ক’টা পিচ্চি মাম্মি-ড্যাডির পোলা আছিল, তখনকার দিনে হ্যান্ডিক্যাম লইয়া ঘুরে, সিনেমা বানাইতে এখনি নাইমা পড়ে অবস্থা। বস তাদের হাতেকলমে, কাগজে আঁইকা শট ডিভিশানসহ দেখাইয়া দিতাছিলেন। আমি ভাবলাম, খাইছে!

হুমায়ূন ফরিদীকে প্রশ্ন করা হলে, অভিনয়ে কীভাবে এলেন, তিনি মজা করে উত্তর দিতেন, ট্যাক্সিতে। বহু বহু আগে সাক্ষাৎকারে পড়া।

আমি স্মৃতিকাতর হই না। অতীত নিয়ে ভাবার সময় আমার নাই। আমার সবটুকুই বর্তমান। কিন্তু কোনো ঘটনা বোঝা যায় বহুদিন পর তার ঘোর কেটে গেলে। ঘটনাকে দেখতে হয় দূর থেকে। এটা মায়েস্ত্রো মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর কথা।

টিভিতে সিনেমা, সিরিজ যা পারি দেখি। এক্স ফাইলসের কঠিন জ্বরে আক্রান্ত তখন আমি। এক্স ফাইলসের বুদ্ধিমতি নায়িকা জিলিয়ানের প্রেমে তখন আমরা নাস্তানাবুদ। কাকতালীয়ভাবে আমাদের কলেজে পড়ত জিলিয়ান নামের এক মেয়ে। বোঝেন অবস্থা! সায়েন্সে ২টা কি ৩টা মেয়ের মধ্যে জিলিয়ান একজন। ব্রিলিয়ান্ট বটে।

ওয়ার্কশপে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীকে ঘিরে সবার আগ্রহ, প্রশ্ন। সাথে আশফাক, পিছনে দেবাশিষদা। সাল ২০০২।
ওয়ার্কশপে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীকে ঘিরে সবার আগ্রহ, প্রশ্ন। সাথে আশফাক, পিছনে দেবাশিষদা। সাল ২০০২।

প্রথম যখন টেরিস্ট্রিয়াল স্যাটেলাইট চ্যানেল ইটিভি আসল মাথা ঘুরে গেল। একি বাবা! এটা কী? বাংলাদেশে এমন হয়। যাইই দেখায় দেখি। যাকেই দেখায়, যাই দেখি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি। সারাদিন দেখি। এমন তো দেখি নাই। এভাবে যে দেখানো যায়, এভাবে খবর পড়া যায়… চেঞ্জ আস্তে আস্তে হয় ইটিভি ধুম কইরা বিপ্লব ঘটাইয়া দিল!

আগে যেখানে খবর দেখতে বিরক্ত লাগত, বিটিভির খবর দেখে আমাদের পেট কষা হইয়া যাইত, এর চেয়ে আমার জন্য রাতের দুর্বোধ্য রাগ সঙ্গীত অনেক ভাল ছিল! খবর শুরু হইলে টিভি অফ করে দিতে হইত। এখন খবরও একটা কিছু, শুধু খবর না। তখন আমার ধুপধাপ প্রেমে পড়ার বদভ্যাস। মারজুক রাসেলের একটা কবিতা পড়ি পত্রিকায়, হুবহু মনে নাই, জিনিসটা এরকম “তোমাকে দেখি, তোমার খবর পড়া দেখি, তারপর বিস্তারিত প্রতিবেদনে চলে গেলে চ্যানেল সুইচ করে চলে যাই অন্য চ্যানেলে।”

বাপে বিলা। বাপে আগে থেকে আমার উপর বিলা। বই পড়লে, গল্প লিখলে, টিভি দেখলে বাপ মনে করত পড়াশোনা নাই, শুধু শুধু সময় নষ্ট, পুলাও নষ্ট। ভাল পুলা, ভাল ছাত্রটা নষ্ট হয়ে গেল। এমনিতেই আমার উপর বিশ্বাস ছিল না এবার ভরসার জায়গাটাও যাচ্ছে। ইটিভিতে দারুণ দারুণ সব মিউজিক ভিডিও দেখাইত। কিচ্ছু ছাড়ি না। বন্ধন হিট, গিয়াসউদ্দিন সেলিমে’র বিপ্রতীপ। আহীর আলমে’র প্রেত কি ভোলা যায়? হরর কিন্তু ভূত-প্রেত না। ব্ল্যাক ম্যাজিক নিয়া। আহীর আলম চলে গেলেন। যে চলে যায় আমরা তাকে মনে রাখি না। আমিও রাখি নাই তো।

তারপর সেলিম আল দীনের নকশী পাড়ের মানুষেরা শুরু হতে না হতে ইটিভি বন্ধ। আহীর আলমের সহকর্মী বন্ধু ছিলেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। ফারুকী ভাইয়ের প্রথম দেখি ওয়েটিং রুম। ফারুকী ভাইয়ের ভাষায় একটা মেয়েকে পটানোর জন্য বানানো। পরে রিমেক হয়। তখনও চিনি না, বুঝি না। একদিন দেখলাম মোস্তফা সরয়ার ফারুকী’র মুভি (অবশ্যই মুভি) চোর চোর-এর ট্রেইলার। ট্রেইলারও হয়! এমন ট্রেইলারও! আমি নড়েচড়ে বসি আর খালি ট্রেইলার দেখি। অপেক্ষায় থাকি কবে দেখাবে। যদিও বস ফারুকী ভাই কোথাও এটার কথা বলে না। আমি বললে বলে, ধুর! ওসব কিচ্ছু হয় নাই। ওগুলা দেখে আমার সিনেমার চোখ খোলা শুরু।

এর আগে বাংলা ছবিই ভরসা ছিল। তারপর দেখলাম করিমন বেওয়া। মুক্তিযুদ্ধের উপর আমার দেখা অন্যতম সেরা কাজ তখন। বিপাশা অভিনীত প্রতি চুনিয়া, কর্নেল তাহেররে নিয়া আয়শামঙ্গল। তারিক আনামরে নিয়া আইডেন্টিটি ক্রাইসিসের মনস্তাত্বিক খেলা আয়নামহল-এর সাথে স্প্যানিশ মুভি এপার্টমেন্ট-এর মিল পাইয়া বসরে ফোনে জানাই। তারপর রবি-নজরুলের গল্পকে দুমড়ে মুচড়ে বানানো ডিটেক্টিভ, তালপাতার সেপাই। ফার্স্ট টাইম এভার। একদম নয়া অভিজ্ঞতা, নয়া স্বাদ, নয়া ভাবনা।

