আমার কলেজ পিকনিকের দিন

সারাজীবনে আমার ফ্যামিলি আমাকে একবারই দূরে যাইতে দিছে। সেইটা কলেজের পিকনিকে। এর আগে সবসময় খালি বলছে, বড় হও, বড় হও, তারপর যাইয়ো। ক্লাস টু বা থ্রি’তে একবার পিকনিকে গেছিল আমার স্কুল। আমার বাপ-মা আমাকে যাইতে দেয় নাই যথারীতি। সেই দুঃখে রাগে আমি একটা কাগজের শপিং ব্যাগে আমার কয়টা হাফ প্যান্ট আর ফ্রক নিয়া বাসা থেইকা বের হইয়া গেছিলাম। যে আর বাসায় থাকব না, আব্বু-আম্মু কত খারাপ, একটা পিকনিকে পর্যন্ত যাইতে দিল না আমাকে!

সেইদিন আবার আব্বুর ছুটি ছিল। সে আমাকে দেখছিল গেইট দিয়া বাইর হইয়া যাইতে। পরে আমার পিছে পিছে গিয়া গলির মাথা থেইকা আমাকে ধইরা আনছে।

কেমনে কেমনে কলেজে ওঠার পর আমাকে যাইতে দিল। আমি প্রত্যেকবারই অবাক হইছি এইটা ভাবতে গিয়া।

কলেজ থেইকা আমাদের নিয়া গেছিল গাজীপুর সাফারি পার্কে। তখন আমার কাছে ফোন ছিল। ফোন আমাকে দেওয়া হইছে বোধহয় ক্লাস সিক্সে বা সেভেনে। কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে বহু দূরে ফ্যামিলি ছাড়া একা এরকম বড় বড় স্বাভাবিক পশু পাখি দেইখা আমি এতই উত্তেজনার মধ্যে ছিলাম যে ফোনের কথা মনেই পড়ে নাই। পুরা পিকনিক ঘুইরা ঘুইরা পশু পাখি সিংহ দেখতেছিলাম। আর মুগ্ধ হইতেছিলাম। একটা জায়গা এত বড়, এত খোলামেলা। সবখানে গাছ, বড় বড় লম্বা লম্বা চিকন অল্প পাতার বেশি পাতার ঘন সবুজ গাছ। আমরা গেছিলাম প্রচণ্ড গরমের মধ্যে। কিন্তু গাছগুলির নিচে গেলে অত টের পাওয়া যাইত না। সবকিছু মিলায়াই ফোন যে সঙ্গেও আছে, তা পুরা পিকনিকে আমার মনে পড়ে নাই। ফলে, ওই পিকনিকে আমার নিজের ফোনে তোলা কোনো ছবি নাই।

এমন না যে হিন্ট ছিল না কোনোপ্রকার ফোনের কথা মনে হওয়ার। পিকনিক যেহেতু, মেয়েরা গাড়িতে ওঠার আগ থেইকাই ফোন হাতে নিয়া ঘুরতেছিল। টিচাররা কিছু বলতে পারবে না এখন এই সুযোগে তারা যা মন চাইছে কইরা নিছে। অনেকে এমনকি বাসে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে আলাপও সাইরা নিছে। অথচ স্যার-ম্যাডামরা সামনে বসা।

যাওয়ার সময়টা খুবই বিরক্তিতে কাটছে আমার। বাস থেইকাই শুরু হইছিল মেয়েদের সেলফি তোলা। ওরা অন্যদের বাধ্যও করত ব্যাকগ্রাউন্ডে ঢুকতে। সামনে পিছনে সমানে মেয়েরা গুচ্ছাকারে সেলফি তুলতেছিল। একে তো বাস, তার উপর চিপা গলি, তার উপর রাস্তার উঁচু-নিচু জায়গা দিয়া বাস গেলেই তারা বিকট চিৎকার দিত আর সিটের উপর আইসা পড়ত। এমন দমবন্ধ অবস্থা, মনে হচ্ছিল কেন যে আসতে গেছিলাম!

