‘কম্পোস্ট টি’―গাছের জন্য এই পুষ্টিকর লিকুইডটি তৈরি করবেন যেভাবে

জায়গার স্বল্পতার কারণে এখন অনেকেই ছাদে, বা বারান্দায় গাছ লাগান। অনেক যত্ন করে, অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে একটু একটু করে শখের গাছগুলিকে বড় করেন। সেই গাছে কোনো ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করতে না চাইলে এর সবচেয়ে ভাল উপায় জৈবসার তৈরি করা। যারা বাগান করেন, তাদের জন্যে জৈবসার তৈরি শিখে নেওয়াটা দরকারি।

বিভিন্ন ধরনের টব বা বড় আকারের পাত্রে গাছ বড় করার জন্যে জৈবসার কার্যকরী। বীজ থেকে চারা গজানো কিংবা গাছ বড় করার ক্ষেত্রে এই সার কাজে দেয়। গাছগুলি যেসব জায়গায় বড় হচ্ছে, সেখানকার মাটির উর্বরতা বাড়ানোর জন্যে জৈবসার ব্যবহার করা যেতে পারে। আবার নতুন করে বাগান শুরুর আগেও মাটি তৈরি করতে এই সার ব্যবহার করা যায়।

জৈবসার শুধুমাত্র কঠিন আকারেই না, বরং তরল ভাবেও ব্যবহার করা যায়।

শুধুমাত্র বাসায় তৈরি করা উন্নত মানের জৈবসার দিয়েই কম্পোস্ট টি (tea) তৈরি করা যায়। গাছের চারপাশে মাটির উর্বরতা বাড়ানোর জন্যে কম্পোস্ট টি ব্যবহার করতে পারেন। আবার এটা ফলিয়ার ফিড কিংবা গাছের পাতার সাহায্যে সার দেয়ার জন্যেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

কীভাবে কম্পোস্ট-টি তৈরি করা যায়, তা নিয়েই আলোচনা। প্রথমে জানা যাক কম্পোস্ট-টি জিনিসটা কী, তা দিয়ে। এরপরে আলোচনা করা হবে এর উপাদানগুলি কীভাবে তৈরি করবেন। এরপর আমরা জানব, কম্পোস্ট টি কীভাবে তৈরি করা যায়। সবশেষে আলোচনা করা হবে বাগানের কোথায় আর কীভাবে এই সার আপনি ব্যবহার করতে পারেন।

‘কম্পোস্ট-টি’ কী?
‘কম্পোস্ট-টি’ নামটা হয়ত আপনার কাছে সুস্বাদু কোনো পানীয়ের মত শোনাবে না, কিন্তু বেশিরভাগ গাছের জন্য জিনিসটা ঠিক এমন কিছুই।

বাগানে যেসব জৈবসার ব্যবহার করছেন, তার সবকিছু একসঙ্গে করে তাতে পানি মেশানোটাই ‘কম্পোস্ট-টি’। পানির সাথে জৈবসার মেশানোর ফলে আপনি মাটির মত কঠিন জৈবসার তরলে রূপান্তরিত করছেন। মাটি আর গাছের জন্য এটা খুবই পুষ্টিকর তরল। জিনিসটা সাধারণ আর খুব সহজেই তৈরি করা যায়।

আপনি হয়ত ভাবছেন জৈবসার যেমনভাবে আছে, তেমনভাবেই গাছের আশেপাশে ব্যবহার করলে কী সমস্যা? এই প্রশ্নের উত্তরটা হল, কম্পোস্ট-টি তরল আকারে থাকে। জৈবসার পানির সাথে মেশালে গাছগুলি আরো দ্রুত পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে। যেমন, এক কাপ চা একজন মানুষকে অনেক দ্রুত চাঙা করে তোলে, তেমনভাবেই কম্পোস্ট-টি আপনার গাছগুলিকে খুব দ্রুত বেড়ে উঠতে সাহায্য করবে।

বাগানে যেসব জৈবসার ব্যবহার করছেন, তার সবকিছু একসঙ্গে করে তাতে পানি মেশানোটাই ‘কম্পোস্ট-টি’

সার বা কম্পোস্ট তৈরি
ভাল মানের জৈবসার তৈরি করার মধ্য দিয়েই ভাল মানের কম্পোস্ট-টি তৈরি করা সম্ভব। সারটা ভালভাবে তৈরি করা আর পুষ্টির সুষম মিশ্রণের মাধ্যমেই ভাল জৈবসার তৈরি করা যায়। প্রথমেই জানা যাক, জৈবসার তৈরি করার ক্ষেত্রে মৌলিক কোন কোন বিষয়গুলি মাথায় রাখতে হবে। এরপর আমরা আলোচনা করবো, কীভাবে সহজেই কম্পোস্ট-টি তৈরি করা যায়।

