জার্মানিতে করোনায় মৃত্যুহার এত কম কেন?

ইতিহাসের অন্যান্য মহামারির তুলনায় করোনাভাইরাসের অবস্থান কেমন তা বোঝার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক হলো মৃত্যুহার। ২৭ মার্চ, ২০২০ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্তদের শতকরা প্রায় ৫ ভাগ মানুষ মারা যাচ্ছেন। প্রতিদিনই আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে মৃত্যুর ঘটনাও। তবে দেশভেদে এসব পরিমাণে অনেক তারতম্য আছে। আর এই তারতম্য বেশ কনফিউজিং।

কারণ মৃত্যুহারের দিক থেকে দেখা হলে তিনটা দেশ বাকিদের তুলনায় খুব ভালো অবস্থানে আছে— দক্ষিণ কোরিয়া, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানি। এসব দেশে মৃত্যুহার অনেক কম। দক্ষিণ কোরিয়ায় যেহেতু তুলনামূলকভাবে কমবয়সীরা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি, কাজেই সেখানে মৃত্যুহার কম থাকাটা তরুণদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণে স্বাভাবিক। আর সুইজারল্যান্ডের করোনায় আক্রান্ত হবার ঘটনা এখনো যথেষ্ট পরিমাণে হয়ে ওঠেনি বলে সেখান থেকে এই মুহূর্তে প্রকৃত ধারণা পাওয়া কঠিন।

কিন্তু জার্মানিতে মধ্যবয়সীরা যেমন আক্রান্ত হচ্ছেন, তেমনি কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হবার আপাত প্রতিষ্ঠিত প্যাটার্ন অনুযায়ী বয়স্কদের মধ্যেও এই রোগ ধরা পড়ছে। অথচ জার্মানিতে আক্রান্তদের মোট সংখ্যা ফ্রান্স, স্পেন এবং অ্যামেরিকার কাছাকাছি হওয়ার পরও তাদের মৃত্যুহার ০.৪%।

করোনায় মরণ ঠেকাতে জার্মানরা এত সফল হচ্ছে কীভাবে তাহলে?

স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে মতামত দিচ্ছেন। কেউ কেউ মনে করেন এই তফাৎ সাময়িক। কারণ দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানি শুরু থেকেই প্রচণ্ড আগ্রাসীভাবে তাদের জনগণের করোনা টেস্ট করছে। এত সতর্কতামূলক টেস্টিং পলিসির কারণে এমনও হচ্ছে যে, যাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো সিরিয়াস অবস্থা হবার সম্ভাবনা নাই, তাদেরকেও শুধুমাত্র করোনা টেস্ট পজিটিভ এসেছে বলেই রোগী ধরা হচ্ছে। যা অন্যান্য বেশিরভাগ দেশেই হচ্ছে না। ফলে মোটামুটি সুস্থ মানুষরাও মোট আক্রান্তের তালিকায় চলে আসছে, আর তালিকা বড় হচ্ছে। কাজেই এই লম্বা তালিকার হিসাবে মৃতদের সংখ্যাও হচ্ছে কম।

তবে জার্মান কর্তৃপক্ষ মনে করছে, সামনের সপ্তাহগুলিতে হয়তো গুরুতর রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাবে, ফলে মৃত্যুর ঘটনাও হয়তো বাড়বে।

আবার অনেকের ধারণা এমন—জার্মানিতে যারা প্রথমের দিকে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছিলেন, তারা বসন্তের ছুটির শুরুতে স্কি করার জন্য এমন কিছু দেশে গিয়েছিলেন যেখানে পরবর্তীতে করোনার প্রকোপ বেশি দেখা যায়। ফলে সমীকরণটা এরকম দাঁড়াচ্ছে যে, জার্মানিতে যারা শুরুর দিকে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তারা বয়স্ক হলেও এতটা বয়স্ক না যে স্কি করার সক্ষমতা তাদের নাই। এরকম ‘মধ্যবয়স্ক’রাই সেখানে করোনায় আক্রান্ত হন বেশি, ফলে অন্যান্য বার্ধক্যজনিত সমস্যা তাদের তেমন একটা ছিল না যা সহজে মরণ ডেকে আনতে পারে।

এসব ছাড়াও যেকোনো ধরনের ইনফেকশনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মৃত্যুহারের বিস্তৃত পার্থক্য বোঝার জন্য চারটা বেসিক দিক বিবেচনা করা যায়:

১. অন্যান্য দেশের ভাইরাসের সাথে আলোচ্য দেশের ভাইরাসে কি কোনো পার্থক্য আছে?

