ঊনিশের ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি। আমি আর পুস্পিতা তখন কয়েকদিন সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করে উল্টায়ে ফেলতেছিলাম। জ্বী না, বিসিএস না। আমি ইংরেজি ভাষায় সমাজবিজ্ঞান, পুস্পিতা সংখ্যা ভাষায় অংক।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাইব্রেরিতে থাকি। এক ঘণ্টা ঝিমাই, দুই ঘণ্টা খাই, দুই ঘণ্টা হলে যায়ে ঘুমাই। একদিন বিকালে আমি ঘুমায়ে আসছি, পুস্পিতা ঘুমাইতে গেছে। হঠাৎ করে আমার তাবা হওয়ার সুপ্ত ইচ্ছা জাগ্রত হইল। তিন চার মিনিট চিন্তা করে ভাবলাম আরো চিন্তা করলে প্রত্যেক বারের মতো প্ল্যান বাতিল করে দিব—ভূত মাথা থেকে যাওয়ার আগে কাজ করে ফেলতে হবে। আমি সাথে সাথে উঠলাম। শাহবাগের দিকে গিয়ে টুপি কিনলাম। তারপর নাপিতের দোকানের দিকে হাঁটা দিলাম।

চুল কাটতে বসার পর নাপিত জিজ্ঞেস করল, কতটুকু কাটবেন?

আমি বললাম, সব।

লোকটা দ্বিতীয় কোনো কথা না বলে কেচি বাদ দিয়ে খুর হাতে নিল। তারপর চুল আঁচড়ায়ে ঠিকঠাক করে মাথায় খুর বসায়ে বলল, ফেলে দিলাম?

আমি বললাম, হ্যাঁ।

ন্যাড়া হওয়ার একদম শেষ পর্যায়ে আছি। সামনের চুলগুলা ফেলবে, এমন সময়ে বলে—চুল তো সুন্দর ছিল, ফেলে দিলেন কেন?

আমি বললাম, সুন্দর ছিল? আমার চুল সুন্দর ছিল!

বলে, হ্যাঁ।

আমি বলি, খুশকি না অনেক?

লোকটা বলে, শীতকালে তো হয়ই।

আমি বললাম, তো আপনি সেটা আগে বলেন নাই কেন!

যাক। ঘটনা তো ঘটেই গেছে। ন্যাড়া হয়ে আমি আবার টুপি পরে দেখি টুপি বড় হয়ে গেছে। চোখের ওপর এসে পড়ে। ভাঁজ বাড়ায়ে দিয়ে কোনো রকমে ম্যানেজ করলাম। রাস্তায় বের হওয়ার পর দেখি মাথা কুট কুট করে। মানে টুপি আর চুল ছাড়া মাথা—ব্যাপারটা ঠিক হজম হচ্ছে না। কিন্তু কিছু করার নাই।

তারপরে আমি আবার লাইব্রেরিতে গিয়ে বসলাম। পুস্পিতা তখনো ঘুম থেকে উঠে আসে নাই। আরো প্রায় পনেরো মিনিট পরে আসল। এসেই বলল, চা খাবি?

আমি বললাম, হ্যাঁ।

তারপর সে জিজ্ঞেস করে, টুপি কই থেকে কিনছিস?

আমি বললাম, শাহবাগ থেকে।

তারপরে আর কিছু বলে না।

কয়েক মিনিট পর আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুই এখনো কিছু বুঝিস নাই?

বলে, কী বুঝবো?

আমি তারে দেখাইলাম কী বুঝবে। তার এক্সপ্রেশন দেখে মনে হইল “হ্যাঁ ঠিক আছে। এরকম তো হইতেই পারে।” বিষয়টা ইতিবাচক না নেতিবাচক আমি ধরতে পারলাম না।

আমার হলের রুমের আপুদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া হইল। একজন বলল, আমাকে অবশ্যই থাবড়া দেওয়া উচিত। একজন বলল, আমাকে বরং ন্যাড়া মাথাতেই বেশি মানাচ্ছে। আরেকজন বলল, বিষয়টা কেমন কেমন জানি, তবে আমি বলেই মানায়ে গেছে। আরেকজন বলল, তারও আমার মতো ন্যাড়া হয়ে যাইতে ইচ্ছা করতেছে।