জৈবসারের বিভিন্ন প্রকার
অনেক পদ্ধতি অনুসরণ করে নানান ধরনের জৈবসার তৈরি করা যায়। এর সবগুলিই কম্পোস্ট-টি তৈরি করার উপাদান হিসেবে আপনি ব্যবহার করতে পারেন। পদ্ধতিগুলির মধ্যে কয়েকটা হলো:

  • কোল্ড কম্পোস্টিং বা শীতল পদ্ধতিতে জৈবসার তৈরি (একটা পাত্রে গাদা করে রাখার মাধ্যমে)
  • হট কম্পোস্টিং বা উষ্ণ পদ্ধতিতে জৈবসার তৈরি (বিশেষ ধরনের তাপ পরিবাহী পাত্রে সার তৈরি করা)
  • ভার্মিকালচার (সার তৈরির জন্যে বিশেষ ধরনের কিটের সাহায্যে একটি পাত্রে জৈবসার তৈরি করা)

জৈবসার তৈরির জন্য আপনি এক বা একাধিক পদ্ধতি বেছে নিতে পারেন। কার্যকর উপায়ে কম্পোস্ট-টি তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপই হবে এটা।

জৈবসার তৈরির ক্ষেত্রে যেসব উপাদান প্রয়োজন

গাছের সবুজ পাতা, ফেলে দেয়ার মত ঘাস কিংবা ফল বা সবজির ছোলকা, ডিমের খোসা―সবই ব্যবহার করা যাবে কম্পোস্ট টি তৈরিতে

ভাল মানের জৈবসার তৈরি করতে সার তৈরিতে যেসব উপাদান ব্যবহার করছেন, সেসব সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকা জরুরি। উপাদানগুলি সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। কার্বন সমৃদ্ধ ‘বাদামি’ উপাদান এবং নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ ‘সবুজ’ উপাদান।

উন্নত মানের জৈবসার তৈরি করার জন্য এই দুই ধরনের উপাদানের প্রয়োজন পড়বে। বাদামি উপাদানগুলির মধ্যে কার্ডবোর্ড, খড়, গাছের ডালপালা আর বাকল এবং কাঠের টুকরা অন্যতম।

অন্যদিকে সবুজ উপাদানের মধ্যে কয়েকটা হতে পারে: গাছের সবুজ পাতা, ফেলে দেয়ার মত ঘাস কিংবা ফল বা সবজির ছোলকা, ডিমের খোসা। জৈবসারের ভাল মিশ্রণ তৈরি করতে বাদামি আর সবুজ উপাদানগুলি একটার পর একটা পাতলা স্তর করে যোগ করা উচিৎ।

জৈবসার তৈরি করার ক্ষেত্রে কার্বন আর নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ উপাদানগুলির সঠিক মিশ্রণের দিকে খেয়াল রাখা ছাড়াও আরেকটা বিষয় আপনাকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তা হল, গাছের বেড়ে ওঠার জন্যে যেসব পুষ্টিকর উপাদান প্রয়োজন হয়, সেগুলির একটা সুন্দর ভারসাম্য যাতে আপনার সারে থাকে।

পদার্থগুলির মধ্যে কয়েকটা হল: নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম। এছাড়াও গাছের বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টিকণা। জৈবসারে এই সব উপাদান সঠিকভাবে মেশাতে পারলে পুষ্টির ভারসাম্য তৈরি হবে।

জৈবসার তৈরির সাথে পানির সম্পর্ক
ভাল মানের জৈবসার তৈরি করার ক্ষেত্রে আরেকটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। সেটা হল, পানির মাত্রা। প্রচুর পরিমাণে পানি দিলে জৈবসার দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যাবে। এতে করে সারে মুক্ত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাবে ও বায়ুপ্রবাহের মাত্রা কমে যাবে। আবার পানির পারিমাণ কম হলে, যেসব কীট, ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য অণুজীব সার তৈরিতে সহায়তা করে, সেগুলি মারা যাবে। ফলে জৈবসার তৈরির প্রক্রিয়া সফল হবে না। অথবা সার তৈরি করতে পারলেও সেটার মান খুব ভাল হবে না।

