ঘর পালানোর গল্প

তো সেদিন আমি ফাঁকিবাজি করে আমার স্টুডেন্টকে পাঁচটা অংক করায়েই বের হয়ে গেলাম। আমার স্টুডেন্ট আমার বাসার উপরের তলায় থাকে। অংক করানো শেষে আমি দৌড়ায়ে দৌড়ায়ে বাসায় গিয়ে জুতা না খুলে ভিতরে ঢুকে গেলাম। পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে লিফটে উঠতে উঠতে ফোন আসলো। নিচে উবার চলে আসছে। উবারে আমার দুইজন সিনিয়র আর একজন জুনিয়র আছে। ওরা টিএসসি থেকে ধানমণ্ডি যাচ্ছিল পিজ্জা খেতে। পথিমধ্যে তাদের মনে হইল আমাকেও সাথে নিয়ে যাবে। তাই আমাকে ফোন করে উবার ঘুরায়ে বাসার নিচে চলে আসছে।

আমি গাড়িতে উঠতে উঠতে তাদেরকে জানালাম, আমার কাছে কিন্তু টাকা-পয়সা নাই কোনো।

আমরা সীমান্ত স্কয়ারে গেলাম। ওই পিজ্জার দোকানটায় আমি আগে যাই নাই কখনো। সেখানে গিয়ে আমার জুনিয়র উন্মেষ পিজ্জার দোকানের লোকজনকে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা আপনারা তো উবার ইটস-এ ২৫% ডিসকাউন্ট দিচ্ছেন। আমরা যদি এখানে বসেই উবার ইটস-এ অর্ডার করি তাহলে?

রেস্টুরেন্টের কাউন্টার থেকে জানালো, তাহলে আর কী! একজন রাইডার আসবে, কাউন্টার থেকে পিজ্জা নিয়ে আপনাদেরকে টেবিলে দিয়ে আসবে। এই তো!

উন্মেষ তারা মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল নাড়ায়ে নাড়ায়ে বলতে থাকলো, তাহলে ঠিকই আছে। এটাই করি।

লোকটা শুকনা মুখে উত্তর দিলো,  কিন্তু তাড়াতাড়ি করতে হবে। আমরা কিচেন ক্লোজ করে দিবো।

এরকম গরিবী কর্মকাণ্ডে আমি প্রচণ্ড বিব্রত হয়ে বসে থাকলাম। মানে গরিবী কর্মকাণ্ড টিএসসিতে, ক্যাম্পাসে, চানখারপুলের পেনাং-এ ভাত খেতে গিয়ে করলে ঠিক আছে। কিন্তু এরকম একটা জায়গায় পিজ্জার মতো একটা জিনিস খেতে এসে এ কেমন লজ্জার কাণ্ড!

উন্মেষ তার ফোন থেকে দুইটা পিজ্জা অর্ডার দিলো। আর কাউন্টারে লোকটাকে মেন্যুটা দেখায়ে বললো, আমি এই দুইটা অর্ডার দিছি। আপনারা বানানো শুরু করে দেন।

আমি চুপচাপ মুখে অস্বস্তির হাসি নিয়ে বসে থাকলাম। উবার ইটস-এর ডেলিভারি পার্সন আসলো। কাউন্টার থেকে পিজ্জা নিয়ে আমাদের টেবিলে দিলো। বিল নিয়ে চলে গেল। ১২০০ টাকার পিজ্জা আমরা ৮০০ টাকায় রেস্টুরেন্টে বসেই খাইলাম। ওয়েটারকেও কোনো টিপস দিতে হইল না।

পিজ্জা খেতে খেতে আমার ফোনে একটা কল আসলো। আমার এক উইয়ার্ড জুনিয়র রিকি। সে ফোন করে বললো, আপু, প্রিয় ভাই কোথায় আপনি কি জানেন? উনাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাসার সবাই অনেক টেনশন করতেছে।

আমি বললাম, আচ্ছা দাঁড়াও, আমি দেখতেছি। আমি আমার বান্ধবী দ্বীনাকে ফোন দিলাম। কারণ কেউ যদি প্রিয়র খবর জেনে থাকে তো সেটা দ্বীনাই।

