করোনা থেকে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যাওয়ার ৪টি সম্ভাব্য টাইমলাইন

করোনাভাইরাসের কারণে ব্যবসা, জনসমাগম বন্ধ হয়ে মানুষ ঘরে বসে আছে। সবার এখন একটাই চিন্তা—পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কখন?

উত্তরটা সন্তোষজনক না হলেও বেশ সহজ—যখন ৬০% থেকে ৮০% জনসংখ্যা কোভিড-১৯ প্রতিরোধে সক্ষম হবে এবং এর বিস্তার রোধ করতে পারবে। এটাই চূড়ান্ত লক্ষ্য। যদিও এই লক্ষ্য অর্জনে ঠিক কত সময় লাগবে সেটা কেউই জানে না।

এই বৃহৎ মাত্রার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের উপায় দুইটা। প্রথমত, ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা এবং দ্বিতীয়ত, রোগটাকে কোনো বাধা ছাড়াই চলতে দেয়া, অর্থাৎ হার্ড ইমিউনিটি। এতে অনেক মানুষ মারা যাবে ঠিক, কিন্তু জনসংখ্যার একটা বিশাল অংশ রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে উঠবে। তাদের শরীরে এই রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা জন্মাবে।


জো পিনস্কার
দি আটলান্টিক, ২৬ মার্চ ২০২০


ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ প্রফেসর অ্যান্ড্রু নয়মার এর মতে, মানুষ এক পর্যায়ে টেফলনের মত হয়ে যাবে। অর্থাৎ, তারা আর এই রোগে আক্রান্ত হবে না এবং রোগের বিস্তারেও তাদের কোনো ভূমিকা থাকবে না। যদিও এই রোগ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার মাধ্যমে শরীরে আদৌ কোনো প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মায় কিনা তা আমরা এখনো জানি না। তবে মানুষ যদি টেফলনের মতো অবস্থায় পৌছাতে পারে তাহলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই দুইটা উপায়ই অর্জন করতে ১ থেকে ২ বছর সময় লাগবে। এই সময়ের মধ্যে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হতে শুরু করবে। আগামি গ্রীষ্মকালে হয়ত আমেরিকার রেস্টুরেন্টগুলি খোলা থাকবে,  কিন্তু কোনো মিউজিক ফেস্টিভ্যাল হবে না, অফিস খোলা থাকবে কিন্তু সমুদ্র সৈকতে ভিড় হবে না, বারগুলিতে সবাই নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে বসবে। জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্র কবে নাগাদ স্বাভাবিক হয়ে উঠবে তা বলা সহজ হত যদি কারা আক্রান্ত হচ্ছে, কারা সুস্থ হয়ে উঠছে, কাদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মাচ্ছে এবং কারা এখনো রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে সেই সম্পর্কে জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরিষ্কার ধারণা থাকত। এইসব তথ্য পাওয়ার জন্য দরকার বিস্তৃত মাত্রায় করোনাভাইরাস টেস্ট করা, যেটা আমেরিকা করতে পারছে না।

এখন আমেরিকা সেলফ আইসোলেশনে আছে। এর মাধ্যমে হয়ত রোগ ছড়ানোর গতি কমে গিয়ে হাসপাতালগুলি অতিরিক্ত রোগীর চাপ থেকে মুক্ত হতে পারে। কিন্তু একই সাথে জনজীবনও স্থবির হয়ে পড়েছে। আমি যেসব এপিডেমিওলজিস্টদের ইন্টারভিউ নিয়েছি তাদের কেউ’ই জানেন না ঠিক কবে এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাব আমরা। তবে, আমেরিকানরা কবে আবার নিরাপদে বাইরে গিয়ে টাকা উপার্জন করবে, অন্যান্য আনন্দদায়ক জিনিসগুলি কর‍তে পারবে তার সম্ভাব্য টাইমলাইনের একটা সিরিজ তারা আমাকে দেখিয়েছেন। নিচে সেই টাইমলাইনগুলি থাকল। সঙ্গে কিছু টার্নিং পয়েন্টও যেগুলির দিকে আগামি সপ্তাহ, মাস এবং বছরে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে।

যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আশা ব্যক্ত করেছেন যে ইস্টারের আগে দেশের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে। তবে নিরাপদে থাকার জন্য এখনও বেশ লম্বা সময় ঘরে থাকতে হবে। বেশি তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করলে আরো বড় দুর্যোগ ঘটতে পারে। নয়মারের মতে, নির্দিষ্ট সময়ের আগে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা বন্ধ করে দিলে একটা সাংঘাতিক খারাপ কাজ হবে যার ফল ভোগ করবে অসংখ্য মানুষ। সেই নির্দিষ্ট সময়টা ঠিক কতদিন তা জানতে চাইলে নয়মার সে সম্পর্কে কোনো পরিষ্কার ধারণা দেননি। তবে বলেছেন, এই সময়টা ৮-১২ সপ্তাহ হতে পারে।

 

টাইমলাইন এক: ১ থেকে ২ মাস

শুরুতেই বলে রাখা ভালো, যেসব বিশেষজ্ঞের সাথে আমি কথা বলেছি তারা বলেছেন এই সময়সীমার মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নাই। কিন্তু হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অফ পাবলিক হেলথের এপিডেমিওলজির প্রফেসর উইলিয়াম হ্যানাজ এর মতে হঠাৎ করেই যদি দেখা যায় করোনাভাইরাস মারাত্মক কোনো রোগ না, তাহলে আমেরিকার সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার সমাপ্তি এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই হবে। তিনি বলেন এখন যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের মধ্যে পূর্বের চেয়ে অনেক কম লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে, তারা সাধারণ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে বোঝা যায় তাদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে। হ্যানাজের মতে করোনাভাইরাস এরকম কোনো ‘ফলস অ্যালার্ম’ হলে বিষয়টা অসাধারণ হবে, কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিরাট বিভ্রান্তিও তৈরি হবে।

স্বল্পমেয়াদী সমাধানের আরেকটা পথ বেশ ভয়ানক ও কঠিন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা শিথিল হয়ে গেলে আগামি কয়েক মাসের মধ্যে সংক্রমণ বিশাল, সংক্ষিপ্ত এবং তীব্র আকারে আঘাত হানবে। যার ফলে হেলথ কেয়ার সিস্টেম দিশেহারা হয়ে যাবে এবং প্রচুর মানুষের মৃত্যু হবে। অনুমান করা হচ্ছে, এই বিপর্যয়ের পরে অনেক আক্রান্ত মানুষ সুস্থ হয়ে উঠবে এবং বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যাকে ইমিউনিটি বা প্রতিরোধের কাছাকাছি নিয়ে আসবে।

এই দুইটা ঘটনা ঘটলে কয়েক মাসের মধ্যেই বাইরে বের হওয়া যাবে। জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষও ততদিনে ভাইরাস সম্পর্কে আরো তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সংক্রমণের প্রথম ধাপে হাসপাতালগুলি কী পরিমাণ চাপের মধ্যে ছিল তা জানা। তাতে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে গৃহীত পদক্ষেপ কতটা সফল তা জানা সম্ভব হবে। এসব তথ্য এখনই পাওয়া সম্ভব না। এর কারণ হিসেবে হ্যানাজ ব্যাখ্যা করেন, আজকে যারা আক্রান্ত হচ্ছে, কয়েক সপ্তাহের আগে তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের দরকার হবে না। তাছাড়া ১ থেকে ২ মাসের মধ্যে জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও গবেষকরা আরো ভালোভাবে বুঝতে পারবেন যারা সুস্থ হয়ে উঠছে, তাদের ভবিষ্যতে আবার আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে কিনা এবং ঠিক কতটা সময় তারা সুরক্ষিত থাকবে। এসব তথ্য ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে।

 

টাইমলাইন দুই: ৩ থেকে ৪ মাস

হ্যানাজের ধারণা এই সময়সীমার মধ্যে আমরা ভাইরাস সম্পর্কে এমন কিছু জানতে পারব যার ফলে দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেতে আমরা সংশয় বোধ করব না। এর মধ্যে একটা হতে পারে আমাদের দেহে শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি তৈরি হয়ে গেছে।

কয়েক মাস ধরে যাদের শরীরে লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে এবং যাদের শরীরে লক্ষণ প্রকাশ পায়নি তাদের টেস্ট বা পরীক্ষা করার মাধ্যমেই এসব তথ্য জানা সম্ভব হবে। এখানে দুই ধরনের টেস্ট গুরুত্বপূর্ণ: কাদের শরীরে ভাইরাস আছে তা শনাক্ত করার জন্য একটা এবং মানুষ যখন সুস্থ হয়ে যাবে তখন তাদের শরীরে কী কী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে তা জানার জন্য একটা পরীক্ষা।

