Subscribe Now
Trending News

Blog Post

কেন আমরা মিথ্যায় বিশ্বাস করি—বিল গেটস, রাশিদা জোন্স ও ইউভাল নোয়াহ হারারি’র আলাপ
বিল গেটস, রাশিদা জোন্স ও ইউভাল নোয়াহ হারারি'র পডকাস্ট আলাপ
কালচার

কেন আমরা মিথ্যায় বিশ্বাস করি—বিল গেটস, রাশিদা জোন্স ও ইউভাল নোয়াহ হারারি’র আলাপ 

কেন আমরা মিথ্যায় বিশ্বাস করি

বিগ কোশ্চেন পডকাস্ট সিরিজ ৩
সম্প্রচার: নভেম্বর ৩০, ২০২০

রাশিদা জোন্স: হাই আমি রাশিদা জোন্স।

বিল গেটস: হাই আমি বিল গেটস।

রাশিদা জোন্স: আর আমরা এই পডকাস্টে কঠিন সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজি। [গান]

রাশিদা জোন্স: বিল, তোমার ব্যাপারে সবচেয়ে অদ্ভুত কোন মিথ্যেটা শুনেছো?

বিল গেটস: আমি নাকি করোনা ভাইরাস ছড়ানোতে জড়িত ছিলাম। আমার মনে হয় না এর চেয়ে অদ্ভুত মিথ্যা আর হতে পারে।


অনুবাদ: আমিন আল রাজী


রাশিদা জোন্স: মানুষ তোমার ব্যাপারে এমন ভাবে কেন?

বিল গেটস: মানুষ তাদেরকেই ভিলেন বানায় যারা অন্যদের চেয়ে চালাক আর যাদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি টাকা আছে। [হাসি]

রাশিদা জোন্স: তোমার কি অন্যদের চেয়ে নিজেকে চালাক মনে হয়?

বিল গেটস: [হাসতে হাসতে] নিঃসন্দেহে।

রাশিদা জোন্স: [হাসি]

বিল গেটস: ভ্যাকসিন নিয়ে অনেকেই ভয় পাচ্ছে। তাদের চিন্তা ভ্যাকসিন নিলে ক্ষতি হতে পারে। অনেকে ভাবছে ভ্যাকসিনের আসল উদ্দেশ্য মানুষের শরীরে মাইক্রোচিপ বসানো। তারপর 5 জি দিয়ে তাদেরকে ট্র্যাক করা। আমাদের ফাউন্ডেশন মানুষকে বাঁচানোর জন্য এত কাজ করছে তবুও এসব কন্সপিরেসি ছড়ানো হচ্ছে আমাদের নিয়ে। এগুলি আমার কাছে পাগলামি ছাড়া আর কিছু না।

রাশিদা জোন্স: মানুষ তাহলে কেন এগুলি বলছে? কী লাভ তাদের?

বিল গেটস: দেখো ভ্যাকসিন দেয়া হয় সাধারণত কমবয়েসীদের। জন্মাবার পর তো শিশুরা খুব নাজুক থাকে। তাদের শরীরে সুঁই ফুটানো হচ্ছে, ব্যথা পেয়ে কেঁদে উঠছে এটা অনেকে মানতে পারে না। কিন্ত ভ্যাকসিন দিয়েই তো আমরা পৃথিবী থেকে স্মলপক্স দূর করেছি। মিলিয়ন মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে। জীবন বাঁচানো ছাড়া আর কী উদ্দেশ্য আছে এখানে। হ্যাঁ, এগুলি সব এখনো পারফেক্ট করা যায়নি। অনেক কেয়ারফুলি ভ্যাকসিন বানাতে হয়, ট্রায়াল দিতে হয়। কিন্ত ভ্যাকসিন আমাদের যে উপকার করে, সেটা তো অবিশ্বাস্য।

রাশিদা জোন্স: তোমাকে যতটুকু চিনি, আমি জানি তুমি সত্য জানতে চাও। কিন্ত এমন কি কোনো মিথ্যা আছে যেটা তুমি বিশ্বাস করো?

বিল গেটস: আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি ইনোভেশন দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করা যায়। শুরুতে যখন সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করতাম, সেখানে দেখেছি। আমার ফাউন্ডেশনের হেলথ স্টাফরা দেখিয়েছে। হয়তো কোনো একটা সমস্যা আছে যেটার নিশ্চিত কোনো সমাধান নেই, তবুও আমি নিজেকে বিশ্বাস দেই যে ইনোভেশন দিয়ে আমি সমাধান বের করে ফেলবো। কেবল আমাদেরকে পরিশ্রম করতে হবে, ব্রিলিয়ান্ট লোকদের ঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে, তাদেরকে প্রয়োজনীয় রিসোর্স দিতে হবে। তাহলে সমাধান বের করা যাবে। আমি খুব সহজভাবে বললাম, যদিও এত সহজ না। মানুষ আমাকে বলে আপনি তো ভ্যাকসিন বের করবেন, কিন্ত ভ্যাকসিন সবার কাছে পৌঁছানো তো সহজ কাজ হবে না। এই কমপ্লেক্সিটি আমিও জানি। কিন্ত আমি সহজভাবে চিন্তা করি যে একটা উপায় বের করে ফেলবো।

রাশিদা জোন্স: আসলেও তাই, সফল মানুষদের মধ্যে এই বিষয়টা আছে। অসম্ভব কাজও যে পারা যাবে এই বিশ্বাস তারা নিজেদের দিতে থাকে।

বিল গেটস: আর এ কারণে তারা রিস্ক নিতে পারে। আমি যে এইচআইভি ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছি, গত দশ বছরে তুমি যদি এই সেক্টরের দিকে তাকাও আমরা ডেড এন্ডে আটকে গেছি। তবুও প্রতিদিন সকালে উঠে আমরা নিজেদের বলি প্রয়োজনে আরও বিলিয়ন ডলার খরচ করবো। একদিন আমরা সফল হবো। নিজেকে ব্যর্থ ভাবার আশঙ্কা অস্বীকার করে যাওয়ার একগুয়েমি একটা বড় গুণ মনে হয় আমার কাছে।

রাশিদা জোন্স: রাইট।

বিল গেটস: রাশিদা তোমাকে কোনো মিথ্যা সাহায্য করে?

রাশিদা জোন্স: অনেকটা তোমার মতই। আমিও মানুষকে নিয়ে আশাবাদী। আমি ভাবি সব মানুষই ভালো। আর যারা দায়িত্বে আছে তারা আমার চেয়ে বেশি দক্ষ এবং তারা ভালো কাজ করতে চায়। কিন্ত এই বিশ্বাস আমাকে এখন আর বেশি সাহায্য করছে না। তবুও মিথ্যা হলেও সবাইকে ভালো মানুষ ভাবা দরকার। আমি তাই ভাবতে চাই সবসময়।

বিল গেটস: এমন বিশ্বাস রাখাটা প্রয়োজন।

রাশিদা জোন্স: আচ্ছা, আমরা এখন এমন একজনকে আমন্ত্রণ জানাবো যিনি মিথ্যা আর কন্সপিরেসি থিওরি নিয়ে কথা বলবেন। তিনি হচ্ছেন ইউভাল নোয়াহ হারারি।

বিল গেটস: ইউভাল একজন অসাধারণ মুক্তচিন্তার দার্শনিক। তার সব বই পড়েছি আমি।

রাশিদা জোন্স: তার বই থেকে তুমি কী পেয়েছ?

বিল গেটস: স্যাপিয়েন্স পড়ে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে ক্ষুধা, মহামারি, যুদ্ধ নিয়ে আমাদের স্ট্রাগল সব সময় ছিল। যদিও সমস্যাগুলি আমরা পুরোপুরি সমাধান করতে পারিনি—মানে আমাদের ফাউন্ডেশন তো এগুলি নিয়েই কাজ করছে। কিন্ত আমরা তো অনেক এগিয়ে গেছি এখন। আমাদের প্রতিদিনের সমস্যার মধ্যে এসব নিয়ে ভাবা লাগে না এখন। তাহলে এক সময় আমাদের বেসিক সব চাহিদা যখন মিটে যাবে, তখন কোন বিষয়গুলি আমাদের কাছে মিনিংফুল এবং ইম্পর্ট্যান্ট হবে। ইউভালের লেখা এই দার্শনিক প্রশ্নগুলি আমাকে জিজ্ঞেস করে।

রাশিদা জোন্স: একদম। আমার ইউভালের একটা তত্ত্ব খুবই পছন্দের যখন উনি বলেন, মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা চোখে না দেখলেও কোনো কিছু বিশ্বাস করতে পারে। তাই না?