আমার সেমি ব্রিলিয়ান্ট ফ্রেন্ড গ্রুপ থেইকা গেছিলাম আমি, মুনজারিন ও নিটোল। মুনজারিন কলেজের ওরিয়েন্টেশনের পরেই পরহেজগার হয়ে গেছিল। একদম আচমকা। মনে আছে ওরিয়েন্টেশনের দিন আমাদের কমন ফ্রেন্ড তৃণা আমাকে ওর স্কুলের দুইটা ফ্রেন্ডের সঙ্গে পরিচয় করায়া দিছিল। দুইজনের কেউ’ই আমাকে পাত্তা দিতেছিল না। তখন খুব সুন্দর সিল্কি স্ট্রেইট চুলের একটা মেয়ে ছিল ওদের মধ্যে। যাকে ওইদিনের পর আমি আর কখনোই দেখি নাই। অনেক পরে আইসা জানছি ওই মেয়েটা মুনজারিন।

এইটা একটা কারণ হইতে পারে সে পিকনিকে অত সেলফি তোলে নাই। আর তার ক্যামেরা ফোন ছিল না। বাটনওয়ালা একটা কী ফোন জানি ছিল। যেইটারে সে বলত ‘আমার ভাঙ্গা আইফোন’। ওই ভাঙ্গা আইফোনের ফোন করা আর রিসিভ করা ছাড়া বিশেষ কোনো কাজ ছিল না। রেডিও, গান ইত্যাদি হয়ত শোনা যাইত। আর আমার সেলফির অত অভ্যাস নাই।

কিন্তু আমাদের থার্ডজন, নিটোল, সে আমাদের বাকি দুইজনের কোটা একাই পূরণ করছিল। দুই মিনিট পর পর, “অ্যাই তাকা, অ্যাই তাকা,” “অ্যাই, মুনজারিন, এদিকে ঘুর!” আমার সঙ্গে যখন যখন ছবি তুলতে আসছে আমি বলছি, বাসে উঠলে আমার খারাপ লাগে, আমার বমি আসতেছে। সে তারপরও ছাড়ে না। মুনজারিনও একটু পর একই কথা বলল। কিন্তু এক্সকিউজ কাজে দিল না, নিটোল আছে নিটোলের তালে।

মুনজারিন বলল, এই বিষয়ে নিটোলরে বুঝায়া সময় নষ্ট করার চাইতে আমাদের মনোযোগ অন্যদিকে ফিরাইতে চেষ্টা করা ভালো, নাইলে সব বমি কইরা ভাসাব। এই কথা বলার সময় ওর অবস্থা কেন জানি একটু  খারাপ মনে হইল। ও ঠিক বইসা নাই, সিটে হেলান দিয়া আছে। একটু কপাল কুচকায়া কথাটা বলতেছিল।

বাসে আমার খারাপ লাগে তা ঠিক, কিন্তু বমি হয় না। খুব ছোটকালে একবার দুইবার হইছে। কিন্তু ওর নাকি বমি করার রেকর্ড আছে। তখন ভয় পাইলাম। এমন দুর্ঘটনা ঘটলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হব আমি। কিন্তু উইঠা গিয়া অন্যখানেও বসা যায় না। পরে সারাজীবন খোটা মারবে, আমার দুর্দশায় এমন ব্যবহার করছিলি।

ছোটকালে একবার একটা প্রাইভেট কারে ফ্যান্টাসি পার্ক গেছিলাম আমরা। গাড়ি অন্যের। জাস্ট গিয়া গাড়ি চলার উপরে পার্কের বাহিরটা দেইখা আবার ফেরত আসা। নামতে হবে না বইলা আব্বু বাসার লুঙ্গি পইরাই গেছিল। গাড়িতে ওঠার পর থেইকা আমার বিশ্রী লাগতে শুরু করল। আমি বললাম, আম্মু খারাপ লাগতেছে। আব্বু সামনে থেইকা বলে, অ্যাই সাবধান, আরেকজনের গাড়ি, খবরদার কিছু কইরো না। আমি পুরা রাস্তা নিজেকে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করলাম। বাসার গেটে আইসা নামার সময়, গাড়ির দরজাও খোলা, গাড়ি থেইকা নামতে নামতে বমি করলাম। আব্বু আমাকে বকতে বকতে শেষ। এছাড়া আমার মনে পড়ে না আর কখনো বমি করছি গাড়িতে।

