটি কমে আসবে। যেমন, কোনো তারিখ বা সময় নির্ধারণ করুন যার মধ্যে আপনি কোনো একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন বা কাজ সম্পন্ন করবেন।  আপনার ক্যালেন্ডারে বা ফোনের রিমাইন্ডারে এই তারিখটি তুলে রাখুন। অথবা, আপনার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করুন এবং কখন আপনার সিদ্ধান্ত  তাকে জানাবেন তা বলে রাখুন।

এছাড়াও, গঠনমূলক ভাবে সমস্যার সমাধানের জন্য দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়কে বেছে নিতে পারেন।

মনে রাখবেন, আপনার মানসিক গভীরতা আপনাকে প্রচুর সহায়তা করবে। একবার যখন আপনি অতিরিক্ত চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখে যাবেন, তখন আপনি আপনার সংবেদনশীলতাকে শক্তিতে রূপান্তর করতে পারবেন।

সূত্র. মেলোডি উইল্ডিং, হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