আইভারমেকটিন: মোনাশ ইউনি’র বিজ্ঞানীরা করোনার সম্ভাব্য ওষুধ শনাক্ত করেছেন

ড. কাইলি ওয়াগস্টাফ
  • অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, সারা বিশ্বে সহজলভ্য, এমন একটি পরজীবী প্রতিরোধী ওষুধ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে করোনাভাইরাস ধ্বংস করতে পারে।
  • বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, আইভারমেকটিন ওষুধের একটি মাত্র ডোজও আমাদের দেহকোষে বাড়তে থাকা সার্স-কভ-২ ভাইরাসের বিস্তার থামাতে পারে।
  • পরবর্তী পদক্ষেপ হল, মানুষের জন্যে ওষুধটির সঠিক মাত্রা নির্ণয় করা এবং ল্যাবের পরীক্ষায় এই ভাইরাস নিরাময়ে যে কার্যকারিতা দেখা গেছে মানুষের পক্ষে নিরাপদ কিনা তা নিশ্চিত করা।
  • কোভিড-১৯ এর সাথে লড়াই করার জন্যে আইভারমেকটিনের ব্যবহার প্রি-ক্লিনিকাল টেস্টিং এবং ক্লিনিকাল ট্রায়ালের উপর নির্ভর করছে। গবেষণাটির অগ্রগতির জন্য তাৎক্ষণিকভাবে অর্থায়নের প্রয়োজন।
  • আইভারমেকটিন যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদিত পরজীবী প্রতিরোধী একটি ওষুধ। ওষুধটি ইতিমধ্যেই এইচআইভি, ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং জিকা ভাইরাসসহ নানান ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে ল্যাবে কার্যকর হিসাবে দেখা গেছে।
  • এই গবেষণার ফলাফল গতকাল ৩ এপ্রিল ‘অ্যান্টিভাইরাল রিসার্চ’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও রয়্যাল মেলবোর্ন হাসপাতালের যৌথ উদ্যোগে পিটার ডোহার্টি ইনস্টিটিউট অফ ইনফেকশন অ্যান্ড ইমিউনিটির (ডোহার্টি ইনস্টিটিউট) সাথে মোনাশ বায়োমেডিসিন ডিসকভারি ইনস্টিটিউট (বিডিআই) এর নেতৃত্বে একটি যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, পরজীবী প্রতিরোধী একটি ওষুধ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সার্স-কভ-২ ভাইরাস ধ্বংস করতে পারে। ওষুধটি বিশ্বের অনেক জায়গায় সহজে পাওয়া যায়।

গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন মোনাশ বায়োমিডিসিন ডিসকভারি ইনস্টিটিউটের ড. কাইলি ওয়াগস্টাফ। তিনি বলেন, বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, আইভারমেকটিন ওষুধের একটি মাত্র ডোজ আমাদের দেহকোষে বাড়তে থাকা সার্স-কভ-২ ভাইরাসের বিস্তার থামাতে পারে।

ড. ওয়াগস্টাফ আরো বলেন, আমরা দেখতে পেয়েছি, ওষুধটির একটি মাত্র ডোজও ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সমস্ত ভাইরাল আরএনএ-কে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলতে পারে। এছাড়াও ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই উল্লেখযোগ্য হারে ভাইরাস দমনে কাজ শুরু করে দেয়।

আইভারমেকটিন হল যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদিত পরজীবী প্রতিরোধী একটি ওষুধ। ওষুধটি ইতিমধ্যেই এইচআইভি, ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং জিকা ভাইরাস সহ নানান ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে ল্যাবে কার্যকর হিসাবে দেখা গেছে।

ড. ওয়াগস্টাফ সাবধান করে দিয়েছেন যে, গবেষণায় করা পরীক্ষাগুলি সম্পূর্ণ ল্যাবে করা হয়েছিল এবং এর কার্যকরিতা নিশ্চিত করার জন্যে মানুষের দেহে পরীক্ষা চালানোর প্রক্রিয়া এখনো বাকি। তার মতে, আইভারমেকটিন নিরাপদ ওষুধ হিসেবে খুব ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এখন মানুষের শরীরে এটির ডোজ কার্যকর হবে কিনা তা খুঁজে বের করাই আমাদের পরবর্তী কাজ।

তিনি আরো বলেন, আমরা বিশ্বব্যাপী একটি মহামারির সম্মুখীন হয়েছি, যার কার্যকরী আর সর্বসম্মত কোনো চিকিৎসা এখনো আবিষ্কৃত হয় নাই। এই অবস্থায় আমরা যদি এমন কোনো রাসায়নিক যৌগের সন্ধান পাই, যেটি সহজেই বিশ্বজুড়ে পাওয়া যায়, তাহলে খুব দ্রুতই তা মানুষের কাজে আসতে পারে। বাস্তবিকভাবে, ভাইরাসটির ভ্যাকসিন ব্যাপকভাবে সহজলভ্য হওয়ার অনেক আগেই এই ওষুধের কার্যকারিতা জানা সম্ভব।

