করোনাভাইরাস চিকিৎসায় ক্লোরোকুইন—কতটা কার্যকর?

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোভিড-১৯ এর ওষুধ হিসাবে ক্লোরোকুইন এর নাম ঘোষণা করেছেন। তবে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত না করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এই ওষুধ কাজ করে কিনা।

ক্লোরোকুইনকে করোনাভাইরাসের ওষুধ হিসাবে গ্রহণ করার আগে বেশ কয়েকটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রয়োজন।

স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা এলন মাস্ক মার্চের ১৬ তারিখে ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক ক্লোরোকুইনকে কোভিড-১৯ এর জন্য বিবেচনা করার কথা টুইট করেছেন।  এরপর মার্চের ১৯ তারিখে একটা প্রেস কনফারেন্সে করোনাভাইরাসের ওষুধ হিসাবে ক্লোরোকুইনের নাম বলেন। তিনি বলেন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) কোভিড-১৯ এর জন্য ক্লোরোকুইনের দ্রুতই এর অনুমোদন দিয়েছে। অবশ্য পরে এফডিএ এই কথা অস্বীকার করে।

কোভিড-১৯ এর চিকিৎসার জন্য ক্লোরোকুইন নিয়ে একটা শোরগোল উঠেছে। এর কতটা সত্য আর কতটা মিথ্যা সেটা হয়ত সময়ই বলে দিবে।  কোভিড-১৯ এর ওষুধ হিসাবে ক্লোরোকুইনের সম্ভাবনা মেডিকেল কমিউনিটিরও মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।


ক্রিস বারানলুক
দ্য সায়েন্টিস্ট


১৯৪০ সাল থেকে ক্লোরোকুইন ম্যালেরিয়ার ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ক্লোরোকুইনের আধুনিক ভার্সন হল কুইনিন এর সিনথেটিক রূপ।

তবে গবেষণাগারে কোষের উপর এর কার্যকারিতা ও মানবদেহে এর কার্যকারিতার মধ্যে যথেষ্ট ফারাক আছে।

মার্চের ২০ তারিখে ক্লোরোকুইনের উপর ফ্রান্সের একটি গবেষণা একটি ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল এজেন্টস-এ বলা হয়েছে হাসপাতালে থাকা ৪২ জন কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর মধ্যে ২৬ জনকে ক্লোরোকুইনের একটা ভার্সন হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন দেওয়া হয়েছিল। বাকি ১৬ জনকে আগের মতই রুটিন চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন নেওয়া রোগীদের মধ্যে ৬ জন রোগীকে পাশাপাশি এজিথ্রোমাইসিন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। এই চিকিৎসা গ্রহণের পাঁচ দিনের মাথায় দেখা গেছে এই ছয়জনই SARS-CoV-2 মুক্ত। বাকি ১৪ জন যারা শুধু হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন নিয়েছিল কিন্তু এজিথ্রোমাইসিন নেয়নি, দেখা গেছে সেই ১৪ জনের মধ্যে ৭ জন ভাইরাস টেস্টে নেগেটিভ, অর্থাৎ শরীরে আর ভাইরাস নেই।

চীন ও অস্ট্রেলিয়াতে সীমিত পরিসরে যেসব পরীক্ষা করা হয়েছিল, সেসব ক্ষেত্রেও ক্লোরোকুইন নিয়ে উৎসাহব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে এই রোগের আক্রান্তের সময়সীমাও কমে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

তবে ক্লোরোকুইনের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরো ব্যাপক পরিসরে পরীক্ষা দরকার। ক্লোরোকুইন আসলেই মানবদেহে কোভিড-১৯ এর প্রভাব বিস্তার থামিয়ে দেয় কিনা সেটা পরীক্ষা করার জন্য ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার গবেষকরা ১৫০০ মানুষের উপর ক্লোরোকুইন নিয়ে একটি গবেষণা শুরু করেছেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এর ফলাফল পাওয়া যাবে। পরবর্তীতে আরো বেশি সংখ্যক মানুষের উপর এই পরীক্ষা করা হতে পারে বলে ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

