আহমদ ছফাকে নিয়ে কেন নাচি?

আহমদ ছফা (১৯৪৩-২০০১)

বছরখানেক আগে এক ব্যক্তি আমাকে বেশ চেপে ধরলেন। আহমদ ছফাকে একরকম নাকচ করে কথা শুরু করলেন।

বললেন, আহমদ ছফার অবদান আসলে কী? আপনারা তাকে নিয়ে এত নাচেন কেন?

আমি বললাম, প্রথম কথা হলো বুদ্ধিজীবিতা একটা জীবন্ত প্রক্রিয়া। এর মূল কাজ হলো, যা ঘটছে তার ব্যাখ্যা করা এবং জনগণকে সম্ভব প্রতিটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা। আহমদ ছফার সময়ে যদি আপনি বসবাস না করেন, তাকে যদি তার সময়ের ভেতর অনুভব করতে না পারেন, তাহলে তার বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান আপনি অনুধাবন করতে পারবেন না। সময় থেকে আলাদা করে আপনি তার বইগুলো নিয়ে বসলেও খুব কম কিছু পাবেন না। কিন্তু যদি বুঝতে চান তাকে নিয়ে আমরা কেন নাচি তাহলে তার সময়টা বুঝতে হবে। ছফা যেভাবে ওই সময়টাকে ফেস করেছেন সে ধারণা আপনাকে পেতে হবে।

একজন বুদ্ধিজীবীর বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা শুধু তার লেখার মধ্য দিয়ে পাওয়া যায় না। জীবনযাপনের নানা পদক্ষেপের ভেতর, সমকালীন রাজনীতির প্রতিটি ঘটনার মধ্যে তিনি অবস্থান নেন, কোনোটার পক্ষে দাঁড়ান, কোনোটা বিরুদ্ধে। এসব তার জীবনচরিতে খুঁজে পাওয়া যাবে। কেন ছফা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এঁটে উঠলেন না, সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেন তার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চললো এবং তিনিও চললেন, কীভাবে তার সমসাময়িক ও পরের প্রজন্মের অনেক লেখকের উদ্বোধন তার মাধ্যমে হলো তার পেছনে তো বিশেষ কারণ আছে। আবার ধরা যাক, এত গুণমুগ্ধ ভক্ত থাকতে কেন ছফার মাধ্যমেই অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক পাঠকমহলে পৌঁছালেন, শিল্পী সুলতানকেই বা কেন তিনি নতুন করে হাজির করতে শুরু করলেন—এসবই সেই পদক্ষেপের অংশ। এসব তো তার বইয়ে লেখা নেই। লেখক যতটুকু লেখেন ততটুকুই বইয়ে থাকে। বাকিটা পড়তে হলে তার জীবনচরিতই ভরসা।

তবু আপনি এখন ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ পড়েন। আপনি যদি ইতিহাসের ঘটনাবলি না জানেন তবে এটাকে আপনার মামুলি ও আবেগি একটা গদ্য মনে হবে। কিন্তু, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও চিন্তার ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই। স্বাধীনতা-পরবর্তী বুদ্ধিবৃত্তির অচলায়তনে বড় আঘাত দিয়েছিল এ বই। এ লেখা আপনাকে সংক্রামিত করবে এখনও।

আপনি ‘অলাতচক্র’ উপন্যাস হিসেবে পড়েন। ভাল উপন্যাস। কিন্তু আহামরি কিছু মনে হবে না। কিন্তু ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে পড়েন। এমন উপন্যাস লেখার সাহস এখনও কোনো বাপের বেটার হয়নি।
‘গাভী বৃত্তান্ত’ বেশ সমালোচিত। কিন্তু এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নানা পরিস্থিতিতে এ উপন্যাস বহুকাল প্রাসঙ্গিক থাকবে।

একবার এক বিদগ্ধ ব্যক্তি বলছিলেন, ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ ঠিক গবেষণাপ্রসূত রচনা নয়। আমি বললাম, অর্ডিনারি লোকেরা গবেষণা করে আর যারা দ্রষ্টা তারা তথ্য প্রমাণ ও রেফারেন্সের ধার ধারে না। কারণ তারাই রেফারেন্স।

আহমদ ছফা দার্শনিক নন। তিনি গবেষক নন। অধ্যাপক নন। তিনি ঔপন্যাসিক, কবি, বুদ্ধিজীবী। তার প্রতিটি কাজ তার সময়ে এবং আমাদের সময়ে প্রাসঙ্গিক। প্রাসঙ্গিকতা ছাড়া কোনো উপন্যাস হোক আর কোনো বিরাট দর্শনের বই, সেটা দিয়ে আমাদের কাজ কী?

আহমদ ছফার যে কোনো লেখা আলোড়িত করে। নতুন চিন্তার খোঁজ দেয়। কেন দেয়? কারণ, তিনি একটা বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মধ্যে ছিলেন। তার প্রতিটি কাজ এনকাউন্টার। এখানকার প্রাতিষ্ঠানিক দাপ্তরিক বুদ্ধিজীবিতাকে তিনি সবসময় চ্যালেঞ্জ করেছেন। আর নিজের সময়কে প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণ করে গেছেন।

আমাদের দেশে হয়তো বড় কবি আছেন, বড় ঔপন্যাসিক আছেন, দার্শনিক আছেন, অধ্যাপক আছেন। কিন্তু আহমদ ছফার তুলনীয় কেউ নেই। তার মতো ভাইব্র্যান্ট, ফায়ারব্র্যান্ড বুদ্ধিজীবী নেই। তার সব কথার সঙ্গে আপনি একমত হতে পারবেন না। তার সীমাবদ্ধতাও ছিল। কিন্তু একটা সময়কে ধরতে সে সময়ের ভাষ্য রচনা করতে যে সাহস, শক্তি ও দক্ষতা লাগে সেটুকু তার পর্যাপ্ত ছিল।

তিনি জমিয়ে রাখতেন, কথা বলতেন। আহমদ ছফা নেই মানে আহমদ ছফা নেই। তিনি আছেন মানে তিনি আছেন। পার্থক্যটা বিরাট। সতর্ক ও সাবধানী বুদ্ধিজীবিতার সময়ে আহমদ ছফার প্রাসঙ্গিকতা সহজে ফুরাবার নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here