ড. ওয়াগস্টাফ বলেন, আইভারমেকটিন কোন পদ্ধতিতে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে কাজ করে তা এখনো জানা যায় নাই। তবে অন্যান্য ভাইরাসগুলির সাথে এর কর্মপ্রক্রিয়ার ভিত্তিতে বলা যায়, ওষুধটি সম্ভবত আক্রান্ত কোষগুলিকে ‘দুর্বল করে দেওয়া’র প্রক্রিয়া বন্ধ করে সেগুলিকে ভাইরাসমুক্ত করতে সাহায্য করে।

ভিকটোরিয়ান ইনফেকশাস ডিজিজ রেফারেন্স ল্যাবরেটরির (ভিআইডিআরএল) সিনিয়র মেডিকেল সায়েন্টিস্ট ও রয়েল মেলবোর্ন হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. লিওন কেলি ছিলেন গবেষণাপত্রটির মূল লেখক। তিনি ও তার সহকর্মীরা ডোহার্টি ইনস্টিটিউটে জীবিত করোনাভাইরাস নিয়ে পরীক্ষাটি চালান।

ডা. কেলি বলেন, জানুয়ারি ২০২০-এ চীনের বাইরে সার্স-কভ-২ শনাক্তকারী প্রথম দলের একজন সদস্য ও ভাইরাোলজিস্ট হিসেবে আমি কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ওষুধ হিসাবে আইভারমেকটিন ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহী।

এর আগেও ২০১২ সালে ড. ওয়াগস্টাফ আইভারমেকটিন ওষুধটির ভাইরাস প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এই গবেষণাপত্রের অন্যতম লেখক ও মোনাশ বায়োমেডিসিন ডিসকভারি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডেভিড জ্যানসের সাথে যুগান্তকারী একটি গবেষণা করেন। অধ্যাপক জ্যানস ও তার দল ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ভাইরাসের বিরুদ্ধে আইভারমেকটিনের প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করে আসছেন।

ডা. ওয়াগস্টাফ ও অধ্যাপক জ্যানস মহামারি শুরু হওয়ার সাথে সাথেই ওষুধটি সার্স-কভ -২ ভাইরাসটির বিরুদ্ধে কাজ করে কিনা তা নিয়ে গবেষণা করা শুরু করেন।

ডা. ওয়াগস্টাফ বলেন, কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে আইভারমেকটিন ব্যবহার করা যাবে কিনা তা ভবিষ্যতের প্রি-ক্লিনিকাল টেস্টিং ও ক্লিনিকাল ট্রায়ালের উপর নির্ভর করছে। গবেষণাটি এগিয়ে নেওয়ার জন্যে এখন জরুরি ভিত্তিতে অর্থায়ন প্রয়োজন।

এর বাইরে এবিসি নিউজ থেকে জানা গেছে, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সবাইকে সতর্ক করেছে যাতে তারা নিজেরা চিকিৎসার জন্যে এই ওষুধটি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত না নেয়। উল্লেখ্য যে, আইভারমেকটিন সারা বিশ্বে সাধারণত মাথার উকুন ও চুলকানির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এবং এটি পিল, লোশন ও শ্যাম্পু আকারে কিনতে পাওয়া যায়।

ভিকটোরিয়া রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেনি মিকাকোস জনসাধারণকে পদার্থটির অপব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছেন। মিস মিকাকোস ভিকটোরিয়াবাসীদের করোনাভাইরাসের চলমান মহামারি সম্পর্কে ব্রিফিং দেওয়ার সময় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বাচ্চাদের চুলে দেওয়ার বাইরে এই উকুনের ওষুধ কেনার কোনো কারণ নেই। আমি বিষয়টি নিয়ে সাবধান করতে চাচ্ছি। কারণ আমরা এমনও শুনেছি, দেশের বাইরে কিছু মানুষ কোনো ওষুধ নিয়ে গবেষণা হচ্ছে শুনেই সেই ওষুধ কিনে খেয়েছেন এবং মারা গেছেন। ফলে আমি চাই না, কেউ ফার্মেসি বা সুপার মার্কেটে উকুনের শ্যাম্পু কিনতে ভিড় করুক। বিজ্ঞানীরা এখনো এটা নিয়ে কাজ করছেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেনি মিকাকোস আরো বলেন, কেউ এই শ্যাম্পু খেয়ে ফেললে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।

এছাড়াও মিস মিকাকোস উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, লোকজন চেষ্টা করবে আইভারমেকটিন কিনে জমা করে রাখতে। এতে যেটা হবে ওষুধটা যাদের আসলেই প্রয়োজন তারা পাবে না। এর আগেও অন্যান্য ওষুধের বেলায় এমন ঘটতে দেখা গেছে।

সূত্র. মোনাশ.এডুএবিসি ডটনেট ডটএইউ

অনুবাদ. ফারহান মাসুদ