আমি যখন এই লেখা লিখছি ২০২০ সালের মার্চের ১৪ তারিখ, সকালেই দেখেছি যে করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা ৫ হাজার পার হয়েছে, সর্বমোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখের কাছাকাছি। দু দিন আগেই দেখলাম আমেরিকার একজন বড় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিষয়ক কোনো এক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা ড. অ্যান্থনি ফাউচি সিএনএন-এ জাতির উদ্দেশ্যে বলছেন, জাতি হিসাবে আমাদের সারা দেশের মানুষকে এখন একটা ব্যাপার উপলব্ধি করতে হবে যে আমরা কয়েক মাস আগেও আমাদের জীবনযাপনের অংশ হিসাবে যেসব কাজ করতাম, সেগুলি আর করতে পারব না…।

সারা পৃথিবীর দিকে একবার তাকালেই আমরা এখন বুঝতে পারছি যে পৃথিবীর মানুষের জীবন খুব বড় একটা পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়ে গেছে। পৃথিবীর মানুষ, এবং খুব বিশেষ করে পশ্চিমা দুনিয়ার মানুষের জীবন তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে পাশ কাটিয়ে খুব বড় একটা পরিবর্তন বা ট্রানজিশন পিরিয়ড পার করছে।


আশরাফুল আলম শাওন


পৃথিবীর দিকে তাকালেই দেখা যাচ্ছে মডার্ন সোসাইটির তৈরি করা লাইফের ইউটোপিয়া ও নেচারের ডিস্টোপিয়ার মধ্যে বিরাট একটা মারামারি চলছে। লন্ডনের বইমেলা বাতিল হয়ে গেছে, ফেসবুকের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের বার্ষিক কনফারেন্স বাতিল হয়ে গেছে, লা লীগা ও প্রিমিয়ার লীগ ফুটবল খেলার বাকি থাকা ম্যাচগুলি স্থগিত করা হয়েছে, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ম্যাচগুলি হবে দর্শকবিহীন মাঠে, জেমস বন্ড সিরিজের নতুন ছবি ও ডিজনির নতুন ছবি মুক্তির তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, টুইটার তার সব কর্মচারীদেরকে বাড়িতে থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে… লিস্ট আরো লম্বা হতেই থাকবে। মডার্ন সোসাইটিতে যেসব জিনিস ও রিচ্যুয়াল মানুষের জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে, জীবনকে জীবন করে তোলে, সবকিছু একেবারে আচমকা থমকে গেছে।

করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত যত লোক মারা গেছে, একটা সিজনাল ফ্লু-তে যে পরিমাণ লোক মারা যায় তার তুলনায় এটা অনেক কম। কিন্তু করোনা’র কারণে যে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে, পৃথিবীকে যে স্থবিরতার মুখোমুখি করে দিয়েছে সেটা যেকোনো তুলনার বাইরে।

গত কয়েক বছর ধরেই নির্দিষ্ট বিরতিতে এইসব উপসর্গ মডার্ন সোসাইটিকে আঘাত করছিল। মানবজাতি বা পৃথিবী যদি ধ্বংসের মুখোমুখি হয় সেজন্য বড় বড় বিলিওনিয়াররা এসকেপ প্ল্যান করছিলেন। যেসব দেশে ওপেন বর্ডার আছে সেখানে বর্ডার বন্ধ করার পলিটিক্স শুরু হয়েছে। গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন নিয়েও পলিটিক্স শুরু হয়েছে। ইউরোপে কিছু মানুষ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্য বিমান ভ্রমণ বন্ধ করে দিয়েছে। জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের টেনিস ম্যাচে এক প্লেয়ার তো ধোয়াযুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার কারণে মাঠের মধ্যে পড়েই গেলেন। কিন্তু, করোনা ভাইরাসের এই প্যানডেমিক, দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া হঠাৎ করে এই সবকিছুর গতি বাড়িয়ে মডার্ন সোসাইটিকে পুরোপুরি হতভম্ব বানিয়ে দিল। এখন অনেক দেশ অলরেডি ভিসা বন্ধ করে দিয়েছে, ভার্সিটি-স্কুল-কলেজ ছুটি দিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীর বড় বড় এয়ারপোর্টগুলিতে ভিড় নাই, চীন ও মালয়েশিয়ার যে শহরগুলি দিনরাত লোকে লোকারণ্য থাকত সেগুলি এখন ধূ ধূ ফাঁকা। ইতালির অবস্থা দেখে পুরো ইউরোপ আতঙ্কে একেবারে জমে গেছে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো সহ ইউরোপের অনেক ফুটবলার, অ্যাথলেট কোয়ারেন্টাইনে চলে গেছে। সব মিউজিশিয়ানরা তাদের কনসার্ট ও শো স্থগিত করে দিয়েছে।