এর আগে রবি-নজরুলের কাজরে বুদ্ধিজীবীরা একঘেয়েমি বিরক্তিকর করে তিতা কইরা ফেলছিল। খুব সাধারণ ঘটনা নিয়া দ্বন্দ্ব সমাস, একটু। ব্যতিক্রমী ভাষা-সংলাপ, ব্যতিক্রমী নায়ক-পরিবার হুমায়ূন আহমেদের রচনার নাটকেই দেখছি। আর ফারুকী মানেই টাইটেল থেকে শুরু করে মেকাপহীন আর্টিস্ট, সংলাপ, মিউজিক, ফ্রেমে চমক, তারুণ্য। ব্ল্যাক একটা ফ্রেমের উপর টাইটেল হত। ফ্রেমিং দেখলেই বুঝতাম ইহা একটি ফারুকী চলচ্চিত্র। পরিবারের সবাই মিলা ছড়িয়ে ছিটিয়ে টিভি দেখতাম। আমাদের বিশাল পরিবার। প্রথম ফিলটা পরিবার থেকে পাই। এখনও কোনো কাজ হলে আমি পরিবারের ভাইবটা আগে শুনি, বোঝার চেষ্টা করি। মিলান কুন্ডেরার মে বি ঠাট্টা অবলম্বনে আনিসুল হকের রচনায় বানানো কানামাছি টিভি প্রোডাকশনের আরেক মোড়। টিভি নাটক এমন হয় আগে দেখি নাই, এভাবে ভাবি নাই। কোন এক ঈদে ছিল। বাড়িভর্তি ভাই-বোন, তাদের ছেলেপুলে আর হাউ-কাউ আত্মীয়-স্বজন ঠাসা। সবাইরে নিয়া বইসা দেখাইছিলাম মনে আছে। কোনটা প্রেম, কোনটা যে নায়ক, কে যে কী করতেছে সব উল্টে-পাল্টে দিলেন।

শ্রাবন্তীর সে কী অভিনয় আহ! অভিমানী ঠোট ওল্টানো কিশোরী, লাজুক! আহমেদ রুবেল, ‘তোমার গায়ে যত দুঃখ সয়’ গাওয়া সেই বিদেশী সার্বিয়ান, কবি রিফাত। অ্যাকশন রোমান্টিক প্রোডাকশান বালক-বালিকা বা নিখোঁজ সংবাদে’র আইডিয়া! বিষয়-বৈচিত্র, নতুন অভিনেতা বা পুরনোদের নয়া ঢঙ্গে হাজির করে হাস্যরস দিয়ে জটিল সার্জারি সারতেন উনি। উনি কে? এই যাদুকরটা কে?

উনি মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অফ মিস্টেক। পরে বহুবার আমি এগুলার কথা বলছি, বারবার বলতাম। উনি বলত, ধুর এগুলা কিচ্ছু হয় নাই। পরে পরে আমি যখন ছবিয়ালে ঢুইকা বসের আর্কাইভের দায়িত্ব পাইলাম সুযোগ পাইলে হাউজে বইসা সারাদিন এ প্রোডাকশনগুলাসহ আরো যত আছে সাফ করি, ঘাটি, চালাইয়া দেখি। বস জানত না। দুঃখের বিষয় মনে হয়, টিভিতে জটিল সব নীরিক্ষা করছিলেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।

২.
তখন বাপের কাছ থেইকা লুকাইয়া লেপের ভিতর, খাটের নিচে বইসা পত্রিকায় লেখালেখি করার ট্রাই করি। পত্রিকা অফিস বা যাদের লেখা ছাপা হয় তাদের আশেপাশে ঘুরি। পাত্তা পাই না। তারা আমার কাছে মহান মানুষ। দুনিয়ায় আর কিছু চাই নাই, আর কিছু করতে আসি নাই যেন। আমার কামানে গোলা সরবরাহ করে জোগান দিয়া গেছে আমার এলাকার হকার বশির ভাই। তারে আমার ঘোড়ায় চইড়া বার্তা লইয়া আসা বীরপুরুষ মনে হইত। ডাকতাম রিপোর্টার। উনি ইচ্ছামত যত শিল্প-সাহিত্য ম্যাগাজিন শৈলী থেকে কম্পিউটার জগত, আনন্দধারা সব সব সাপ্লাই দেয়া শুরু করল। সব একসাথে দিয়া যাইত। টাকা নিয়া কথা কইত না, মুচকি হাসি দিয়া যাইত গা। এমনও হইল ঈদে মোটা মোটা ঈদ সংখ্যা, কোনটা ফালাইয়া কোনটা নিমু। উনি সব দিয়া যাইত। পড়তাম আর নিজে নিজে লিখতাম। পত্রিকায় ছদ্মনামে পাঠাইতাম। বাপের ভয়ে। কিছু কিছু ছাপা হইত। লুকাইয়া দেখতাম বার বার।

প্রথম আলো’র প্রথম দিককার আলপিন পয়লা বৈশাখ সংখ্যায় একবার আমার লেখা নিয়ে কার্টুন করে কভার করছিল। মজার বিষয়, পরবর্তীতে স্বনামে লিখার পর থেকে আর কখনও আমার লেখা ছাপে নাই! সেইসময় একটা পত্রিকায় দেখলাম ‘চট্টগ্রাম চলচিত্র কেন্দ্রে’র আয়োজনে ‘মুভি অ্যান্ড স্ক্রিপ্ট ওয়ার্কশপ’।

চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্রের আয়োজনে এক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের মিলনমেলায়। শৈবালদা, আশফাক ও অন্যান্য সদস্যসহ আমি।
চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্রের আয়োজনে এক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের মিলনমেলায়। শৈবালদা, আশফাক ও অন্যান্য সদস্যসহ আমি।

আসবেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, সাথে আনিসুল হক। প্রত্যাবর্তন তখন আলোচিত। দেরি করা ঠিক হবে না। রেজিস্ট্রেশন কইরা ফেললাম। মানুষ প্রেমে পড়লে বা অভিনয়ের জন্য খাওন-দাওন ছাইড়া স্লিম হয়, আমিও সব দিয়া দিয়া পেরাই সিলিম এবং আরো ছোট হইয়া গেলাম। চুল উশকু খুশকু, সেই দিনটার উত্তেজনায়।

দেখি শিল্পকলা একাডেমিতে মানুষের ভিড়। খাইছে! এতজন জানে, এত ভক্ত উনার, এত মানুষ কোর্স করবে। আমি তো বসার সিটই পামু না দেখি। প্রস্তুতি ছিল না। ওরা নিজেরা নিজেরা গল্প করে। একজন আরেকজনরে চিনে, নাকি এখানে আইসা পরিচয়? এরা কি নাটক, মুভির লোক? শিল্পকলায় আনাগোনা ছিল না, কাউরে চিনি না কেউ আমারে চিনে না। আমি শিল্পকলার গেটের বাইরের দোকান থেইকা কলা কিন্না খাই। নির্ধারিত সময়ে বাইছা একটা আসনে গিয়া বইলাম। আমার পাশে অতীব সুন্দরী বোরখা নেকাব পরিহিতা এক আলিফ লায়লা। সে নানা ব্যাপারে আমার সাহায্য নিতাছিল। উছিলাও হইতে পারে। আমি চলিচ্চত্র কেন্দ্রের সরবরাহ করা প্যাডে নোট নিতেছিলাম। সে হয়ত মিডিয়ার এসব কাজ-কামের লগে পরিচিত না, আমারে এক্সপার্ট ধইরা লইছে। আমিও ভাব ধরছি সব জানি। বিশাল এক্সপার্ট। ‘এইসব ওয়ার্কশপ কোনো কাহিনীই না… আর মোস্তফা সরয়ার ফারুকী খুব বড় কোন কুতুব না (উনার প্রতি যত কম মানুষ ঘেঁষে তত আমার লাভ) এই ভাব। সে আস্বস্তের হাসি দেয়। ধইরা নিলাম, বোরকার নিচে হাসিই দিছে। সে হাসিটাও মারাত্মক!

আমরা এখানে জমায়েত হইছি–কেউ স্ক্রিপ্ট লেখা, কেউ পরিচালক হওয়া, কেউ অভিজ্ঞতা অর্জন। কেউ কেউ হুদাই আসে। ভাব মারাইতে। “আমি শিল্প কলায় যাই ইন্টেলেকচুয়াল কবি-সাহিত্যিকদের সাথে আড্ডা মারি”–এই ভাব! আজকে একটা কাম পাইছে বন্ধুদের কইব, দোস্ত শোন একদম টাইম নাই, জরুরী ওয়ার্কশপ আছে শিল্পকলায়, একদম টাইম নাই। আমার জন্য সবাই বসে থাকবে। যাই রে।

বোরকাওয়ালা আলিফ লায়লারে জিজ্ঞেস করলাম তুমি কী বুইঝা? কীসে ইন্টেরেস্ট?

সে কইল, অভিনয়।

মুগ্ধ হয়ে গেলাম কথায়। মহিলা স্পাইডারম্যানের দিকে তাকাইলাম। যেমনে বাইন্ধ্যা আইছে এই কলঙ্কিত মুখ কাউরে দেখাইব মনে হয় না। আসলে কী দেখাইতে আইছে? এখানে অনেকের শিল্পকলার নাটকের লগে যোগাযোগ। অনেকেই আইছে এই অভিনয়ের জন্যই। ফারুকী সাহেব আসলেন শীর্ণকায় শরীর নিয়ে, গায়ে একটা টি-শার্ট, পায়ে চপ্পল। আমি বিশ্বাস করলাম, কেমনে ছোট্ট নেপোলিয়ন দুনিয়া জয় কইরা নিছিল।

ফারুকী ভাইয়ের কাজ নিয়ে যেহেতু আমি বেশ ভালোভাবেই পরিচিত ছিলাম তাঁর কথা শুনতেছিলাম। ভাল্লাগতেছিল। অনেকক্ষণ কথা বলার পর উনি জিগাইল, কোয়েশ্চেন? একজন উইঠা খাড়াইল। কইল, অভিনয় শিক্ষার কথাও বলা হইছে, সেটা কই? তার কিছুই তো শিখলাম না। ফারুকী সাহেব আকাশ থেকে পড়লেন না কোত্থেকে পড়লেন জানি না। তাঁর কৃশ শরীরে প্রায় নাচের ভঙ্গি দেখাইয়া কইলেন, তাহলে কীভাবে অভিনয় শিখায়? এখন কি আমাকে এক্টিং করে দেখাতে হবে?

সেদিন জানলাম তাঁর বডিতে ড্যান্স আছে। পরিচালকের আরেকটা প্রতিভা আবিষ্কারে কোর্সটা সার্থক মনে হইল। পরবর্তীতে আরো বহুবার দেখার সুযোগ হইছে। ঢাকায় আমার বড় আপা থাকার সুবাদে এবং নাটক স্বরণি কাছে হবার সুবাদে মহিলা সমিতিতে নাটক দেখতে যাইতাম। বিনোদন বা টিভি ফিকশানের প্রতি আকর্ষণ থেকে বা পত্রিকার মাধ্যমে জানার ফলে আগ্রহ থেকেই হোক, যেতাম। অনেককে দেখতাম কখনও কথা বলা, ছবি তোলা, অটোগ্রাফের কথা মনে হয় নাই। ফারুকী ভাই কথা প্রসঙ্গে বললেন, জামিল আহমেদের ‘বিষাদ সিন্ধু’ কে কে দেখছেন? দাঁড়াইয়া লাভ নাই, আমি হাত তুললাম। আমি একজনই দেখছি।

চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্রের মুখপত্র 'নিউ ওয়েভ'
চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্রের মুখপত্র ‘নিউ ওয়েভ’

