ভিজুয়াল মেমোরি আমাদেরকে সাহায্য করে চোখের মাধ্যমে বাইরে থেকে নেয়া তথ্য প্রক্রিয়া করে কাজে লাগাতে বা ব্রেইনে রেখে দিতে। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চোখের নড়াচড়ার মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন হয়।

ভিজুয়াল মেমোরি নিয়ে গবেষক ও বিজ্ঞানীরা সবসময়ই নানা রকম পরীক্ষা করে যাচ্ছেন। তাতে করে বেরিয়ে আসে নিজেদের সম্পর্কে আশ্চর্যজনক সব তখ্য। আমরা যা জানি নিজেদের ব্যাপারে তার বহুগুণ অসাধারণ কাজ আমরা করতে পারি মস্তিষ্কের কারণে।

প্রতিদিন আমরা দেয়ালে, পত্রিকায়, বইয়ে এবং ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসে অনেক ছবি দেখি। এর মধ্যে কিছু আমাদের স্মৃতিতে রয়ে যায়। কোন উপাদানের প্রভাবের কারণে আমরা কিছু ছবি মনে রাখি আর বাকিগুলি না, তা এখনও জানা যায়নি। কিন্ত গবেষকরা ধারণা করতেন যে ছবির আকার এবং স্মৃতি পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত না। এর কারণ একটা ছবি ছোট হোক বা বড় হোক, আমরা তা দেখে সচরাচর বুঝি কী দেখাচ্ছে।

ড. শ্যারন গিলাই-ডোটানের রিসার্চ

বার-ল্যান ইউনিভার্সিটির স্কুল অপ্টোমেট্রি অ্যান্ড ভিশন সাইন্স অ্যান্ড গোন্ডা (গোল্ডশিমিড) মাল্টিডিসিপ্লিনারি ব্রেইন রিসার্চ সেন্টারের অধ্যাপক ড. শ্যারন গিলাই-ডোটানের নেতৃত্বে একটি নতুন গবেষণা ছিল এটা নিয়ে, আমাদের প্রতিদিনকার জীবনে বড় ছবি বেশি মনে থাকে কিনা। তার অনুমান এই ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যে বড় আকারের ছবি প্রক্রিয়া করার জন্য আমাদের দেখার সিস্টেমের বেশি শক্তি খরচ করার প্রয়োজন হয়।

আমাদের ভিজ্যুয়াল মেমোরি ও ছবির আকৃতি

সম্প্রতি এই গবেষণায় ফলাফল প্রকাশ হয়েছে ‘প্রসেডিংস অফ দা ন্যাশনাল একাডেমি অফ সাইন্সেস’ জার্নাল থেকে। এখানে প্রথমবারের মতো দেখানো হয়েছে , ছবি দেখার জন্য আমাদের যে ভিজ্যুয়াল মেমোরি ব্যবহৃত হয়, তা রেটিনার উপর পতিত ছবির আকার দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই ফলাফলের অনেকগুলি ব্যবহারিক দিক আছে। এর মধ্যে আছে বিভিন্ন ধরনের ইলেক্ট্রনিক স্ক্রিনের ব্যবহার করে আমরা যখন তথ্য প্রক্রিয়া করি, তখন আমাদের তথ্য প্রক্রিয়ার করার গুণগত মান কেমন হবে তা স্ক্রিন বড় না ছোট সেটার কারণে প্রভাবিত হয় কিনা।

আরো পড়ুন: বয়স্করা কেন সহজেই নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন?

গবেষণাটি যেভাবে হয়

ড. গাইলেই-ডোটান ল্যাবের পিএইচডি শিক্ষার্থী শাইমা মাসারওয়া এবং অলগা ক্রেইকম্যান কয়েকজন অংশগ্রহণকারীকে ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে বলে তাদের ভিজ্যুয়াল মেমোরি পর্যবেক্ষণ করেন। এরপরে তাদের যে স্মৃতি বিষয়ক পরীক্ষা হয়েছে তার ব্যাপারে আগে থেকে অংশগ্রহণকারীরা কিছুই জানতেন না। প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে ভিন্ন আকারের ভিন্ন ভিন্ন ছবি কেবল একবারের জন্যে দেখানো হয়।

গবেষণার ফলাফল

মোট ১৮২ জন ৭টি ভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। গবেষকেরা দেখতে পান, বড় ছবিগুলি ছোট ছবির চেয়ে অংশগ্রহণকারীরা বেশি মনে রাখতে পেরেছিল (১.৫ গুণ বেশি)।

ড. শ্যারন গিলাই-ডোটান

এই বিষয়টি অন্য কোনো প্রভাবক যেমন কোন ক্রমে ছবিগুলি দেখানো হয়েছিল, তাদের রেজুলেশন কেমন ছিল বা ছবিতে কী বলা হয়েছে এগুলির ওপর নির্ভর ছিল না।