বিল গেটস: হ্যাঁ।

রাশিদা জোন্স: সরকার, ধর্ম, দেশপ্রেম, দর্শন বা কর্পোরেশন এগুলি সবই তো কনসেপ্ট ছাড়া আর কিছু না। সেই কনসেপ্টের উপরে আমরা স্ট্রাকচার তৈরি করি। সেই স্ট্রাকচার থেকে আমরা অর্থ খুঁজে বের করি। তারপর আমরা কমিউনিটি বানাই, অবকাঠামো তৈরি করি, ইনোভেশন করি। এ সব কিছুই সম্ভব কারণ আমরা এই বড় কনসেপ্টগুলিতে বিশ্বাস করতে পারি। বিশ্বাস করার ফলাফল কখনো ভালো, কখনো খারাপ।

বিল গেটস: শিওর।

রাশিদা জোন্স: বেশির ভাগ সময় খারাপ হয় যদিও। যাই হোক, এগুলি নিয়েই আমরা এখন ইউভালের সাথে আলাপ করবো। আমরা তাহলে তার কাছে যাই। হ্যালো ইউভাল।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: হাই। ধন্যবাদ আমাকে আমন্ত্রণের জন্য। এটা আমার জন্য অনেক সম্মানের ব্যাপার।

রাশিদা জোন্স: ইউভাল, আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ এখানে আসার জন্য। আমি রাশিদা। আর ও হচ্ছে আমার বন্ধু বিল গেটস।

বিল গেটস: হাই [হাসি]

রাশিদা জোন্স: ইউভাল, আপনি কী মনে করেন, মানুষ কি জন্ম থেকেই মিথ্যা বলে?

কেন আমরা মিথ্যায় বিশ্বাস করি—বিল গেটস, রাশিদা জোন্স ও ইউভাল নোয়াহ হারারি'র আলাপ
বিল গেটস, রাশিদা জোন্স ও ইউভাল নোয়াহ হারারি’র পডকাস্ট আলাপ

ইউভাল নোয়াহ হারারি: আমি তা বলবো না। আর আমি মিথ্যাকে এত প্রাধান্য দেই না যতটা ফিকশনকে দেই। ফিকশনাল স্টোরি অসত্য। আবার এগুলিকে মিথ্যাও বলা যায় না কারণ মানুষ তো এগুলিতে বিশ্বাস করে। আমরা ইচ্ছা করে অন্যদের ধোঁকা দিতে চাই না। মানুষ যে দুনিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে এর প্রধান কারণ আমরা অন্য প্রাণীদের চেয়ে নিজেদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কোঅপারেট করতে পারি। আর আমরা ভালো কোঅপারেট করতে পারি কারণ আমরা ফিকশন তৈরি করতে পারি, আর তাতে বিশ্বাস করতে পারি। মানুষের তৈরি বড় কর্পোরেশনের দিকে তাকান। এর সবগুলিই ফিকশনাল স্টোরির ওপর তৈরি।

রাশিদা জোন্স: মিথ্যা আর ফিকশনের মধ্যে তফাৎ কী?

ইউভাল নোয়াহ হারারি: মিথ্যা হলো সেই কথাটি যেটা অসত্য জেনেও আপনি বলেন কারণ আপনি অন্যদের ঠকাতে চান। আর ফিকশন হচ্ছে এমন মিথ্যা যেটা আপনি নিজেই বিশ্বাস করেন এবং আপনি চান অন্যরাও সেটা বিশ্বাস করুক। এখানে কোনো ঠকবাজি নেই। ফিকশন ছোটখাটো হতে পারে, আবার বড়ও হতে পারে যেমন ধর্ম বা অর্থনীতি বা বর্ণবাদের থিওরি। আমার মতে বেশির ভাগ নাৎসি তাদের বানানো বর্ণবাদের থিওরি নিজেরাও বিশ্বাস করত। যেভাবে লোকেরা ধর্মের কথা বেশি করে। এগুলির পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে কিন্ত মানুষ অন্যদেরকে তাই বলে যা সে নিজে বিশ্বাস করে।

রাশিদা জোন্স: আমাদের ইউএসএ’র যে অবস্থা চলছে, এখানে তো বলাই কঠিন কে ইচ্ছা করে মিথ্যা ছড়াচ্ছে আর কে ছড়াচ্ছে না।

বিল গেটস: হ্যাঁ! তুমি যদি ভাবো কভিডে মানুষ মারা যাচ্ছে না, তাহলে তো তুমি মাস্ক পরবে না। তুমি এর মধ্যে পলিটিক্স দেখবে। এসব ভুল বোঝাবুঝি আর মিথ্যা ছড়ানোর জন্যেই তো কম মানুষ মাস্ক পরছে।

রাশিদা জোন্স: আচ্ছা ইউভাল, আপনি কী ভাবেন আমাদের লিডাররা নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্যের জন্যে মিথ্যা বলে?

ইউভাল নোয়াহ হারারি: মানুষকে মিথ্যা কথায় বিশ্বাস করাতে হলে আগে তাদের বোঝাতে হবে। আর অন্যদের বোঝানোর সহজ উপায় হলো প্রথমে নিজে সেই মিথ্যা বিশ্বাস করা।

রাশিদা জোন্স: ঠিক।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: এটা সহজ কাজ না। কখন আমরা নিজেদের ঠকাচ্ছি আর কখন অন্যদের ঠকাচ্ছি এই পার্থক্য বুঝতে পারা বেশ কঠিন।

রাশিদা জোন্স: হুম।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: মানুষ যখন অন্যদের মিথ্যা বলতে থাকে একসময় সে নিজেও ওই মিথ্যা বিশ্বাস করা শুরু করে।

রাশিদা জোন্স: মার্চ-এপ্রিলের দিকের কথা, তখন আপনি বলছিলেন এই প্যানডেমিকের সময় মানুষের উচিত হবে বিজ্ঞানের ওপর ভরসা রাখা। তো এখন কী মনে হচ্ছে? এর মধ্যে তো কভিড-১৯ নিয়ে কত ভুল তথ্য আর মিথ্যা কথা ছড়ানো হলো।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: তবুও বিজ্ঞানে বিশ্বাস রাখা প্রয়োজন। এখন আমরা কোনো আদর্শ অবস্থায় নেই, তবুও ইতিহাস বিবেচনা করলে আমরা অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো আছি। আমি তো মধ্যযুগ নিয়ে গবেষণা করি। আপনি এই সময়ের সাথে যদি ব্ল্যাক ডেথের তুলনা করেন, দুটার মধ্যে অনেক ব্যবধান। তখন ব্ল্যাক ডেথের কারণে এশিয়া ইউরোপের জনসংখ্যা উজাড় হয়ে যাচ্ছিল। এই অঞ্চলগুলির সাড়ে তিন ভাগ মানুষ মারা যায় ব্ল্যাক ডেথে। অথচ কারো কোনো আইডিয়া ছিল না এটা কী হচ্ছে। না চাইনিজরা, না ভারতীয়রা, না মুসলিমরা, না ইটালিয়রা, না ব্রিটিশরা। কারো কোনো ধারণা ছিল না কী হচ্ছে। অনেক থিওরি এসেছে। গ্রহ নক্ষত্র নিয়ে থিওরি দেয়া হয়েছে, কেউ বলেছে ইহুদীরা কুয়াতে বিষ মেশানোর কারণে মানুষ মারা যাচ্ছে। এখন কভিড নিয়ে কিছু লোক তো অন্তত জানে আসলে কী ঘটছে। এটা তো সেই সময়ের চেয়ে অনেক বড় অগ্রগতি।

বিল গেটস: আরেকটা নতুন জিনিস, আমাদের ডিজিটাল সোশ্যাল মিডিয়া আছে এখন।

রাশিদা জোন্স: হ্যাঁ।

বিল গেটস: আর থিওরিগুলি যে স্পিডে সারা বিশ্বে ছড়াচ্ছে এটাও বেশ নতুন।

রাশিদা জোন্স: রাইট।

বিল গেটস: আমার মনে হয় একসময় আমরা অনেক মানুষকে ভ্যাকসিন দিতে পারব। মহামারীও শেষ হবে। তবে এই বিভক্তি আমরা বনাম তোমরা—এটা থেকে যাবে। মানুষের উন্নতির জন্য এক সাথে কাজ করার জন্যে এই বিভক্তি বাধা হয়ে থাকবে।

রাশিদা জোন্স: ইউভাল আপনি কী মনে করেন, এখন কি মিথ্যা আগের চেয়ে বেশি বিপদজনক?