আপনি যেই পদ্ধতিতেই জৈবসার তৈরি করেন না কেন, তাতে আর্দ্রতার মাত্রা ঠিক রাখাটা জরুরি।

প্রচুর পরিমাণে পানি দিলে জৈবসার দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যাবে। এতে করে সারে মুক্ত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাবে ও বায়ুপ্রবাহের মাত্রা কমে যাবে। আবার পানির পারিমাণ কম হলে, যেসব কীট, ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য অণুজীব সার তৈরিতে সহায়তা করে, সেগুলি মারা যাবে।

কম্পোস্ট-টি তৈরি
উন্নত মানের জৈবসার তৈরি করার পর আপনার কাজ হল, ঝরঝরে মাটির মত সারকে তরলে পরিণত করা। তার জন্যে যা যা করতে হবে:

  • সারের সঙ্গে মিশে যায়নি এমন জিনিসগুলি আলাদা করুন। এজন্য সরাসরি চালুনির সাহায্যে ছাঁকতে পারেন
    একটা বালতি, পাত্র বা ড্রাম নিন। সেটার ৩ ভাগের ১ ভাগ সার দিয়ে পূর্ণ করুন
  • পাত্রের বাকি অংশ পানি দিয়ে পূর্ণ করুন (ট্যাপের পানির চাইতে বৃষ্টির পানি ভাল)
  • মিশ্রণটি ভাল ভাবে নাড়তে থাকুন
  • এক বা দুই সপ্তাহ রেখে দিন। এর ফলে সারের পুষ্টিকণাগুলি পানির সাথে মেশার সুযোগ পাবে
    ছাঁকনি বা কাপড়ের সাহায্যে ছেঁকে ফেলুন।
  • গাছ এই কম্পোস্ট টি ব্যবহার করুন। ছাঁকার পরপরই কম্পোস্ট-টি ব্যবহার করা দরকার। অথবা সর্বোচ্চ ২ দিনের মধ্যে ব্যবহার করা উত্তম। দ্রুত ব্যবহার করলে সারে জমে থাকা পুষ্টিগুণ নষ্ট হওয়ার আগেই তা ব্যবহার করা যায়
মিশ্রণ বানিয়ে এক বা দুই সপ্তাহ রেখে দিন। এর ফলে সারের পুষ্টিকণাগুলি পানির সাথে মেশার সুযোগ পাবে

কম্পোস্ট টি’র ব্যবহার
যেই পাত্র দিয়ে গাছে পানি দেন, সেই পাত্রেই কম্পোস্ট টি রাখতে পারেন। গাছে পানি দেয়ার মত করেই এই কম্পোস্ট টি ব্যবহার করতে পারেন। পানি দেয়ার সময় যেভাবে গাছের গোড়ায় ঢালেন, সেভাবে কম্পোস্ট টি’ও গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করতে পারেন।

গাছের বৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পুষ্টি এবং পুষ্টিকণার সুষম মিশ্রণ হচ্ছে কম্পোস্ট টি।

প্রায় সব ধরনের গাছেই এই সার ব্যবহার করতে পারবেন। তবে, একবারে চারাগাছে ব্যবহার করার চাইতে একটু পরিণত গাছের গোড়ায় ব্যবহার করা ভাল। কারণ, মিশ্রণের পুষ্টির একেবারে সঠিক ভারসাম্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়াটা কঠিন। আর মিশ্রণে যদি নাইট্রোজেনের মাত্রা অনেক বেশি থাকে, তাহলে ছোট গাছ কিংবা চারাগাছের জন্যে তা ক্ষতির কারণ হতে পারে।

মিশ্রণে যদি নাইট্রোজেনের মাত্রা অনেক বেশি থাকে, তাহলে ছোট গাছ কিংবা চারাগাছের জন্যে তা ক্ষতির কারণ হতে পারে।

আরেকটা উপায়ে কম্পোস্ট-টি ব্যবহার করতে পারেন, তা হল প্ল্যান্ট স্প্রেয়ার ধরনের পাত্রে মিশ্রণটি রেখে গাছের পাতাগুলিতে স্প্রে করতে পারেন। তাহলে এই মিশ্রণ ফলিয়ার ফিড হিসেবে কাজ করবে। অর্থাৎ গাছের পাতা সার থেকে খুব দ্রুত পুষ্টি শোষণ করে বেড়ে উঠতে পারবে।

সূত্র. রুরাল স্প্রাউট
অনুবাদ. ফারহান মাসউদ