Subscribe Now
Trending News

Blog Post

ইউভাল নোয়াহ হারারি: প্রযুক্তি কেন স্বৈরাচারের পক্ষে
ইউভাল নোয়াহ হারারি
কালচার

ইউভাল নোয়াহ হারারি: প্রযুক্তি কেন স্বৈরাচারের পক্ষে 

স্যাপিয়েন্স: অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অব হিউম্যানকাইন্ড (২০১৪) খ্যাত ইউভাল নোয়াহ হারারি এই শতকের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল পঠিত বুদ্ধিজীবী ও লেখকদের একজন। মূলত ইতিহাসবিদ হলেও, হারারির লেখালেখির পরিসর বেশ বিস্তৃত। ইতিহাস, সভ্যতা, বুদ্ধিমত্তা, স্বাধীন ইচ্ছা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, এমনকি মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা উঠে আসে তার লেখায়। স্যাপিয়েন্স ছাড়াও এই দশকে প্রকাশিত হয়েছে তার আরো দু’টি বেস্ট সেলার বই হোমো ডিউস: অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অব টুমরো (২০১৬) এবং টুয়েন্টিওয়ান লেসন্স ফর দ্য টুয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরি (২০১৮)

‘হোয়াই টেকনলজি ফেভারস টাইরানি’ প্রবন্ধটি তার টুয়েন্টিওয়ান লেসন্স ফর দ্য টুয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরি বই থেকে নেওয়া।

প্রযুক্তি কেন স্বৈরাচারের পক্ষে

ইউভাল নোয়াহ হারারি

১. ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার ভয়
গণতন্ত্রে অনিবার্য বলতে কিছু নেই। গত এক শতকে গণতন্ত্র যত সাফল্য পেয়েছে, তা ইতিহাসের সাপেক্ষে এক ক্ষুদ্র ঝলক মাত্র। রাজতন্ত্র, গোষ্ঠীশাসন এবং অন্যান্য প্রকারের কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা বরং ছিল জনগণকে শাসন করার অধিক প্রচলিত পদ্ধতি।

উদারনৈতিক গণতন্ত্রের উত্থান স্বাধীনতা এবং সাম্যের আদর্শের সাথে সম্পর্কিত যা স্বতঃসিদ্ধ এবং অপরিবর্তনীয় বলে মনে হতে পারে। তবে এই আদর্শগুলি আমরা যা ভাবি তার চাইতে অনেক বেশি ভঙ্গুর। ২০ শতকে এদের সাফল্য নির্ভর করত বিশেষ প্রযুক্তিগত অবস্থানের উপর যা ক্ষণস্থায়ী হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।

২১ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে উদারনীতি’র বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস পেতে শুরু করেছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চাহিদা মেটাতে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের সক্ষমতা বিষয়ে প্রশ্ন আরো জোরদার হয়েছে, এবং রাজনীতি হয়ে উঠেছে আরো বেশি গোষ্ঠীগতান্ত্রিক। ক্রমশ বহু দেশের নেতারা বক্তৃতা ও আবেগ-সর্বস্ব রাজনীতি এবং একনায়কতন্ত্রের প্রতি ঝোঁক প্রকাশ করছেন। এই রাজনৈতিক পালাবদলের কারণগুলি বেশ জটিল, তবে তা বর্তমান প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে জড়িত। যে প্রযুক্তি গণতন্ত্রের অনুকূলে ছিল তা পরিবর্তিত হচ্ছে। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত উন্নত হচ্ছে, ততই এই প্রযুক্তিতে হয়ত আরো বেশি পরিবর্তন আসতে থাকবে।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: প্রযুক্তি কেন স্বৈরাচারের পক্ষে
টুয়েন্টিওয়ান লেসন্স ফর দ্য টুয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরি

তথ্য প্রযুক্তি এগিয়ে যাচ্ছে অবিরত। জৈবপ্রযুক্তি আমাদের অভ্যন্তরীণ জীবন―অর্থাৎঅনুভূতি, চিন্তা ও পছন্দের ক্ষেত্রে দিগন্ত উন্মোচন করতে শুরু করেছে। মানুষের কর্তৃত্ব, এবং সম্ভবত মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে পরাভূত করার মধ্য দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি ও জৈবপ্রযুক্তি যৌথভাবে মানব সমাজে অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের সৃষ্টি করবে। এমন পরিস্থিতিতে উদার গণতন্ত্র এবং মুক্ত-বাজার অর্থনীতি অচল হয়ে পড়তে পারে।

সাধারণ মানুষ হয়ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা জৈবপ্রযুক্তি’র খুঁটিনাটি বিশদভাবে বুঝতে পারে না, কিন্তু তারা অনুভব করছে যে ভবিষ্যৎ তাদের আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে। ১৯৩৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন, জার্মানি অথবা যুক্তরাষ্ট্রের একজন সাধারণ নাগরিকের অবস্থা হয়ত দুর্বিষহ ছিল, কিন্তু তাকে ক্রমাগত আশান্বিত করা হত যে সে-ই দুনিয়ার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এবং সে-ই হল ভবিষ্যৎ (তবে অবশ্যই একজন “সাধারণ নাগরিক” হিসেবে, একজন ইহুদী কিংবা নারী হিসেবে নয়)। সে প্রপাগাণ্ডা পোস্টারের দিকে তাকাত, যা সাধারণত কয়লা খননকারী বা ইস্পাত-শ্রমিকের বিরোচিত ভঙ্গিমাকে তুলে ধরত, এবং নিজেকে এরমধ্যে দেখতে পেত: “ঐ পোস্টারে আমি আছি! আমি-ই ভবিষ্যতের বীর!”

২০১৮ সালে এসে একজন সাধারণ ব্যক্তি নিজেকে ক্রমাগত অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। টেড টকস-এ, সরকারের চিন্তাশালায়, এবং উচ্চ-প্রযুক্তি বিষয়ক সম্মেলনগুলিতে গ্লোবালাইজেশন, ব্লকচেইন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং ইত্যাদি নানাবিধ রহস্যময় পরিভাষা (টার্ম) নিয়ে হরহামেশা আলোচনা হয়। আর আমজনতার, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে যে এই পরিভাষাগুলির একটিও তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।


টুয়েন্টিওয়ান লেসন্স ফর দ্য টুয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরি (২০১৮) থেকে
অনুবাদ: দীপ্র আসিফুল হাই