বাহ, একটু কি তাঁর নজরে পড়ছি। ফারুকী ভাই পাত্তা দিলেন না। আমি বইসা পড়লাম, বইসাই ছিলাম অবশ্য। ফারুকী ভাই মঞ্চের লোক নন, টিভিতে কাজ করতে মঞ্চের দরকারও নাই। সবাইকে এই ধারণা দিতে পারছেন বইলা তার কাজগুলা টিভিতেও কখনও নাটক হয় নাই, সিনেমা। মঞ্চের ও আনকোরা, এমন কি রাস্তার আর্টিস্ট নিয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এক্সপেরিমেন্ট করছেন, খেলছেন। সফল তো বটেই, সেটা বিবেচ্য না। এদের নিয়ে প্রচুর এক্সপেরিমেন্টের কারণে টিভিতে, মুভিতে বিপ্লব ঘইটা গেছে। ফারুকী ভাই ঘোষণা দিলেন, মঞ্চে একটা কাজ হইছে সেটা হচ্ছে এই ‘বিষাদ সিন্ধু’।

তারপর দেখালেন টিভিতে অভিনয় করতে গেলে সবাই কেমন অতি অভিনয় করে। মেলোড্রামা। ব্রেসোর কথা বললেন। তারা বহু আগে তাদের মুভিতে এগুলা কইরা গেছেন, উদাহরণ দিয়া কিছুটা কইরাও দেখাইলেন। ওয়ার্কশপ সেদিনের মত শেষ।

হাত-পা ঝুলাইয়া আইসা উনি বাইরের বারান্দায় পা ছড়াইয়া বসেন। সাধারণ একটা টি-শার্ট আর চপ্পল। সাধারণ। উনারে ঘিরা ভিড়, সবার নানা প্রশ্ন। আমি দূরে দূরে হাঁটতে লাগলাম। পুলাপান লড়ে না ক্যা? মাপতে লাগলাম। উনি খেয়াল করছেন। এবার নজরে পড়লাম। উনি কইলেন, আপনি কিছু বলবেন? এবার আমি কাছে গিয়া আমার ঝাঁপি খুইলা দিলাম। উনি বললেন, সিনেমা দেখতে হবে। প্রচুর সিনেমা। দেশ-বিদেশের সিনেমা। যা পান সব দেখতে হবে সব।

পরেরদিন শুক্রবার দুপুরের ব্রেকে উনি কই জানি গেল দেখলাম। ভাবলাম, কই যায়? যামু নাকি পিছে পিছে। চান্স নিতে পারলাম না। চট্টগ্রামে তখন বসের ফ্রেন্ড-পরিচিত আছে জানতাম না। পরের ইনিংসে তথাকথিত ইন্টেলেকচুয়ালগো কয়টা প্রডাকশান দিয়া ভুল-ভাল, আর্টিস্টের অতি অভিনয় দেখাইলেন। তাঁর প্রত্যাবর্তন-এর অংশ বিশেষ দেখাইয়া বোঝাইলেন কোন শটটা কেন? কোন শট দিয়া কী বোঝাইলেন। মজার সব ট্রিক্স আছিল প্রত্যাবর্তনে। যদিও যথারীতি এটাও মানতে চান না বস। কন, এইটাতেও নাকি মেলোড্রামা আছে। ভুল আছে। এরপর আমাদের দেখায়ছিলেন বসের প্রিয় চলচ্চিত্রকার আব্বাস কিয়ারোস্তামির বিখ্যাত ছবি থ্রু দ্যা অলিভ ট্রিজ

দেখা শেষে কইলেন, কী বুঝলাম! এখানে ছিল ইরানের ভূমিকম্প পরবর্তী একটা গ্রামে একটা গরীব, অশিক্ষিত ছেলে একটা বড়লোক, সুন্দরী, শিক্ষিত মেয়েকে পছন্দ করে। বিয়ে করতে চায়। মেয়েটা রাজি না। মেয়েটারে বিভিন্নভাবে কনভিন্স করার মধ্য দিইয়া গল্প আগায়।

ছেলেটা কয়, দেখো, বড়লোকের উচিত গরীবকে বিয়ে করা অশিক্ষিতের উচিত শিক্ষিত বিয়ে করা। তাহলে ব্যালেন্স হবে। সংলাপগুলা এরকম ছিল, মাথায় গেঁথে গেছে। আমি তো খুশি। আমার মনের কথা কয় কেন আব্বাস ভাই! এতদিন কোথায় ছিলেন, আয় বুকে আয়! কোর্স করতে এসে মুভি দেখে সবাই খুশি। সব বুইঝা ফেলতাছি। দিনও ঘনাইয়া আসতাছে, বোরখার দিকে তাকাই! তারপর বস কইলেন, ছেলেটা কি কনভিন্স করতে পারছে? মেয়েটা কি শেষ পর্যন্ত রাজি হইছে? আমরা কইলাম কই, সেরকম কিছু তো দেখায় নাই।

বস: এর জন্য এটার নাম ‘থ্রু দ্যা অলিভ ট্রিজ’।

লাস্ট সিন, টপ শট একটা জলপাই বনের ভেতর দিয়ে ওরা দুজন যায়। কারো মুখের অভিব্যক্তি দেখা যায় না বা কথা শোনা যায় না। হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত মেয়েটা রাজি হয়। জলপাই হচ্ছে শান্তি আর সুসংবাদের প্রতীক। আর এটা আরো পোক্ত করার জন্য পরিচালক বেছে নিছেন একটা ইরানি ‘হ্যাপি এন্ডিং’ মিউজিক। যেখানে মিউজিকের তালে তালে সম্মতি আদায় করতে পারা খুশি নিয়া ছেলেটা নাচতে নাচতে যায়।

এখানে শুধু মোস্তফা সরয়ার ফারুকীকে নিয়ে কইতেছি তাই আনিসুল হকের বিষয় আনি নাই। শেষদিন রিকশার ছবিওয়ালা টি-শার্ট গায়ে আনিসুল হক ভাইয়ের লগে তাঁর লেখা, সদ্য লেখা প্রথম আলোর কলামগুলা নিয়া আলাপ হইছিল। সেদিন পিকনিক একটা ভাব আছিল। দুইজনের লগে সেজো আপার আমেরিকা থেইকা পাঠানো পোলারয়েড ক্যামেরায় ছবি তুললাম। বস মুখ ঘুরাইয়া আড়াল করার চেষ্টা করেন। আগে ফারুকী ভাই তেমনভাবে ক্যামেরার সামনে আইতেন না, সাক্ষাৎকার দিতেন না কখনই। আনিসুল হক ভাই কইলেন, ফারুকী, তোমার মুখ তো দেখা গেল না। তাকাও তাকাও। ফাঁকে ফাঁকে রসিকতা। তারপর খুব সুন্দর একটা লেখা লিখা অটোগ্রাফ দিলেন।