এই নতুন তথ্যের মাধ্যমে আক্রান্ত এবং আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের আইসোলেশনে রাখা সম্ভব হবে। এবং বাকিরা মোটামুটি স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে পারবে। রেস্টুরেন্ট ও বারে অল্পসংখ্যক লোক থাকবে। রোগ ছড়িয়ে পড়ার হারের ওপর ভিত্তি করে কোনো শহরের মানুষেরা আগে এবং কোনো শহরের মানুষেরা পরে ঘর ছাড়তে শুরু করবে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড পপুলেশন হেলথ বিভাগের অধ্যাপক মাইকেল স্টোটো জানান, তিনটা চলক রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করে—আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাব্য দিনে একজন মানুষ কয়জনের সংস্পর্শে এসেছিল (মুখোমুখি কিংবা একই তল স্পর্শ করার মাধ্যমে), সেসব যোগাযোগের মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা।

ভালোভাবে টেস্ট করার মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণের সম্পূর্ণ ও প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেলে জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ কোনো একটা চলকের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে পারত। যেমন টেস্টিং থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে যদি জানা যেত মানুষজনের পারস্পরিক যোগাযোগ (প্রথম চলক) কমিয়ে দিলে রোগ সংক্রমণ কমে যাবে, তাহলে রেস্টুরেন্ট ও ছোট ছোট ব্যবসা পুনরায় চালু হত, কিন্তু বড় এবং বেশি লোক সমাগম হবে এমন অনুষ্ঠান বাতিল করা হত।

৩ বা ৪ মাসের মধ্যে গবেষকরা হয়ত কোভিড-১৯ এর একটা চিকিৎসা বের করতে পারেন। প্রতিষেধক না হলেও এমন কিছু একটা যা দ্রুত ওই লক্ষণগুলি থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করবে এবং মৃত্যুহার কমাবে। তবে এর দ্বারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রয়োজন কমছে না, যেহেতু বড় ধরনের প্রকোপের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। কিন্তু কোনো একটা চিকিৎসা উদ্ভাবিত হলে যেকোনো দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতেও হাসপাতালগুলির উপর বাড়তি চাপ পড়ার আশঙ্কা থাকবে না।

হ্যানাজের মতে ফলস অ্যালার্ম সিনারিওর চেয়ে এই ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু কবে হবে কিংবা আদৌ হবে কিনা তা কেউ জানে না।

 

টাইমলাইন তিন: ৪ থেকে ১২ মাস

কোভিড-১৯ এর ব্যাপারে একটা বড় অমীমাংসিত প্রশ্ন হচ্ছে ফ্লু’র মত গ্রীষ্মকালে এর ছড়িয়ে পড়া কমে যাবে কিনা। গ্রীষ্মকাল কেন ভাইরাসের জন্য প্রতিকূল সে ব্যাপারে গবেষকদের কিছু থিওরি আছে। বেশি তাপমাত্রা ও অতিরিক্ত আতিবেগুনি রশ্মির বিকিরণের কারণে ভাইরাস প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে পারে। আরেকটা কারণ হিসেবে তারা গ্রীষ্মকালে বেশিরভাগ স্কুলেরই সেশন শেষ হওয়াকে দেখিয়েছেন। এতে ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কমে যেতে পারে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে এই থিওরিগুলি প্রযোজ্য হবে কিনা তা এখনো জানা যায়নি।

আগামি ২, ৩ মাসের মধ্যে অবশ্য এই প্রশ্নগুলির উত্তর পেয়ে যেতে পারি আমরা। এখানেই তৃতীয় টাইমলাইন বা সময়সীমা দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে: একটা সম্ভাব্য পৃথিবীতে গ্রীষ্মকালে ভাইরাসের সংক্রমণ কমে যাবে, অন্যটাতে কমবে না। কিছু কিছু জায়গায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কিছু পদক্ষেপ বছরের দ্বিতীয়ার্ধেও চলতে থাকবে।

