অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করতে ধনীরা যেভাবে ভূমিকা রাখছে

অসংখ্য গবেষণায় দেখা গেছে, সম্পদ ও আয়ের ভারসাম্যহীনতার সমস্যা আমেরিকায় দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। এই গবেষণাগুলির ফল হতে পারে আমেরিকার অর্থনৈতিক উন্নতি ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। অথচ অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করার ব্যাপারে ফেডারেল সরকারের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। এছাড়াও, অনেক স্টেইট এর তা মোকাবেলা করার মতো অবস্থাও নেই।
কিছু গবেষণায় এও দেখা গেছে, সরকারের উপর প্রভাব সবচেয়ে বেশি আছে ধনীদেরই। অর্থাৎ, এই অসাম্য নিয়ে প্রভাব বিস্তারী কাজ করার ক্ষমতা আছে কেবল ধনীদেরই। অন্যদের পক্ষে তা অসম্ভব। আর অল্প সংখ্যক কিছু ধনী আমেরিকান সত্যিই সেই চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাদের সময় ও অর্থ দিয়ে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছেন অর্থনৈতিক এই বৈষম্য দূর করতে।

বাড়তে থাকা বৈষম্য

সর্বশেষ ২০১৩ সালের সমীক্ষায় দেখা গেছে, ধনীরা (মোট জনগণের যারা মাত্র ১০%) পুরো দেশের ৭৬% সম্পদের মালিক। অর্থাৎ, প্রতি ১০ ডলারে ৭.৬০ ডলারেরই মালিক তারা এবং বাকি ৯০% জনগণের জন্য রয়েছে মাত্র ২.৪০ ডলার। এবং সম্পদের এই ভারসাম্যহীনতা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। অথচ ১৯৮৯ সালে ১০% ধনী ব্যক্তিদের কাছে ছিল দেশের ৬৭% সম্পদ।

তবে কিছু ধনী ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় নীতি ও কর্পরোরেশনগুলিকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে বাড়তে থাকা এই বৈষম্য মোকাবেলা করতে এগিয়ে আসা শুরু করেছেন। তেমনই একজন হলেন ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম ‘ব্ল্যাকরক’ এর সাবেক ম্যানেজিং ডিরেক্টর মরিস পার্ল। মরিস ‘ক্যারিড ইন্টারেস্ট’ নামক কর ফাঁকি দেয়ার একটি উপায় আইনি সহায়তায় বাতিল করেন। ‘ক্যারিড ইন্টারেস্ট’ এর মাধ্যমে অসংখ্য ফিনানশিয়াল ম্যানেজার তাদের করের পরিমাণ কমিয়ে ফেলত। আরেক উদাহরণ হলেন ‘চবানি ইয়োগার্ট’ এর প্রতিষ্ঠাতা হামদি উলুকায়া। তিনি তার কোম্পানিটি বিক্রি করে দেয়ার আগে সব এমপ্লয়িদেরকে কোম্পানিটির একটি ওউনারশিপ স্টেইক দিয়ে দেন। অথচ এটি না করলে তিনি একা অনেক লাভ করতে পারতেন।

আয়নায় তাকানো

এই অল্পসংখ্যক মানুষদের আরেক উদারণ টি. জে. জ্লোৎনিৎস্কি। সবার প্রথমে তিনি নিজে একটি টেক কোম্পানি গড়ে তুলে নিজেকে ধনীদের কাতারে তোলেন। এরপর তিনি দাবি তোলেন যেন কোম্পানিগুলি কর্মীদের বেতন বাড়ায় এবং সরকার যেন ধনীদের ট্যাক্সের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। জ্লোৎনিৎস্কি নিজে অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করার চেষ্টায় থাকা ধনীদের একটি সংস্থা ‘পেট্রিওটিক মিলিওনেয়ার’ এর সদস্য। একটি ব্লগ পোস্টে তিনি বলেন:
“আমার পরিবার যে সমস্ত সুযোগ ও রাষ্ট্রীয় সুবিধাদি পেয়েছে সেগুলি কেবল আমেরিকাতেই সম্ভব, আর এইগুলি ছাড়া আমার এই গল্প ছিল অসম্ভব।”