ইউভাল নোয়াহ হারারি: না। যদিও এক হিসাবে এখনকার মিথ্যায় বিপদ আগের চেয়ে বেশি। কারণ মানুষের ক্ষমতা এখন আগের চেয়ে বেশি। যাদের হাতে নিউক্লিয়ার অস্ত্র আছে তারা যদি মিথ্যা বিশ্বাস করে সেটা প্রস্তর যুগের মানুষ মিথ্যা বিশ্বাস করার চেয়ে বেশি বিপদের। তবে আমাদের বিষয়টা ঐতিহাসিক বিবেচনা থেকে দেখতে হবে। মানুষ তথ্যের সাথে সত্য মিলিয়ে ফেলে। তথ্য মানেই সত্য না। কন্সপিরেসি তত্ত্ব এক ধরনের তথ্য। তথ্য ছড়ানোর যত মাধ্যম আছে, এর সবগুলিই মিথ্যা আর ফিকশন ছড়ানোরও মাধ্যম।

বই আবিষ্কারের পর—ইউরোপে যখন প্রিন্টিং প্রেস চালু হয়—আসলে তো বই চীনে আবিষ্কার হয়েছিল প্রথমে। যাই হোক, ইউরোপে বই আসার পর কি ভাবছেন বৈজ্ঞানিক বিপ্লব শুরু হয়েছিল? সবাই নিউটন আর কোপার্নিকাস পড়া শুরু করে? ভুল। তখনকার একটা বেস্ট সেলার বই ছিল, ‘দা হ্যামার অফ দা উইচেস’। এটা একটা DIY (ডু ইট ইওরসেলফ) ম্যানুয়েল যেখানে লেখা ছিল কীভাবে ডাইনি চিনবেন ও তাদের হত্যা করবেন। এই বইটা কোপার্নিকাস বা নিউটনের লেখা বইয়ের চেয়ে বহু বহুগুণ বেশি বিক্রি হয়েছে।

রাশিদা জোন্স: বইটা এখনো ভালো বিক্রি হতো।

বিল গেটস: [হাসি]

ইউভাল নোয়াহ হারারি: মানুষ মনে করে ডাইনি হত্যা মধ্যযুগীয় বিষয়। এগুলি কিছুটা মধ্যযুগে ছিল, তবে ১৬ আর ১৭ শতকের সময় ছিল উইচ হান্টিং-এর সময়। আবার এই সময়েই সাইন্টেফিক রেভ্যুলিউশন হয়েছিল। আধুনিক যুগের কথা বলছি আমরা। এর পেছনে অন্যতম প্রভাবক ছিল প্রিন্টিং প্রেস। প্রিন্টিং প্রেস আবিষ্কারের কারণে তখন বিভিন্ন রকমের অবান্তর কন্সপিরেসি বাজারে ছড়াত এবং আগের চেয়ে দ্রুতগতিতে মানুষের কাছে পৌঁছে যেত। সবাই এর লেখা বিশ্বাস করত। কারণ কী? কারণ এগুলি ছাপার অক্ষরে লেখা বই। বইয়ে অবশ্যই সত্য লেখা থাকবে। তাই না?

রাশিদা জোন্স: অবশ্যই। আচ্ছা, তাহলে মানুষ কি আসলে সত্য জানতে চায়? নাকি কোনো মিথ্যাকে সত্য ভাবলেও তার কাজ হয়ে যায়?

ইউভাল নোয়াহ হারারি: নির্ভর করে কোন ধরনের সত্যের কথা বলা হচ্ছে। দুই ধরনের সত্য আছে। এক ধরনের সত্য আছে যে সত্য জানলে আপনি অন্য জিনিস নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। আপনি জিরাফ শিকার করতে চান। আপনার জানতে হবে জিরাফ কোথায় থাকে, কী করে। আপনি অ্যাটম বোম বানাতে চান, আপনার নিউক্লিয়ার ফিজিক্স জানতে হবে। আপনি যদি অ্যাটম বোমের কন্সপিরেসি থিওরিতে বিশ্বাস করেন তাহলে বোম বানাতে পারবেন না। এই ধরনের সত্য বোঝা সহজ। কিন্ত আরেক ধরনের সত্য আছে অথবা বলতে পারি আরেক ধরনের গল্প আছে, যে গল্পগুলি দিয়ে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। যেগুলির ওপর সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে। যেমন ধর্ম বা মতাদর্শ ইত্যাদি। এগুলি সত্য না হয়েও কাজ করে। অনেক মানুষকে যখন আপনার গল্প বিশ্বাস করাতে পারবেন, সেটাই ক্ষমতা। ক্ষমতা আগে, সত্য তার পরে আসে। আপনার গল্প সত্য না হলে সেটা কাজ করবে না এমন কোনো ব্যাপার নেই। মানুষকে আপনার বানানো গল্প বিশ্বাস করাতে পারলে সমাজে আপনার অনেক ক্ষমতা তৈরি হবে।

রাশিদা জোন্স: রাইট।

বিল গেটস: ইউভাল একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন, মানুষ সিম্পল কারণ খুঁজতে চায়। যেমন এই লোকটা একটা খারাপ কাজ করেছে তার মানে সে খারাপ, তার মানে সে আমাদের বিপক্ষে। এই ধরনের বিশ্বাসের একটা প্যাটার্ন থাকে। প্যাটার্নগুলি সত্য না হলেও এগুলি মানুষকে স্যাটিসফাই করে।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: অবশ্যই। আপনি কন্সপিরেসি থিওরির একটা বৈশিষ্ট্য দেখবেন, যে এগুলি খুব সিম্পল হয়। দুনিয়া তো জটিল জায়গা। একটু আগে জিজ্ঞেস করলেন মানুষ আসলে সত্য জানতে চায় কিনা। সত্য জানার বড় দুইটা সমস্যা আছে। এক হচ্ছে, সত্য কথা শুনতে ভালো লাগে না। সত্য আনপ্লিজেন্ট। নিজের ব্যাপারে সত্য বা অন্যের ব্যাপারে সত্য—এগুলি যখন শুনবেন আপনার ভাল লাগবে না।

রাশিদা জোন্স: হুম

ইউভাল নোয়াহ হারারি: আরেকটা হল সত্য সব সময় জটিল হয়। ভাইরাসের কথা ভাবেন। কাউকে আপনি বোঝাতে চাচ্ছেন ভাইরাস নিয়ে। এটা তো কোনো জীব না। এটা কেবল কিছু ইনফরমেশন। কিছু বায়োলজিক্যাল কোড। তাহলে ভাইরাস থেকে কীভাবে প্যানডেমিক ছড়ায়? জটিল ব্যাপার এগুলি। আমাদের মস্তিষ্ক কিন্ত অলস। বিবর্তনের কারণে আমাদের মস্তিষ্ক কিছু জটিল বিষয় বুঝতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক সম্পর্কগুলি। এগুলি বোঝার ব্যাপারে আমরা জিনিয়াস বলা যায়। কারণ হান্টার গ্যাদারার সোসাইটিতে ভাল সামাজিক স্কিল ছাড়া টিকে থাকা সম্ভব না। গ্রুপের বাকি সবার ব্যাপারে আপনার আইডিয়া থাকতে হবে। কে কাকে পছন্দ করে, কে কন্সপিরেসি করতে পারে সব জানা থাকতে হবে আপনার।

রাশিদা জোন্স: হুম।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: ভাইরাস আছে কিনা, বা থাকলেও এটা কেমন জিনিস এ ব্যাপারে আমাদের ব্রেনের কোনো ধারণা নেই। এগুলি ভাবার জন্য আমাদের ব্রেন তৈরিই না। কঠিন বিষয়গুলি আমাদের ব্রেন পছন্দ করে না। আমরা পছন্দ করি যেগুলি সহজে বোঝা যায় তেমন বিষয়। বাদুড় থেকে মানুষে কীভাবে এই ভাইরাস ছড়ালো কীভাবে এটা মহামারী হলো তার চেয়ে কয়েকজন বিলিওনেয়ার তাদের লাভের জন্য ভাইরাস ছড়াচ্ছে, এটা বোঝা অনেক সহজ। এমন চিন্তার সাথে আমাদের হান্টার গ্যাদারার সমাজের মিল আছে। আমরা তখন গ্রুপের মধ্যে কে কন্সপিরেসি করছে সেটা খুঁজে বের করতাম। এগুলি আমাদের পছন্দের কাজ, কারণ এতে নিজেদের স্মার্ট মনে হয়। আর মনে হয় দুনিয়াতে কী চলছে সেটা নিয়ে আমার আইডিয়া আছে।

রাশিদা জোন্স: রাইট।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: ভাইরাসের ব্যাপারে যখন কথা হয়, যেগুলি কয়েকজন প্রফেসর ছাড়া কেউ বোঝে না তখন আমাদের নিজেদেরকে মূর্খ মনে হয়। আমরা তা পছন্দ করি না।

রাশিদা জোন্স: হ্যাঁ, আমরা তো সহজ বিষয়গুলিই জানতে চাই। কিন্ত আধুনিক সমাজ যেসব মিথ বা গল্পের ওপর তৈরি এগুলি তো জটিল।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: মোটেই না। এগুলি সাধারণত সহজই হয়।

রাশিদা জোন্স: আসলেই?