নিটোলকে বললাম, তোর কাছে খাওয়ার কিছু থাকলে ওরে দে, ও কখন জানি বমি করে। নিটোলের সিট ছিল আমাদের হাতের ডানে। বাসে ওঠার সময়ই দেখছিলাম ও ওর বিরাট স্কুল ব্যাগ নিয়া আসছে, আমি ভাবছি ওর হয়ত আর কোনো ব্যাগ নাই। পরে দেখি সে ওই ব্যাগ থেইকা পপকর্ন ভর্তি একটা বিরাট প্লাস্টিকের বস্তা বের করছে। সঙ্গে দুই লিটারের পানির বোতল, কোক, চানাচুর, আরো অনেকগুলি ছোট ছোট প্যাকেট। পপকর্ন আমার হাতে ধরায়া দিয়া বলল, ওরে পপকর্ন খাইতে বল, তাইলে বমি হবে না। আমার তো বাসে বমি হয়, প্রত্যেকবার বাসে এইজন্য আব্বু পপকর্ন কিনা নেয়। ওইটা খাইলে আর খারাপ লাগে না। বইলা ব্যাগটা তার সিটের উপরে রাইখা বের হইয়া বাসের মেয়েদের সঙ্গে আবার নাচা শুরু করল। যাওয়ার সময় বইলা গেল, পানি লাগলে ব্যাগ থেকে বের করে নিস।

মুনজারিনকে পপকর্ন খাইতে বললাম। ও বেচারি সিটে হেলান দিয়া চোখ বন্ধ কইরা বইসা ছিল। পপকর্ন কতগুলি খাইল। খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে দেখি লাফ দিয়া সোজা হইয়া বসল হঠাৎ, বইসা তড়িঘড়ি কইরা ইশারা করল পলিথিন দিতে, এইটা তখন বুঝি নাই ও কী চাইতেছিল। সামনের সিটের পিছে থলের মত জায়গায় প্রত্যেকের জন্যে পলিথিন বরাদ্দ ছিল। সে পলিথিনটা মুখে ধইরা মুখ ভর্তি কইরা বমি করল। নিটোলের ব্যাগ থেইকা পানি বের কইরা ওরে দিলাম। জানলা দিয়া অল্প কুলি করল, তারপর পানি খাইল। একটু শান্ত হইয়া বলল, ওর কথা শোনা ঠিক হয় নাই। ভালোই আছিলাম, হালার পো পপকর্নটা খাওয়াইয়া সব শেষ কইরা দিল।

মুনজারিনের শৃঙ্খলাবদ্ধ বমি করায় আমি একটু নিশ্চিন্ত হইলাম। আর ভয় নাই। কিন্তু বাসে তারপরই যতরকমের বাজে গান বাজানো শুরু হইল। সেই সময়কার হিট গান ‘নাগিন’ নিয়া আসছিল একটা মেয়ে। স্যার-ম্যাডামদের টপকাইয়া সে গিয়া বাসওয়ালারে বইলা এই গান দিয়া আসছে। হঠাৎই পিকনিকের গান বন্ধ হইয়া ধ্বংসাত্মক আওয়াজে নাগিন বাজতে শুরু করল। আমার হেভি মেটাল কানে (তখন সবে হেভি মেটাল শোনা শুরু করছি) সেই গান আরো কুশ্রী হইয়া ধরা দিল। আমি বুঝতেছিলাম না কী করব। মুনজারিন বমি কইরা শান্তিতে ন্যাপ ধরনের কিছু একটাতে ঢুকতেছে। আর নিটোল নাগিনে মোহাবিষ্ট হয়ে আছে। একটা শান্ত শিষ্ট সারাক্ষণ গলা নামায়া কথা বলা ভদ্রতা জানা মেয়ে এমন উড়াধুরা গানে পাগলের মত নাচতে পারে ওরে দেইখা আমার বিশ্বাস হইতেছিল না। নাচের মাঝখানে একবার আইসা আমাকে আর মুনজারিনকে বলে, আমার বাপ যদি আমারে দেখত এইভাবে বাসে নাচতেছি, আনন্দে কাইন্দা দিত। আমরা জানতে চাইলাম কেন। বলে, প্রত্যেকবার বাসে উঠলে আমার বমি থামাইতে থামাইতেই তাদের সময় চইলা যায়, ভিউ আর দেখতে পারে না। বইলা হাসতে হাসতে আবারো নাচতে গেল। সে বাসে কয়েক ঘণ্টা নাচছে। পৌছানোর আগ পর্যন্ত একটা সেকেন্ডও তাকে সিটে বসতে দেখা যায় নাই।

