কোয়ারেন্টিনে সময় কাটাবেন কীভাবে—নভোচারীদের কিছু টিপস

পৃথিবীতে যদি এমন কেউ থেকে থাকেন যিনি এক জায়গায় বন্দি অবস্থায় সময় কাটানোতে সবচেয়ে বেশি অভ্যস্ত, তিনি হচ্ছেন একজন নভোচারী।

পৃথিবীর বাইরের একাকী মাসের পর মাস কাটানো নভোচারীরা করোনাভাইরাস মহামারির এই সময়ে কোয়ারেন্টিনে সময় পার করার বিভিন্ন পদ্ধতি শেয়ার করছেন। নাসার নভোচারী স্কট কেলি ২০১৫ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে একটানা প্রায় এক বছর সময় কাটিয়ে বিশ্বরেকর্ড করেছেন।

নিউ ইয়র্ক টাইমসে লেখা একটি প্রবন্ধে তিনি বলেন, বাসায় আটকা পড়া বেশ চ্যালেঞ্জিং। আমি যখন প্রায় ১ বছর স্পেস স্টেশনে ছিলাম, সেই অভিজ্ঞতা মোটেও সহজ ছিল না। ওখানে যখন ঘুমাতে যাচ্ছিলাম, তখনো  কাজে ছিলাম। ঘুম থেকে ওঠার পরও কাজেই ছিলাম। মহাকাশে থাকা হয়ত পৃথিবীর একমাত্র চাকরি যেটা আপনি কখনোই পুরাপুরি ছাড়তে পারবেন না।

কেলির মতে, এসময়ে একটা নির্দিষ্ট শিডিউল ঠিক করে সেই অনুযায়ী কাজ করা ভালো, যাতে করে কাজ ও ঘরোয়া জীবনের যৌথ পরিবেশে একটা নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করা যায়। ধীরস্থির থাকাটাও দরকার বলে মনে করেন তিনি। যখন আপনি দিনের পর দিন একই জায়গায় কাজ করেন আবার থাকেনও ওইখানেই, তখন বাকি সবকিছুকে ছাপিয়ে কাজটাই আপনার সময়ের সবচেয়ে বড় অংশটা দখল করে ফেলতে পারে। এরকম পরিস্থিতিতে উপভোগ করা যায় এমন সব কাজ করার জন্য আলাদা সময় রাখুন। মুভি দেখার জন্য অন্য সহকর্মীদের সাথে আলাদা সময় ঠিক করে রাখতাম আমি। মুভি দেখার সময় আমাদের কাছে স্ন্যাকস থাকত। এসময় আমি গেম অফ থ্রোনস এর গোটা সিরিজ একটানা দেখেছি, তাও দুইবার।

স্কট কেলি মনে করেন, এসময়ে ঘুমাতে যাওয়ার জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে রাখা অনেক দরকারি। তাছাড়া বাইরে গিয়ে প্রকৃতির মাঝে কিছুক্ষণ কাটানো উচিত আমাদের সবারই। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে বাসার ভেতরেই প্রাকৃতিক কিছু শব্দ, যেমন বৃষ্টির পানির আওয়াজ, পাখির কাকলী, গাছের পাতায় ঘষা লাগার শব্দ ইত্যাদির রেকর্ডিং শোনা যেতে পারে। তার কলিগরা নিয়মিতই এসবের ওপর নির্ভর করতেন।

তাছাড়া আমাদের যত ধরনের হবি আছে (বই পড়া, লেখা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো, গান গাওয়া ইত্যাদি) সেগুলির চর্চা করার এটাই সবচেয়ে ভালো সময়। নভোচারীরা মহাকাশে থাকার সময় নিয়মিত এসব করে থাকেন।

ডায়েরি লেখা শুরু করতে পারেন, যেখানে প্রয়োজনীয় সব কথা লিখে রাখলেন। কর্মহীন অবস্থায় পড়ে থাকলে বা রুটিনের বাইরে গেলে আমরা অনেক সময়ই গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য পরে মনে রাখতে পারি না; এজন্য জার্নাল অনেক ইউজফুল। আর ভিডিও কনফারেন্স বা ফোন কলের সুযোগ থাকলে আত্মীয়দের সাথে কানেক্টেড থাকাও এই সময় আপনার মানসিক অবস্থা ফ্রেশ রাখবে।

অন্যদিকে, কেলি তার লেখায় প্রাক্তন কানাডিয়ান মহাকাশচারী ও আইএসএস কমান্ডার ক্রিস হ্যাডফিল্ডের কথাও স্মরণ করেন, যিনি স্পেস স্টেশনে থাকাকালীন ডেভিড বোয়ি’র বিখ্যাত গান ‘স্পেস অডিটি’র কভার ভার্শন গেয়ে ও মিউজিক ভিডিও শুট করে বিখ্যাত হয়েছিলেন।

ক্রিস হ্যাডফিল্ডের সেই মিউজিক ভিডিওটি:

ক্রিস হ্যাডফিল্ড নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করা তার নতুন ভিডিওতে আইসোলেশনে কীভাবে সময় কাটাবেন তার ওপর কিছু টিপস দিয়েছেন। তার সেই টিপসগুলিতে আছে:

  • সবকিছু নিয়ে আতঙ্কিত থাকলে চলবে না। বর্তমান পরিস্থতি সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য সূত্র থেকে সব রকম তথ্য নিয়ে রাখুন। এতে করে আপনি ও আপনার পরিবার কী ধরনের ঝুঁকির মধ্যে আছেন সেটা সম্বন্ধে সঠিক ধারণা পাবেন।
  • দরকার হলে দিনের প্রতিটি ভাগের জন্য আলাদা আলাদা গোল সেট করে নিন। এভাবে চিন্তা করুন—যদি আরো ৭ দিন আপনাকে কোয়ারেন্টিনে থাকতে হয়, তাহলে এই ৭ দিন পর কী কী গোল পূরণ করতে চান আপনি? তারপর সেই অনুযায়ী একটা স্ট্র্যাটেজি সাজিয়ে নিন।
  • তারপরে খুঁজে বের করুন, আপনার সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কোন কোন প্রতিবন্ধকতা আছে। মানসিক চাপ, উৎকণ্ঠা, টাকা-পয়সার সমস্যা নাকি পারিবারিক বোঝাপড়ার অভাব?
  • আগের ৩টা পয়েন্টের সবগুলির জবাব পাওয়ার পর কাজে নেমে পড়ুন। সেট করা গোল মোতাবেক কাজ করুন। হয় পরিবারের দেখাশোনা করুন বা অনেক দিনের পড়ে থাকা কাজগুলি করে ফেলুন। বা নতুন কোনো বই পড়া, নতুন একটা ভাষা শেখা শুরু করুন—যেটাই লক্ষ্য হোক না কেন।

আগে পারেননি, এমন কাজগুলি করে ফেলার এটাই সুযোগ, বলেন হ্যাডফিল্ড।

এদিকে পৃথিবীর প্রথম চাঁদে যাওয়ার অভিযানে অংশ নেওয়া অবসরপ্রাপ্ত নভোচারী বাজ অলড্রিনও তার কোয়ারেন্টিনে থাকা সময়ের জন্য প্ল্যান করে রেখেছেন। ৯০ বছর বয়সী এই অগ্রজ মহাকাশচারীকে তার প্ল্যানের কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, দরজা লক করে শুয়ে থাকব।

সূত্র. হাফিংটন পোস্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here