প্রথম জগতে গ্রীষ্মকাল বসন্তের চেয়েও আনন্দদায়ক হবে, বিশেষ করে উত্তর গোলার্ধে। ছোট ছোট দলে ঘরের বাইরে বিভিন্ন কাজ করা যাবে। বার এবং রেস্টুরেন্ট আবার খুলবে। কিন্তু বড় জনসমাগম এড়িয়ে চলা হবে। নয়মারের মতে লোলাপালুজা, মেজর লিগ বেসবল বাতিল করে দেয়া হবে, সমুদ্রসৈকতে মানু্ষ জড়ো হবে না।

হ্যানাজের মতে, বিভিন্ন স্পোর্টস লিগ দর্শকশূন্যভাবে চলবে। টিভি শোগুলিতে, স্টুডিওতে দর্শক থাকবে না। প্রতিটা শপিংমলে দোকানগুলিতে ক্রেতার সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেয়া হবে। তার মতে একটা লম্বা সময়ের জন্য বড় জনসমাগম এড়িয়ে চলা হবে। কিন্তু ছোট আকারে আমেরিকার জনগণ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করবে।

প্রিয়জনকে দেখতে যাওয়াও তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হয়ে যাবে। যখন সব জায়গায় ভাইরাস ছড়িয়ে যাবে, আপনি এলাকার কনভেনিয়েন্স স্টোর থেকেও আক্রান্ত হতে পারেন, তখন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কোনো মানে হয় না। তবে এয়ারপোর্টে ভিড় কমাতে কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

মোটামুটি স্বাভাবিক গ্রীষ্মকালের একটা অসুবিধা হচ্ছে ৬ মাসের মধ্যে রোগের পুনরাবির্ভাবের আশঙ্কা। পুনরায় সংক্রমণের সূচনা সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে শুরু হতে পারে। তখন আবার সামাজিক দূরত্বের দরকার দেখা দিবে। তখনকার পরিস্থিতি অনেকটা এখনকার মতই হতে পারে। কিন্তু ততদিনে অনেকের মধ্যেই প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে যাবে। আমরাও ভাইরাস সম্পর্কে অনেক কিছু জানব। ততদিনে যদি জানা যায় যে শিশুদের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ায় না, তাহলে স্কুলগুলি আবার খুলতে পারে।

এছাড়াও ততদিনে সংক্রমণ ঠেকাতে রাষ্ট্র আরো ভালোভাবে পদক্ষেপ নিতে পারবে বলে আশা করা যায়। গ্রীষ্মকালে আরো ভেন্টিলেটর, হাসপাতাল এবং হেলথ কেয়ার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পরার জন্য প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট তৈরি করা যেতে পারে।

দ্বিতীয় পৃথিবীতে আমরা গ্রীষ্মকালে ভাইরাস থেকে সাময়িক মুক্তি পাচ্ছি না। আইসোলেশনের পদক্ষেপের ফলে বর্তমান অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা করা যায়, কিন্তু গরমের দিনে ভাইরাসের পুনরাবির্ভাবের আশঙ্কা থেকেই যায়। যদি জুনের মাঝামাঝি সময়েও ভাইরাস সংক্রমণের সংখ্যা না কমে, তাহলেই বোঝা যাবে যে ভাইরাস মৌসুমি না।

এই পর্যায়ে পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সামাজিক দূরত্বের বিভিন্ন পদক্ষেপ পরিবর্তন করা যেতে পারে। আরেক দফায় ভাইরাসের আক্রমণ হলে আমেরিকানরা বর্তমান পরিস্থিতিতেই আটকে যেতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারলে কেউ কেউ কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারেন। বাড়ির বাইরে গিয়ে কাজ করা গেলেও নিয়মিত হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশি দেয়ার পর যথেষ্ট পরিমাণে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা ইত্যাদি মেনে চলতে হবে। এই অবস্থায় যাদের বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ রয়েছে, তাদের তা-ই করতে হবে।