দ্বীনা কাঁদতে কাঁদতে ফোন ধরে বললো, হ্যালো সুচি…।

দ্বীনার কাছ থেকে ঘটনা জানলাম। তারা দুইজন মিরপুরের একটা রাস্তায় বসে ফুচকা খাচ্ছিল। তখন প্রিয় দ্বীনাকে বলছে, আচ্ছা আমার ফোনটা একটু রাখো তো। ফোনটা দ্বীনার ব্যাগে রেখে তারা ফুচকা খাওয়া শেষ করলো। তারপর প্রিয় বলল, তুমি একটু বসো। আমি আসতেছি।

দ্বীনা ভাবছিল প্রিয় বোধহয় সিগারেট কিনতে যাচ্ছে সামনের রাস্তাটায়। প্রিয় গেল। এরপর দেড় ঘণ্টা পার হলো। কিন্তু প্রিয় আর ফিরলো না। শেষমেশ রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে দ্বীনা বাসায় চলে গেল। বাসায় গিয়ে প্রিয়র ভাবিকে ফোনে সবকিছু জানানোর পর থেকে প্রিয়কে খোঁজাখুঁজি শুরু হইছে।

আমি চুপচাপ ঘটনাটা শুনলাম। দ্বীনাকে বললাম, প্রিয় মনে হয় বরিশাল গেছে।

দ্বীনা বলল, বরিশাল কেন যাবে এরকম ভাবে?

আমি জানলাম, ওর তো বরিশাল, লঞ্চ-ফঞ্চ এগুলা নিয়ে আগ্রহ আছে। আর প্রিয় অনেক উইর্য়াড। ওরা মাঝেমধ্যে এগুলা করে।

ওরা বলতে আমি এখানে প্রিয় ও দীপ্তকে বুঝাইছি। ওদের দুইজনের বরিশাল যাওয়ার প্রবণতা আছে। তবে সে ব্যাপারে দ্বীনাকে আমি কিছু জানাই নাই। যাই হোক, আমি খোঁজ পেলে ফোন দিবো বলে ফোন রাখলাম। তারপর প্রিয় এবং আমার দুই একজন বন্ধুকে ফোন দিলাম। কেউই কিছু জানে না।

পিজ্জা খেতে খেতে আমার সিনিয়র জিহাদী ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করলো, কী হইছে? আমি ঘটনা বললাম পুরাটা। এবং জানালাম যে, প্রিয় প্রায়ই এইটা করে। ও একটু কেমন জানি টাইপের।

উন্মেষ এক গ্লাস কোক হাতে স্বভাবমতোই তার হলুদ দাঁতগুলি বের করে একগাল হাসি দিয়ে বললো, জানেন আপু আমার এক মামা ক্লাস ফাইভ-সিক্সে থাকতে বাসা থেকে পালায়ে গেছিল। বাসায় বকাঝকা করছে, মাইর-টাইর দিছে তারপর সে রাগ করে তার রুমে গিয়ে দেয়ালের উপরে বড় বড় করে লিখছে, “মস্ত বড় এই দুনিয়ায়, অনেক আছে ঠাঁই”।  লিখা শেষে বাসা থেকে বের গেছে। কিন্তু পালায়ে আর যাবে কই! পাশের রাস্তায় আরেক মামার বাসা আছে, সেখানে গিয়ে বসে ছিল। তারপর তো উনার বাবা-মা দেয়ালে এই লিখা দেখে মহা দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেছে। কিছুক্ষণ পরেই অবশ্য ওই মামাকে বাসায় ফিরায়ে আনা গেছে। মামা তার মামার বাসা থেকে চুপচাপ যেন কিছুই হয় নাই এমন ভঙ্গিতে চলে আসছেন।