বিংশ শতাব্দীতে জনগণ শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং অর্থনীতিতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করতে চেয়েছিল। বর্তমানে জনসাধারণ অপ্রাসঙ্গিকতাকে ভয় পায়, এবং খুব বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই তাদের পরিশিষ্ট রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করতে মরীয়া। তাই ব্রেক্সিট এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান প্রচলিত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিপরীত একটি পাথেয়কে নির্দেশ করে থাকতে পারে। রুশ, চীনা ও কিউবান বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিল জনসাধারণ যাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার ঘাটতি থাকলেও অর্থনীতিতে তাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৬ সালে ট্রাম্প এবং ব্রেক্সিট-কে সমর্থন করা অনেকেই এখনো রাজনৈতিক ক্ষমতা উপভোগ করলেও নিজেদের অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেলার ভয়ে ভীত। হয়ত একবিংশ শতকে জনসাধারণকে শোষণকারী অর্থনৈতিক-অভিজাতদের (ইকোনমিক এলিট) বিরুদ্ধে পরিচালিত না হয়ে লোকরঞ্জনবাদী (পপুলিস্ট) বিদ্রোহ সংগঠিত হবে এমন অর্থনৈতিক-অভিজাতদের বিরুদ্ধে যাদের আর জনগণকে প্রয়োজন নেই। এটি হতে পারে এমন একটি যুদ্ধ যেখানে পরাজয় নিশ্চিত। শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার চাইতে অপ্রাসঙ্গিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা অধিকতর কঠিন।

তথ্যপ্রযুক্তি ও জৈবপ্রযুক্তিতে যে বিপ্লবসমূহ এসেছে তা এখনো শিশু অবস্থায় রয়েছে, এবং উদারনীতির বর্তমান সংকটের জন্যে এরা কতটুকু দায়ী তা তর্কসাপেক্ষ। বার্মিংহাম, ইস্তানবুল, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও মুম্বাইয়ের বেশিরভাগ লোক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান ও তাদের জীবনে এর প্রভাব সম্বন্ধে অবগত হয়ে থাকলেও তা অতি অল্প পরিসরে। তবে নিঃসন্দেহে এই মুহূর্তে যে প্রযুক্তিগত বিপ্লব গতিপ্রাপ্ত হচ্ছে তা আগামী কয়েক দশকে মানবজাতিকে সবচাইতে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করাবে যার সম্মুখীন তারা আগে কখনোই হয় নি।

২. এক নতুন অকার্যকর শ্রেণী?
চাকরি এবং রোজগার দিয়ে শুরু করা যাক, কেননা উদারপন্থী গণতন্ত্রের দার্শনিক আকর্ষণ যাই হোক না কেন, এটির ব্যাপক হারে শক্তি সঞ্চয়ের পিছনে রয়েছে এক ব্যবহারিক সুবিধা। এই সুবিধাটি হল মত নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণ পন্থার অবলম্বন। আর এটি হল রাজনীতি এবং অর্থনীতি উভয় ক্ষেত্রে উদারপন্থার বৈশিষ্ট্য। এই বিকেন্দ্রীকরণ পন্থা উদারপন্থী গণতন্ত্রকে অন্যান্য রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ছাড়িয়ে যেতে এবং জনগণকে ক্রমবর্ধমান সমৃদ্ধির জোগান দিতে সক্ষম করে তুলেছে।

উদারপন্থা প্রলেতারিয়েতের সাথে বুর্জোয়ার, আস্তিকের সাথে নাস্তিকের, অধিবাসীদের সাথে অভিবাসীদের, এবং ইউরোপীয়দের সাথে এশীয়দের মিলন ঘটিয়েছে সবাইকে খাবারের বড় অংশটি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। নিয়ত বর্ধনশীল খাবার থাকায় এটি সম্ভব ছিল, এবং এই বৃদ্ধি হয়ত চলমান থাকবে। তবে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়ত প্রযুক্তিগত সংকটের ফলে সৃষ্ট সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে পারবে না, কারণ আরো বেশি বেশি বিধ্বংসী প্রযুক্তির উদ্ভাবনের উপরে এই ধরনের প্রবৃদ্ধি ক্রমবর্ধমান হারে নির্ভরশীল।

মানুষকে যন্ত্র চাকরির বাজার থেকে হঠিয়ে দেবে এই ভয় অবশ্যই নতুন কিছু নয়, এবং অতীতে এই ধরনের ভয় ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পুরানো যন্ত্রসমূহ থেকে ভিন্ন। অতীতে, যন্ত্র প্রধানত শারীরিক দক্ষতার (ম্যানুয়াল স্কিলস) ক্ষেত্রে মানুষের সাথে প্রতিযোগিতা করেছে। এখন তারা বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতায় (কগনিটিভ স্কিলস) আমাদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে শুরু করেছে। আর আমরা শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা ব্যতিত অন্য কোনো তৃতীয় ধরনের দক্ষতা সম্পর্কে অবগত নই―এক্ষেত্রে মানুষ সর্বদাই সীমাবদ্ধ।

মানুষের বুদ্ধিমত্তা কমপক্ষে আরও কয়েক দশক পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে কম্পিউটারের বুদ্ধিমত্তাকে বহুগুণে ও বহুক্ষেত্রে ছাড়িয়ে যাবে। ফলে, কম্পিউটার যেমন আরও বাঁধাধরা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ গ্রহণ করবে, মানুষের জন্যেও তেমন নতুন সৃজনশীল কাজ দেখা দিতে থাকবে। এই নতুন কাজগুলির অনেকগুলিই সম্ভবত মানুষ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মধ্যে প্রতিযোগিতার বদলে সহযোগিতার উপর নির্ভর করবে। শুধুমাত্র মানুষের চেয়ে নয়, মানুষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে গঠিত দলগুলি সম্ভবত স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করা কম্পিউটারের চাইতেও শ্রেয়োতর প্রমাণিত হবে।

তবে, বেশিরভাগ নতুন চাকরির জন্যে সম্ভবত উচ্চ স্তরের দক্ষতা এবং উদ্ভাবনকুশলতার প্রয়োজন হবে। ফলে বেকার ও অদক্ষ শ্রমিকদের, অথবা নূন্যতম মজুরিতে কর্মরত কর্মচারীদের সমস্যার সমাধান এভাবে হবে না। এছাড়াও, যেহেতু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে, তাই এমনকি উচ্চতর বুদ্ধিমত্তা এবং সৃজনশীলতার উপর নির্ভরশীল কাজগুলিও ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। ব্যাপারটা কোথায় গড়াচ্ছে তা বোঝার জন্যে দাবা খেলার জগৎ একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে। ১৯৯৭ সালে আইবিএম-এর কম্পিউটার ডিপ ব্লু গ্যারি কাসপারভকে পরাজিত করার পরেও বেশ কয়েক বছর ধরে মানব দাবা খেলোয়াড়দের উন্নতি অব্যাহত ছিল। এআই (আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স) সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হত, এবং মানুষ ও কম্পিউটারের সমন্বয়ে গঠিত দলগুলি একক কম্পিউটারের চাইতে শ্রেয়োতর প্রমাণিত হয়েছিল।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: প্রযুক্তি কেন স্বৈরাচারের পক্ষে
স্টকফিশ-৮ ২০১৬ সালে বিশ্ব কম্পিউটার দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিল। এটির রয়েছে কয়েক শতাব্দী যাবৎ জমে থাকা দাবা খেলা সংক্রান্ত মানব অভিজ্ঞতা ও কয়েক দশকের কম্পিউটারের অভিজ্ঞতায় প্রবেশাধিকার।