শরৎকালে একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। কারণ এই সময়টাতে একটা নির্বাচন হওয়ার কথা। যেটা বিস্তৃত পরিসরে ভাইরাস ছড়াতে সাহায্য করতে পারে। সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গুজবের ফলেও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। তাছাড়া নির্বাচনের সময় ফ্লু জাতীয় রোগগুলিরও আবির্ভাব ঘটবে। তখন পরীক্ষা করা ছাড়া একজন ব্যক্তি কোভিড-১৯ নাকি ফ্লুয়ে আক্রান্ত তা বলা যাবে না। নির্বাচন এবং ফ্লু আমাদের এ’ও মনে করিয়ে দেয়, যে এই অস্বাভাবিক সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ অন্যান্য সাধারণ ঘটনাবলি থেমে থাকবে না। কারণ গ্রীষ্ম ও শরৎকাল হারিকেন ও দাবানলের সময়।

 

টাইমলাইন চার: ১২ থেকে ১৮ মাস কিংবা তারও বেশি

এতক্ষণ যা যা বর্ণনা করা হয়েছে—দর্শকহীন বেসবল খেলা, নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে রেস্টুরেন্ট এবং বারে বসা প্রভৃতি—এই সময়টার মাঝেই গবেষকরা একটা ভ্যাকসিন তৈরির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। তবে ২০২১ এর বসন্তের আগে ভ্যাকসিন আবিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। নয়মারের মতে, এর আগে কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হলে তা হবে বিশ্ব রেকর্ড। যদি খসড়া আকারেও কোনো ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়, সেটা ঠিকভাবে চালু করতেও আগামি বসন্তের পরে আরও ৬ মাস থেকে ১ বছর লেগে যাবে।

ভ্যাকসিন তৈরিতে এত সময় লাগে কারণ নিখুঁতভাবে ভ্যাকসিন তৈরি করা বেশ কঠিন। একটা ভ্যাকসিন সুস্থ লোকের কোনো ক্ষতি করবে না, প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি সরবরাহ করবে এবং সেই অ্যান্টিবডিগুলি রোগ প্রতিরোধে সক্ষম তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু মেডিকেল পরীক্ষা করতে হয়। গবেষকরা যদি কয়েকশ মিলিয়ন কিংবা বিলিয়ন লোকের বাহুতে দেয়ার জন্য কিছু তৈরি করেন, তা যাতে একদম নিখুঁত হয় সেই চেষ্টাই করেন তারা।

যদি যথার্থ বা নিখুঁত ভ্যাকসিন তৈরি করা যায়, তাহলেও সাথে সাথে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হবে না। কারণ ৩৫০ মিলিয়ন মানুষের কাছে ভ্যাকসিন পৌঁছে দেয়া কোনো সামান্য কাজ না। তাছাড়া সবার জন্য ভ্যাকসিন তো একই সাথে তৈরি হবে না। ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ কাদের দেয়া হবে, রোগের ঝুঁকিতে থাকা লোকজন নাকি স্বাস্থ্যকর্মীরা, সেই সম্পর্কিত একটা সিস্টেম তৈরি করতে হবে।

একটা নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি নাও করা যেতে পারে। তখন পপুলেশন লেভেল ইমিউনিটিতে পৌঁছানোর অপেক্ষা করতে হবে এবং ২০২১ সালের শরৎকালের মধ্যেই এই লেভেলে পৌঁছানো সম্ভব। তার মানে এই না যে সেই পর্যন্ত অর্থাৎ ১ বছরেরও বেশি সময় গৃহবন্দি হয়ে থাকতে হবে। নয়মারের মতে, আমরা যদি ১২ মাসের বেশি সময় পরেও এই অবস্থা থেকে বের না হতে পারি, তার অর্থ করোনাভাইরাস যথাসম্ভব শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য এবং তা ভাইরাল প্রাদুর্ভাবকে এমন একটা অবস্থায় এনেছে যেটা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব না আমাদের পক্ষে।

ভ্যাকসিনবিহীন পৃথিবীতেও পপুলেশন লেভেলের ইমিউনিটি অর্জন করার অর্থ হচ্ছে কোভিড-১৯ এর ভবিষ্যৎ প্রাদুর্ভাবের সময় আমেরিকাকে এখনকার মত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে না। এই ভাইরাস হয়ত এখনকার মতই বিপজ্জনক ও মারাত্মক হয়েই থাকবে, ঠাণ্ডা বা ফ্লু’র মত নিয়মিত লোকজনকে আক্রান্ত করবে। পরিস্থিতি আদর্শ না হলেও ততদিনে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে উঠবে এবং একই সাথে সম্পূর্ণ বদলে যাবে।

অনুবাদ. জোহানা আফরিন নিশো

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here