অ্যাঞ্জেলিনা জোলি: কোভিড-১৯ এর কারণে আমরা বাচ্চাদের শিক্ষা নষ্ট হতে দিতে পারি না

কোভিড-১৯ মহামারির কারণে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ঘটনা আমাদের মনুষ্যত্বের অর্থ নিয়ে ভাবাচ্ছে। ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে সবাইকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্যকর্মী ও ফ্রন্টলাইনাররা আমাদের সুরক্ষার জন্য নির্দ্বিধায় নিজেদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ঠেলে দিচ্ছেন। স্কুল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ত্যাগ: ১৬৫টি দেশে জাতীয়ভাবে স্কুল বন্ধ করে দেয়ায় দেড় বিলিয়নের বেশি অর্থাৎ ৮৭% ছাত্রছাত্রী ক্লাসে যেতে পারছে না।


অ্যাঞ্জেলিনা জোলি ও অড্রে আজুলে
টাইম, ২৫ মার্চ ২০২০


বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা কোনো কিছু হারানোর পর তার মূল্য বুঝতে পারি। শিক্ষা ক্লাসরুমের পড়ার চেয়েও বেশি কিছু। কয়েক মিলিয়ন শিশু-কিশোরের জন্য স্কুল অন্য অনেক সুযোগ সুবিধার পাশাপাশি আত্মরক্ষার ঢাল হিসেবে কাজ করে। ক্লাসরুম―নির্যাতন, শোষণ ও অন্যান্য প্রতিকূল অবস্থা থেকে সুরক্ষা বা সাময়িক মুক্তি দিয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২২ মিলিয়ন শিশু দৈনিক খাবারের জন্য স্কুলের ওপর নির্ভরশীল। অনুন্নত দেশগুলিতে স্কুল বন্ধ হওয়ার ফলে বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে এবং শিশুদের ভবিষ্যতে এর স্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে।

যখন কয়েক সপ্তাহের বেশি সময়ের জন্য স্কুল বন্ধ করা হয়, বাল্যবিবাহ বেড়ে যায়, সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়া শিশুর সংখ্যা বেড়ে যায়, শিশু ও কিশোরীরা বেশি নির্যাতনের শিকার হয়, টিনএজ প্রেগনেন্সি ও শিশুশ্রম বেড়ে যায়। বিপরীত পরিস্থিতিটাও সত্য: শিক্ষা শুধু ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন ধাপেরই বিশেষ উন্নতি করে না বরং একটা সমাজকেও উন্নত করে তোলে।

যখন কয়েক সপ্তাহের বেশি সময়ের জন্য স্কুল বন্ধ করা হয়, বাল্যবিবাহ বেড়ে যায়, সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়া শিশুর সংখ্যা বেড়ে যায়, শিশু ও কিশোরীরা বেশি নির্যাতনের শিকার হয়, টিনএজ প্রেগনেন্সি ও শিশুশ্রম বেড়ে যায়।

দিন যত বাড়তে থাকবে, অসমতাও বেড়ে যাবে। বিশ্বের বিভিন্ন এলাকার শরণার্থীদের মধ্যে এই বিষয়টা প্রকটভাবে লক্ষ করা যায়। প্রতি পাঁচজনের একজন শরণার্থীর বিশ বছর বা তার বেশি সময়ের জন্য উৎখাত হতে হয়েছে, যা একটি শিশুর সম্পূর্ণ শিক্ষা জীবনের চেয়ে দীর্ঘ।

করোনাভাইরাসের কারণে স্কুলে যেতে না পারা অনেক শিশু জরুরি ও কার্যকর সহায়তা ছাড়া আর কখনোই স্কুলে যেতে পারবে না। সুক্ষ্মভাবে প্রতিকূলতার মাত্রা উপলব্ধি করে আমাদের যথার্থ ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে শিশু কিশোররা তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে।

আরো পড়ুন: শিশুর স্থূলতার ব্যাপারে আপনার যা করার আছে

কার্যকর সমাধানের অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করতে ইউনেস্কো আজ একটি নতুন গ্লোবাল এডুকেশন কোয়ালিশন চালু করছে। আমরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, সুশীল সমাজ ও এই সংক্রান্ত কাজের তত্ত্বাবধানে থাকা প্রাইভেট সেক্টর কোম্পানিগুলিকে অনুরোধ করছি।

আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, মহামারীর সময়েও শিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সেরা উপায়গুলি চিহ্নিত ও শেয়ার করা এবং এই সংকট সমাধানের পর শিক্ষাকে আরও ইনক্লুসিভ বা ব্যাপক ও ন্যায়সঙ্গত করার ভিত্তি স্থাপনে সাহায্য করা।

স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মূল প্রতিক্রিয়া হচ্ছে ডিসটেন্স ও অনলাইন লার্নিং। ছাত্রছাত্রীদের একটা বিশাল অংশের জন্য স্কুল এখন বাসায় এবং ভার্চুয়াল শিক্ষকের পাশাপাশি বাবা-মা, ভাইবোন, পরিবার ও কাছের বন্ধুরা শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। অনেক কর্মজীবী বাবা-মা, যারা এখন বাসা থেকে কাজ করছেন, কাজের পাশাপাশি সার্বক্ষণিক এই শিক্ষকের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। এই অভিজ্ঞতা আমাদের শিক্ষকদের প্রতিদিনের শ্রমের মূল্য বোঝায়, যাদেরকে আমরা সবসময় অবহেলার চোখে দেখি এবং সমালোচনা করতে পিছপা হই না।