তবে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কম্পিউটার দাবা খেলায় এত ভাল হয়ে উঠেছে যে এই খেলায় মানুষের কার্যকারিতা ফুরিয়ে গেছে এবং তা শীঘ্রই সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে। ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর আরো একটি মাইলফলক অর্জিত হয় যখন গুগল-এর আলফাজিরো প্রোগ্রাম স্টকফিশ-৮ প্রোগ্রামকে পরাজিত করে। স্টকফিশ-৮ ২০১৬ সালে বিশ্ব কম্পিউটার দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিল। এটির রয়েছে কয়েক শতাব্দী যাবৎ জমে থাকা দাবা খেলা সংক্রান্ত মানব অভিজ্ঞতা ও কয়েক দশকের কম্পিউটারের অভিজ্ঞতায় প্রবেশাধিকার। অন্যদিকে, আলফাজিরোকে তার মানব স্রষ্টারা কোনো দাবার কৌশল শেখায় নি, এমনকি প্রাথমিক চালগুলিও না। বরং এটি নিজেকে দাবা খেলা শিখিয়েছে সর্বশেষ মেশিন-লার্নিং নীতি ব্যবহার করে নিজের বিরুদ্ধে নিজেই খেলে। তবুও, স্টকফিশ-৮ এর বিপক্ষে অনভিজ্ঞ আলফাজিরো যে ১০০টি গেম খেলেছে তার মধ্যে আলফাজিরো ২৮-টিতে জয় লাভ করেছে এবং ৭২-টিতে ড্র করেছে এবং একবারও হারে নি। আলফাজিরো যেহেতু মানুষের কাছ থেকে কিছুই শেখেনি, তাই এর বেশিরভাগ বিজয়ী চাল এবং কৌশল মানুষের চোখে অপ্রচলিত ঠেকেছে। এগুলিকে স্পষ্টতই প্রতিভা হিসেবে না হলেও, সৃজনশীল হিসেবে বর্ণনা করা যেতেই পারে।

অনুমান করতে পারেন আলফাজিরো একদম প্রাথমিক পর্যায় থেকে দাবা শেখা, স্টকফিশ ৮-এর বিরুদ্ধে ম্যাচের প্রস্তুতি নেয়া এবং এর প্রতিভাময় প্রবৃত্তির বিকাশ ঘটানোর জন্যে কত সময় ব্যয় করেছিল? মাত্র চার ঘণ্টা। কয়েক শতাব্দী ধরে দাবা খেলাকে মানব বুদ্ধিমত্তার অন্যতম প্রধান গৌরব হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। আলফাজিরো কোনো মানুষের সাহায্য ছাড়াই নিছক অজ্ঞতা থেকে সৃজনশীল দক্ষতার চরমে পৌঁছে যায় মাত্র চার ঘণ্টায়।


স্টকফিশ-৮ এর বিপক্ষে অনভিজ্ঞ আলফাজিরো যে ১০০টি গেম খেলেছে তার একটি

আলফাজিরো-ই একমাত্র কল্পনাশক্তিসম্পন্ন সফটওয়্যার নয়। দাবা টুর্নামেন্টগুলিতে আজকাল প্রতারকদের ধরার অন্যতম উপায় হ’ল খেলোয়াড়রা কী পরিমাণ মৌলিকতা প্রদর্শন করেন তা পর্যবেক্ষণ করা। যদি তারা একটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমধর্মী ও সৃজনশীল চাল দেন, বিচারকরা প্রায়শই সন্দেহ করেন যে এমন চাল কোনো মানুষের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। এটি খুব সম্ভবত কোনো কম্পিউটারের দেয়া চাল। অন্তত দাবা খেলায় ইতিমধ্যে সৃজনশীলতাকে মানুষের বদলে কম্পিউটারের বিশেষত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে! সুতরাং দাবা যদি কয়লা খনিতে আমাদের ক্যানারি হয়, তবে আমাদের যথাযথভাবে সতর্ক করা হয়েছিল যে ক্যানারিটি মারা যাচ্ছে। দাবাতে আজ মানব-এআই দলগুলি নিয়ে যা ঘটছে তা ভবিষ্যতে পুলিশি কার্যক্রম, চিকিৎসা, ব্যাংকিং এবং অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে।

এছাড়াও, এআই-এর রয়েছে এমন সব অনন্য ক্ষমতা যা মানুষের আয়ত্তাধীন নয়। ফলে এআই এবং একজন মানবকর্মীর মধ্যে পার্থক্য শুধুমাত্র কাজের মাত্রায় নয়, কাজের ধরনেও। মানুষের আয়ত্তের বাইরে দুটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা যা এআইয়ের রয়েছে তা হ’ল সংযুক্ততা (কানেক্টিভিটি) এবং আপডেটেড হওয়ার সামর্থ্য।

উদাহরণস্বরূপ, অনেক চালক তাদের চলতি পথের পরিবর্তনশীল সমস্ত ট্র্যাফিক নিয়মাবলীর সাথে পরিচিত নন, এবং তারা প্রায়শই এই নিয়মগুলি ভঙ্গ করেন। এছাড়াও, যেহেতু প্রতিটি চালক একেকটি স্বতন্ত্র সত্তা, তাই যখন দুটি গাড়ি একই অভিমুখে অগ্রসর হয়, তখন চালকদের মধ্যে প্রায়ই বোঝাপড়ার গড়মিল হয়ে যায়, ফলে সংঘর্ষ ঘটে। অন্যদিকে, স্বয়ংক্রিয় গাড়িগুলি সমস্ত ট্র্যাফিক বিধি সম্পর্কে অবগত থাকবে এবং কখনোই উদ্দেশ্যমূলকভাবে এগুলি অমান্য করবে না। আর এই গাড়িগুলি একে অপরের সাথে সংযুক্ত থাকতে পারবে। যখন এই জাতীয় দুটি যান একই জংশনের দিকে অগ্রসর হবে, তারা আসলে দুটি পৃথক সত্তা না হয়ে একটি একক অ্যালগরিদমের অংশ হবে। সুতরাং তাদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি ও সংঘর্ষের আশঙ্কা অনেক কম হবে।