এই মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় আমার পুনর্বার উপলব্ধি হইল ভালো-খারাপ বলতে কিছু হয় না, বাবা। না ফেললে সারাজীবন ফেলতে চাইতাম—কাজেই ফেলে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হইছে।

পরিচিত মানুষজনদের সাথে দেখা হইলেই তাবা মাথা দেখার জন্য তারা এত আগ্রহ দেখাইতে শুরু করে দিল যে আমি ভাবলাম ফি বসাব। প্রত্যেকবার দশ টাকা করে নিব। কিন্তু, আমি যেহেতু বেশি ভালো মানুষ—সেইজন্য করলাম উল্টাটা। পরিচিত কারো সাথে দেখা হইলেই সে তার মুখ খোলার আগেই আমি টুপি খুলে বেল মাথা দেখানো শুরু করে দিলাম। এই সমস্ত অগ্রীম কাজকর্ম করে আমি সবসময় ফল পাই। কেউ আমাকে থাবড়া দিতে চাইলে আমি বরাবরই অতি আগ্রহের সাথে গাল বাড়ায়ে দেই—ফলত থাবড়াটা কোনোদিন খাইতে হয় না।

যাক। আমার ধারণা ছিল চুল ফেলে দিলে মাথা চুলকায় না। কিন্তু ঘটনা উল্টা ঘটা শুরু করলো। ফাঁকা মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে আমার মোটামুটি জীবন বের হয়ে যেতে লাগলো। উপরি ঝামেলা শুরু হইল চুম্বক আকর্ষণ। মাথায় কিছু দিলেই আটকে যায়। বালিশের থেকে মাথা তুলতেও ঝামেলা। যন্ত্রণায় অতীষ্ট হয়ে প্রথম বার মনে হইল কাজটা ঠিক হয় নাই। তার উপরে আমার ক্লাসমেট রায়হান এসে বলল, তোর মাথায় তো চুল এপ্রিলের আগে উঠবে না।

এই কথা শুনে আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম।

তবে চুল ফেলে দেওয়া নিয়ে প্রচুর ন্যারেশন তৈরি হইছিল। কেন আমি চুল ফেলে দিলাম বা কারা আমাকে ন্যাড়া করে দিল শীর্ষক। সেইগুলা সবকয়টাই বেশ মজার ছিল।

 

চুল ফেলার পরের দিন আমি গেলাম বাসায়। আমার আম্মা প্রথমে টুপি দেখে মনে করল আমি শখ করে পরছি। তারপরে সন্দেহ হওয়ায় তার সন্দেহের সুরাহা করা হইল। তিনি সাথে সাথে বললেন, ছি ছি ছি ছি! তুই এই কাজ কেমনে করলি! সামনে এতগুলা বিয়া!

আমাকে দেখার পর তূর্ণার (আমার ছোটবোন) মাথায় যে ঠাডাটা পড়ছিল সেটা এবার আমার মাথায় পড়ল। এতগুলা বিয়া মানে কী? আম্মু তখন মানে ব্যাখ্যা করল।

আমি দেখলাম নানাবাড়ি দাদাবাড়ি দুই দিকের ধরা খাইতে হবে। অনেক কষ্টে ঠাডাহত অবস্থা থেকে উঠে বললাম, আমার কী? আমার তো দেখতে হচ্ছে না। আমি তো খোলা মাথায়ই চলে যেতে পারি।

তূর্ণা রীতিমত আর্তনাদ করে বলল, কিন্তু আমাদের তো দেখতে হচ্ছে।

আমি বললাম, আমার তাতে কিছু আসে যায় না।

আসে যায় কি যায় না সেটা বোঝা গেল বাড়িতে যাওয়ার পর। ছোট ভাই-বোনেরা আমার সাথে যা করল সে ইতিহাস গোপন থাকাই ভালো। দুলাভাইরা কী করল সেই ইতিহাসও। দাদা ভাইয়ার অবস্থা দেখে মনে হইল আমি পালায়ে বিয়ে করে ফেলছি। সবাই এমন বকাটা দিল আমাকে—স্বীকার করে ফেললাম যে বিয়ের খবর জানলে আমি ন্যাড়া হওয়াটা আরো এক দফা স্থগিত রাখতাম।