৩.
এরপর পুরা দমে লাইগা গেলাম গা সিনেমা দেখতে। ঐ সময়েই চট্টগ্রামে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের আয়োজন হচ্ছিল তার কাছাকাছি সময়ে শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালও।

একটা ফিল্মও বাদ দিলাম না। বাসা থেকে টাকা চুরি কইরাও দেখছি। বিখ্যাত বিখ্যাত সব ছবি বড় পর্দায়। আমাদের কোর্সের তিনজন এখন মিডিয়ায় স্বনামে প্রতিষ্ঠিত। তাদের একজন আশফাক নিপুণ। এলিট শ্রেণীর। পাত্তা দিত না। ফেস্টিভ্যালগুলাতে দেখা হইত। খুব ভাবস নিয়া কইত, “কী অবস্থা? ফিল্ম শিখার কদ্দুর?” চ্যাট-ইনবক্সে এমন সব টেক্সট-লিঙ্ক পাঠায় মাঝরাত্তিরে হোঃ হোঃ করে হাসি। কাউয়াক্যাচাল লেখাটা পইড়া খুব পঁচাইয়া (পজিটিভ অর্থে) এমনভাবে এপ্রিশিয়েট করল… এইটা খোলা চিঠি, আর খুইলা কওন গেল না। আশফাক নিপুণ উচ্চশিক্ষিত, আমার সিনিয়র বন্ধু। ছবিয়ালেও। আমি যখন প্রবেশ করি আশফাক তখন বানাইতেছে। কী নিয়া যখন লিখব ভাবতেছি তখন এই সাবজেক্টটা মাথায় আইল। কোর্সের আরেকজনটা কে? কুইজ থাকল!

ফেস্টিভ্যালের একটার আয়োজক ছিল কাফস (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সেন্টার); আমি তাদের টিকেট কাউন্টারগুলার আশেপাশে ঘুরতাম। যদি কোন কাজে লাইগা যাই। ভাবতাম, ইশ ওদের মত হইতে পারলে সব মুভি ফ্রি। স্মার্ট, আধুনিক তরুণ সব। ফেস্ট শেষ হলে যোগাযোগ করলাম। মেম্বার হমু। হয়তো টাকা লাগবে। ওদের প্রধান বলল, চবি-র স্টুডেন্ট হতে হবে। এরপর একবছর… আশা শেষ!

vai7

অন্য ফেস্টের আয়োজক কোর্সের সেই চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্র। যোগাযোগ করলাম। আর মেম্বার হইয়া গেলাম। বাহ এত্ত সহজ! দীর্ঘদিন আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ‘চট্টগ্রাম চলচিত্র কেন্দ্রে’র পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নিকটজন শৈবাল চৌধুরী কইলেন, জ্বি, সহজ। এখন থেকে নিয়মিত আসবেন। ছবি দেখবেন, ছবি পড়বেন, ছবি নিয়ে আড্ডা হয়, থাকবেন। জানবেন। কেমন? তখন থাইকা আমি সিএফসি’র সদস্য। ফ্রি যে শুধু বড় পর্দায় দেখি তা না। দুর্লভ সব ছবির মাস্টারপ্রিন্ট কালেকশানে ভরা সিএফসি’র আর্কাইভ। পরবর্তীতে ছবিয়ালে ঢুইকা পাইলাম ছবির ডিভিডির বিশাল ভাণ্ডার। বস সিনেমা বাইছা দিয়া কইত, দেখ। কখনও একা বেশিরভাগ সবাই মিলা সিনেমা দেখার মাতলামি। সিএফসি বড় বড় কুতুব ডিরেক্টরদের সিনেমা নিয়ে রেট্রোস্পেক্টিভ করত। সিনেমা দেখা, জানা, বোঝা সহজ করে দিয়া সেই থেইকা শৈবালদা আমার প্রিয় এক ব্যক্তিত্ব। উনি ডকু বানান, আঞ্চলিক পত্রিকাগুলাতে নিয়মিত সিনেমা নিয়া আর্টিকেল লেখেন। সেগুলা সংগ্রহ কইরা পড়া আমার আরেকটা কাজ হইয়া খাড়াইল।

৪.
পরে জানলাম বস মাঝখানে কিছুদিন জব করছিলেন। জবের সুবাদে চিটাগাং ছিলেন। চট্টগ্রামে তাঁর ভাল বন্ধু-আড্ডা আছে। চট্টগ্রাম ভালবাইসা ফেলছেন। চট্টগ্রামে কাজে, বন্ধুদের কাছে আইতেন। অনেক শুটিং করছেন। একদিন শুটিং-এর লোকেশন দেখতেই আসছেন। সন্ধ্যার পর সিএফসিতে আইলেন লগে কচি ভাই, মারজুক ভাই। আমি আগে থাইকা জানতাম। এত কাছে পাইলাম সবাইরে।

মারজুক ভাইয়ের তখনকার লুক
মারজুক ভাইয়ের তখনকার লুক

সিএফসি’র নন্দন কানন অফিসের ফ্লোরে বইসা চা-মুড়ি দিয়া খোলামেলা আড্ডা হইল। ডিজাইনার, সিএফসি’র দেবাশিষদা ফারুকী ভাইয়ের ক্লোজ ফ্রেন্ড। আমি বুদ্ধের মতন মৌন বইসা দেখি। কচি ভাই, প্রথম কাছ থেইকা দেখা, টিশার্টের উপর শার্ট, গলায় অনেকগুলা লকেট। বুম মেরে বইসা আছেন। দেইখা মনে হয় চুর। পরে জানলাম কচি ভাই এমনই। সেদিন পোলাপান বসের কাছে সিনেমা নিয়া, গল্প নিয়া উইঠা পইড়া লাগছিল। বস তাদের আগ্রহ দেইখা বেজায় খুশি। ক’টা পিচ্চি মাম্মি-ড্যাডির পোলা আছিল, তখনকার দিনে হ্যান্ডিক্যাম লইয়া ঘুরে, সিনেমা বানাইতে এখনি নাইমা পড়ে অবস্থা। বস তাদের হাতেকলমে, কাগজে আঁইকা শট ডিভিশানসহ দেখাইয়া দিতাছিলেন। আমি ভাবলাম, খাইছে! আমার সিনেমা বানানোর কী হইব! আস্তে আস্তে মারজুক ভাইর কাছে ঘেষতাছি। ভাই তখন ইয়াং ক্রেজ। কইলাম, ভাই আসসালামুলাইকুম।

মারজুক রাসেল (হুংকার দিয়া): হুউম।

আমি: ভাই, ‘কবিতা আছে নি? খাইছে কে? মাছে নি?’ আছে নাকি নাই!