মানবদেহে ক্লোরোকুইনের কার্যকারিতা নিয়ে আরো অনেকগুলি পরীক্ষা চলছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকরা ১০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী ও SARS-CoV-2 এর ঝুঁকিতে থাকা মানুষদেরকে প্রতিষেধক হিসাবে ক্লোরোকুইন দেওয়ার চিন্তা করছে। নরওয়েতেও হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদেরকে এই ওষুধ দেওয়ার চিন্তা করছে চিকিৎসকরা। থাইল্যান্ডে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অংশ হিসাবে বিভিন্ন অ্যান্টিভাইরালের পাশাপাশি ক্লোরোকুইন দেওয়ার কথা চিন্তা করা হচ্ছে।

 

ক্লোরোকুইন যেভাবে কাজ করে
যদি দেখা যায় যে ক্লোরোকুইন আসলেই SARS-CoV-2 এর বিরুদ্ধে কাজ করছে, তবে ম্যালেরিয়ার ক্ষেত্রে এটা যেভাবে কাজ করে ঠিক সেভাবে করবে না। কারণ ম্যালেরিয়া ভাইরাস এর মাধ্যমে তৈরি হয় না, প্লাসমোডিয়াম গোত্রের এক ধরনের ক্ষুদ্র পরজীবি দিয়ে তৈরি হয়। এই পরজীবি আক্রান্ত ব্যক্তির হিমোগ্লোবিনে বাসা বাঁধে এবং হিমোগ্লোবিনকে ধ্বংস করে দেয়। ক্লোরোকুইন যেটা করে, এই হিমোগ্লোবিনকেই ওই পরজীবির জন্য বিষাক্ত করে তোলে।

ভাইরাসের ক্ষেত্রে ক্লোরোকুইনের প্রভাব হতে পারে সম্পূর্ণ আলাদা। যেমন, ক্লোরোকুইন হয়ত ভাইরাসের মানব কোষে প্রবেশ করার ক্ষমতা নষ্ট করে দিবে।

মন্ট্রিয়াল ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একজন মলিকিউলার বায়োলজিস্ট নাবিল সেইদাহ এবং তার সহকারী গবেষকরা সেই ২০০৫ সালেই SARS-CoV এর ক্ষেত্রে ক্লোরোকুইনের প্রভাব পরীক্ষা করে দেখেছিলেন। এবার তিনি ওষুধ হিসেবে SARS-CoV-2 এর ক্ষেত্রে ক্লোরোকুইনের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা করছেন। ২০০৫ সালে তার করা গবেষণাতে ক্লোরোকুইনের শক্তিশালী অ্যান্টিভাইরাল ক্ষমতার কথা বলা হয়েছিল।

ক্লোরোকুইন কোষের ভিতরের ভেসিকল ও এন্ডোসম-এর pH এর মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ভেসিকল ও এন্ডোসম-কে ভাইরাস কোষে প্রবেশের পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে। সেইদাহ বলেছেন ক্লোরোকুইন pH বাড়ানোর পাশাপাশি যেসব এনজাইম ভাইরাস ও ফুসফুস কোষের ফিউশন ঘটাতে সাহায্য করে সেই এনজাইমগুলিকেও নিষ্ক্রিয় করে দেয়, এর ফলে ভাইরাস আর অনুলিপি তৈরি করতে পারে না।

সেইদাহ’র কথা অনুযায়ী, যেভাবেই কাজ করুক, কোভিড-১৯ এর চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনো একধরনের সাথে এটার (ক্লোরোকুইন) কম্বিনেশনই প্রয়োজন হবে। ক্লোরোকুইন একাই এই সমস্যাটা সমাধান করতে পারবে না।

তবে দীর্ঘদিনব্যাপী ক্লোরোকুইন বেশি ডোজে ব্যবহার করা খুবই বিপদজনক। অনিয়ন্ত্রিতভাবে ক্লোরোকুইন ব্যবহার করলে মানুষ চিরতরে অন্ধ হয়ে যেতে পারে, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। কোভিড-১৯ এর ওষুধ হিসেবে ক্লোরোকুইন ব্যবহারের আগে অবশ্যই বড় পরিসরে অনেকগুলি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন—এ ব্যাপারে সব বিশেষজ্ঞই একমত হয়েছেন, এবং তারা আরো গবেষণার প্রয়োজনের কথা বার বার উল্লেখ করেছেন।