ইউভাল নোয়াহ হারারি: আপনি নিজেই চিন্তা করে দেখেন।

রাশিদা জোন্স: সরকার? কর্পোরেশন? ধর্ম? এগুলি কি জটিল বিষয় না। এগুলির পেছনে কত গল্প তৈরি করা লাগে।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: কর্পোরেশন জটিল বলেই তো বেশির ভাগ মানুষ কর্পোরেট কাঠামো ঠিক বুঝতে পারে না।

বিল গেটস: [হাসি]

রাশিদা জোন্স: তুমি দেখি একটু বেশিই হাসছ।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: কর্পোরেট আইনের সাথে যদি ধর্মের মিথগুলি তুলনা করেন দেখবেন ধর্ম কত সহজ বিষয়। খারাপ কাজ করলে শয়তান আপনাকে আগুনে পোড়াবে—ধর্ম এতটাই সহজ বিষয়।

রাশিদা জোন্স: তার মানে হচ্ছে কর্পোরেশন যদিও জটিল এগুলিকে আমরা সহজ ভাবেই দেখি।

বিল গেটস: কর্পোরেশন টেকনোক্র্যাটিক বিষয়। আমাদের সমাজে এর আইডিয়া অনেক পরে এসেছে। আর সরকারের কথা যদি বলি আমাদের ইউএস সরকারের বাজেট বোঝে, বাজেট নিয়ে কাজ করে এমন মানুষ তো সংখ্যায় খুব কম।

রাশিদা জোন্স: রাইট।

বিল গেটস: আমরা মানুষদের জিজ্ঞেস করি—ইউএস সরকারের বাজেটের কত অংশ গরীব দেশগুলিতে সাহায্যে পাঠানো হয়। মানুষজন উত্তর দেয় ৫% বা ১০%। যদিও তারা চায় যাতে ২% বা ৩% এর বেশি না দেয়া হয়। আসলে দেয়া হয় ১% এরও কম। তবুও আমরা বলি তোমার যত ইচ্ছা চাও।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: [হাসি]

বিল গেটস: থ্যাংক গড, মানুষের নিজেদের মধ্যে বিশ্বাস আছে। কারণ কর্পোরেশন বলেন, ইলেক্ট্রিসিটি বলেন, ভাইরাস বা সরকারের ট্যাক্স কাঠামো বলেন, এগুলি বোঝে এমন লোকের সংখ্যা আসলেই কম।

রাশিদা জোন্স: আচ্ছা, আমরা আবার কর্পোরেশন নিয়ে আলাপে ফিরে যাই। আমার মতে কর্পোরেশনগুলি অনেক মিথ্যা আর প্রোপাগান্ডা ছড়ায়। নিজেদের মধ্যেও ছড়ায়, বাইরেও ছড়ায়। ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য এমন করে, অন্যান্য কারণও আছে। যাই হোক, আমি এখন ছোট একটা থট এক্সপেরিমেন্ট করতে চাই। প্রথমে বিলকে জিজ্ঞেস করব, মাইক্রোসফট বলতে তুমি কী বোঝো? তারপর আমি ইউভালের কাছে জানতে চাইব তার কাছে মাইক্রোসফট কী।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: [হাসি]

বিল গেটস: মাইক্রোসফট ধরেন একটা ইউটিলিটারিয়ান কিছু। আমরা খুব ভাল কিছু প্রোডাক্ট বানাই। যদিও আমরা অ্যাপল বা কোকাকোলার মত ব্র্যান্ডিং-এ ভাল না। স্টিভ জবস-এর ব্র্যান্ডিং নিয়ে ন্যাচারাল দক্ষতা ছিল, কিন্ত আমি ব্র্যান্ডিং ভাল পারি না। আমি ভাল করতে পারলে মাইক্রোসফট আরও সাকসেস পেত।

রাশিদা জোন্স: আমার মনে হয় তুমি ঠিকই আছো। মাইক্রোসফটও ঠিক আছে।

বিল গেটস: আমরা ভালো কোডিং করতে পারি। আমাদের মেইন জিনিস ওটাই। আমরা বিশুদ্ধ ইঞ্জিনিয়ার।

রাশিদা জোন্স: [হাসি]

বিল গেটস: আমরা যে কয়েকজন প্রথমে শুরু করি, অন্য স্কিলও আমরা ডেভেলপ করতে চেয়েছিলাম। তবে আমাদের ইনোভেশন সব ইঞ্জিনিয়ারিং থেকেই।

রাশিদা জোন্স: ইউভাল তোমার উত্তর কী?

ইউভাল নোয়াহ হারারি: অন্য কর্পোরেশনের মত মাইক্রোসফটও একটা গল্প। এটা এমন একটা গল্প যেটা আইনজীবীদের মাথা থেকে এসেছে। আইনজীবীরা হচ্ছে পীরদের মতো। তারা যা বলে তাই হয়। কর্পোরেশন কেবল আমাদের চিন্তাতে আছে, বাস্তবে না। কিন্ত কর্পোরেশনগুলি কম ক্ষমতাশালী না। পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী কয়েকটা জিনিসের একটা হলো কর্পোরেশন। কিন্ত এগুলির অস্তিত্ব কেবল আমাদের গল্পে। আপনি মাইক্রোসফট ধরতে পারবেন না। মাইক্রোসফট দেখতে পারবেন না। শুঁকতে পারবেন না। স্বাদ নিতে পারবেন না। অন্য কোনো প্রাণীকে আপনি বোঝাতে পারবেন না মাইক্রোসফট কী জিনিস। ধরেন আপনি একটা শিম্পাঞ্জিকে মাইক্রোসফটের হেডকোয়ার্টারে নিয়ে গেলেন।

রাশিদা জোন্স: [হাসি]

বিল গেটস: [হাসি]

ইউভাল নোয়াহ হারারি: শিম্পাঞ্জি দেখবে এখানে একটা বাড়ি আছে…।

রাশিদা জোন্স: [হাসি]

ইউভাল নোয়াহ হারারি: মানুষ সেখানে আসছে যাচ্ছে, আর একটা ক্যাফেটেরিয়া আছে যেখানে কলা ঝুলছে—শিম্পাঞ্জি এগুলি ছাড়া আর কিছুই বুঝবে না।

রাশিদা জোন্স: এর কারণ মনে হয়

ইউভাল নোয়াহ হারারি: এটাই মাইক্রোসফট…

রাশিদা জোন্স: আসল কারণ মনে হয় বিল মাইক্রোসফটের ঠিকমতো ব্র্যান্ডিং করতে পারেনি। [হাসি]

ইউভাল নোয়াহ হারারি: না শিম্পাঞ্জি কোকাকোলা কর্পোরেশনও চিনবে না।

রাশিদা জোন্স: রাইট।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: মানে শিম্পাঞ্জি কোকাকোলা খেতে পারবে অবশ্যই। কিন্ত কোকাকোলা কর্পোরেশন এটা কেবল মানুষই বুঝবে কারণ কর্পোরেশন মানুষের সম্মিলিত চিন্তার ফলাফল।

রাশিদা জোন্স: কিন্ত তারপরে কী? মানে মাইক্রোসফট কর্পোরেশন যা বিক্রি করে? সফটওয়্যার তো আমরা ধরতে পারি না কিন্ত এটা দিয়ে তো আমরা কাজ করি, তাই না? সব মানুষই তো এটা দিয়ে কাজ করে। তাহলে সফটওয়্যার কি আরও বেশি বাস্তব না? [হাসি]

ইউভাল নোয়াহ হারারি: না সফটওয়্যার অবশ্যই বাস্তব। এটা দিয়ে বাস্তব দুনিয়ার কাজই আমরা করি। কিন্ত খেয়াল করেন, সফটওয়্যার তো অবশ্যই কর্পোরেশন না। সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে মাইক্রোসফট বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এর অস্তিত্ব তখন আর থাকবে না। কিন্ত সফটওয়্যার থেকে যাবে।

রাশিদা জোন্স: তুমি কি তাই মনে করো বিল?