মারজুক রাসেল: ক্যামনে!?

কী ক্যামনে বুঝলাম না। ফারুকী ভাইয়ের অবর্তমানে শৈবালদা, দেবাশিষদা ফারুকী ভাইরে নিয়া অনেক গল্প করতেন আমাদের কাছে।

আমাদের বাসায় ডিশ আছিল না, ইলেক্ট্রনিক্সে এক্সপার্ট আমি চোরা লাইন টাইনা আর পরবর্তীতে ডিশ লাইন লইলে ‘স্টার মুভিজ’ লইয়া পইড়া থাকতাম। টানা মুভি দেখতাম। আমাদের পরিবারে তো বটেই আশেপাশের বা আত্মীয়স্বজনের মইধ্যেও তখন ইংলিশ মুভি মাইনে খুব খারাপ। তাও টানা সবাই অবাক হইল, বিলা খাইত! আমি শুধু বস বলল বলে না, একেকটা মুভি দেখি আর আমার সামনে দুনিয়ার একেকটা দরজা খুলে যায়।

উনার ধারাবাহিক, নিউজ দেখে দোকান থেইকা ফোন দিতাম। কাউরে ফোন করতাম না। উনাকে দিতাম। ক্যারিশম্যাটিক পারসোনালিটি। আমি পাইলাম, আমি ইহারে পাইলাম। উনি ধরত, বেশিরভাগ সময় ঘুম ঘুম জড়াইন্না গলায় কইত, হেলো কে?

বস, আমি হুমায়ূন। চট্টগ্রাম থেকে (ভয়ে ভয়ে)।

এরপর নরমাল টোনে, “ও, হ্যাঁ। কী অবস্থা কবীর?”

ভাল বস। আপনি?

আমিও ভাল। এইটা জানার জন্য ফোন দিছি। (আর কী বলব খুঁইজা পাইতাম না তো।)

ও, হ্যাঁ। আমি ভাল আছি। ভাল থাকবেন হ্যাঁ।

জ্বি।

এরপর আইল চড়ুইভাতি। আমার তখন ভিডিও’র দোকানে আড্ডা। ফ্রি মুভি আর গান শুনি। চড়ুইভাতি বাংলাদেশের প্রথম টেলিমুভি যেটার প্রিমিয়ার, ডিভিডি বের হইছিল আর ব্যাপক চলছিল। বুয়েটের কাহিনী। মারজুক রাসেল, নয়া আমদানি আরবান লুক মামুনুল হক, তরুণদের বুকধড়াস অপি, ইলোরা। অসম প্রেম, নায়কের টু-টাইমিং। নায়কের একলগে অপি আর টিচারের লগে কঠিন পিরীত। জেলাসি! আগে দেখি নাই কখনও। বসরে ফোন দিয়া দীর্ঘ আলাপ জুড়ি। খালি প্রশ্ন… কত প্রশ্ন মাথায়!


চড়ুইভাতি – টেলিফিল্ম – ইউটিউব ভিডিও

বস, চড়ুইভাতির মত এমন ঘটনা কি ঘটছে আসলে। আজাইরা সব প্রশ্ন। বস, ঐ বুড়াটা বুয়েট ক্যাম্পাসে এসে কী খোঁজে?

বস ঐ যে, ঐ মেয়েটা… যে খালি ফোন ধরে। কিছু না, কোন কাম নাই। আর খালি টিভি দেখে। এটার মানে কী?

শোন এটা হচ্ছে আরবান সোসাইটির চিত্র। আর মেয়েটা হচ্ছে, কিছু মানুষের কোন কাম নাই ফোন ধরা আর টিভি দেখা ছাড়া। এরা কিছু করে না। এটাই এর চরিত্র।

মনে মনে নিজের সাথে মিলাই… আরে! আমি শটের কিছুই বুঝতাম না। অনেক কিছু বুঝতে চাইতাম। বস মনে হয় খুশি হইত। এতদূর থেইকা একটা ছেলে তার ফিল্ম লইয়া, শট লইয়া, দৃশ্য লইয়া আগ্রহ দেখাইতেছে… সাহস পাইয়া প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতাম, উত্তর দিত। ব্যাখ্যা কইরা বুঝাইত। এরপর মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর প্রথম মুভি ব্যাচেলর আসতেছে আওয়াজ পাই। চড়ুইভাতির সিক্যুয়েলের মত। এক কোরবান ঈদে চ্যানেল আইতে প্রিমিয়ার হইল আলোচিত, তরুণ-তরুণীদের মনে প্রশ্ন ও ঝড় তুইলা দেয়া আরেক ইতিহাস ব্যাচেলর। তখন রাতদিন ব্যাচেলরে’র গান শুনি। কী একেকটা গান। মারজুক ভাইয়ের লেখা লিজেন্ড রকার আইয়ুব বাচ্চুর “আমিতো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার উপর পড়েছে…”, “বাড়ছে তোমার বন্ধুর সংখ্যা, তোমাকে তাই হারাবার শংকা, কমছে প্রাণের আয়ু”।

কামু ভাইয়ের লেখা কিংবদন্তী সঞ্জিবের “তোমার ভাঁজ খোল আনন্দ দেখাও, করি প্রেমের তর্জমা.”, পান্থ কানাই’র “গোল্লাইয় নিয়ে যাচ্ছে আমায় হাওয়াই জলের গাড়ি” পথিক নবীর “মানুষ আমি আমার কেন পাখির মত মন” আহ রকিং!! সারাদিন এগুলা শুইনাই দিন যাইত। বুকের মাঝে উথাল-পাথাল হইয়া যাইত।