বিয়ের দিনের দুইটা কাহিনি না বললে আমার তাবা হওয়ার গল্প কোনো ভাবেই সম্পূর্ণ হবে না। ফুপাতো বোনের বিয়ে। আমি গেলাম স্টেজে নতুন দুলাভাইয়ের সাথে পরিচিত হতে। চারপাশে মানুষজন খাচ্ছে। এর মাঝে আমার ভাগ্নি আমার টুপিটা দিল টান। আমার বীরপুরুষ ভাই তারে একপাশে নিয়ে দিল বিশাল এক চড়। আমি যদি তার মতো বীরপুরুষ হইতাম আমিও তারে একটা চড় দিতাম। কিন্তু আমি যেহেতু বীর নারী—আমি তারে বললাম, তুই এটা একটা কাজ করলি?

সে বলে, বেয়াদবি করবে কেন?

আমি বললাম, সেই কারণে মারবি? পোলাপান মেরে মানুষ করে? যা আদর করে দে।

ভাই আমার বীরপুরুষ হইলেও স্নেহময় মামা। কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছিল। কী আর করবে। প্রকাশ করে ফেলল। এদিকে আমার বাঁই বাঁই করে মাথা ঘুরাচ্ছে। আমি বাড়িতে গেলাম রেস্ট নিতে। ফুপুর বাড়িতে হই চই পড়ে গেল আমি অপমানিত হয়ে বাড়ি চলে গেছি। ফোন পায়ে দৌড়ায়ে যায়ে দেখি আমার বেচারি ভাগ্নি আরো এক দফা মাইর খাইছে মায়ের হাতে। তার মা’কেও আমার বকা দিতে হইল। এত অপমানবোধ থাকলে এই বয়সে কেউ মাথা ন্যাড়া করে না এইটা কে কাকে বোঝাবে!

ওর মা’কে বকাবকি করে বাইরে বের হলাম। আমার বোনের দূরসম্পর্কের দেওর আমার কাছে এসে বলল, আপনার কাছে একটা আবদার আছে।

আমি বললাম, কী আবদার?

বলে, আপনার টুপিটা একটু দিবেন ছবি তুলবো?

আমি টুপি দিয়ে বললাম, শিওর, আমি ভিতরে আছি, ছবি তোলা শেষে দিয়ে যাবেন।

পরের দিন বৌভাতে গিয়ে অনেক খুঁজলাম ছেলেটাকে। ছেলেটা প্রথম বার দেখে সুন্দর করে হাই দিল। তার পরের বার গ্রুপ ছবি তোলার সময় পাইলাম। তাকে ফোনটা ধরায় দিয়ে বললাম, কালকে তো আমার টুপি পরে ছবি তুলছেন, আজকে আমাদের ছবি তুলে দেন।

আমার এই তাবা হওয়ার ঘটনায় নতুন মাত্রা যুক্ত করল ডিসেম্বর মাস এবং পারমিতা আপুর জন্মদিন। পারমিতা আপু আমার তাবা হওয়াকে তার জন্মদিনের উপহার হিসেবে গ্রহণ করলেন! কারণ তিনি তাবা মাথা পছন্দ করেন এবং আমার এই সম্পাদিত কর্মের পিছনে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব আছে। আমি যখন চুল ছোট করি, তখনই তিনি বলেছিলেন সব ফেলে দিতে। কিন্তু সমাজ সংসার একসাথে এত বড় ধাক্কা সামলাতে পারবে না ভেবে আমি তাদেরকে ধাপে ধাপে ধাক্কা দিয়েছি। তাদের নিয়ে আমি যত চিন্তাভাবনা করেছি, যে সেনসিটিভিটি দেখিয়েছি তার এক পার্সেন্টও আমি তাদের কাছ থেকে পাই নাই, ইহা দুঃখজনক।

চুল যখন ছিল না তখন চুল মিস করতাম। কিন্তু চুল একেবারে ফেলে না দিলে যে বিশাল অভিজ্ঞতা হইল সেটাও মিস হয়ে যাইতো। এখন আবার চুল বড় হচ্ছে—অশান্তি লাগতেছে। শান্তি এক জিনিস নাই পৃথিবীতে। কম কম সময়ের জন্য আসে—আবার চলে যায়। আবার চলে না গেলে সে যে আছে, তারে যে পাওয়া লাগবে, সেটাই বা বোঝা যেত কেমনে!

Recommended Posts