বাস থেইকা নাইমা আমরা গ্রুপওয়াইজ একজন টিচারের নেতৃত্বে ঘুরতেছিলাম। আমরা ছিলাম গ্রুপ থ্রি। আমাদের গাইড ছিলেন আমাদের ফিজিক্স টিচার। যিনি ক্লাসে যাওয়ার আগে টিচার্স বিল্ডিংয়ের নিচে কেমিস্ট্রি স্যারের সঙ্গে একজন আরেকজনের কোমরে হাত দিয়া আলাপ করতেন। এইটা আমি আমার ফ্রেন্ডদের দেখায়া একদিন অনেক হাসাহাসি করছিলাম।

তখন আমি একটা নতুন প্রেমে পড়ছিলাম। পরে গিয়া জানছিলাম তা শুধু আমার দিক থেইকাই ছিল, মানে ওয়ান সাইডেড। সে আমাকে সেইভাবে দেখে নাই কখনো। অসফল হওয়া সেই প্রেমের কথা এর মধ্যেই বার বার মনে আসতেছিল, আর মন খারাপ লাগতেছিল। তা ওদের সামনে প্রকাশ করি নাই অবশ্য। এখনও ওরা জানে কিনা সন্দেহ।

আমাকে সবচেয়ে টানছিল ওখানকার খোলামেলা পরিবেশ। প্রচুর গাছপালা। প্রাণিগুলি চিড়িয়াখানার প্রাণিদের মত রোগা পটকা না, বেশ স্বাস্থ্যবান আর মুক্তভাবে স্বচ্ছন্দে ঘুইরা বেড়াইতেছে যে যার মত। কেউ দৌড়াইতেছে। কেউ ঘাস খাইতেছে।

সাদা সিংহের পার্টটা আমার সবচেয়ে ভালো লাগছিল। ওখানে সিংহের এলাকায় যাইতে হয় মিনিবাস দিয়া। যেহেতু ওরা বন্দি অবস্থায় থাকে না। বড় বড় মেশিনচালিত স্লাইডিং গেইট দিয়া অ্যাগ্রেসিভ প্রাণিদের এলাকা আলাদা কইরা দেওয়া। সিংহ ওখানে দুইটা ছিল। মাঝখানে একটা ছোট জলার মত। ওখানে ওরা নামে, গোসল করে। তো দুইজনই ওখানে ছিল। আমাদের বাসটা জলার সামনে আইসা থামামাত্র একটা সিংহ উইঠা আইসা ধীরে ধীরে বাসের পাশ কাটায়া পিছনে একটু দূরত্বে গিয়া ফিরা তাকাইলো। মেয়েরা আনন্দে চিৎকার শুরু করল। সব গিয়া বাসের একপাশে ধাক্কাধাক্কি কইরা সিংহকে কাছ থেইকা দেখার চেষ্টা করল। নিটোলকে যথারীতি দেখা যাচ্ছে না মেয়েদের ভিড়ে সে ঠিক কোন জায়গাটায় আছে। আমি ভিড় পছন্দ করি না আর মুনজারিন অলরেডি বমি করছে তার শক্তি নাই এই ভিড়ের মধ্যে ঢুইকা সিংহ দেখবে। ফলে আমরা দুইজন সিটেই বইসা থাকলাম।