উন্মেষের গল্প শেষ হওয়ার পর ক্লাস ফোরে থাকতে আমি যেবার বাসা থেকে পালায়ে গেছিলাম সেই গল্প মনে পড়লো। ক্লাস ফোরে থাকতে বাসায় একবার তুমুল বকাঝকা দিচ্ছিল আমাকে । চিল্লাচিল্লির এক পর্যায়ে মুখে মুখে তর্ক করার অপরাধে বকাঝকা মাইরে গড়ায়। মারধরের প্রতিবাদ স্বরূপ আমি বাসা থেকে বের হয়ে হাঁটা শুরু করলাম। আর জীবনেও বাসায় যাবো না সিদ্ধান্ত নিলাম।

কিন্তু যাবো আর কোন দিকে! স্কুলের দিকেই হাঁটা শুরু করলাম। গেটের কাছে এসে দেখি পারমিতা দাঁড়ায়ে আছে সেখানে। আমি বাসা থেকে বের হয়ে গেছি শুনে ও কেমনে যেন বুঝে গেছিল যে আমি স্কুলের দিকেই যাবো!

এ গল্প শোনার পর জিহাদী ভাই জানালেন যে উনাকে কখনো ঘর পালাতে হয় নাই। কারণ উনার বড় ভাই একবার বাবা মায়ের হাতে বেধড়ক মাইর খেয়ে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর উনারা আর কাউকে পিটান নাই।

এটা শুনে এক গাল হেসে আমার আরেক সিনিয়র মাহিম ভাই বললো, হেহ! আমার কখনো রাগ করে ঘর পালাইতে হয় নাই। আমারেই বাসা দিয়ে (উনি সবসময় কথা বলার সময় ‘থেকে’র বদলে ‘দিয়ে’ বলেন’) বের করে দিছে। বাপ-মার ঝগড়া লাগছে, রাগারাগি হইছে আমি স্কুল দিয়ে এসে দেখি আমার ব্যাগ ট্যাগ গুছায়ে দরজায় রেখে দিছে আর বলছে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে যা!

এ দুঃখের কাহিনী শুনে আমরা সবাই হো হো করে হেসে উঠছি। মানুষের দুঃখের ঘটনা নিয়ে হাহাহিহি করা আমার আশেপাশের সবারই স্বভাব। ঘটনা যত বেশি দুঃখের হবে উনারা তত উচ্চঃস্বরে হাসেন। আমার মোবাইল, ল্যাপটপ, টাকা চুরির ঘটনায় প্রতিবারই উনারা আমার বিপদ এবং দুঃখে এরকম হাসছেন।

সে অর্থে আমার দেখা, পড়া এবং শোনা সবচেয়ে ‘হাস্যকর’ ঘর পালানোর গল্প মনে হয় দীপ্তর বরিশাল চলে যাওয়ার গল্পটা।

আমার বন্ধু (বন্ধুত্ব যদিও এখন আর নাই) দীপ্ত একদিন সন্ধ্যায় গায়ে জ্বর আর কাঁধে গিটার নিয়ে বের হয়ে গেল। রিনা আন্টি (দীপ্ত’র মা) অনেকবার ওকে পিছন থেকে ডাকাডাকি করলেও ও শুধু “যখন সময় হবে তখন আসবো” বলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল।

রাত ১২টায়ও ও বাসায় না ফিরলে আন্টি আমাকে ফোন দেয়। জানায় যে দীপ্তর ফোন বন্ধ এবং ওকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার আগে বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুক, মেসেঞ্জার এবং বাস্তবেও সবাই ওর সুইসাইডাল কথাবার্তা শুনতে শুনতে আর ঝাড়ি দিতে দিতে প্রায় বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিল। তাই ওর এরকম গায়েব হয়ে যাওয়াটা সবাইকেই বেশ অস্থিরতায় ফেলে দেয়।

আমি ওর ব্যান্ডমেট সবাইকেই ফোন দিতে থাকি। ইউনিভার্সিটি থেকে স্কুল পর্যন্ত ওর যত বন্ধুকে চিনতাম সবাইকেই যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। এসব কিছুর মাঝেও আমার মনে হচ্ছিল প্রিয় (ওর সবচেয়ে ভালো বন্ধু এবং ব্যান্ডমেট এবং যে আজকে হারায়ে গেছে) ওর খোঁজ জানে। কারণ ও আমাকে বলছিল  “দীপ্ত মনে হয় লঞ্চে করে কোথাও গেছে।” লঞ্চে করে গেছে না রকেটে করে গেছে এ জিনিস যে বলতে পারে সে কোথায় গেছে সেটাও বলতে পারে। কিন্তু প্রিয় আর কিছুই কাউকে বলতেছিল না। প্রিয়কে একপ্রস্থ ঝাড়ি দিয়ে আমি ফোন কেটে দিলাম।