বিল গেটস: হ্যাঁ, কোম্পানিগুলির কিছু গল্প থাকে যেটা তারা বিশ্বাস করে এবং কিছু ভ্যালু থাকে যেগুলি তারা অন্যদের মোটিভেট করতে ব্যবহার করে। তাদের উদ্দেশ্য থাকে মানুষকে তার প্রোডাক্টের ব্যাপারে এক্সাইটেড করা, আর অন্য কোম্পানিদের ছোট করা। এখানে আমরা বনাম তোমরা দ্বন্দ্ব থাকে। অনেকটা খেলার মতো। চলো আমরা ওই দলকে হারাই—এরকম কম্পিটিশন করে কোম্পানিগুলি নিজেদের মধ্যে। আর কিছু কথা বাড়িয়েও বলে যে আমার প্রোডাক্ট তোমাকে আরো স্মার্ট করবে বা তোমার সময় আরো ভালো কাটবে আমাদের প্রোডাক্ট ব্যবহার করলে।

রাশিদা জোন্স: মাইক্রোসফটের ব্যাপারেও এটা সত্য, তাই না?

ইউভাল নোয়াহ হারারি: [হাসি]

বিল গেটস: হ্যাঁ, আমরা যদিও এগুলি গোপন রাখতে চাই। কিন্ত এটা সত্য।

রাশিদা জোন্স: ইউভাল আপনার কী মনে হয়, সত্য বলে আদৌ কিছু আছে?

ইউভাল নোয়াহ হারারি: হ্যাঁ, অবশ্যই। নদী সত্য, পর্বত সত্য, মানুষ সত্য। আমার কাছে সবচেয়ে সত্য হলো কষ্ট পাওয়া। অনেক সময় আমরা যে গল্পগুলি বিশ্বাস করি সেগুলির জন্য আমরা কষ্ট পাই। ধরেন কোনোো একটা গল্প বিশ্বাস করে আমরা যুদ্ধে গেলাম। গল্পটা আমাদের কল্পনায় কিন্ত যুদ্ধে প্রাণহানি ক্ষয়ক্ষতি তো সত্য। যারা প্রিয় মানুষ হারায় তাদের জন্য এটা ১০০% সত্য।

রাশিদা জোন্স: মিথ্যা কি আমাদের কষ্ট থেকে বাঁচাতে পারে? আমি জানি আপনি সব মিথ্যাকে খারাপ ভাবেন না, আপনার লেখা পড়ে এটা বুঝেছি। তারপরেও জিজ্ঞেস করছি, মিথ্যা কি আসলেই আমাদের সাফারিং কমাতে পারে? মিথ্যা, মিথলজি বা ফিকশন?

ইউভাল নোয়াহ হারারি: মিথ্যা আর ফিকশন এক না, বিশাল তফাৎ আছে। পোপ যখন তার অনুসারীদের ক্রিস্টিয়ানিটির বয়ান দেয় আমার মনে হয় না সে তখন মিথ্যা বলে।

বিল গেটস: [হাসি]

ইউভাল নোয়াহ হারারি: আমার মনে হয় পোপ যা বিশ্বাস করে তাই বলে। গত ২০০০ বছরে অনেক পোপ এসেছে। হয়তো দুই-চারজন এর মধ্যে মিথ্যা বলে থাকবে।

বিল গেটস: [হাসি]

ইউভাল নোয়াহ হারারি: তবে বেশির ভাগ পোপ তার অনুসারীদের উদ্দেশ্যে যা বলে সেটা তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে দেখেই বলে। হয়তো এমন হতে পারে অনুসারীদের যেভাবে সহজভাবে বলা হচ্ছে তত সহজ না, বয়ানগুলির ধর্মীয় ব্যাখ্যা হয়তো আরো কঠিন। কিন্ত আমার মনে হয় না তারা মিথ্যা বলে। একইভাবে কর্পোরেশনের কথা বলি, টাকার কথাও যদি বলি এগুলি তো মিথ্যা না। দেখেন আপনি ইন্টারেস্ট রেট যখন বাড়ান এটা যদিও মিথ্যা না কিন্ত ইন্টারেস্ট রেট বিষয়টা তো বানানো। এর অস্তিত্ব আমাদের কল্পনাতে। এসব ফিকশনের আমাদের দরকার আছে। যেমন আপনি ফুটবল খেলার কথা চিন্তা করেন। ফুটবল খেলা ধর্মের চেয়ে আলাদা কারণ আমরা জানি ফুটবলের নিয়ম আমাদের তৈরি করা। কিন্ত ফুটবল খেলে যদি আমরা আনন্দ পেতে চাই আমাদের এই ফিকশনাল নিয়মগুলি অন্তত ৯০ মিনিট মানতে হবে। নয়তো ফুটবল কীভাবে খেলবো আমরা?

বিল গেটস: [হাসি]

রাশিদা জোন্স: রাইট।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: আমি এতে সমস্যার কিছু দেখি না। তবে, সমস্যা হয় যখন আমরা ভুলে যাই এই গল্পগুলি আমাদের বানানো। তখন গল্পগুলি আমাদের ওপর চেপে বসে। আমাদের সৃষ্টির কাছে আমরা দাস হয়ে যাই। ফ্রাংকেনস্টাইনের কথা জানি আমরা, মানুষ ভাবে ফ্রাংকেনস্টাইনের আইডিয়া অনেক পুরনো। এটা মোটেই আধুনিক বিষয় না। আমাদের সৃষ্টি ক্রমশঃ আমাদেরকেই অধিকার করতে থাকে। মানুষ অন্তত দশ হাজার বছর ধরে তার সৃষ্টির কাছে দাস হয়ে আছে। যেদিন থেকে মানুষ স্রষ্টার ব্যাপারে, জাতির ব্যাপারে, টাকার ব্যাপারে গল্প তৈরি করেছে। তারপর ভুলে গেছে এগুলি আসলে নিজেদের বানানো গল্প। তখন তারা আটকে পড়ে গেছে মৃত মানুষদের স্বপ্নের মধ্যে।

রাশিদা জোন্স: বিশ্বকে দেখার ভঙ্গি কি কখনো বদলেছে আপনার? নাকি মনে হয় আপনি একই অবস্থাতে আছেন, সেখান থেকেই দেখছেন সবকিছু? শেষ কবে আপনার জীবনে আহা (বিস্ময়কর) মুহূর্ত এসেছে? হয়তো কোনো বই পড়ে বা কিছু রিসার্চ করে যেটা আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সাহায্য করেছে।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: আমার দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই বদলে যায় যখন আমি স্যাপিয়েন্স লিখি। স্যাপিয়েন্সে আমি কম্পিউটার বা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স এগুলির কথা কিছুই ভাবিনি। হয়ত একটা দুইটা বাক্য। তারপর আমি অনেক পড়া শুরু করলাম এ নিয়ে। এখন আমার পড়াশোনার ৫০% এর বেশি হচ্ছে এআই আর মেশিন লার্নিং নিয়ে। আমি কথা বলি এগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে। যদিও টেকনিক্যাল বিষয় মোটেই ভালো বুঝি না। মরে গেলেও এক লাইন কোড লিখতে পারব না। কিন্ত আমি এসব অসাধারণ আবিষ্কারের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক এমনকি দার্শনিক প্রয়োগ বুঝতে পারি।

রাশিদা জোন্স: বিল তোমাকে ঠিক উল্টা প্রশ্নটা করব। তোমার তো অনেক জ্ঞান সায়েন্স নিয়ে আর তুমি কোডিং করো। স্টোরিটেলিং তোমার কী কাজে লাগে?