বাসটা একটু আগায়া গেলে মেয়েরা যার যার সিটে বইসা পড়ল। আগায়া গিয়া আরেকবার থামল। তখন পিছন ফিরা দেখার চেষ্টা করলাম, দেখা যাচ্ছিল তখন। সিংহটা এক দৃষ্টিতে আমাদের বাসটার দিকে তাকায়া আছে। আমার মনে হইল, পৃথিবীর যত ঐশ্বরিক শক্তি সব নাইমা আসছে ওই চোখ দুইটায়। এত সুন্দর একটা প্রাণি, ওর সঙ্গে দেখা হবে তা একটু আগেও ভাবি নাই।

পার্কে আরো অনেক কিছু দেখলাম আমরা। ম্যাকাও, প্রজাপতি… আরো কী কী জানি। সবাই ছবি তুলল। নিটোল প্রতিটা খাঁচার সামনে গিয়া আলাদা আলাদা কইরা সব প্রাণির সঙ্গে আগে নিজের, পরে আমাদের দুইজনকে সাথে নিয়া গ্রুপ ছবি তুলল। ওরে মাছের ছবি তুলতে দেইখা মুনজারিন বলল, বান্দর নাই এই এলাকায়? বান্দর আছে? জিগা তো কাউরে, থাকলে বান্দরের সঙ্গে একটা ক্লোজ ছবি তুল, আমি তুইলা দিতেছি। সেলফির জন্য এই প্রাণিদের মধ্যে বান্দর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিটোলের কোনো হ্যাঁ না নাই। সে একটা ভেংচি দিয়া তার মতো তুলতে থাকল।

ঘুরাঘুরি শেষে সবাই গেলাম খাইতে। পার্কেরই একটা রেস্টুরেন্টে। ওখান থেকে সিংহের এলাকা দেখা যায়, এবং পুরাটা গ্লাস হওয়ায় জায়গাটা উন্মুক্ত মনে হয়। যেন এখনই একটা সিংহ হাঁটতে হাঁটতে আইসা আমাদের পাশে চেয়ারে বসবে খাইতে। আমরা খাইতেছিলাম ভাত, সবজি আর মুরগী। এত খিদা পাইছিল আমার যে অনেকগুলি কইরা খাইতেছিলাম। মুনজারিন আমাকে বলল, আন্টি যদি দেখত এই দৃশ্য এখনই আনন্দে নফল নামাজ পইড়া মাজারে সিন্নী দিত।

তারপর আমাদের পাশ থেইকা কারা জানি “রিয়া” বইলা ডাক দিল। আমার খুবই বিরক্ত লাগল। নিটোল আর মুনজারিন হাসল। গ্রুপ ফোরের একটা মেয়ের নাম রিয়া। সে বোধহয় তার ফ্রেন্ডদের মধ্যে ফেমাস। ফলে, যা কিছু হয়, মাথা থেইকা একটা চুল পড়লেও ওদের সেইটা রিয়া’কে ডাইকা দেখাইতে হয়। অ্যাই রিয়া এইটা হইছে, অ্যাই রিয়া সেইটা হইছে। সারাক্ষণ এক প্যাঁচাল, যেন দুনিয়াতে আর কোনো আত্মীয় স্বজন নাই ওদের। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম খাওয়া শেষ কইরা যখন বের হব ওদের থেইকা এক মাইল দূরে দূরে হাঁটব।

খাওয়া-দাওয়ার পরে বেশিক্ষণ আমরা থাকি নাই ওখানে। রেস্টুরেন্টের সামনে একটা হলুদ মাটির ফকফকা বন, ওখানে চেয়ারে বইসা আমরা খাওয়ার ক্লান্তি ঝরাইতেছিলাম আর ভাবতেছিলাম বাকিরা কত গাধা, এই জিনিস কেউ মিস করে! আরো পাবে এই পিকনিক? মুনজারিনকে একটু ইমোশনাল দেখাইল। আমরা আর কতদিন একসঙ্গে আছি, এই পার্টটা সে সবসময় খুব গুরুত্বের সঙ্গে প্লে করে। তখনও করল।