সারারাত দীপ্তকে খোঁজাখুঁজি চললো। লঞ্চে করে ঢাকা থেকে বরিশাল কিংবা চাঁদপুরেই যাওয়া যায়। আমি এই দুই জায়গার লঞ্চের ব্যাপারে খোঁজ নিলাম। জানলাম চাঁদপুরের লঞ্চ ভোরের আগেই পৌঁছায়ে যায় আর বরিশালেরটা আরো পরে সকালের দিকে পৌঁছায়। দীপ্তর ফোনে টেক্সট পাঠায়ে রাখলাম যাতে ও ফোন অন করা মাত্রই নোটিফিকেশন চলে আসে।

১১টার দিকে দীপ্তর ফোন অন পাওয়া গেল। ফোনে সে যথেষ্ট রুড আচরণ করলো। আমি আর কথাবার্তা না বাড়ায়ে ওর আম্মুর সাথে ওকে যোগাযোগ করালাম।

পরদিন সকালে দীপ্ত ঢাকায় ফিরলো। বরিশালের গল্প করলো। বরিশালের একটা মসজিদে কাঁধে গিটার নিয়ে সকাল বেলা হাত মুখ ধুতে গিয়ে সেখানের এক টুপি পরা ধার্মিক লোক ওকে মসজিদের একটা রুমে নিয়ে গেছিল। রুমে বসে তারা একসাথে সাথে গানবাজনা করলো। গল্প শুনলাম, বরিশালে ওকে হিজরারা ধরার পরেও সে গান শুনায়ে সেখান থেকে চলে আসছিল। তার এই গুরুত্বপূর্ণ মিউজিক্যাল জার্নি নিয়ে আমরা দীর্ঘ সময় আলাপ করলাম।

তবে, এই ট্যুরের বিস্তারিত, সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প আমি জানতে পারলাম বরিশালের একজনের লিখা ব্লগ থেকে। জানলাম, কোনো মিউজিক্যাল জার্নি-ফার্নি না, সে মূলত ওই মেয়ের সাথেই দেখা করতে বরিশাল গেছিল। একজন মেয়ের সাথে দেখা করতে যাওয়া নিয়ে কেউ এরকম ‘ঘর পালানো’র কাহিনি করতে পারে কে জানতো!

সেই ব্লগ প্রকাশিত হওয়ার পর আমি তারে ‘অ্যাটেনশন সিকিং’ এর জন্য কয়েক প্রস্থ গালি দিলাম। গালাগালি শেষে বাসায় গিয়ে দেখি  ‘তিথি কেন অগোছালো?’ বিষয়ক এক বিশাল মত বিনিময় সভা বসছে। মত বিনিময় সভায় আমাকে পারসোনাল অ্যাটাক এবং হেনস্তা করায় আমি বাসা থেকে বের হয়ে যাবো ঘোষণা দিলাম।

ঘোষণা শুনে মা বলল, যা বের হয়ে যা! কই যাবি তুই? ছাদে গিয়ে বসে থাকবি আর বেশি হইলে টিএসসি, এই তো!

এরকম অপমানের পর আমি কানতে কানতে ঠাণ্ডার মধ্যে ছাদে গিয়ে সারারাত বসে থাকলাম। গভীর রাতে মা এসে আমাকে এক ডাক দিতেই আমি উঠে চলে আসছিলাম। বাসায় এসে ঘোষণা দিলাম, শুধু সকালটা হোক! ব্যাগ গুছায়ে চলে যাবো। ঘোষণা শেষে প্রতিবাদস্বরূপ ওইদিন সোফায় ঘুমায়ে ছিলাম। প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুযায়ী এর পরের দুইদিন আমি টিএসসিতে অবস্থান করছিলাম।