করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে হাত ধোয়ার প্রয়োজনীয়তা

কোভিড-১৯ থেকে বেঁচে থাকতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দেয়া একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ হলো নিয়মিত হাত ধোয়া।

“সর্বশেষ গবেষণায় দেখা গেছে সবকিছুর মূলে রয়েছে হাত”, বলেন এলিজাবেথ স্কট পিএচডি। স্কট বোস্টনে অবস্থিত সিমনস ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর হাইজিন অ্যান্ড হেলথ ইন হোম অ্যান্ড কমিউনিটির সহ-পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন।

তিনি আরো বলেন, “আপনি যা স্পর্শ করবেন তা সামলাতে পারবেন না। অন্য কেউ তা স্পর্শ করল কিনা তাও আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবে আপনি আপনার হাত দুটি সামলে রাখতে পারেন।”

জীবাণু ধ্বংসে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়া আমরা যতটা ভাবি তার চাইতে বহু গুণ বেশি শক্তিশালী একটা অস্ত্র।

স্কট এর মতে এটি দুইভাবে কাজ করে থাকে: প্রথমত আপনি নিজে হাত থেকে ময়লা সাফ করছেন। একইসাথে, নির্দিষ্ট ভাইরাসবাহীর ক্ষেত্রে সাবান সেই ভাইরাসকে ধুয়ে ফেলে।

করোনা ভাইরাসের এবারের সংস্করণটি, যা বিশ্বব্যপী সংক্রমিত হয়েছে তা একটি লিপিড প্রকোষ্ঠে, মূলত চর্বিযুক্ত একটি স্তর দ্বারা আবৃত থাকে। সাবান সেই চর্বির স্তরটি ভেদ করে ভাইরাসকে সংক্রমণে অক্ষম করে তোলে।


ব্রেন্ডা গুডম্যান
ওয়েবএমডি


সাবানের দ্বিতীয় কাজটি যান্ত্রিক। এটি ত্বককে পিচ্ছিল করে তোলে যাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে হাত ঘষে জীবাণুগুলোকে আলাদা করে সেগুলো ধুয়ে ফেলা যায়।

শুনে খুব সহজ মনে হলেও অধিকাংশ মানুষই এই কাজটি সঠিকভাবে করতে পারে না।

২০১৩ সালে একটি গবেষণায় দক্ষ পর্যবেক্ষকদের দ্বারা ৩,৭০০ মানুষের হাত ধোয়া আলদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায় তাদের মাঝে মাত্র ৫% সকল নিয়ম মেনে হাত ধুয়েছেন। প্রতি চারজনে একজন মানুষ কোনো রকম সাবান ব্যবহার না করে শুধুমাত্র হাত ভিজিয়েছেন—এই পদ্ধতিকে  স্বাস্থ্য গবেষকরা ‘স্প্ল্যাশ অ্যান্ড ড্যাশ’ নামে ডাকেন। প্রতি ১০ জনে ১ জন টয়লেট ব্যবহারের পর একদমই হাত ধোন না। বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সময়। মাত্র ৫% মানুষ হাত ধুতে ১৫ সেকেন্ড এর বেশি সময় ব্যয় করেন।

স্কট বলেন, আপনি যদি অসুস্থ হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে চান তবে এটি যথেষ্ট নয়।

নতুন ভাইরাসের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা আরো বেশি। তাই, আপনার পদ্ধতিকে গতিশীল করার সময় এসেছে।

কীভাবে? প্রথমে পানির কলটি ছাড়ুন, গরম বা ঠাণ্ডা পানি এক্ষেত্রে কোনো বিষয় না।

“আমরা পানির তাপমাত্রা নিয়ে গবেষণা করেছি এবং আমরা আবিষ্কার করেছি যে কার্যকারিতার ক্ষেত্রে পানির তাপমাত্রায় কিছু যায় আসে না।” বলেছেন ডোনাল্ড শ্যাফনার পিএইচডি, যিনি নিউ ব্রান্সউইকের রাটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেডিক্টিভ ফুড মাইক্রোবায়োলজি, হ্যান্ড-ওয়াশিং এবং ক্রস-কন্ট্যামিনেশন নিয়ে লেখাপড়া করেছেন।