—না।

২.  কিছু দেশ কি অন্যান্য দেশের চাইতে দ্রুত রোগনির্ণয় করে ফেলছে?

—হ্যাঁ, যেমনটা আগে বলা হলো, জার্মানি আর দক্ষিণ কোরিয়া তাদের অতিসতর্কতামূলক অ্যাপ্রোচের কারণে তেমন গুরুতর উপসর্গ ছাড়াও করোনা টেস্টে পজিটিভ হলেই আক্রান্তদের তালিকাভুক্ত করছে।

৩.  এক দেশের আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে অন্য দেশের আক্রান্তদের পার্থক্য আছে কি?

—আছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় তরুণরা বেশি আক্রান্ত হয়েছেন, ইতালিতে বয়স্করা। তাদের মহামারির বৈশিষ্ট্য এদিক থেকে ইউনিক। তাছাড়া ইরানের অবস্থা ঠিকমতো জানাই যায় নাই এখনো। এমনিতে যেসব দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে—যেমন চায়না থেকে শুরু করে অ্যামেরিকার নিউ ইয়র্ক—মোটামুটি সব জায়গাতেই আক্রান্তদের বৈশিষ্ট্য একরকম: মহিলাদের চেয়ে পুরুষ রোগী বেশি, বয়স্কদের আক্রান্ত হবার নমুনা বেশি, ধূমপায়ীরা বেশি ঝুঁকিতে আছেন—ইত্যাদি।

৪. স্বাস্থ্যসেবা সিস্টেমের দিক দিয়ে দেশগুলির মধ্যে পার্থক্য আছে কি?

—অবশ্যই আছে। তবে পার্থক্যগুলি ঠিক কোন কোন জায়গায়, সেটা একেবারে কাছ থেকে না দেখলে বোঝা সম্ভব না। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞরা সাধারণত কোনো দেশ, প্রদেশ বা হাসপাতালের অবকাঠামোগত পদ্ধতি দেখে এ ব্যাপারে মোটামুটি নির্ভরযোগ্য ধারণা পেতে পারেন।

এক্ষেত্রে ডাক্তারের সংখ্যা বা হাসপাতালে বেডের পরিমাণের চাইতেও আরেকটা জিনিসের ভূমিকা থাকতে পারে: কোনো দেশের সার্বিক জনসংখ্যায় প্রতি এক হাজার জনে মোট নার্সের সংখ্যা।

যে নয়টি দেশে করোনা আক্রান্তদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, সেগুলির মধ্যে ওই দেশেই মৃত্যুহার সবচেয়ে কম যেখানে কর্মরত নার্সের হার বেশি। জার্মানিতে প্রতি ১,০০০ জনে ১৩.২ জন নার্স কাজ করেন। এমনিতেই অবশ্য বাদবাকি দেশের হিসাবে উত্তর ইউরোপে নার্সরা বেশি আছেন।

হতে পারে কোনো রোগতত্ত্ববিদ ঘরে বসে এই হিসাব করেছেন, কিন্তু তারপরও নার্সের আধিক্যের অন্তত দুইটা ইতিবাচক দিক আছে—এক, হাসপাতাল ও বিশেষ করে আইসিইউ সাপোর্টের মেরুদণ্ড ধরা হয় নার্সদেরকে। ফলে রোগীদের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও মৃত্যুর আশঙ্কা দূরীকরণে তাদের ভূমিকা প্রচণ্ড গুরুত্ব রাখে।

দুই, যে দেশ বা যে হাসপাতাল নার্সদের নিয়োগ দেওয়াকে প্রাধান্য দেয়, তারা নিশ্চয়ই এমন আরো ক্ষেত্রকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে যেসব বিষয় স্বাস্থ্যসেবার মূল্যায়নে হয়ত আমাদের চোখে পড়ে না, কিন্তু মহামারির মুখে টিকে থাকার ক্ষেত্রে নানাভাবে সাহায্য করে।

আরো পড়ুন: কভিড-১৯ ভ্যাকসিন আবিষ্কারে সুপার কম্পিউটার ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছেন গবেষকরা

করোনা ভাইরাসের মহামারির কারণে যে আমরা পৃথিবীর একেক দেশের স্বাস্থ্যসেবার উপেক্ষিত নানা দিক সম্বন্ধে নতুন করে বিবেচনা করার সুযোগ পাব তাতে সন্দেহ নাই। কারণ করোনা আমাদেরকে স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন দুর্বলতা ও শক্তির ব্যাপারে অবগত করে দিচ্ছে, যা আমরা এই মহামারি থেমে যাওয়ার পর পজিটিভলি কাজে লাগাতে পারব।

সূত্র. সিএনএন