ছবির আকার নাকি ছবির ডিটেইল বা স্পষ্টতা, কোনটা মনে রাখার পিছনে ভূমিকা রেখেছে তা বোঝার জন্য গবেষকেরা বড় কিন্ত ঘোলা ছবির সাথে ছোট কিন্ত পরিষ্কার ছবি দেখিয়েছেন। এই ছবিগুলির কন্টেন্ট একই ছিল।

গবেষকরা অবাক হয়ে যান যখন তারা এখানেও দেখেন অংশগ্রহণকারীরা বড় ঘোলা ছবিগুলি, ছোট পরিষ্কার ছবির থেকে বেশি মনে রাখতে পারছেন।

তারা আরো দেখতে পান, একই ছবি বেশিরভাগ সময় অংশগ্রহণকারীরা আরো ভালোভাবে মনে রাখতে পারে যখন তাদের ছোট আকারের চেয়ে বড় আকারে দেখানো হয়।

ড. গিলাই-ডোটান এর পর্যবেক্ষণ

“মস্তিষ্কের যে অংশ রেটিনার ইমেজের প্রতিনিধিত্ব করে, সেখানে ছোট ছবি প্রক্রিয়া করার চেয়ে বড় ছবি প্রক্রিয়া করতে বেশি শক্তি খরচ করা হয়। এর কারণ প্রক্রিয়াকরণ নির্ভর করে ছবিটি রেটিনার কী পরিমাণ এলাকা উদ্দীপিত করেছিল—জানান ড. গিলাই-ডোটান। তিনি উল্লেখ করেন, আরো কিছু প্রভাবক বড় ছবির ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে, যেমন এর কারণে চোখের ভিন্ন ধরনের গতিবিধি এবং এতে আরো বেশি মনোযোগ দেয়া।

এই গবেষণাটি করা হয়েছিল ১৮-৪০ বছর বয়স্ক তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে, যাদের দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণভাবে বিকশিত হয়েছে। তবে বয়সের কারণে এখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এর যুক্তি হলো, ভিন্ন ভিন্ন বয়সে হয়ত ছবি দেখার উদ্দীপনা ভিন্ন হতে পারে। কারণ বয়স এবং স্ক্রিন দেখার অভিজ্ঞতায় তরুণ এবং বয়স্কদের মধ্যে বেশ পার্থক্য আছে।

গবেষণায় একদিকে কেবল স্থির ছবির বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, তবে এর ফলাফলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার আছে ‘স্ক্রিন জেনারেশন’ এর ক্ষেত্রে, যেটা ছোট ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসে প্রচুর পরিমাণে তথ্য গ্রহণ করে। “এটি সম্ভব যে গতিশীল ছবি যেমন ভিডিওর ক্ষেত্রেও ছোট আকারের ছবির তুলনায় আমাদের বেশি পরিমাণ শক্তি ব্যবহৃত হয়। তাই যেসকল ভিডিও বড় পর্দায় দেখা হয়, তা মনে থাকার সম্ভাবনা বেশি”, বলেন গিলাই-ডোটান।

আরো পড়ুন: আপনার কি সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়?

শিক্ষা ক্ষেত্রে ভিজ্যুয়াল মেমোরির এই গবেষণা যেভাবে কাজে আসতে পারে

অনেক স্কুলে আজকাল টেক্সটবই ইলেক্ট্রনিক ফরম্যাটে পাওয়া যাচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা তাদের স্মার্টফোনে পড়াশোনা করছে। যদিও স্মার্টফোনের স্ক্রিন ব্যবহার করা সুবিধাজনক এবং নাগালযোগ্য, ব্যবহারিক দিক দিয়ে বড় স্ক্রিনে পড়াশোনা করলে তার মান আরো ভালো হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

গিলিয়ান-ডোটান বলেন, “এই ঘটনা কতটা বিস্তৃত তা বোঝার জন্য এবং এটা কি সকল সময়ে কাজ করে নাকি কিছু নির্দিষ্ট অবস্থায় কাজ করে তা জানার জন্য এরপর আরো ফলো আপ গবেষণার প্রয়োজন আছে।

ছবি. মানুষের কর্টেক্সের প্রথম দিককার ভিজ্যুয়াল এলাকা, বেশি পরিমাণ কর্টেক্স বড় ছবি প্রক্রিয়া করার জন্য নিয়োজিত (লাল—ছোট ছবি, বেগুনি—মাঝারী ছবি, নীল—বড় ছবি)

বার-ল্যান ইউনিভার্সিটির প্রতিবেদন থেকে অনুবাদ. আমিন আল রাজী