এর মধ্যেই আবার একটা মেয়ে ধরা খাইছে স্যারের কাছে। সে গ্রুপ থেইকা বিচ্ছিন্ন হইয়া দূরে গিয়া নাকি কোন ছেলের সঙ্গে ঘুরতেছিল। অন্য গ্রুপের মেয়ে, আমরা চিনি না। পরে জানা গেছে ছেলেটা ওই মেয়ের বয়ফ্রেন্ড। পিকনিকে আসছে বইলা সে তার বয়ফ্রেন্ডকেও আসতে বলছে এখানে। কী সাহস, মেয়েদের সঙ্গে ঘুরার এক ফাঁকে কায়দা কইরা সে আলাদা হইয়া গেছে। পশুপাখির এলাকা থেইকা সইরা অন্যপাশের পার্ক এলাকয় ঘুরতেছিল। তার ফ্রেন্ডরা বিষয়টা কাভার দিতেছিল। তাতে লাভ হয় নাই। স্যারেরা খুবই চালাক। ঠিকই ধইরা ফেলছে। মেয়েটার গ্রুপের স্যার, বয়ফ্রেন্ডটাকে ভাগায়া দিছে। আর মেয়েটাকে বইক্কা বাসে পাঠাইছে। আমরা মেয়েটার দুঃখে সব হাসতে হাসতে শেষ। সবাই বলতেছিল “একদম উচিত শিক্ষা হইছে, পিকনিকে বয়ফ্রেন্ডকে ডাকবে কেন!”

একটু পরে আমাদের বাসে ওঠার আয়োজন শুরু হইল। ওঠার আগে ওখানে যত রকমের হাবিজাবি আছে খাওয়ার, যত রকমের আচার সব কিনলাম আমি। মুনজারিন বলে, আর কিছু বললাম না, সময়মতো রেজাল্ট সব বলবে। আমি বললাম, বলুক, যা আছে কপালে। যাইতে যাইতে সেগুলি সব খাইলাম। হাবিজাবির সমালোচক মুনজারিন আমার সব আইটেম থেইকা খাইল, বলল, ওরেও দে। নিটোল বলল ও এখন বসবে না, আনন্দ করবে।

তার এই আনন্দের মানে একশবার যেই গানে নাচছে আসার সময়, আগামী দুই আড়াই ঘণ্টাও ওই গানে নাচবে। আমি আর মুনজারিন খাইয়া এতই ক্লান্ত ছিলাম যে বাকি টাইম আর উঠি নাই বসা থেইকা। মুনজারিন নিটোলরে দেখাইয়া বলে, ওর সিট তো ইউজই হয় নাই, ওরে দিছে কেন? যাওয়ার পথে আর মুনজারিন বমি টমি করে নাই। বেশ আনন্দ নিয়াই যাত্রা উপভোগ করতে দেখা গেছে তাকে।

কলেজে নাইমা আমরা বিদায় নিয়া আমাদের বাপ মা’র সঙ্গে যার যার বাসায় গেলাম। নিটোল বাস থেইকা নাইমা একদম পল্টি, সে এখন সেই আগের ভদ্র কিচ্ছু না জানা মেয়েটি।

আমি আমার আম্মার সঙ্গে ফিরলাম। যাওয়ার সময় কোল্ড কফি খাইলাম বেইলি রোড থেইকা। বাসায় ফিরা ব্যাগ থেইকা জিনিসপত্র বের করতে গিয়া দেখি ফোনটা আমার ব্যাগের ভিতরেই ছিল।

ফোন যে আদৌ আমার আছে সেই কথাই মাথায় আসে নাই আমার, মানে কোনো ছবিই তুলি নাই আমি। এই কথা গিয়া ম্যাসেঞ্জারে আমাদের গ্রুপে বললাম।

নিটোল বলল, তুই একটা ছাগল, দাঁড়া আমি তো ছবি আপলোড করবই, এখানেও সব ছবি দিচ্ছি, যার যেইটা লাগে সে সেইটা নিয়া নে।

যার যেইটা বলতে বুঝাইছে আমাদের নয়জন বন্ধুদের মধ্যে সে সহ আর যে দুইজন গেছে, তাদের যেইটা লাগে।