ইঁদুররা অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে মুখভঙ্গি বদলায়—মুড ডিজঅর্ডারের চিকিৎসার ধরন বদলে দিতে পারে নতুন গবেষণা

ইঁদুর

যতদূর আমরা জানি, মানুষের মত ইঁদুর জোর করে হাসতে পারে না বা বিরক্ত হলে তা গোপন করতে পারে না। কিন্তু আমরা হয়ত ভাবিই নাই তাদের ছোট্ট অদ্ভুত মুখগুলি আদৌ কোনো আবেগ প্রকাশ করতে পারে।

তবে জার্মান নিউরোবায়োলজিস্টদের একটা দল প্রমাণ করেছে, ইঁদুররা আসলেই আবেগ প্রকাশ করতে পারে। তা তাদের ছোট্ট চেহারা দিয়েই প্রকাশ করে। গবেষকরা বলছেন, ইঁদুরের মস্তিষ্কের ওপরে করা এই গবেষণার ফলাফল মেজাজ জনিত রোগ বা মুড ডিজঅর্ডারের রোগীদের চিকিৎসার পদ্ধতি উন্নত করতে পারে।

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অফ নিউরোবায়োলজির স্নায়ুবিজ্ঞানী ও গবেষণাপত্রটির অন্যতম লেখক নাডিন গগোলা সিএনএনকে জানান, কোনো প্রাণির অনুভূতির অবস্থা নির্ণয় করতে পারা মস্তিষ্কের ‘কীভাবে’ এবং ‘কেন’ শনাক্ত, সঙ্গে সেখানে কেন অনুভূতির সঞ্চার হয় তা বুঝতেও সাহায্য করবে।


স্কটি অ্যান্ড্রু
সিএনএন, ২ এপ্রিল ২০২০


গগোলা ও তার সহকর্মীরা কিছু আবেগপ্রবণ ইঁদুরের ওপর একাধিক পরীক্ষা করেন। তাদের মুখভঙ্গির সাথে আনন্দ, ঘৃণা, বিরক্তি, কষ্ট আর ভয়—এই ৫টি সংবেদনশীল অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য খুঁজে পান তারা।

গত সপ্তাহে সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফল আবেগের ব্যাপারে আমাদের জানাশোনা আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এছাড়া এই গবেষণা ইঁদুরদের সম্পর্কে আমাদের ধারণাও বদলে দিবে।

 

আপনি ইঁদুরের আবেগকে নির্ণয় করবেন কীভাবে?

অবশ্যই কাজটা খুব সহজ না।

গবেষক দল প্রথমে ইঁদুরদের কিছু নির্দিষ্ট উপায়ে প্রতিক্রিয়া দেখানোর জন্যে উদ্দীপিত করেছিলেন। যাতে প্রতিক্রিয়ার সাথে সাথে তাদের চেহারা কীভাবে পরিবর্তিত হয় তা পর্যবেক্ষণ করা যায়। যেমন একটা মিষ্টি দ্রবণ পান করে ইঁদুরগুলি আনন্দ প্রকাশ এবং তিতা স্বাদের ক্ষেত্রে বিরক্তি প্রকাশ করেছিল। আবার, লেজে যন্ত্রণাদায়ক ইলেকট্রিক শক তাদের মধ্যে ভয় জাগিয়েছিল। লিথিয়াম ক্লোরাইডের একটা ইনজেকশন তাদের অসুস্থ করে তুলেছিল।

গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, উদ্দীপিত করার কোনো নির্দিষ্ট উপায়ে প্রতিটা ইঁদুর একই প্রতিক্রিয়া দেখায় নাই। একটা তৃষ্ণার্ত ইঁদুর, পেট ভরা একটা ইঁদুরের চেয়ে পানি পান করার সময় বেশি আনন্দ প্রকাশ করছিল। এমন একটা ছোট প্রাণির পক্ষে এটা মোটামুটি সূক্ষ্ম ধরনের প্রতিক্রিয়া।