একই ভাবে, যদি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোনও নতুন রোগ চিহ্নিত করে, অথবা যদি কোনো পরীক্ষাগার কোনো নতুন ওষুধ তৈরি করে তবে অবিলম্বে বিশ্বের সমস্ত মানব চিকিৎসককে এই বিষয়ে আপডেটেড করা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে, যদি বিশ্বে কোটি কোটি এআই ডাক্তারও থাকে যারা প্রতিটি মানুষের স্বাস্থ্যের উপর নজর রাখছে―তবুও এদেরকে এক সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে আপডেট করা যাবে, এবং তারা সবাই একে অপরের সাথে নতুন রোগ বা ওষুধ বিষয়ে মূল্যায়ন আদান-প্রদান ও যোগাযোগ করতে পারবে। সংযুক্ততা এবং আপডেটেড হওয়ার এই সম্ভাব্য সুবিধাগুলি এতটাই ব্যাপক যে অন্তত কিছু কাজের ক্ষেত্রে মানুষের বদলে কম্পিউটার ব্যবহার করাই অধিক যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হতে পারে, যদিও বা স্বতন্ত্রভাবে কিছু মানুষ হয়ত মেশিনের চেয়ে আরো ভাল কাজ করতে পারবে।

এই সমস্ত কিছুই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে গিয়ে পৌঁছায়: অটোমেশন বিপ্লব একটি মাত্র যুগান্তকারী ঘটনা নিয়ে সংগঠিত হবে না, যে ঘটনার পরে চাকরির বাজারে এক নতুন স্থিতাবস্থা কায়েম হবে। বরং, এটি আরো বড় ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করবে। পুরানো চাকরিগুলি বিলুপ্ত হবে এবং নতুন নতুন চাকরির উদ্ভব হবে। তবে নতুন চাকরিগুলিও দ্রুত পরিবর্তন ও বিলুপ্ত হবে। মানুষকে কেবল একবারই নয়, বরং বহুবার নিজেদেরকে পুনঃপ্রশিক্ষিত ও পুনঃউদ্ভাবন করতে হবে।

বিশ শতকে সরকারগুলি অল্পবয়স্কদের জন্য বিশাল শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল। তেমনি একুশ শতকে তাদের হয়ত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বিশাল পুনঃশিক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। তবে তা কি যথেষ্ট হবে? পরিবর্তন সব সময়ই দুরূহ। আর মহাব্যস্ততায় পরিপূর্ণ একবিংশ শতাব্দীর শুরুটা বিশ্বব্যাপী মানসিক চাপের এক মহামারি তৈরি করেছে। মানুষ কি কাজের অস্থিরতা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে? ২০৫০ সালের মধ্যে একটি অকেজো শ্রেণীর উত্থান হতে পারে। এই উত্থান কেবল চাকরির ঘাটতি বা প্রাসঙ্গিক শিক্ষার অভাবে নয়, সেই সাথে অবিরাম নতুন দক্ষতা অর্জনের জন্যে যে মানসিক শক্তি দরকার তার অপর্যাপ্ততার ফলেও ঘটতে পারে।

৩. ডিজিটাল একনায়কতন্ত্রের উত্থান
যেহেতু অনেক লোক তাদের অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারাবে, তারা তাদের রাজনৈতিক শক্তিও হারাতে পারে। কোটি কোটি মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলতে সক্ষম প্রযুক্তিগুলি তাদেরকে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা ও নিয়ন্ত্রণ করাটাও সহজ করে তুলতে পারে।

অনেকের কাছেই এআই দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কারণ তারা মনে করে এটি বাধ্যগত থাকবে না। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীগুলি এমন ধারণা প্রচার করে যে কম্পিউটার বা রোবটদের সম্ভবত চেতনার বিকাশ ঘটবে, এবং এটি ঘটার পরে খুব শীঘ্রই সব মানুষকে হত্যা করার চেষ্টা করবে। তবে এআই আরো বুদ্ধিমান হওয়ার সাথে সাথে এর চেতনতার বিকাশ ঘটবে এমনটি বিশ্বাস করার কোনো বিশেষ কারণ নেই। বরং আমাদের এআইকে ভয় করা উচিত কারণ এটি সম্ভবত সর্বদাই তার মনুষ্য প্রভুদের অনুগত থাকবে, এবং কখনোই বিদ্রোহ করবে না। এআই হ’ল এমন এক ভিন্নধর্মী হাতিয়ার এবং অস্ত্র যা মানুষ আগে কখনো তৈরি করে নি; এটি প্রায় নিঃসন্দেহে ইতিমধ্যে যারা ক্ষমতাধর তাদের আরো ক্ষমতাবান করে তুলবে।

নজরদারির কথা বিবেচনা করুন। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ, এমনকি কয়েকটি গণতান্ত্রিক দেশও নজরদারির অভিনব সব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যস্ত। উদাহরণস্বরূপ,নজরদারি প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইসরাইল শীর্ষস্থানীয়। দেশটি অধিকৃত পশ্চিম তীরে সম্পূর্ণ নজরদারি পরিচালনার জন্য একটি কার্যকরী প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে। আজকাল যখনই ফিলিস্তিনিরা ফোন কল করে, ফেসবুকে কিছু পোস্ট করে, বা এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াত করে তখন সম্ভবত ইসরাইলী মাইক্রোফোন, ক্যামেরা, ড্রোন, বা স্পাই সফটওয়্যার দ্বারা তদারকির শিকার হয়। অ্যালগরিদম সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে ইসরাইলী নিরাপত্তা বাহিনীকে তারা যা সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে তা নির্ণয় ও মোকাবিলা করতে সহায়তা করে। ফিলিস্তিনিরা পশ্চিম তীরের কয়েকটি শহর এবং গ্রাম পরিচালনা করতে পারে। কিন্তু ইসরাইলীরা আকাশ, বায়ু-তরঙ্গ (এয়ারওয়েভস) এবং সাইবারস্পেস নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং পশ্চিম তীরে বসবাসকারী প্রায় আড়াই মিলিয়ন ফিলিস্তিনিকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে মাত্র কিছু সংখ্যক ইসরাইলী সৈন্যই যথেষ্ট।