এসবের সাথে ম্যাস হিস্টিরিয়া তো আছেই। সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে মজুদ করা।

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ মার্ক লিপসিচ অনুমান করেছেন, আমেরিকায় কমপক্ষে প্রতি ৫জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্য থেকে ১জন করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হবে; আর বেশি হলে ৬০ শতাংশ আক্রান্ত হবে।

করোনা ভাইরাস সহ পৃথিবী যেসব ঘটনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সবকিছু খুব খারাপ একটা যোগসূত্রের দিকে ইঙ্গিত করে। বিজ্ঞানী, টেকনোলজিস্ট ও দার্শনিকদের একটা দল দাবি করছে যে এই শতাব্দীতে মানবজাতি একটা বড় ধরনের বিলুপ্তির ‘নন-ট্রিভিয়াল’ বা তাৎপর্যপূর্ণ ঝুঁকির মুখোমুখি হবে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিউচার অব হিউম্যানিটি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ও অস্ট্রেলিয়ান ফিলোসফার টবি ওরড এর একটা নতুন বই বের হয়েছে এই মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে। বইয়ের নাম ‘দ্য প্রেসিপাইস—এক্সিসটেনশিয়াল রিস্ক অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব হিউম্যানিটি’। সেখানে টবি বলছেন, বিশ শতকে আমরা মানবজাতির বিলুপ্তির জন্য শুধু মাত্র একটা আশঙ্কার কথা চিন্তা করতাম—সেটা হল পারমাণবিক যুদ্ধ। এখন আশঙ্কা কয়েকটা—এর মধ্যে কয়েকটা আমাদের নিজেদেরই তৈরি করা। জলবায়ু পরিবর্তন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বায়োওয়ারফেয়ার।

টবি বলছেন বিশ শতকে মানবজাতি বিলুপ্ত হওয়া এবং এই হিউম্যান সিভিলাইজেশন আনরিকভারেবল-ভাবে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল ১০০ তে ১। আর এখন, যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তাতে, এই একবিংশ শতকে সেই আশঙ্কা হল ৬ তে ১। রাশিয়ান রোলেট। আমরা পুরো মানবজাতি একটা রাশিয়ান রোলেট টেস্টের মধ্যে আছি।

আমি জানি না, করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ হয়ত মানবজাতির বিলুপ্তি করে দেওয়ার মত শক্তিশালী না, হয়ত করোনা আক্রান্ত হয়ে মানব সভ্যতা ভেঙে পড়বে না; এর আগে ব্ল্যাক ডেথ মহামারী বা ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীতেও লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেলেও তো মানবজাতি বিলুপ্ত হয়নি।

তবে এই ভাইরাস যেরকম অনিয়ন্ত্রিতভাবে আগাচ্ছে, এবং খুব দ্রুতই পৃথিবীতে যে আনপ্রেডিক্টেবল পরিস্থিতি তৈরি করেছে, আচমকা পৃথিবীকে যে আতঙ্ক ও স্থবিরতার মুখোমুখি করে দিয়েছে—বিমানের ফ্লাইট ক্যান্সেল, স্পোর্টিং ইভেন্ট ক্যান্সেল, স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি বন্ধ, কর্পোরেট কনফারেন্স স্থগিত; স্বাভাবিকভাবেই, এখন এই করোনা’র কারণে মানুষের মধ্যে অসুখ-বিসুখ ও সামাজিক জীবন নিয়ে যে ধারণা কাজ করত সেটা বদলে যাবে।

মানুষের সেন্স অব লাইফ ও সেন্স অব ভালনারেবিলিটিও বদলে যাবে—মানুষের বিচরণের জন্য জীবন ও পৃথিবী অতটা উন্মুক্ত না।

Recommended Posts