জানালায় আঘাত লেগেও বেঁচে যাওয়া পাখি উদ্ধার করলে দেখা যায় এরা ঘটনার আকস্মিকতায় একদম হতবুদ্ধি হয়ে গেছে।

পাখিরা জানালায় আঘাত করে কারণ এরা জানালাকে কঠিন বস্তু হিসেবে বুঝতে পারে না। উজ্জ্বল উঁচু স্থাপনাগুলি পরিযায়ী পাখিদের জন্যে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির কারণ। কিন্তু এই ‘পাখি-জানালা’ সংঘর্ষ এড়ানোর জন্যে কিছু সহজ সমাধান আছে।

জানালার কাচে ধাক্কা খেয়ে প্রতি বছর প্রায় এক বিলিয়ন পাখি মারা যায়। কয়েক দশক ধরেই আমরা এটা জানি, আর এই হতাহতের ঘটনা বিষক্রিয়া, যানবাহনের সাথে সংঘর্ষ বা অন্যান্য কারণে মৃত্যুকে সংখ্যার বিচারে ছাড়িয়ে যায়।


অ্যানা ফাংক
ডিসকভারি ম্যাগাজিন, ১১ মার্চ ২০২১


এর চাইতে বেশি মৃত্যুর একমাত্র কারণ হল পোষা বিড়াল। ধারণা করা হয় এরা বছরে ১.৩ থেকে ৪ বিলিয়ন পাখি হত্যা করে।

অভিপ্রয়ানের মৌসুমে জানালায় আঘাত লেগে পাখি মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ বৃদ্ধি পায়, যখন বিলিয়ন বিলিয়ন পাখি রাতের আকাশে উড়তে থাকে বহু দূরে তাদের গন্তব্য স্থলের দিকে লক্ষ্য রেখে। সম্প্রতি, গবেষক ও পরিবেশ সংরক্ষণ দলগুলি উদ্ভাবনী হয়ে উঠেছে। এরা বিভিন্ন যন্ত্র যেমন রাডার ব্যবহার করে এই পাখিগুলির নিরাপদে ওড়ার জন্যে নতুন পথ খুঁজে বের করছে।

পাখিরা অবশ্যই ওড়ার সময় বিল্ডিঙে ধাক্কা খেতে চায় না। আসলে জানালার কাচের প্রতিচ্ছবি তাদের ধোঁকা দেয়। এরা চকচকে গ্লাসকে কঠিন বস্তু হিসেবে চিনতে পারে না। উঁচু স্থাপনাগুলিতে যে মিররড উইন্ডো দেখা যায় সেগুলিকে বিশেষ করে খোলা আকাশের মত দেখায়। তবে সাধারণ কাচও পাখিদের বিভ্রান্ত করতে পারে। যেকোনো ধরনের প্রতিবিম্বই কোনো জানালাকে কঠিন দেয়ালের বদলে আকাশের মত দেখাতে পারে।

বেশিরভাগ সংঘর্ষই ঘটে রাতে। কারণ রাতের বেলা পাখিদের কাছে শহরে কৃত্রিম আলোগুলি বিভ্রান্তিকর, এমনকি আকর্ষণীয় মনে হয়। গবেষকেরা এখনও এর কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছেন। মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটি’র ইকোলজিস্ট জেরেড এলমোর-এর মতে, যদি আমরা প্রায় ১৫০ মিলিয়ন বছর ধরে পাখিদের বিবর্তনের সময়কে বিবেচনা করি, তাহলে কৃত্রিম আলো ও উঁচু দালান আসলে খুবই নতুন ঘটনা। এলমোরের মতে, তাদের বিবর্তনের ইতিহাসে তারা যা প্রত্যক্ষ্য করেছে সেগুলির তুলনায় এগুলি যথেষ্ট ভিন্ন।

বাণিজ্যিক বিমানের মতই পরিযায়ী পাখিরা এমন উচ্চতায় উড়তে চায় যা বিপদসীমার বাইরে। কিন্তু দালানগুলি তাদের বাধা দেয় যখন তারা উড়তে শুরু করে, বা নামতে থাকে বা নিচু হয়ে উড়তে থাকে, যেমন ঝোড়ো আবহাওয়ায়। আর যখন পাখিরা পূর্ণ বেগে জানালার কাচে এসে ধাক্কা খায়, তখন এর প্রচণ্ড প্রভাব পড়ে তাদের মাথায়। এলমোর জানান, জানালায় আঘাত লেগে মৃত পাখিদের অনেক সময় ঠোঁট ভেঙে যায়। এটি তাদের আঘাতের তীব্রতার এক ধরনের প্রমাণ।

জানালায় আঘাত লেগে মারা যাওয়া পাখির আনুমানিক সংখ্যাটা মোটামুটি সঠিক। কারণ পরিবেশবিদরা কাচের জানালা বহুল ভবনগুলির আশেপাশে ঘুরে ঘুরে মৃত পাখিগুলি গুণে দেখতে পারেন। তবে ঠিক কতগুলি পাখি জানালার সাথে ধাক্কা খাওয়ার পরেও বেঁচে থাকে বা এই আঘাতের ফলে কিছুদিন পরে মারা যায় সেই হিসাব করাটা বেশ কঠিন।