২০১৭ সালের অক্টোবরের একটি ঘটনায় দেখা যায়, একজন ফিলিস্তিনি শ্রমিক তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নিজের কর্মক্ষেত্রে একটি বুলডোজারের পাশে নিজের একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন। ছবিটির সাথে তিনি “শুভ সকাল” এই কথাটি জুড়ে দেন। ফেসবুকের একটি অনুবাদ অ্যালগরিদম আরবী বর্ণগুলি অনুবাদ করার সময় একটি ছোট ভুল করে ফেলে। “শুভ সকাল” কথাটির পরিবর্তে অ্যালগরিদম অনুবাদ করে বসে “তাদের আঘাত করো”। লোকটিকে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী ভেবে, এবং তিনি মানুষের উপর বুলডোজার তুলে দেয়ার পায়তারা কষছেন এই সন্দেহে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনী তাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে। তারা যখন বুঝতে পারে যে অ্যালগরিদমটি একটি ভুল করেছে তখন তারা তাকে ছেড়ে দেয়। তারপরও আপত্তিজনক ফেসবুক পোস্টটি সরিয়ে নেয়া হয়―বাড়তি সতর্কতা স্বরূপ। ফিলিস্তিনিরা আজ পশ্চিম তীরে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছে তা হয়ত পুরো পৃথিবীজুড়ে কোটি কোটি মানুষ একসময় যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হবে তার প্রাথমিক নমুনা।

উদাহরণস্বরূপ, কল্পনা করুন যে উত্তর কোরিয়ায় বর্তমান সরকার ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রযুক্তির আরো উন্নত সংস্করণ করায়ত্ত করেছে। উত্তর কোরিয়ানদের হয়ত একধরনের বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরিধান করতে হবে যা তাদের সমস্ত কাজকর্ম ও কথোপকথনকে তদারকির পাশাপাশি তাদের রক্তচাপ এবং মস্তিষ্কের কার্যকলাপের ওপর নজর রাখবে। মানুষের মস্তিষ্ক বিষয়ে ক্রমবর্ধমান এই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে, এবং মেশিন লার্নিংয়ের অপরিসীম শক্তি ব্যবহার করে উত্তর কোরিয়ার সরকার হয়ত একসময় প্রতিটি নাগরিক প্রত্যেক মুহূর্তে কী ভাবছে তা অনুমান করতে সক্ষম হবে। কোনো উত্তর কোরিয়ান যদি কিম জং উনের একটি ছবি দেখে এবং বায়োমেট্রিক সেন্সর সেই ব্যক্তির রাগের উচ্চতর লক্ষণগুলি (উচ্চ রক্তচাপ, অ্যামিগডালা’র ক্রমবর্ধমান ক্রিয়াকলাপ) টের পায়, তবে পরের দিন সেই ব্যক্তিকে হয়ত গুলাগ-এর মত কোনো বন্দিশালায় যেতে হতে পারে।

তবে, বেশিরভাগ সময়েই এই ধরনের কঠোর পন্থা অবলম্বনের হয়ত প্রয়োজন হবে না। জনসাধারণ যদি ক্রমাগত নিয়ন্ত্রণ হারাতেও থাকে, তারপরেও কিছু দেশে হয়ত স্বাধীন ইচ্ছা এবং অবাধ ভোটদানের সুযোগ অব্যাহত থাকবে। যেমন, ভোটারদের অনুভূতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা নতুন কিছু নয়। তবে একবার যখন কেউ (সান-ফ্রান্সিসকো, বেইজিং কিংবা মস্কো যেখানেই হোক না কেন) মানুষের হৃদয়কে নির্ভরযোগ্যভাবে, সস্তায় এবং মাত্রা অনুযায়ী চালিত করার প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করে তখন গণতান্ত্রিক রাজনীতি একটি আবেগী পুতুল নাচে পরিণত হয়।

আসছে দশকগুলিতে আমরা সংবেদনশীল মেশিনের বিদ্রোহের মুখোমুখি হব এমন সম্ভাবনা কম। তবে আমাদের হয়ত এমন রোবটদের মোকাবেলা করতে হবে যারা আমাদের মায়েদের চাইতেও ভালো জানে আমাদের ইমোশনাল বাটন কীভাবে চাপতে হয়। তারা হয়ত একটি অভিজাত শ্রেণীর মানুষের নির্দেশে এই অদ্ভুতুড়ে ক্ষমতাটি ব্যবহার করে আমাদের কাছে কিছু বিক্রি করার চেষ্টা করতে পারে―হোক সেটা গাড়ি, রাজনীতিবিদ বা আস্ত একটা মতাদর্শ। রোবটেরা হয়ত আমাদের গভীরতম ভয়, ঘৃণা এবং কামনা শনাক্ত করতে পারবে এবং সেগুলি আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে। বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক নির্বাচন এবং গণভোটগুলিতে আমরা ইতিমধ্যে এর পূর্বাভাস পেয়েছি, যখন হ্যাকাররা ভোটারদের সম্পর্কে ডেটা বিশ্লেষণ করে এবং তাদের পূর্বধারণাকে কাজে লাগিয়ে তাদের প্রভাবিত করার পদ্ধতি বের করতে সক্ষম হয়েছে। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ও থ্রিলারগুলি যখন আগুন এবং ধোঁয়ায় ভরপুর নাটকীয় অ্যাপোকেলিপস নিয়ে ব্যস্ত, তখন আমরা হয়ত ক্লিকিং-এর মাধ্যমে আপাতদৃষ্টিতে অনাকর্ষণীয় এক অ্যাপোকেলিপস-এর মুখোমুখি হচ্ছি।

এআই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় এবং ভীতিজনক প্রভাব পড়তে পারে গণতন্ত্র ও স্বৈরশাসনের আপেক্ষিক কার্যকারিতার উপর। ঐতিহাসিকভাবে, একনায়কতন্ত্র উদ্ভাবন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছে। বিশ শতকের শেষদিকে এসে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাসমূহ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাসমূহকে ছাড়িয়ে গেছে, কারণ তথ্য প্রক্রিয়াকরণে তারা অনেক উন্নত ছিল। আমরা গণতন্ত্র এবং একনায়কতন্ত্রের দ্বন্দ্বকে দুটি পৃথক নৈতিক ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব হিসাবে ভাবার প্রবণতা পোষণ করি। কিন্তু এটি আসলে দুটি ভিন্ন ডেটা-প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব। গণতন্ত্র তথ্য প্রক্রিয়া করার ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা একাধিক ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিতরণ করে, যেখানে একনায়কতন্ত্র এক জায়গায় তথ্য এবং ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করে। বিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তি বিবেচনায়, এক জায়গায় খুব বেশি তথ্য এবং শক্তি কেন্দ্রীভূত করাটা অকার্যকর ছিল। সমস্ত উপলব্ধ তথ্য দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা কারোরই ছিল না। এই কারণেই সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি খারাপ সিদ্ধান্ত নিত এবং সোভিয়েত অর্থনীতি আমেরিকান অর্থনীতির চেয়ে পিছিয়ে ছিল।

তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শীঘ্রই হয়ত পেন্ডুলামের গতিপথ ঘুরিয়ে দিতে পারে। এআই কেন্দ্রীয়ভাবে প্রচুর পরিমাণে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সম্ভব করে তুলেছে। প্রকৃতপক্ষে, এটি বিকেন্দ্রীয় সিস্টেমগুলির চেয়ে কেন্দ্রীয় সিস্টেমগুলিকে আরও বেশি দক্ষ করে তুলতে পারে। এর কারণ হল মেশিন লার্নিং আরো ভাল কাজ করে যখন মেশিনগুলোতে বিশ্লেষণ করার জন্য অধিক তথ্য থাকে। আপনি যদি সমস্ত প্রাইভেসি কনসার্নকে উপেক্ষা করে একটি ডাটাবেসে এক বিলিয়ন লোক সম্পর্কিত সমস্ত তথ্যকে কেন্দ্রীভূত করেন তবে আপনি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার রক্ষা করে ও ডাটাবেসে মিলিয়ন লোকের উপর কেবলমাত্র আংশিক তথ্য রেখে যে অ্যালগরিদম পান তার চাইতে বহুগুণে ভালো অ্যালগরিদম পাবেন। একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার যা তার সমস্ত নাগরিককে তাদের ডিএনএ সিকোয়েন্সড করতে এবং কিছু কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য জমা দেয়ার আদেশ দেয় এমন সরকার সেইসব সমাজের চাইতে যেখানে চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যের গোপনীয়তা কঠোরভাবে রক্ষিত হয়, জেনেটিক্স এবং চিকিৎসা গবেষণায় অপরিসীম সুবিধা অর্জন করতে পারে। বিংশ শতাব্দীতে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার প্রধান প্রতিবন্ধকতা―সমস্ত তথ্য এবং ক্ষমতা এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত করার ইচ্ছা―একবিংশ শতাব্দীতে তাদের চূড়ান্ত সুযোগে পরিণত হতে পারে।

অবশ্যই নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভূত হতে থাকবে এবং তাদের মধ্যে কয়েকটি হয়ত তথ্য এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের চেয়ে বিকেন্দ্রীকরণকে উৎসাহিত করবে। ব্লকচেইন প্রযুক্তি এবং এর মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠা ক্রিপটোকারেন্সির ব্যবহারকে বর্তমানে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার সম্ভাব্য পাল্টা জবাব হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে ব্লকচেইন প্রযুক্তি এখনও ভ্রূণীয় পর্যায়ে রয়েছে এবং আমরা এখনও জানি না যে এটি সত্যই এআইয়ের কেন্দ্রিয়করণের প্রবণতাকে নিষ্ক্রিয় করবে কিনা। মনে রাখবেন যে ইন্টারনেটকেও এর প্রাথমিক পর্যায়ে একটি উদারপন্থী সর্বরোগের ওষুধ হিসাবে ধরে নিয়ে প্রচুর হৈচৈ করা হয়েছিল যা মানুষকে সমস্ত কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা থেকে মুক্তি দেবে। অথচ এখন মনে করা হয় এটি কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক ক্ষমতাশালী করে তুলবে।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: প্রযুক্তি কেন স্বৈরাচারের পক্ষে
ইতিমধ্যে, আজকাল গুগল সার্চের শীর্ষ ফলাফলগুলিকেই “সত্য” হিসেবে গ্রহণ করা হয়।―ইউভাল নোয়াহ হারারি

৪. যন্ত্রের কাছে কর্তৃত্বের স্থানান্তর
এমনকি কিছু সমাজ যদি বাহ্যিকভাবে গণতান্ত্রিক থেকেও যায়, তবুও অ্যালগরিদমের ক্রমবর্ধমান কার্যকারিতা ব্যক্তি-মানুষের কাছ থেকে নেটওয়ার্ক দ্বারা যুক্ত যন্ত্রে কর্তৃত্বকে আরো অধিক হারে স্থানান্তরিত করবে। আমরা স্বেচ্ছায় আমাদের জীবনের আরো বেশি কর্তৃত্ব ছেড়ে দিতে পারি কারণ আমরা অভিজ্ঞতা থেকে নিজের বোধের চাইতে অ্যালগরিদমকে বেশি বিশ্বাস করতে শিখব, যার ফলে নিজের জন্য অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলব। একবার ভেবে দেখুন মাত্র দু দশকের মধ্যে কীভাবে কোটি কোটি মানুষ গুগলের অনুসন্ধানের অ্যালগরিদমকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলির একটি, অর্থাৎ প্রাসঙ্গিক ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। উত্তরের জন্য আমরা গুগলের উপর যত বেশি নির্ভর করি, ততই আমাদের স্বাধীনভাবে তথ্য শনাক্ত করার ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। ইতিমধ্যে, আজকাল গুগল সার্চের শীর্ষ ফলাফলগুলিকেই “সত্য” হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই প্রক্রিয়াটি একইভাবে আমাদের শারীরিক ক্ষমতাগুলিকে প্রভাবিত করেছে, যেমন দিক নির্ণয়ের ক্ষমতা। লোকজন গুগলকে কেবল তথ্য অনুসন্ধান করতে নয়, বরং তাদেরকে দিক নির্দেশনাও প্রদান করতে বলে। স্বয়ংক্রিয় গাড়ি এবং এআই-চিকিৎকরা আরও ক্ষয়ের প্রতিনিধিত্ব করবে: যদিও এই উদ্ভাবনগুলি যানবাহন চালক এবং মনুষ্য-ডাক্তারদের চাকরিচ্যুত করবে, তবুও তাদের বৃহত্তর আমদানি নির্ভর করবে যন্ত্রের কাছে কর্তৃত্ব ও দায়বদ্ধতার ক্রমাগত স্থানান্তরের ওপর।

মানুষ জীবনকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এক নাটক হিসাবে ভাবতে অভ্যস্ত। উদার গণতন্ত্র এবং মুক্ত-বাজার পুঁজিবাদ ব্যক্তিকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিনিধি হিসাবে দেখে যে কিনা ক্রমাগত বিশ্ব সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। শৈল্পিক কাজসমূহ―তা হোক শেক্সপিয়ারের নাটক, জেন অস্টেন-এর উপন্যাস বা চিজি হলিউড কমেডি―সাধারণত ঘুরপাক খায় নায়কের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর। টু বি অর নট টু বি? আমার স্ত্রীর কথা শুনে রাজা ডানকানকে হত্যা করব, না আমার বিবেকের কথা শুনে তাকে বাঁচতে দিব? মি. কলিনসকে নাকি মি. ডারসিকে বিয়ে করব? খ্রিস্টান ও মুসলিম ধর্মতত্ত্ব একই ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নাটকে মনোনিবেশ করে এই যুক্তিতে যে চিরস্থায়ী পরিত্রাণ নির্ভর করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপর।

আমাদের হয়ে আরো বেশি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমরা যখন এআইয়ের ওপর নির্ভর করি তখন জীবন সংক্রান্ত এই দৃষ্টিভঙ্গির কী হবে? এমনকি এখন আমরা মুভি রেকমেন্ড করার জন্যে নেটফ্লিক্স-এর ওপর ভরসা করি, আর আমাদের পছন্দ মতো গান বাছতে দিই স্পটিফাই’কে। তবে এআই এর সহায়তা এখানেই কেন থেমে থাকবে?