বিল গেটস: আমাদের ফাউন্ডেশনের একটা প্রধান কাজ হল বিশ্বকে জানানো, ডেভেলপিং দেশগুলিতে আসলে কী হচ্ছে। অচেনা দেশের মানুষগুলির মৃত্যুও যেন তাদের কাছে ট্র্যাজেডি মনে হয়। যাতে আরো বেশি রিসার্চার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর রোগব্যাধি নিয়ে ভাবে, আরো বেশি রিসার্চ যাতে এ কাজের জন্য যোগাড় করা যায়। আপনি কেবল সংখ্যা দিয়ে মানুষকে কনভিন্স করতে পারবেন না। আমি যদি বলি ৩ মিলিয়ন শিশু মারা যাচ্ছে তারচেয়ে বরং আমি যদি মারা যাওয়া শিশুদের ৩টা ছবি দেখাই তাহলে অডিয়েন্স বেশি রেসপন্স করবে। তারপর এই ফিল্ডের হিরোদের গল্প শোনাতে পারি। যে মা তার সন্তানদের টিকা দিতে নিয়ে যাচ্ছে বা যে স্বাস্থ্যকর্মী গ্রামে গিয়ে কাজ করছে, তার গল্প শেয়ার করতে পারি। মানুষ গল্পের প্রতি অনেক বেশি মনোযোগ দেয়। আমাদের ফাউন্ডেশন যদিও ডেটা আর স্ট্যাটিস্টিকস নিয়ে কাজ করে তবুও আমাদের ডেটার সাথে গল্প মিলাতে হয়। আমরা কাজগুলি ঠিকমতো করতে পারলে, মিলিয়ন শিশুর জন্যে বিশ্বের রিসোর্সের ক্ষুদ্র অংশ হলেও যোগাড় করা সম্ভব হবে।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: বিল, আপনার কাছে প্রশ্ন—যখন কম্পিউটার, অ্যালগরিদম, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স আমাদের ব্যাপারে আমাদের চেয়ে বেশি জেনে যাবে, তখন হিউম্যানিটির কী অবস্থা হবে? আপনি বলতে পারেন, এমন কখনোই হবে না। কিছু বিষয় কম্পিউটারের সব সময়ই বোঝার বাইরে থাকবে। কিন্ত আমার এমন বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। তাই আমি জানতে চাই, আসলে কী হতে পারে, বিষয়টার গভীরে যেতে চাই। ওই সিচুয়েশন না যখন আমাদের ডেটাগুলি কোনো ডিক্টেটরের কাছে যাচ্ছে। টোটালিটেরিয়ান শাসনে যেমন নাগরিকরা কই যাচ্ছে, কী করছে এসবের ডেটা থাকে রাষ্ট্রের কাছে। এমন ডিস্টোপিয়ার কথা বলছি না। বলছি স্বাভাবিক অবস্থার কথা। কোনো স্বৈরশাসন চলছে না। একটা অক্ষতিকর বিনাইন সিস্টেম চলছে। কিন্ত তারপরেও যন্ত্রের কাছে আমাদের ব্যাপারে সব ইনফরমেশন আছে এবং যন্ত্রই আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কোথায় পড়াশোনা করব, কী গান শুনব, কী বই পড়ব, কাকে বিয়ে করব। আমাদের জীবন তখন কেমন হবে?

বিল গেটস: অবশ্যই সফটওয়্যার একসময় আমাদের ব্যাপারে আমরা যা জানি বা আমাদের ব্যাপারে অন্য মানুষ যা জানে তার চেয়ে বেশি জেনে যাবে। পুরো বিষয়টা বুঝতে… আচ্ছা আমি যদি জিজ্ঞেস করি কেন আমরা শিখতে চাই? কেন আমরা এক্সপিরিয়েন্স নিতে চাই? আমাদের কিছু ভ্যালু আছে। ড্রাগস ব্যবহার করে তো আনন্দ পাওয়া যায় তবুও কিছু মানুষ জিনিসটা প্রচণ্ড অপছন্দ করে। আবার কেউ আছে বছরের পর বছর ধরে কোনো কাজ না করে ড্রাগ নিয়ে যাচ্ছে।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: হুম।

বিল গেটস: সফটওয়্যার ভবিষ্যতে মানুষের ওপর এমনভাবে কাজ করবে যে আপনাকে সব দিক দিয়ে হ্যাপি রাখবে। এটা খুব সফিস্টিকেটেড সিস্টেম হবে। তখন আমরা চিন্তায় পড়ে যাব। আমাদের মনে দার্শনিক প্রশ্ন আসবে যে, সবার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ খাবার উৎপাদন করে ফেলেছি, এরপর আমরা কী করব? মানুষকে অরগানাইজ করতে পারি আমরা, কিন্ত কেন অরগানাইজ করব? বিবর্তনের কারণে যে সব কাজ আমাদের ভাল পারার কথা সেগুলি যখন আমরা পেরে গেছি, এরপর আমাদের কী করা উচিৎ? আমি জানি না এর উত্তর কী হবে।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: আর কতদিন সময় আছে যখন কম্পিউটার আমার ব্যাপারে আমার চেয়ে বেশি জানবে?

বিল গেটস: এখনো কিছু আবিষ্কার বাকি। আমরা এখন মেশিন লার্নিং দিয়ে অনেক কিছু করতে পারি। কিন্ত এটা থেকে মিনিংফুল নলেজ কীভাবে নিতে পারি সেটা এখনো আমাদের জানা বাকি। একটা ইন্টারেস্টিং টেস্ট আছে। যখন মেশিন বই পড়ে মানুষের চেয়ে বেশি নলেজ নিতে পারবে তখন আমরা বলতে পারব মেশিন লার্নিং এগিয়ে গেছে। আমরা কি সেই অবস্থায় এখনো এসেছি? মনে হয় না। তবে নেক্সট ৫০ বছরে, আমরা চিটিং করে হোক অথবা আমাদের ব্রেনের অ্যানালাইসিস করে হোক, বের করে ফেলতে পারব বিবর্তনের কারণে আমাদের সাথে কী হয়। অথবা আমরা নতুন কোনো ধারণা পাব। কিন্ত এটা হবেই। সেই সময় মেশিন আমাদের ব্যাপারে এত জেনে যাবে এবং সবকিছুতে আমাদের চেয়ে এত পারদর্শী হবে যে, তখন মানুষের আদৌ কোনো কাজ করার দরকার আছে কিনা সেই প্রশ্ন সামনে চলে আসবে। যদি মেশিন আপনার কাজ আপনার চেয়ে ১০ গুণ বেটার করে, আপনার তো মন খারাপ হবেই।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: [হাসি]

রাশিদা জোন্স: হ্যাঁ, তখন মন খারাপ তো হবেই [হাসি]

ইউভাল নোয়াহ হারারি: আমরা তো বুঝবো না মেশিন কীভাবে ডিসিশন নিচ্ছে। কারণ মেশিনের ডিসিশন মেকিং আমাদের চেয়ে ভিন্ন পদ্ধতিতে হয়। মানুষ যখন চিন্তা করে তখন দুই-চারটা মেইন পয়েন্টের বেশি নিয়ে ভাবতে পারে না। ধরেন আমি একজন ব্যাংকার। আপনি আমার কাছে লোন চাইতে আসলেন। আমি আপনার ব্যাপারে ৩-৪টা পয়েন্ট বিবেচনা করে ঠিক করব আপনাকে লোন দেয়া যায় কিনা। যেমন আপনার আগের ক্রেডিট হিস্ট্রি দেখব আমি। আবার আমি রেসিস্ট হলে বা কোনো পক্ষপাত থাকলে তখন হয়ত অন্যভাবে বিবেচনা করব। মানুষের চিন্তা এভাবেই তৈরি হয়। কিন্ত এআই এমন সিদ্ধান্ত নিতে হাজার হাজার ডেটা পয়েন্ট চিন্তা করবে। হয়ত আপনি কখন লোন চাইতে ব্যাংকে এসেছেন এটাও সে হিসাব করবে। ধরেন এই ভ্যারিয়েবলের উপরে .০৭% গুরুত্ব দেয়া হল। কম হলেও, এআই তাও বিবেচনা করছে।

রাশিদা জোন্স: রাইট।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: অনেকে বলেন, কম্পিউটার ডিসিশন নিলেও আমাদের তো আইন আছে। যেমন ইউরোপে GDPR আছে, আর এসব আইন এড়ানোর কোনো উপায় নেই। কিন্ত মানুষ তো কারণ জানতে চায়। ধরেন আপনি লোন চাইলেন কিন্ত আপনাকে দেয়া হল না। আপনি কারণ জানতে চাইলেন ব্যাংকের কাছে। কিন্ত ব্যাংক আপনাকে কারণ জানাল না। ব্যাংক আপনাকে বলবে আমাদের অ্যালগরিদম ডেটা অ্যানালাইসিস করে দেখেছে আপনাকে লোন দেয়া সম্ভব না। আপনি চাইলে এই অ্যানালাইসিস প্রিন্ট করে দিতে পারি। কিন্ত আপনাকে আমরা এটা এক্সপ্লেইন করতে পারব না। আমাদের অ্যালগরিদমের সিদ্ধান্তই আমাদের সিদ্ধান্ত। ব্যাপারটা হচ্ছে যদি অ্যালগরিদম মানুষের মতই চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিত, তাহলে তো আমাদের আর অ্যালগরিদমের দরকার হত না। আমাদের তো মানুষ ব্যাংকার অনেক আছে।

রাশিদা জোন্স: ইউভাল, আমি একটা বিষয় চিন্তা করছি, বিল তোমাকেও বলছি আমাদের কি এআই-এর কর্তৃত্ব নিয়ে চিন্তিত হওয়া উচিত না? এআই যে আমরাই প্রোগ্রাম করেছি, এটা যদি এআই আর মনে না করতে পারে কোনো দিন?