দ্বিতীয়ত, সাবানের ফেলা তুলুন। আপনি যখন দু হাত ঘষেন, তখন সাবান জীবাণুগুলিকে ত্বক থেকে পিছলে যেতে সাহায্য করে। আপনি নিজের ব্যবহারের জন্য ফোম জাতীয় সাবানের পরিবর্তে তরল বা জেল জাতীয় সাবান বেছে নিন। ২০১৭ সালে একটি গবেষণায় একই ব্র্যান্ডের ফোম সাবান ও জেল বা লিকুইড সোপ বা তরল সাবান ব্যবহার করে দেখা যায় যে, জেল সোপের চেয়ে ফোম জাতীয় সাবান খুব বেশি জীবাণু ধ্বংস করতে পারেনি।

এরকম গবেষণা এই প্রথম, এবং খুবই ছোট আকারে করা হয়েছে৷ সাধারণত, নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা বারংবার গবেষণার ফল মিলিয়ে নেন। গবেষণায় অংশ নেয়া মানুষজন মাত্র ৬ সেকেন্ড সময় নিয়ে হাত ধুয়েছিলেন। সিডিসির দেয়া নির্দেশনা অনুসারে হাত ধোয়ার জন্য অন্তত ২০ সেকেন্ড ব্যয় করা উচিত, কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা হাত ধুতে এর অনেক কম সময় ব্যয় করি।

এখনো গবেষকরা মনে করেন তাদের গবেষণা সফল। কারণ জেল সোপ থেকে ফোম তাড়াতাড়ি পানিতে ধুয়ে যায় এবং ব্যবহারকারীরা মনে করেন হাতে ফোমের ফেনা হলেই হাত ভালোভাবে ধোয়া হয়ে গেছে।

MiOra নামের একটি শিক্ষামূলক অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক ওজলেম ইকুইলক বলেন, “মানুষের মাঝে ফোম সাবান দিয়ে খুব অল্প সময় হাত ধোয়ার প্রবণতা দেখা যায়।”

বার সাবান সম্পর্কে গবেষকদের মতামত কী? নানা গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত ব্যবহার হওয়া বার সাবানগুলি ভিজে থাকায় সেখানে ব্যাকটেরিয়া বসবাস করে। এটি কোনো সমস্যা কিনা তা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, ব্যাকটেরিয়াগুলি সাবান থেকে পরবর্তী ব্যবহারকারীতে স্থানান্তরিত হয় না। যদি আপনার বার সাবানটি পিচ্ছিল মনে হয় তবে তা ব্যবহারের আগে পানিতে ধুয়ে নিন এবং ব্যবহারের পর এমন ভাবে রাখুন যেন পরবর্তী ব্যবহারের আগে তা শুকিয়ে যায়।

পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের সময় সেখানে সাবান না থাকলে, কেবলমাত্র পানি দিয়ে হাত ধোয়া কোনো উপকারে আসবে না। লন্ডন স্কুল অব ট্রপিক্যাল হাইজিন এর ২০১১ সালের একটি সমীক্ষায় গবেষকরা দেখতে পান যে শুধুমাত্র পানি দিয়ে হাত ধুলে হাতের কেবলমাত্র এক-চতুর্থাংশ জীবাণু কমে। সাবান ও পানি দিয়ে হাত হোয়ার পর হাতের জীবাণু প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসে।

মোদ্দাকথা হলো, আপনার কাছে যা আছে তা নিয়েই আগানো উচিত, নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।

কতক্ষণ আপনার হাত ঘষা উচিত? সিডিসির মতে অন্তত ২০ সেকেন্ড। হয়তো আপনি শুনে থাকবেন, দুইবার “হ্যাপি বার্থডে টু ইউ” গানটি গাইতে এই সময় লাগে। যদি আপনি এতে ক্লান্ত হয়ে থাকেন তাহলে টুইটারে কিছু দারুণ বিকল্প রয়েছে।