প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন কলেজ শিক্ষার্থীকে কী পড়বে সে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল সিদ্ধান্ত। এক্ষেত্রে মা-বাবা, বন্ধুবান্ধব এবং প্রফেসরদের আলাদা আলাদা আগ্রহ এবং মতামত রয়েছে। এই সব মতামতের চাপের মধ্যে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এটি শিক্ষার্থীদের নিজস্ব ভয় এবং কল্পনা দিয়েও প্রভাবিত হয়, যা আবার গঠিত হয় চলচ্চিত্র, উপন্যাস এবং বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে। বিষয়গুলি আরো জটিল হয়ে ওঠে কারণ একজন শিক্ষার্থী আসলে জানে না কোনো পেশায় সফল হতে কী কী লাগে, এবং নিজের শক্তি এবং দুর্বলতা সম্পর্কেও তার বাস্তব ধারণা নেই।

ক্যারিয়ার সম্পর্কে, এবং এমনকি সম্পর্কের বিষয়ে এআই একদিন কীভাবে আমাদের চাইতে আরো ভাল সিদ্ধান্ত নিতে পারবে তা অনুধাবন করা খুব কঠিন নয়। তবে একবার যখন আমরা কী পড়ব, কোথায় কাজ করব এবং কার সাথে ডেট করব বা কাকে বিয়ে করব তা ঠিক করার জন্য এআইয়ের উপর নির্ভর করতে শুরু করব, মানুষের জীবন তখন আর সিদ্ধান্ত গ্রহণের নাটক থাকবে না, এবং জীবন সম্পর্কে আমাদের ধারণায় পরিবর্তন আনতে হবে। গণতান্ত্রিক নির্বাচন এবং মুক্ত-বাজারের হয়ত আর কোনো অর্থই থাকবে না। বেশিরভাগ ধর্ম এবং শিল্পকর্মেরও একই দশা হতে পারে। কল্পনা করুন যে আন্না কারেনিনা তার স্মার্টফোন বের করে সিরিকে জিজ্ঞেস করছেন তার ক্যারেনিনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ থাকা উচিত না কি সুদর্শন কাউন্ট ভ্রনস্কি’র সাথে পালিয়ে যাওয়া উচিত। অথবা আপনার সবচেয়ে প্রিয় শেক্সপিয়ার’র নাটকের কথা চিন্তা করুন যেখানে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে গুগল অ্যালগরিদম। যদি সত্যিই এমন হত তাহলে হ্যামলেট এবং ম্যাকবেথে’র জীবন হতে পারত অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যময়। তবে কেমন হত সেই জীবন? এই জাতীয় জীবনকে বোঝার জন্য কি আমাদের কাছে কোনো নমুনা রয়েছে?

আইনসভা ও রাজনৈতিক দলসমূহ কী এই চ্যালেঞ্জগুলি কাটিয়ে উঠতে এবং আরো সংকটময় পরিস্থিতি এড়াতে পারবে? বর্তমান মুহূর্তে এটি সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না। এই মুহূর্তে প্রযুক্তিগত সংকট এমনকি রাজনৈতিক কর্মসূচির শীর্ষ আলোচ্য বিষয়ও নয়। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে, প্রযুক্তির সংকট নিয়ে মূল আলোচনার বিষয় ছিল হিলারি ক্লিন্টনের ইমেল কেলেঙ্কারি। আর বেকারত্ব সম্পর্কে এত কথা সত্ত্বেও, কোনো প্রার্থীই অটোমেশনের সম্ভাব্য প্রভাব সরাসরি উল্লেখ করেন নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প ভোটারদের সতর্ক করেছিলেন যে মেক্সিকানরা তাদের চাকরি কেড়ে নেবে, তাই যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ এর দক্ষিণ সীমান্তে প্রাচীর তৈরি করা। তিনি ভোটারদের একবারও সতর্ক করেননি যে অ্যালগরিদম তাদের কাজ কেড়ে নেবে, বা ক্যালিফোর্নিয়ার আশপাশে ফায়ারওয়াল তৈরি করতে হবে।

তো, আমাদের কী করা উচিৎ?

শুরুতেই যে বিষয়ে আরো বেশি গুরুত্ব দিতে হবে তা হল মানুষের মন কীভাবে কাজ করে―বিশেষত কীভাবে আমাদের নিজস্ব বুদ্ধি এবং মমত্ববোধ গড়ে তোলা যায়। যদি আমরা মানুষের বুদ্ধিমত্তার চাইতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বেশি মনোযোগ দিই তবে কম্পিউটারের অত্যন্ত পরিশীলিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল মানুষের প্রাকৃতিক বোকামিকে (ন্যাচারাল স্টুপিডিটি) উসকে দিতে থাকবে এবং আমাদের নিকৃষ্টতম (এবং খুব সম্ভবত, সবচেয়ে শক্তিশালী) আবেগকে লালন করতেও সহায়তা করবে, যেগুলির মধ্যে রয়েছে লোভ এবং ঘৃণা। এ জাতীয় পরিণতি এড়াতে, এআই-এর উন্নতিতে আমরা যত অর্থ এবং সময় বিনিয়োগ করি, মানব চেতনা অন্বেষণ ও বিকাশেও ঠিক তত অর্থ ও সময় ব্যয় করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

আমরা যদি অল্প সংখ্যক অভিজাতের হাতে সমস্ত সম্পদ এবং শক্তির কেন্দ্রীভবনকে আটকাতে চাই তবে আমাদের অবশ্যই ডেটার মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে আরো ব্যবহারিকভাবে ও দ্রুততার সাথে। প্রাচীনকালে ভূমি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, সুতরাং রাজনীতি ছিল ভূমি নিয়ন্ত্রণের লড়াই। আধুনিক যুগে, যন্ত্র ও কারখানা ভূমির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাই রাজনৈতিক সংগ্রামগুলি উৎপাদনের এই গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারগুলি নিয়ন্ত্রণ করার দিকে মনোনিবেশ করেছিল। একবিংশ শতাব্দীতে, ভূমি এবং যন্ত্রপাতি উভয়কেই ছাড়িয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠবে উপাত্ত, সুতরাং রাজনীতি হবে উপাত্তের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার লড়াই।