তার মতো আরও ধনী ব্যক্তিদের সম্পর্কে জানার জন্য কিছু সাক্ষাৎকারের আয়োজন করা হয়েছিল। এই সাক্ষাৎকারগুলি নেয়া হয়েছিল সারা দেশের ২০ জন ব্যক্তির যারা অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার চেষ্টায় নিয়োজিত অলাভজনক কিছু প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। প্রতিষ্ঠানগুলির নাম তারা প্রকাশ করতে চান নি। এই ২০ জনের প্রত্যেকেই নিজেদেরকে ‘ধনী বন্ধু’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। তাদের দাবী, তারা অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে স্বল্প আয়ের মানুষদের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। এই ২০ জন ব্যক্তি আমেরিকার ধনী ব্যক্তিদের উজ্জ্বলতম উদাহরণ। তাদের বেশিরভাগই সাদা চামড়ার এবং পুরুষ। বয়সের দিক থেকে তারা সব প্রজন্মকেই প্রতিনিধিত্ব করেন। কেউ কেউ উত্তরাধিকারসূত্রেই ধনী। আবার কেউ কেউ স্বল্প আয়ের পরিবারে জন্ম নিলেও সময়ের সাথে সাথে নিজেই গড়ে নিয়েছেন নিজের ভাগ্য।
জ্লোৎনিৎস্কির মতো বাকিরাও বলেছেন যে এই ব্যাপারে কাজ করতে গিয়ে তারা সবার আগে এক ধরণের গভীর উপলব্ধির প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য ছিল আর্থিক বৈষম্য দূর করতে গিয়ে নিজেদের মর্যাদা ও অবস্থানের কারণে তারা যে বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন তা চিহ্নিত করা।

প্রথমত, তারা এটা মেনে নেন যে তাদের সম্পদের জন্য তারা অংশত ঋণী এমন এক সিস্টেমের কাছে যে সিস্টেম তাদের যোগ্যতা ও চেষ্টার বাইরেও তাদেরই অনুকূলে ছিল। বিশাল সম্পদের জন্য সিস্টেমের এই সহায়ক ভূমিকা বা ভাগ্যের কাছে ঋণী থাকার এই উপলব্ধি সহজ কোনো কাজ নয়। কারণ ‘যেটা যার প্রাপ্য সেটাই সবাই পায়’ এমন একটা প্রচলিত ধারণা সবার মনেই গেঁথে আছে। ‘বর্ন অন থার্ড বেইজ’ নামক স্মৃতিকথায় চাক কলিন্স এমনই এক আত্মোপলব্ধির গল্প বলেছেন। অস্কার মায়ের এর সম্পত্তির উত্তরাধিকার হয়েছিলেন চাক কলিন্স যা তিনি গ্রহণ না করে দান করে দিয়েছিলেন। মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের আগে আরোপিত কর ‘এস্টেট ট্যাক্স’ সংরক্ষণের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন এখন কলিন্স। একই সাথে তিনি অর্থনৈতিক বৈষম্যের ব্যাপারে আরো গবেষণা করে যাচ্ছেন।

পরের ধাপটি হচ্ছে লজ্জ্বাকে দূর করা। বাড়তি সুবিধা পাওয়ার ব্যাপারটা উপলব্ধি করার ফলে ২০ জন ধনী ব্যক্তির অনেকেই লজ্জ্বিত হয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় একজন বাইসেক্সুয়াল নারীর কথা যিনি ২১ বছর বয়সেই প্রায় ১ মিলিয়ন ডলারের মালিক হয়েছিলেন। তিনি বলেন, তার বন্ধুদের কাছে একজন লেসবিয়ান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করাটা তার কাছে বরং সহজই ছিল। সে তুলনায় নিজেকে মিলিয়নেয়ার হিসেবে পরিচয় দেয়াটা তার জন্য বেশি কঠিন ছিল। ধনী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেয়ার ব্যাপারটা অস্বস্তিকর — সাক্ষাৎকার দেয়া ২০ জনের মধ্যে অনেকের কাছ থেকেই এই রকম প্রতিক্রিয়া পাওয়াটা বেশ অবাক করা ব্যাপার ছিল। কারণ বেশিরভাগ আমেরিকানদের কাছেই তাদের সম্পদের পরিমাণ তাদের যোগ্যতার পরিচয়।
অপরাধবোধ আর লজ্জ্বা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি এই ‘ধনী বন্ধু’দের একটি ভয় ছিল তাদের প্রতি অন্য ধনী ব্যক্তিদের প্রতিহিংসা। ধনীদের উপর কর আরোপের পক্ষে কাজ করা জাতীয় তাদের কর্মকাণ্ডগুলি অন্য ধনীদের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছিল। ফলে তা ছিল অন্য ধনীদের জন্য উদ্বেগের।

