ডেক্সামেথাসোন এর মাধ্যমে কোভিড-১৯ এ গুরুতর আক্রান্তদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব। কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত যেসব রোগীরা ভেন্টিলেশনে আছেন, ডেক্সামেথাসোন নামের একটা ওষুধের মাধ্যমে তাদের অনেকেরই জীবন বাঁচবে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীদের গবেষণায় এমনটাই উঠে এসেছে। এই ওষুধ দিয়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ভেন্টিলেশনে থাকা এক তৃতীয়াংশ রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধায়নে রিকভারি ট্রায়াল (Randomised Evaluation of Covid-19 Therapy, সংক্ষেপে RECOVERY) নামের একটা উদ্যোগের অধীনে এতদিন ধরে কোভিড-১৯ এর সম্ভাব্য ওষুধের উপরে গবেষণা করা হচ্ছিল। এর আগে তারা অ্যাজিথ্রোমাইসিন এবং হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন নিয়ে গবেষণা করেছেন। তবে গবেষকদের মতে, ডেক্সামেথাসোনের কার্যকারিতা খুঁজে পাওয়াটা একটা যুগান্তকারী আবিষ্কার।

 

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নাফিল্ড ডিপার্টমেন্ট অফ মেডিসিনের ইমার্জিং ইনফেকশাস ডিজিজের অধ্যাপক পিটার হরবি ছিলেন গবেষকদলের অন্যতম একজন সদস্য। তিনি যেমনটা জানিয়েছেন, “ডেক্সামেথাসোন হল এখন পর্যন্ত পাওয়া একমাত্র ওষুধ, যেটা মৃত্যুর হার কমায়। আর খুব সফলতার সাথেই মৃত্যুর হার কমাতে পারে এই ওষুধ।” তার মতে, “এই গবেষণার ফলাফল তাদের জন্যে অনেক বড় একটা সাফল্য।”

চলতি বছরের মার্চ মাসে ডেক্সামেথাসোন নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। সমগ্র যুক্তরাজ্যের ১৭৫টা হাসপাতালে ভর্তি হওয়া কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত ১১,৫০০ জন রোগীর উপরে পরীক্ষা চালানো হয় এই গবেষণায়। মোট ২,১০৪ জন রোগীকে প্রথমে ১০ দিন ধরে প্রতিদিন একবার করে ডেক্সামেথাসোনের ৬ মিলিগ্রাম ডোজ দেয়া হয়। ইনজেকশনের মাধ্যমে শিরায় কিংবা মুখ দিয়ে, দুইভাবেই তাদের ওপরে এই ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। এরপরে তাদের অবস্থা ৪,৩২১ জন রোগীর সাথে তুলনা করে দেখা হয়, যাদেরকে সাধারণ চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল।

রোগীদেরকে ২৮ দিন পর্যবেক্ষণ করার পরে গবেষকরা উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখতে পান। যাদেরকে সাধারণ চিকিৎসা দেয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে বিশেষ করে যারা ভেন্টিলেশনে ছিল, তাদের মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি দেখা গিয়েছে (৪১ শতাংশ)। যারা শুধুমাত্র অক্সিজেনের সাহায্যে শ্বাস নিচ্ছিলেন, তাদের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল ২৫ শতাংশ। আর শ্বাস প্রশ্বাসের জন্যে যাদের কোনো ধরনের সাহায্যের প্রয়োজন হয়নি, তাদের মধ্যে মৃত্যহার ছিল ১৩ শতাংশ।

গবেষণার ফলাফলে দেখা গিয়েছে, ডেক্সামেথাসোন গ্রহণ করার ফলে ভেন্টিলেশনে থাকা রোগীদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের জীবন বাঁচানো সম্ভব। এবং যাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্যে  অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়, তাদের মধ্যে ৫ ভাগের ১ ভাগ রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব। তবে যেসব রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্যে কোনো ধরনের সাপোর্টের দরকার হয় না, তাদের ক্ষেত্রে এই ওষুধ কোনো কাজে দেয়নি।

গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে গবেষকরা সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, ডেক্সামেথাসোন প্রয়োগ করলে ভেন্টিলেশনে থাকা প্রতি ৮ জন রোগীর মধ্যে একজনের জীবন বাঁচবে। আর যেসব রোগী কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন নিচ্ছেন, তাদের মধ্যে প্রতি ২৫ জনের মধ্যে ১ জনের জীবন বাঁচানো সম্ভব।

পিটার হরবি জানান, “ডেক্সামেথাসোন খুবই কমদামি একটা ওষুধ। সারাবিশ্বের অনেক জায়গাতেই এটা পাওয়া যায়। তাই রোগীদের জীবন বাঁচাতে এখনই এই ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।”

ওষুধের দাম কম হওয়াতে বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি এতে উপকৃত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই গবেষণার নেতৃত্ব দেয়া অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন গবেষক মার্টিন ল্যানড্রে যেমনটা বলেছেন, “বিশ্বব্যপী ছড়িয়ে পড়া একটা রোগ হল কোভিড-১৯। এটা চমৎকার একটা ব্যাপার যে, আক্রান্তদের মৃত্যুহার কমানোর জন্যে প্রমাণিত প্রথম ওষুধটাই অনেক সাশ্রয়ী আর বিশ্বের অনেক জায়গাতেই পাওয়া যায়।”

কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে বিশ্বব্যাপী এই পর্যন্ত প্রায় ৪,৩১,০০০ জনেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গবেষণার পরে ডেক্সামেথাসোনের সাহায্যে মৃত্যুর হার অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।

যুক্তরাজ্যের সরকারী বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থা ছাড়াও এই গবেষণার তহবিলে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের মতো কিছু বেসরকারি সংস্থা সাহায্য করেছে।

Write A Comment