দুর্ভাগ্যক্রমে, আমাদের কাছে উপাত্তের মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করার খুব বেশি অভিজ্ঞতা নেই, যা ভূমি বা যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে সহজাতভাবে অনেক বেশি কঠিন কাজ। উপাত্ত সবখানেই আছে, আবার কোথাও নেই। এগুলি আলোর গতিতে চলতে পারে এবং আপনি যত ইচ্ছা অনুলিপি (কপি) তৈরি করতে পারেন। আমার ডিএনএ, আমার মস্তিষ্ক এবং আমার জীবন সম্পর্কে সংগৃহীত উপাত্তগুলির মালিকানা কি আমার? না সরকারের? না কি কোনো কর্পোরেশনের, না মানব গোষ্ঠীর?

ইউভাল নোয়াহ হারারি: প্রযুক্তি কেন স্বৈরাচারের পক্ষে
ডেটা সংগ্রহের প্রতিযোগিতা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে, এবং বর্তমানে গুগল এবং ফেসবুকের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলি এবং চীনে, বাইদু এবং টেনসেন্টও এক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে।―ইউভাল নোয়াহ হারারি

ডেটা সংগ্রহের প্রতিযোগিতা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে, এবং বর্তমানে গুগল এবং ফেসবুকের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলি এবং চীনে, বাইদু এবং টেনসেন্টও এক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে। এখন পর্যন্ত, এই সংস্থাগুলির মধ্যে অনেকগুলি “মনোযোগ ব্যবসায়ী” (অ্যাটেনশন মার্চেন্টস) হিসাবে কাজ করেছে―তারা আমাদের নিখরচায় তথ্য, পরিষেবা এবং বিনোদন সরবরাহ করার মাধ্যমে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং তারপরে তারা বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে আমাদের এই মনোযোগ পুনরায় বিক্রি করে। তবুও তাদের আসল ব্যবসা কিন্তু নিছক বিজ্ঞাপন বিক্রি নয়। বরং আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করার মাধ্যমে তারা আমাদের সম্পর্কে প্রচুর পরিমাণে উপাত্ত সংগ্রহ করে, যা কোনো বিজ্ঞাপনের আয়ের চেয়েও বেশি মূল্যবান। আমরা তাদের গ্রাহক নই―আমরা তাদের পণ্য।

সাধারণ মানুষের কাছে এই প্রক্রিয়াটি প্রতিরোধ করা খুব কঠিন বলে হবে। বর্তমানে, আমরা অনেকেই বিনামূল্যে ইমেল পরিষেবা এবং “ফানি ক্যাট” ভিডিও-এর বিনিময়ে আমাদের অতি মূল্যবান সম্পদ―আমাদের ব্যক্তিগত ডেটা খুশি মনে দিয়ে দিতে প্রস্তুত। তবে, ভবিষ্যতে যদি সাধারণ মানুষেরা উপাত্তের প্রবাহ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তাদের সম্ভবত সমস্যার মুখে পড়তে হবে। বিশেষত, যেহেতু তারা স্বাস্থ্য ও শারীরিকভাবে বেঁচে থাকা থেকে শুরু করে সব বিষয়েই সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্যে নেটওয়ার্কের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

আরো পড়ুন: নেটফ্লিক্সের ফেসবুক ও গুগল বিরুদ্ধতার ‘মার্কেট’

সরকার কর্তৃক তথ্য জাতীয়করণ একটি সমাধান দিতে পারে; এটি অবশ্যই বড় কর্পোরেশনগুলির শক্তিকে রোধ করবে। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে আমরা অতিপরাক্রমশালী সরকারের হাতেও একদম নিরাপদ নই। সুতরাং আমরা আমাদের বিজ্ঞানী, আমাদের দার্শনিক, আমাদের আইনজীবী, এমনকি আমাদের কবিদেরও এই বৃহত্তর প্রশ্নের দিকে মনোনিবেশ করার জন্য আহ্বান জানাতে পারি: কীভাবে তথ্যের মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করা যায়?

বর্তমানে, মানুষ গৃহপালিত প্রাণীদের মতো হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আমরা সহজে পোষ মানে এমন গরু প্রজনন করেছি যা প্রচুর পরিমাণে দুধ উৎপাদন করে, অথচ এরা এদের বুনো পূর্বপুরুষদের চেয়ে অপেক্ষাকৃতভাবে অনেক দুর্বল। এগুলি কম চটপটে, কম কৌতূহলী এবং কম চতুর। আমরা এখন এমন বাধ্যগত মানুষ তৈরি করছি যারা প্রচুর পরিমাণে উপাত্ত উৎপাদন করে এবং বিশাল উপাত্ত-প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থায় কার্যকর চিপ হিসাবে কাজ করে, অথচ মানুষ হিসেবে তাদের সম্ভাবনাকে খুব অল্প পরিমাণে বর্ধিত করে। আমরা যদি সাবধান না হই, তবে আমরা এমন ডাউনগ্রেড মানুষেদের হাতে পড়ব যারা আপগ্রেড কম্পিউটারগুলির অপব্যবহার করে নিজেদেরকে এবং বিশ্বকে সর্বনাশের দিকে নিয়ে যাবে।

আপনি যদি মনে করেন এই প্রক্রিয়াটি বিপদজনক, আপনি যদি ডিজিটাল স্বৈরশাসন বা এরকম কোনো অধস্তন সমাজের বাসিন্দা হতে না চান, তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে অবদান আপনি রাখতে পারেন তা হল এমন একটি উপায় খুঁজে বের করা যেন খুব বেশি উপাত্ত অল্প কিছু মানুষের কাছে জিম্মি না হয়। একই সাথে, কেন্দ্রীভূত উপাত্তের চাইতে প্রবাহিত উপাত্তের প্রক্রিয়াকে অধিক কার্যকর রাখার কৌশল খুঁজে বের করতে হবে। এই কাজটি সহজ হবে না। কিন্তু এটিই হয়ত হবে গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ রক্ষাকবচ।

Related posts

সাম্প্রতিক © ২০২১ । সম্পাদক. ব্রাত্য রাইসু । ৮১১ পোস্ট অফিস রোড, বাড্ডা, ঢাকা ১২১২