আমরা চ্যানেল আইয়ের কল্যাণে দেইখা ফেললেও ইম্প্রেসের এই সমস্যাটা ছিল। ছবি টিভিতে প্রিমিয়ার করত। তাতে অনেকে টিভিতে দেখে ফেলে আর হলে যায় না। আর রেকর্ড হয়ে ডিভিডি বাইর হইয়া যায়। বাকিরা ডিভিডি দেখে ফেলে। এতে পরিচালক ও হল হারায় অনেক বড় কিছু। ফোন না দিয়া পারলাম না। ততদিনে আমার বিশ্বাস জইন্মা গেছে, এই লোকটা ফোন করলে ধরে, কথা কয়, বিরক্ত হয় না। আলাদা সেলিব্রিট ভাব আছিল না আর কি। কিন্তু একেক সময় একেক নাম্বার থেইকা করি যদি না ধরেন, যদি বিরক্ত হন! কাঁপা হাত আর বুকের ধুঁকফুকানির মইধ্যে ফোন করতাম। পরিচিত ফোন-ভিডিও’র দোকান ভি-জোন থেইকা করতাম, সময় লইয়া, নিরিবিলিতে গিয়ে কথা কওয়ার লাইগা। বন্ধুরা কইত, কীরে কার সাথে কথা বলছ? কোন মাইয়া? কিছু কইতাম না। তারা দাম দিবে না। সবার ইন্টারেস্ট তো এক না।

ফোন দিয়া অভিনন্দন জানাই। আর উচ্ছাসের কথা কইলাম। তিনিও খুশি। ধন্যবাদ জানাইলেন। টিভিতে প্রিমিয়ার হওয়াতে উনি খানিকটা নাখোশ। এবং এখন তিনি জিনিসটা করে ছাড়লেন। টিভিতে প্রিমিয়ার হতে দেন না। বলছিলেন, এটার ডিভিডি বের হবে না। কেউ বের করলে কঠিন দণ্ড। মজাদার ডায়ালগ, ইয়াং হার্টথ্রব মারজুক রাসেলের জেরিন, রেকলেস বিউটি ইলোরা আর বিশাল অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদী এই ছবিরে কই নিয়া গেছে। ব্যাচেলরের সরাসরি ফসল হাসান মাসুদ, ইলোরা গওহর।

এইটা নিয়া ফারুকী ভাইরে অনেক কথা অনেক প্রশ্ন শুনতে হইছে। যাদের কাছে সিনেমা মানে লং শট, আলো-ছায়ার খেলা তারা কইল, এটা কেমন সিনেমা… এমুন ক্যা? আনিসুল হক জবাব দিছেন, আমরা এমনই বানাতে চেয়েছি। আর এমন ব্যাচেলর শ্রেণী কি নাই ঢাকায়? আমরা তাদের গল্প বলতে চেয়েছি। ডেইলি স্টারের রিপোর্টে ফারুকী ভাইকে জিজ্ঞেস করা হল, এখানে কোন চরিত্রটা আপনি, আহমেদ রুবেল। ফারুকী হেসে বলল, না না। এমন কি আমার প্রেমিকার অভিযোগ আমি তার দিকে তাকাই না কেন?

আমেরিকার রাষ্ট্রদুত হ্যারি কে টমাস তার তিনটা প্রিয় মুভির নাম বলছিলেন। একটা ব্যাচেলর

এভাবে ভিডিওর দোকানে গলায়-হাতে ব্রেসলেট ঝুলাইয়া মারজুক ভাই স্টাইলে আড্ডা দিই। শান্টিং ছাড়া সংযোগ নিষিদ্ধ– কবিতা পড়ি।


ব্যাচেলর মুভি – ইউটিউব ভিডিও

বসরে ফোন দিয়া কইলাম, বস ক্যামনে কী? বস বাণী দিল, নগদ যা পাও হাত পেতে নাও। তখন আমার তলাও নাই, বাপের হোটেলে বইসা খাই। বাপের উপর একটা চাপ, অভিশাপ হইয়া আছি। কিছু একটা করতে হইব, বাসায় কম থাকি। টিভি দেখি না। কিন্তু খবরাখবর রাখি। সিরিয়াল স্বরবর্ণ থিয়েটার, ৭৪২, ৫১বর্তীর পর তখন সিক্সটি নাইন হিট (সংখ্যা নিয়া নামগুলাও আকর্ষণীয়, পরবর্তীতে ৪২০, থার্ড পারসন)। বড়ভাইর কাছ থেইকা পিসি, নেট, মেইলের তালিম আগে পাইছি। টাকা যা পাইতাম ছুটতাম সাইবার ক্যাফে। ক্যাফে গিয়া ভাইয়ার মেইল প্রিন্ট কইরা আইনা পড়তাম। আম্মাই কইত, কোন মেইল আইছেরে? সো নিয়মিত আড্ডা সাইবার ক্যাফে গিয়া সিক্সটি নাইনের ব্যাবহৃত মিউজিক সংগ্রহ কইরা শুনি। একদিন টিভিতে সিক্সটি নাইন সিরিয়ালের এন্ড টাইটেলের শেষে দেখি উনার ইমেল অ্যাড্রেস। ৯/১০ বছর আগে ক্যাফে এত সহজ, সুলভ আছিল না। বহু দূরে তাও স্লো আবার এক্সপেন্সিভ। বসরে মেইল করতাম বস মেইলের জবাব দিত। বড় অ্যাচিভম্যন্ট ভাইবা পুলকিত থাকতাম। মেইলগুলা আছে এখনও। এরপর বাসায় আনলাম পিসি। উদ্দেশ্য সিনেমা দেখা আর নেট। টাকা জোগার কইরা ইন্টারনাল মডেম লাগাই। বাপ-মায়ের লগে বিদেশে থাকা ভাই-বোনের কথা কইয়াই দেই ম্যাসেঞ্জারে, তারা আজিব যন্ত্রের কারবারে চমৎকৃত আর খুশি পোলার কৃতিত্বে। এতদিনে কিছু করছে। ধরে নেয় পোলার আবিষ্কার। একজনের কাছে নেটের কার্ডের খোঁজ পেয়ে খুচরা টাকার প্রিপেইড কার্ড কিনে নেট ইউজ করি। তখন হটমেইলের এমএসএন ম্যাসেঞ্জার ছিল। বসের হটমেইলে অ্যাকাউন্ট। লাগা কানেকশান। আমার আইডি আছিল ‘কবীর’।

বসের ইমেইল আইডি এড কইরা চ্যাট বক্সে ঢুইকা বসরে পাইতাম। সালাম… হাউ আর ইউ?