বিল গেটস: এটা একটা সমস্যা হতে পারে ভবিষ্যতে। আমার মনে হয় না এখনই আমরা কিছু করতে পারব এ বিষয়ে। এক সময় বিশ্বে তো হিট ডেথও হবে যখন কমপ্লেক্স কোনো জিনিসই আর থাকবে না।

রাশিদা জোন্স: হিট ডেথ? আচ্ছা তা নিয়ে আমরা না হয় পরে আলাপ করবো।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: [হাসি]

বিল গেটস: শোনো, একদিকে আছে ভবিষ্যতে আমাদের সাথে কী হবে আর আদৌ কী সেটা আমরা এখন সমাধান করতে পারব কিনা, অন্যদিকে আছে আমাদের বর্তমানে কী কী সমস্যা এই যে মানুষ মানুষের ওপর অটোনমি (মেশিনের কর্তৃত্ব) চালাচ্ছে এ ব্যাপারে আমরা কী করতে পারি (যেটার সমাধান এআই করে দিচ্ছে)। ভবিষ্যতে কী হবে না হবে তা নিয়ে তুমি অনেক ভাবতে পারো যদিও ভাল কোনো সমাধান মিলবে না। হ্যাঁ, হতে পারে তখন মানুষের প্রায় সব কাজ মেশিন করে দেবে। তখন আমাদের ভাবতে হবে, আমরা যা করি কেন আমরা তা করি। আর কাজ না থাকলে আমাদের পরিচয় কী হবে। এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের চিন্তা করতে হবে।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: আমি এমন ভাবি না হলিউড সায়েন্স ফিকশনের মতো রোবট আমাদেরকে মেরে পৃথিবীর দখল নিয়ে নেবে। কিন্ত সেই ধরনের অটোনমি না থাকলেও অন্য ধরনের অটোনমি এখন ঠিকই আছে। অ্যালগরিদমের কারণে আপনি ব্যাংক লোন পাবেন না এটাও তেমন একটা বিষয়। এগুলি সায়েন্স ফিকশন না, বাস্তব। এবং সময়ের সাথে এটা সারা পৃথিবীতেই বাড়ছে। আমাদের এগুলি নিয়ে ভাবা উচিত। আচ্ছা, এখন আমাদের পুরনো কথায় ফেরত যাই। কভিড-১৯ নিয়ে যে সব কন্সপিরেসি হচ্ছে, আমার মনে হয় না এগুলি এত সহজে উড়িয়ে দেয়া যায়। কন্সপিরেসি থিওরির পেছনে ভয় লুকানো থাকে, যেগুলি অনেক সময় যৌক্তিক হয়। যদিও মানুষের শরীরে চিপ বসানোর জন্য কভিড-১৯ সৃষ্টি করা হয়েছে এটা একটা অবান্তর থিওরি, অনেক দিক দিয়েই। কিন্ত বিষয়টা সারভিলেন্স (নজরদারি) টেকনোলজি নিয়ে আমাদের ভয় প্রকাশ করে যেটা যৌক্তিক। কভিড কেউ ইচ্ছা করে তৈরি করেনি এটা সত্য ধরে নিলেও কভিডের কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবেই সারভিলেন্স টেকনোলজির ব্যবহার ও বিস্তার পৃথিবীতে বাড়ছে। আমি যদিও কন্সপিরেসি থিওরিতে বিশ্বাস করি না, কিন্ত এ বিষয়ে আমি চিন্তিত। আমার মনে হয় কভিড-১৯ এর পর থেকে অনেক মানুষের ওপর নজরদারি করা শুরু হয়ে যাবে।

রাশিদা জোনস: রাইট।

বিল গেটস: মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করে আর কী হতে পারে। অনেকে উদাহরণ দেয় ২০১৫ সালে আমি এমন মহামারির ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলাম। এখন তারা জিজ্ঞেস করছে, আর কোনো ভয়াবহ জিনিস ভবিষ্যতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে কিনা। এর একটা উত্তর হল জলবায়ু পরিবর্তন। আরো প্যানডেমিকও আসতে পারে। বায়ো টেররিজম নিয়ে মানুষ ভাবছে না, কিন্ত আমাদের এটা নিয়েও ভাবা উচিত। যদি আসলেই মানুষ ষড়যন্ত্র করে কভিড তৈরি করে তবে এর একটা ভাল দিক হবে এই যে সব দেশ এখন একত্র হয়ে তাদের রিসোর্চ আর এক্সপার্টদের কাজে লাগাচ্ছে, যেটা ভবিষ্যতে বায়ো টেররিজম ঠেকানোর জন্য কাজে লাগবে। আর সারভিলেন্সের ব্যাপারে একটা ইন্টারেস্টিং ট্রেইড অফ আছে। বায়ো টেররিজম থামাতে চাইলে তোমাকে ল্যাবরেটরিতে নজরদারি বাড়াতে হবে। নজরদারি করে যদি মানুষকে খারাপ কাজ করা থেকে বিরত করা যায় তাহলে দোষ কী? যেমন নিউক্লিয়ার অস্ত্র নিয়ে যারা কাজ করে তাদেরকেও তো নজরদারিতে রাখা লাগে।

রাশিদা জোন্স: কিন্ত ল্যাবে যারা কাজ করে তাদেরকে নজরে রাখা আর রাস্তায় হেঁটে যাওয়া মানুষকে নজরে রাখা নিশ্চয়ই এক না।

বিল গেটস: এটা ঠিক। আমাদের সীমা টানা উচিৎ এখানে।

রাশিদা জোন্স: কিন্ত আমরা কি তা করব? আমার মনে হয় না কোনো সীমা টানা হবে। ইউভালের কথাই আমার ঠিক মনে হচ্ছে, কভিডের পর আমরা মানুষকে নজরদারিতে রাখার বড় অজুহাত পেয়ে গেছি। এগুলি নিয়ে চিন্তা করতে হবে।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: [হাসি]

রাশিদা জোন্স: আমি আরো আশাবাদী হতে চাই। বিশ্বজুড়ে নজরদারি আর ভবিষ্যতে এআই আরো কী করবে সেই আশঙ্কা নিয়ে ভাবতে চাই না। আমি বিলকে জিজ্ঞেস করছিলাম ২০ বছর পরের পৃথিবী কেমন হবে। ও বলেছিল তখন জীবন আরো উন্নত হবে, মানুষের কষ্ট আরো কমে যাবে। ইউভাল আপনারও কি তাই মনে হয়, মানুষের জীবন আরো ভালো হবে ভবিষ্যতে? এখন যে ট্রেন্ড আমরা দেখছি, সেভাবে কি এগুতে থাকবে?

ইউভাল নোয়াহ হারারি: সবটাই নির্ভর করছে আমাদের ওপর। আমি মনে করি না ভবিষ্যৎ অনুমান করা যায়। ইতিহাস পূর্বনির্ধারিত পথে আগায় না। কভিড-১৯ এর কথা ভাবেন। আপনি কী করতে পারতেন এটা নিয়ে? হয়ত দোষ চাপাতে পারতেন, মাইনরিটি আর বিদেশীদের ওপর। বা আপনি লোভী হলে কভিডের সুযোগে প্রচুর পয়সা কামাতে পারতেন। বা আপনি ভুল তথ্য ছড়াতে পারতেন। কন্সপিরেসি থিওরি দিতে পারতেন। আবার আপনি একেবারে অন্য পথেও যেতে পারতেন। আপনি চিন্তা করলেন এই জরুরি সময়ে কীভাবে মানুষের সাহায্যে আসা যায়। যেটাই থাকুক আপনার কাছে, তবুও আপনি চেষ্টা করলেন। অন্তত মানুষকে ঠিক তথ্য জানালেন। মানুষকে বোঝালেন বিজ্ঞানের ওপর ভরসা রাখা উচিৎ। সবাই জানতে পারল ভাইরাস কী, এপিডেমিক কীভাবে শুরু হয়, কীভাবে ছড়ায়। সব মানুষ এভাবে যদি কাজ করত কভিড ক্রাইসিস সামলানো তো সহজ হতোই, আমরা ভবিষ্যতের জন্যও প্রস্তুত হয়ে যেতাম। তাই আপনি খেয়াল করলে বুঝবেন, আমাদের বড় শত্রু ভাইরাস না। বড় শত্রু আমাদের ভেতরের অজ্ঞতা, লোভ আর বিদ্বেষ।

বিল গেটস: কিন্ত আপনার কি মনে হয় না আজকে থেকে ২০ বছর বা ৪০ বছর পরে যাদের জন্ম হবে তারা এখনকার চেয়ে ভাল থাকবে?