খুব কাছ থেকে তোলা ইঁদুরের ছবিগুলিতে তাদের মুখের ভাবভঙ্গির সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলি ধরা পড়েছিল। যখন কোনো ইঁদুর ব্যথা অনুভব করেছিল, তাদের নাক আর কান নিচের দিকে নেমে গিয়েছিল। আবার, যখন ভয় পেয়েছিল তখন তাদের কান কেঁপে উঠেছিল আর চোখ বড় বড় হয়ে গিয়েছিল।

যদিও গবেষকরা শুধুমাত্র তাদের মুখভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করেই সংবেদনের তীব্রতা নির্ধারণ করতে পারেন নাই। তাই নিউরোবায়োলজিস্টরা ইঁদুরের পরবর্তী মুখের ভঙ্গি কেমন হবে, তার একটা তালিকা তৈরি করেছিলেন এবং একটা কম্পিউটারকে ১ সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে তা শনাক্ত করার জন্যে প্রোগ্রাম করেছিলেন। গগোলার মতে, এটাই কার্যকরভাবে আবেগ ‘পরিমাপ’ করেছে।

তবে গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, আবেগ কেবল কোনো উদ্দীপনার প্রতি প্রতিক্রিয়া জানাতেই তৈরি হয় না। সেগুলির সূত্রপাত—মস্তিষ্কে।

তাই নিউরোবায়োলজিস্টরা টু-ফোটন ইমেজিং ব্যবহার করে ইঁদুরের মাথার ভিতরের ছবিটা দেখলেন। টু-ফোটন ইমেজিং হলো এক ধরনের মাইক্রোস্কপি, যার সাহায্যে টিস্যু ভেদ করে জীবিত কোষগুলি কীভাবে চলাচল করে আর কীভাবে সেগুলির পরিবর্তন ঘটে তা দেখা যায়। গবেষকদল ইঁদুরের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্যে আলো ফেলে তাদের নিউরন উদ্দীপ্ত করেন। আর নিউরন হলো স্নায়ুকোষ, যেগুলি সারা শরীর থেকে পারিপার্শ্বিক বিষয়ের তথ্য মস্তিষ্কে সরবরাহ করে।

মানুষের মস্তিষ্কের যেই অংশগুলি আবেগের সাথে যুক্ত, পরীক্ষায় দেখা গেছে ইঁদুরের মস্তিষ্কের সেই অংশগুলিই সাড়া দিয়েছিল। অ্যানটেরিয়র ইনসুলার কর্টেক্স নামে মস্তিষ্কের একটা অংশকে এতদিন সংবেদনশীল অনুভূতির জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়েছিল। একটা ইঁদুর যখন আনন্দ প্রকাশ করে, তখন তার মস্তিষ্কের সেই অংশটাই সক্রিয় হয়ে উঠেছিল।

ইঁদুরের মুখের অঙ্গভঙ্গি বদলানোর সাথে সাথেই তাদের মস্তিষ্কের নিউরনগুলি একই তীব্রতায় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। এই ঘটনা থেকে ধারণা করা যায়, নির্দিষ্ট কিছু নিউরন প্রাণিদের আবেগের পেছনে কাজ করতে পারে। গগোলার মতে, এই বিষয়টা নিয়ে আরো গবেষণার প্রয়োজন।

 

এই গবেষণা যেভাবে মানুষের কাজে আসতে পারে

মস্তিষ্কে উদ্বেগ এবং হতাশার মত আবেগগুলি কীভাবে তৈরি হয়, স্নায়ুবিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেন নাই। ডিপ্রেশন এবং উদ্বেগজনিত অসুখের চিকিৎসায় প্রচলিত ওষুধগুলি মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের সাথে কাজ করে। এবং কিছু রোগী বিহেভিয়রাল থেরাপির মাধ্যমে কিছুটা উপশম লাভ করেন।

তবে মস্তিষ্কে আবেগের উদ্ভব কীভাবে এবং কোথা থেকে হয়, তা জানা গেলে চিকিৎসকরা মুড ডিজঅর্ডারের চিকিৎসা পদ্ধতিতে উন্নতি আনতে পারবেন।

গগোলা বলেন, আশা করি, মস্তিষ্কের বিশেষ অংশগুলির কার্যক্রমে পরিবর্তন আনার মাধ্যমে কীভাবে মানুষের দুর্ভোগ কমানো যায় গবেষণাটা আমাদের সেটাই বুঝতে সাহায্য করবে।