হ্যাঁ কবীর ভাই, কী অবস্থা?

এই তো ভাল। আপনার?

ভাল। আপনাদের ওখানে এখন কয়টা?

বুঝলাম, গ্যাঞ্জাম হয়ে গেছে। বস আমারে দেশের বাইরে ধইরা বইছে নাকি অন্য কেউ মনে করতাছে?

কইলাম, বস, আমি তো বাংলাদেশে। আমি হুমায়ূন। চট্টগ্রাম থেকে।

ও, তাই নাকি। হুমায়ূন। কী অবস্থা? আমার বড় ভাই কবীর বাইরে থাকে। ‘কবীর’ আইডি দেখে আমি ভাবছি কবীর ভাই।

সেদিন থেকে বিদেশ বিভূঁইয়ে থাকা কবীর ভাইয়ের লগে আমার অদৃশ্য সখ্য হইয়া গেল। আমার আত্মার আত্মীয়। শুধু নামের কারণে না, বস আর আমার মাঝখানে ঘটক পাখি হিসেবে কাজ করছেন কবীর ভাই।

এখনো শুধু কথা বলা, দূর থেকে দেখা কবীর ভাই বড় ভাই হিসেবে মাথার উপর থাইকা গেছেন। বাংলাদেশের কাজ দেখেন। কার কাজ পছন্দ কোন কাজ ভাল, কোনটা ভাল হয় নাই এসব কথা হয় কবীর ভাইয়ের লগে। বসের কাজেরও কড়া সমালোচক কবীর ভাই। যারা দেশের বাইরে থাকে, নিয়মিত এবং আগ্রহ নিয়ে বাংলাদেশের কাজ দেখে, আমার ভাই, কবীর ভাই, তাদের আগ্রহ, অনুরোধ, অভিযোগ আমি মন দিয়া শুনি। একটা দিকনির্দেশনা পাই। নিভৃতে বসের পরিবারের সাথে একটা সম্পর্ক হইয়া গেল। বসের বাসায় গেলে এখনো সেটা টের পাই। একান্নবর্তী পরিবারের মত। বাড়ির নামও একান্নবর্তী। বসের মা ধর্মপ্রাণ কিন্তু একজন জাতকবি। নিজের গান নিজেই সুর দিয়া গান। এইখান থেইকা হয়তো বস তাঁর ক্রিয়েটিভিটি পাইয়া থাকবেন।

এরপরও ফারুকী ভাইয়ের লগে অনেক কথা হইত। চট্টগ্রামে তো আইতেনই। একদিন ম্যাসেঞ্জারে কথা হইতাছে, কইলেন, এরমধ্যে চট্টগ্রাম আইবেন নতুন ছবি ‘মেড ইন বাংলাদেশের’ লোকেশান দেখার লাইগা। আমি ঝাপাইয়া পড়লাম। কব্বে? দেখা করুম। থাকুম আমি। উনি ইংরেজীতে লিখলেন, ডান। নাম্বার দিলেন। আমার সেল আছিল না। ল্যান্ডফোন আছিল। ল্যান্ডফোনের লগে তখন সেলফোনের যোগাযোগটা ছিল না। আমি কইলাম, আমার তো সেল নাই, ল্যান্ডফোন আছে। আমি ফোন দিয়া জাইনা নিমু নাকি জিগাইলে কইলেন, চিটাগাং আইসা যোগাযোগ করবেন। আমি একটা রিকুয়েস্ট নাম্বার দিলাম। আমার বোনের নাম্বার।

আরেক কুরবানির ঈদ আসন্ন। উনি আর আসেন না, কল আর আসে না। আমি তো আর জানি না উনি ব্যস্ত মানুষ উনি কি আর আমাকে কল দিবেন! কত পুলা উনার সাথে কাজ করার লাইগা ডিস্টার্ব করে, উনার কি আমার কথা মনে আছে! থাকার কথা না। আমি তো জানতাম না বুঝতাম না। আমি আশায় থাকি… “বন্ধু চলে গেলারে… কবে আইবারে!” যদি ডিস্টার্বড হন, যদি কথা না কন তাই কল দেই নাই। সেই ঈদে কবি প্রোডাকশনটা গরম গরম গেল। একটা উপলক্ষ পাইয়া বহুদিন পর ফোন করি। ওপাশে রিং হয়… কী হয় কী হয় আমার বুকের মইধ্যে!

বস, লোকেশান দেখতে আসবেন বললেন, আসলেন না?

ফারুকী ভাই: হ্যাঁ। আমি তো গেছিলাম।

এঁহ! আমার মাথায় খাড়া দুপুরে ঠাডা পরে। সব প্ল্যান ভাইসা গেল মনে হইল। বস কইল, অসুবিধা নাই। আবার গেলে দেখা হবে। আর ঢাকা আসলে দেখা কইরেন।

ঢাকায় আপা থাকে। আমি প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলাম। ঢাকা যাইতে হবে। ট্রেনের টিকেট করলাম। ব্যাগ গুছাইলাম। সকাল ৬টায় ট্রেন। নির্দিষ্ট দিনে ঘুম থেইকা উঠতে করলাম দেরি। রেডি হয়ে খাইয়া না খাইয়া দিলাম দৌড়। ভোর বেলা কোনো গাড়ি নাই। অপেক্ষা অপেক্ষা… একটা রিক্সা পাইয়া তাড়াহুড়া কইরা যাইতেছি। স্টেশানে নাইমাই আমার ছোট্ট দেহের কাঁধে ব্যাগ ঝুলাইয়া উসাইন বোল্টের মত প্লাটফর্মে ছুটতাছি। ট্রেনের হুইসেল শুনি। মেসির গোল মিস হইতে পারে, গেইলের ছক্কা। আমার ট্রেন মিস হইতে পারে না। আমি ছুটতাছি…

(আমাদের ভাই-বেরাদর হওয়া ২)

সিনেমায় আরো লেখা

মেয়েকে লেখা মার্টিন স্করসিসের চিঠি
গলিয়োঁ কি রাসলীলা রাম-লীলা ছবির কাহিনি
রেড ওয়ান রনির চোরাবালি ও আমরা
রুবাইয়াত হোসেনের ইন্টারভিউ