ইউভাল নোয়াহ হারারি: এমন নাও হতে পারে। কারণ ইতিহাস সরল পথে চলে না।

বিল গেটস: ওকে।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: আমাদের কাছেই এমন উদাহরণ আছে। ১৯১৩ সালে যদি ইউরোপে থাকতেন, আপনার মনে হতেই পারতো সব ঠিক আছে। গত ৪০ বছর যেভাবে গেছে সামনের দিনগুলিও তেমন যাবে। কিন্ত সেটা তো হয় নি। মানুষ যখন পেছন ফিরে তাকাবে বিশেষ করে পশ্চিমা মানুষেরা তখন এমন হতে পারে, তারা ১৯৯০ থেকে ২০১৫ কে গোল্ডেন এজ ভাববে। আর ভাববে এরপর থেকে সবকিছুর পতন শুরু হয়েছে। শুধু ইকোলজি না, রাজনীতি থেকে শুরু করে সবকিছুতে। কিন্ত আমি আসলে জানি না। কারণ ইতিহাস অনুমান করা অনেক কঠিন। ইতিহাসবিদ হিসেবে আমি বলতে পারি, মানুষের স্টুপিডিটি আন্ডারএস্টিমেট করা আমাদের উচিত হবে না।

রাশিদা জোন্স: [হাসি]

ইউভাল নোয়াহ হারারি: বিজ্ঞান আর ডেটা, এগুলি তো অনেক গ্রেট বিষয়। কিন্ত মানুষের আহাম্মকি কখনোই আন্ডারএস্টিমেট করা যাবে না। আমরা গত কয়েক শতাব্দীতে অনেক উন্নতি করেছি, এটা সবার বোঝা উচিত। তবে কিছু লোক আছে যারা ভাবে কোনো উন্নতিই হয় নি। এটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার। কারণ তারা যেটা বলতে চায়, উন্নতির কোনো দরকার নেই।

রাশিদা জোন্স: এটা অবাস্তব না?

ইউভাল নোয়াহ হারারি: যদি গত শতাব্দীতে আমাদের অবদানগুলি এই যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা মাইনরিটিদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন—এসব যারা উন্নতি ভাবে না তাদের চিন্তাধারা হতাশাজনক।

রাশিদা জোন্স: রাইট।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: মনে হয় প্রকৃতির নিয়মেই এমন কিছু আছে যেটা উন্নতির পথে বাধা দিতে থাকে। উন্নতি যে হচ্ছে এটা বুঝতে পারাও গুরুত্বপূর্ণ।

রাশিদা জোন্স: রাইট।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: তবে আমাদের বুঝতে হবে এখন সন্তুষ্ট হওয়ার সময় না। আমাদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। তখন বুঝতে পারব যে উন্নতির আরো জায়গা আছে।

রাশিদা জোন্স: ইউভাল, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের সাথে কথা বলার জন্য। আমি সত্যিই ভীষণ সম্মানিত আপনার সাথে আলাপ করতে পেরে। আর আমি বিলকে বলছিলাম যদি আপনি কোনোদিন কাল্ট তৈরি করেন, আমি অবশ্যই আপনার অনুসারী হব।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: [হাসি]

রাশিদা জোন্স: আমি জানি হয়ত বা আপনি কোনোদিন এমন কিছু করবেন না। কিন্ত আমি আপনার সাথে আছি। অন্তত একজন সদস্য আপনি পেয়ে গেছেন।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: আচ্ছা এ ব্যাপারে আমি চিন্তা করবো। [হাসি]

রাশিদা জোন্স: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

ইউভাল নোয়াহ হারারি: ধন্যবাদ। বিল আপনার সাথে কথা বলাও আনন্দের ছিল।

বিল গেটস: হ্যাঁ আপনার সাথে আলাপ করাটাও ছিল দারুণ ব্যাপার।

রাশিদা জোন্স: বিল, ইউভালের কোনো কথা তোমাকে কি অবাক করেছে?

বিল গেটস: ইউভাল সব কিছু অনেক বড় পরিসরে দেখতে পারে। এটা ব্রিলিয়ান্ট ব্যাপার। সে আমাদের মনে করিয়ে দিল আমাদের মর্ডার্ন লাইফের কত কিছুই আসলে অ্যাবস্ট্র্যাক্ট। ফিকশনের ওপর গড়ে ওঠা। এগুলি বুঝতে পারা তার ব্রিলিয়ান্স। ফিকশনগুলি যদিও অনেক উপকার করে আমাদের। মানুষকে সাহায্য করার জন্যই এগুলি।

রাশিদা জোন্স: মিথ্যা বা ফিকশন নিয়ে ইউভালের সাথে কথা বলা আসলেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইতিহাস থেকে বোঝা যায় আমরা আসলে কত পথ পার করে এখানে এসেছি। আমি চিন্তা করি যে আমাদের সামনে একটা খুব ভয়ানক সময় আছে। এখন এমন একটা সময়ে আমরা আছি, যদি আমি বিশ্বাস করি আকাশের রঙ সবুজ ইন্টারনেটে ঠিকই এমন এক্সপার্ট খুঁজে পাব যে বলবে আসলেই আকাশের রঙ সবুজ। এখন এই মিথ্যা খবরের যুগে আর বানানো সব ফ্যাক্টস দিয়ে সব অবাস্তব থিওরিও প্রমাণ করা যায়। এখন কি তবে ধ্রুব সত্য বলে আর কিছু নেই? যদি থেকে থাকে, সেটা কোথায় পাওয়া যায়?

বিল গেটস: কিছু সোর্স আছে যেগুলি থেকে তুমি সত্য খবর জানতে পারো। তোমাকে খুশি করার জন্য খবর তারা ছাপায় না। আমি চাই মানুষ এমন সোর্সগুলি খুঁজে বের করুক আর নিজেদের মনতুষ্টি খোঁজা বাদ দিয়ে সত্য জানতে আগ্রহী হোক।

রাশিদা জোন্স: আমার কাছেও তাই মনে হয়। আমরা সত্যের প্রতি কীভাবে আরো সন্ধানী করতে পারি মানুষকে? কারণ মানুষ ভাবে তারা সত্য জানতে চায়। কিন্ত তার জন্য তারা বেশি কষ্ট করতে চায় না। এসব মানুষের কাছে আকাশ আসলেই সবুজ। তারা বলে রাশিদার কথাই ঠিক। মানুষ নিজের বিশ্বাসকেই একমাত্র সত্য ভাবে। কিন্ত মানুষকে মিনিংফুল উপায়ে সত্য খুঁজতে হবে। যদিও এটা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে যাবে।

বিল গেটস: মানুষের শিক্ষা যে কমে গেছে এমন না। তারা বোকা বোকা সব মিম দেখে বোকা বনে যাচ্ছে। কিন্ত জনতার অপিনিয়ন দিয়ে কখনো কঠিন সমস্যার সমাধান করা যায় না। আমাদের দরকার এক্সপার্টদের। আর এক্সপার্টদের কাজে লাগাতে হবে ঠিকভাবে। তাহলে আমরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর দারিদ্র্য দূর করার যে অগ্রগতি করেছি সেটা ধরে রাখতে পারব।

রাশিদা জোন্স: আমার তবুও চিন্তা হয়। মনে হয় এক্সপার্টদের জন্য পাবলিক রিলেশন্স অফিসার রাখা উচিত। যাতে তারা মানুষকে বিজ্ঞানের প্রতি আর এক্সপার্টদের প্রতি বিশ্বাস আনাতে পারে।

বিল গেটস: হ্যাঁ, তা করা যায়। এটা আসলে দুঃখের ব্যাপার কিছু লোক এক্সপার্টদের বিপক্ষে সব সময়ই বলতে থাকে। আমাদের এটা বন্ধ করতে হবে। হয়ত বা এক্সপার্টদেরও নিজেদের ব্যাপারে কোনো পরিবর্তন আনতে হবে।

রাশিদা জোন্স: ওকে এক্সপার্টরা, আমরা তোমাদের সাথে আছি। তোমাদের ওপর কড়া নজর রাখছি। তোমাদের সাথে নিয়ে আমরা সব ঠিক করে ফেলব।

মিউজিক। শেষ।

Related posts

সাম্প্রতিক © ২০২১ । সম্পাদক. ব্রাত্য রাইসু । ৮১১ পোস্ট অফিস রোড, বাড্ডা, ঢাকা ১২১২