তবে সাক্ষাৎকারে মুখোমুখি হওয়া ২০ জনের মধ্যে সবাই এই বিষয়ে একমত যে ‘ধনী বন্ধু’ হওয়ার জন্য এই কাজগুলি কঠিন হলেও জরুরি ছিল। অনেকেই বলেছেন নৈতিক সমর্থনের জন্য তারা একই মানসিকতার মানুষদের উপর ভরসা করেছেন।

জনসেবা বা ফিলানথ্রোপির সমস্যা

অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কিছু করতে চায় এমন বেশিরভাগ ধনী ব্যক্তিই তাদের কিছু টাকা দান করে দেন। তবে অর্থনীতিবিদ ইন্দ্রনীল দাসগুপ্ত ও রবী কানবুর এর গবেষণা অনুযায়ী, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য ফিলানথ্রোপি আদর্শ উপায় নয়।
ফিলানথ্রোপির ব্যাপারে অন্যান্য ধনী ব্যক্তির তুলনায় সাক্ষাৎকারের ২০ জন ধনী ব্যক্তির ছিল ভিন্ন ধারণা। সবাই তাদের সম্পদের অন্তত কিছু অংশ দান করেছেন। কেউ কেউ এমনকি তাদের অর্জিত পুরো সম্পদই দান করেছেন। কিন্তু বেশিরভাগই তাতেই থেমে না থেকে আরো কিছু কাজ করেছেন। যেমন, ধনীদের উপর কর বাড়ানোর জন্য লবি করা বা কর্মীদের বেতন বাড়ানোর জন্য কর্পোরেট বোর্ডগুলিকে চাপ দেয়া ইত্যাদি। অর্থনৈতিক সাম্যের জন্য যা সম্ভাব্য ২টি সমাধান।

কেউ কেউ বলেন, তাদের মনে হয়েছে তারা যেন আরো কার্যকর ভাবে ফিলানথ্রোপি করার অন্য আরেক পথ খুঁজে পেয়েছেন। যেমন, একজনের মনে হয়েছিল তার টাকা কোথায় খরচ হওয়া উচিত সেটা ঠিক করার জন্য তিনি সঠিক ব্যক্তি নন। প্রথমে তিনি তারই মতো উচ্চমধ্যবিত্তদের সৃষ্ট ও পরিচালিত বিভিন্ন চ্যারিটি সংস্থাসমূহে দান করতেন। তারপর তিনি এমন সংস্থাসমূহে দান করা শুরু করলেন যেগুলির পরিচালনায় রয়েছে গরীবরা নিজেরাই। এইভাবে তিনি তার এলিট ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন গরীবদের কাছে। কারণ তার মনে হয়েছিল নিজেদের উন্নতি কীভাবে করতে হয় সেটা তারা তার চেয়ে ভালো জানে।

এই উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করতে ‘ধনী বন্ধু’ হতে গেলে এমন প্যারাডাইম শিফট এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সাক্ষাৎকারের ২০ জন ‘ধনী বন্ধু’ বলেন, তাদের কাছে অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় মনে হয়েছে গরীবদের কাছে নিজেদের ক্ষমতা স্বেচ্ছায় হস্তান্তর করা। এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া অনেক ধনীদের জন্যই অস্বস্তিকর ও কঠিন একটা ব্যাপার হবে। কিন্তু তাদের এই চেষ্টা যদি আমেরিকার অর্থনীতি আর গণতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়, তবে তা কঠিন হলেও জরুরি ।