জানালার আকার আকৃতি এই ঘটনাগুলির জন্যে অনেকাংশে দায়ী। বড় ভবনের বড় জানালায় ধাক্কা লেগে পাখিমৃত্যুর আশঙ্কা বেশি। একটি নির্দিষ্ট স্থানে ও সময়ে আবহাওয়া এবং পরিযানের ধরণ (মাইগ্রেশন প্যাটার্ন) কীভাবে এই ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে তা গবেষকেরা বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের এই গবেষণার উদ্দেশ্য হলো সমাজের মানুষকে এই বিষয়ে সচেতন করে তোলা যেন এই মৃত্যু হার কমিয়ে আনা যায়। জার্নাল অব অ্যাপ্লাইড ইকোলজি-তে প্রকাশিত এলমোরের সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, আবহাওয়া এবং পরিযায়ী পাখিদের সংখ্যা থেকে জানালায় আঘাত লাগার ঝুঁকি অনুমান করা যায়।

এটি খুবই প্রয়োজনীয় কারণ গবেষণায় দেখা গেছে যে আলো নিভিয়ে রাখলে পরিযায়ী পাখিদের রক্ষা করা যায়। কিন্তু বেশিরভাগ শহরই প্রতি রাতে পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যেতে চাইবে না। এলমোর’র মতে, কেউ যদি নিজের বিল্ডিংম্যানেজারকে বলে রাখে রাতে আলো বন্ধ করে রাখলে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক পাখিকে রক্ষা করা যাবে, তাহলে এই পদ্ধতিটা কার্যকর হতেও পারে। প্রতি রাতেই আলো নিভিয়ে না রেখে বছরের নির্দিষ্ট কিছুদিন আলো নিভিয়ে রাখলেই হবে।

গবেষকেরা যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেছেন যা পাখিরা কখন সবচেয়ে উঁচুতে উড়তে থাকবে তা নির্ধারণ করতে লোকজনকে সাহায্য করবে। এই যন্ত্র তৈরির উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন সঠিক সময়ে আলো নিভিয়ে পাখি মৃত্যুহার কমিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।

জানালায় ধাক্কা লেগে পাখি মৃত্যুর ঘটনা দিনের বেলায়ও ঘটতে পারে। এই ঘটনা সচরাচর ঘটে পাখিদের দৈনন্দিন কার্যকলাপের সময়, বিশেষ করে তাদের প্রজনন ঋতুতে। তবে, যাদের অ্যাপার্টমেন্ট ব্যালকনি বা বাইরের দিককার জানালা খোলা বা বন্ধ রাখার সুযোগ আছে তারা কাচ বিষয়ে পাখিদের সাবধান করতে পারেন।

এমন সবকিছুই যা বাইরে থেকে জানালাগুলিকে কঠিন বস্তু হিসেবে প্রতীয়মান করে তা সংঘর্ষের হার কমিয়ে আনবে। এমনকি ব্লাইন্ড বা পর্দা টানিয়ে রাখলেও কাজ হবে। সবগুলি জানালায় ব্লাইন্ড ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে, সেগুলিকে পুরোপুরি টেনে রাখতে হবে এমন নয়। আবার, বাজারে অনেক রকম স্টিকার কিনতে পাওয়া যায় যা জানালার বাইরের দিকে লাগিয়ে রাখা যেতে পারে। এই স্টিকারগুলির অনেক রকম আকৃতি রয়েছে, যেমন কোন কোনটা দেখতে পাখির মত। তবে আকৃতি এই ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়।

এলমোর এর মতে, কোথায় এবং কীভাবে স্টিকার লাগানো হচ্ছে সেটাই বেশি জরুরি। এমনভাবে এগুলি লাগাতে হবে যেন পাখিগুলি বুঝতে পারে যে এর মধ্য দিয়ে যাতায়াত করা যাবে না। পাখিদেরকে বাধা দেয়ার জন্য ব্লাইন্ড-স্ল্যাট এবং স্টিকারের মধ্যে সর্বোচ্চ ২ ইঞ্চি ফাঁক থাকতে হবে। এরচেয়ে কম ফাঁক থাকলে ছোট ছোট পাখিগুলি ভাবতে পারে যে তারা এই সরু ও খোলা পথ দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে। অনেক ছোট ছোট পাখি আছে যেগুলি খাদ্যের সন্ধানে গাছের ডালের মধ্যবর্তী অনেক সরু পথে ওড়াউড়ি করতে সক্ষম। তাই এরা জানালার ফাঁক দিয়েও উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

জানালায় আঘাত লেগেও বেঁচে যাওয়া পাখি উদ্ধার করলে দেখা যায় এরা ঘটনার আকস্মিকতায় একদম হতবুদ্ধি হয়ে গেছে। এলমোর এই ক্ষেত্রে পরামর্শ দিয়েছেন এদেরকে ছোট ও অন্ধকার বাক্সে রাখার জন্যে, যেন আরো ওড়াউড়ি করতে গিয়ে নিজেকে আরো আঘাত দিতে না পারে। সুস্থ হয়ে ওঠার জন্যে পাখিগুলির কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। তাই সবচেয়ে ভালো হয় কাছাকাছি কোনো বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্র থাকলে সেখানে যোগাযোগ করা। এদেরকে অবশ্যই এমন কোথাও রাখা যাবে না যেখানে বিড়াল বা অন্য কোনো শিকারির আনাগোনা আছে।

পাখি ও জানালার মধ্যকার সংঘর্ষ। এর কারণ ও ফলাফল বিষয়ক বিস্তারিত গবেষণা নিয়ে পর্যবেক্ষকরা বেশ আশাবাদী। গবেষকেরা এখন জানেন কেন, কীভাবে এবং কখন এই সংঘর্ষ ঘটে। তাদের মতে এখন আমাদের যেতে হবে পরবর্তী ধাপে, অর্থাৎ এই সংঘর্ষ প্রতিরোধ করা এবং পাখীদের সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা নেয়া।