হাত ধোয়ার সময় হাতের সেই অংশগুলির প্রতি মনোযোগী হোন যেগুলি নিয়ে সচরাচর আপনি ভাবেন না।

গ্লো জার্ম এক ধরনের পণ্য যা দিয়ে হাত ধোয়ার পর ব্ল্যাক লাইটের নিচে হাত রাখলে দেখিয়ে দেয় হাতের কোন কোন অংশ সঠিক ভাবে ধোয়া হয়নি। গবেষণায় এটি ব্যবহার করে দেখা গেছে মানুষ সঠিক ভাবে হাতের সব অংশ ধুতে পারে না।

স্কাফনার বলেন, “সাধারণত মানুষ হাতের পেছনের অংশ, তালুর নিচের অংশগুলি ধুতে ভুলে যান। আপনি হাতের নখে এবং নখের চারপাশেও কিছু আভা দেখতে পাবেন, যেখানে মানুষজন সাধারণত ভালোভাবে ধোয় না।”

জেনে রাখা ভালো: সদিচ্ছা একটি বড় ব্যাপার। স্কাফনার বলেন, তার গবেষণায় দেখা গেছে মানুষ যত বেশি লম্বা সময় নিয়ে হাত ধোয়ার প্রতি ঝুঁকেছে, তত কম জীবাণু রান্নাঘরে ছড়িয়েছে।

স্কাফনার বলেন, “সাধারণ হাত ধোয়ার পাশাপাশি কাগজের টিস্যুর ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ।”

ঠিকই শুনেছেন, শুধুমাত্র হাত ধোয়ার চেয়ে কাগজের টিস্যু দিয়ে হাত ঘষলেও অনেক জীবাণু দূর হয়। তাছাড়াও ভেজা হাতের চেয়ে  শুকনা হাতে জীবাণু ছড়ানোর সম্ভাবনা বেশ কম।

কতবার হাত ধোয়া প্রয়োজন? বহুবার… সিডিসি’র মতে নিচের কাজগুলির ক্ষেত্রে হাত ধোয়া উচিত:

  • খাবার তৈরির আগে ও পরে
  • খাবার খাওয়ার আগে
  • অসুস্থ কারো যত্ন নেয়ার আগে ও পরে
  • কোনো কাটা বা ক্ষত’তে হাত দেয়ার আগে ও পরে
  • টয়লেট ব্যবহারের পর
  • বাচ্চাদের ডায়পার পরিবর্তনের পর বা কোনো বাচ্চাকে টয়লেট ব্যবহারে সাহায্য করার পরে
  • নাক ঝাড়ার পর, হাঁচি বা কাশি দেবার পরে
  • গৃহপালিত কোনো পশুকে স্পর্শ করলে, বা তাদের খাবার বা মলমূত্র স্পর্শ করলে
  • যে কোনো  আবর্জনা স্পর্শ করার পরে

আপনি যদি হাত ধুতে না পারেন তাহলে অন্তত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের চেষ্টা করুন। স্কট বলেন, করোনাভাইরাসের মতো লিপিড মেমব্রেন ভাইরাসগুলি অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার দ্বারা মারা যায়। তবে এতে ৬২% এর উপর অ্যালকোহল আছে তা নিশ্চিত হতে হবে।

আপনার পুরো হাতের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন। পুরো হাত শুকনো অনুভূত না হওয়া পর্যন্ত দুই হাত ভালো ভাবে ঘষুন। এটি করতে অন্তত ২০ সেকেন্ড সময় লাগবে।

এভাবে হাত ধোয়ার পরও যদি কোন অংশ বাকি থাকে তবে তা যতটা সম্ভব পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করুন। জীবানুযুক্ত যেকোনো কিছু স্পর্শ করা এড়িয়ে চলুন। টয়লেটের দরজা খুলতে কাগজের টিস্যু ব্যবহার করুন। আপনার ফোনের টাচস্ক্রিন, ল্যাপটপের কীবোর্ডের মতো নোংরা জায়গাগুলি যা আপনি নিয়মিত স্পর্শ করেন তা প্রতিদিন জীবাণুমুক্ত করুন।

অনুবাদ. রেজওয়ানা সামী