যাই হোক, তরুণরা এই রিমোট লার্নিংয়ের সুযোগ পাচ্ছে না। বিশেষ করে অনুন্নত দেশগুলির অনেক পরিবারেই রিমোট লার্নিং এর সুবিধা ভোগ করার মতো যথেষ্ট প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও আর্থিক সামর্থ্য নেই। আবার পাঠ্যক্রমের অনেক বিষয়ই রিমোট লার্নিং এর মাধ্যমে শেখানো সম্ভব না। বাবা-মায়ের বাসায় শিক্ষা দেয়ার মত সময় এবং সামর্থ্যও দেশভেদে আলাদা।

আরো পড়ুন: ড. লিওনার্ড স্যাক্স: নম্রতা শেখাতে হবে, যেটা এখন কোনো আমেরিকান বাচ্চার মধ্যে নেই

গ্লোবাল কোয়ালিশনের মাধ্যমে প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় করা এবং যাদের প্রয়োজন তাদের কাছে বিনামূল্যে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও ডিজিটাল ডিভাইস পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে। দ্রুততার সাথে বিভিন্ন উপায় বের করে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতে হবে, তাদের ইন্টারনেট থাকুক বা না থাকুক। সেটা জাতীয় ক্লাউড প্লাটফর্মের মত জটিল উপায়ে হতে পারে কিংবা স্থানীয় পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রযুক্তিগত ও কমিউনিটি অ্যাপ্রোচের সমন্বয়ে রেডিও সম্প্রচার ও অফলাইনে ব্যবহার উপযোগী মোবাইল অ্যাপের মত সাধারণ উপায় হতে পারে।

অরক্ষিত বা অসহায় ও অনগ্রসর শিশু, মেয়ে, দরিদ্র, বিকলাঙ্গ এবং স্থান বদলানো শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। এই শিশুদের পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া, অসুস্থতা ও অপুষ্টিতে ভোগার আশঙ্কা বেশি। এবং স্কুল খুললে স্কুলে না ফেরার আশঙ্কাও তাদেরই বেশি। শিক্ষাকে ভবিষ্যতে অস্টেরিটি কাট (এক ধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নীতি; যার উদ্দেশ্য খরচ কমিয়ে, ট্যাক্স বাড়িয়ে বা এই দুইয়ের সমন্বয়ে কিছু একটা করে সরকারের বাজেট ঘাটতি কমানো) থেকেও মুক্ত করতে হবে।

অরক্ষিত বা অসহায় ও অনগ্রসর শিশু, মেয়ে, দরিদ্র, বিকলাঙ্গ এবং স্থান বদলানো শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। এই শিশুদের পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া, অসুস্থতা ও অপুষ্টিতে ভোগার আশঙ্কা বেশি। এবং স্কুল খুললে স্কুলে না ফেরার আশঙ্কাও তাদেরই বেশি।

স্কুল বন্ধ হওয়ায় ইতিমধ্যে অনেক দেশেই নতুন রীতির অনুসরণ করা হচ্ছে। পেরুতে টিভি ও রেডিওর মাধ্যমে লার্নিং ম্যাটেরিয়াল ১০টি দেশীয় বা আঞ্চলিক ভাষায় অনুবাদ করে সরবরাহ করা হচ্ছে। সেনেগালের জাতীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় লার্নিং ফ্রম হোম এর উদ্যোগ নিয়েছে। ইউনেস্কোর ‘কোয়ালিফিকেশনস পাসপোর্ট ফর রিফিউজিস অ্যান্ড ভালনারেবল মাইগ্রেন্টস’ এর মতো পরিকল্পনার মাধ্যমে গত কয়েক বছর শরণার্থী ও উৎখাত হওয়া মানুষদের স্বীকৃত যোগ্যতা অর্জনে সহায়তা করা হচ্ছে। নির্ভরযোগ্য নতুন রীতিগুলির মধ্যে এগুলি কয়েকটা।

তবে এখন স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপ নিয়ে ক্ষতি কমানোর চেয়েও বড় করে ভাববার সময়। কোভিড-১৯ জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য সতর্কবার্তা। এই মহামারীর পূর্বেও সারাবিশ্বে ২৫৮ মিলিয়ন শিশুকিশোর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল। শিক্ষার ভবিষ্যৎ ও বিশ্বব্যাপী গুণগত মানের শিক্ষা অর্জনের সুযোগ থাকলে সেটা যে পরিবর্তন নিয়ে আসবে তা নিয়ে ভাবার উপযুক্ত সময় এখনই।

আজ আমাদের অবশ্যই স্কুল বিহীন শিক্ষাদানের অভূতপূর্ব এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপায় নিয়ে ভাবতে হবে। একই সাথে শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ এসেছে। আমাদের এই সুযোগ ছিনিয়ে নিতে হবে।

অনুবাদ. জোহানা নিশো