ডাচ লাইফস্টাইল টেকনিক নিকসেন—কিছুই না করবেন যেভাবে

নিকসেন বিষয়ে ওলগা মেকিং এর বই আসবে ২০২১ এর জানুয়ারির ১২ তারিখে

নর্ডিক দেশগুলি অনেক কিছুতেই বিশ্বের অন্য দেশ থেকে আলাদা। তাদের হেলথ কেয়ার সিস্টেম, এডুকেশন সিস্টেম, সোশাল সিকিউরিটি পলিসি সবকিছু থেকেই বাকি দেশের শেখার অনেক কিছু আছে।

এখন আবার তারা দুনিয়াকে শেখাচ্ছে নতুন সব লাইফস্টাইল কনসেপ্ট। যেমন ডেনিশ কনসেপ্ট হিউগো (Hygge)। এটা এমন একটা লাইফস্টাইল যেটা ডেনিশদের শীতের দীর্ঘ সময়ে ডিপ্রেশনের হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করে।

আবার আছে সুইডিশ কনসেপ্ট লাগোম (Lagom)। এখানে বলা হয় ব্যালান্সড লাইফস্টাইল এর কথা। যার মূল কথা হচ্ছে পরিবেশের ভালোর জন্য ভোগবিলাস কমিয়ে আমাদের মডারেট লাইফস্টাইল ফলো করা উচিত।


আমিন আল রাজী


এরকম আরেকটা লাইফস্টাইল কনসেপ্ট হচ্ছে নিকসেন (Niksen)। যাদের ক্যারিয়ার অনেক স্ট্রেসফুল, অতিরিক্ত কাজ করতে করতে বার্নড আউট হয়ে যাচ্ছে, এনজাইটি ডিসঅর্ডার এর মতো মানসিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে, তাদের জন্য নিকসেন বেশ কাজে আসতে পারে।

২.
নিকসেন স্ট্রেস কমানোর ডাচ টেকনিক। টেকনিকটা হচ্ছে কিছুই না! লিটারারিই কিছু না, মানে কিছুই না করা।

এই কনসেপ্ট বিশ্বে পরিচিত করেন লেখক ও সাংবাদিক ওলগা মেকিং (Olga Mecking)। নিকসেন এর ওপর লেখা তার একটা বই আসবে ২০২১ এর জানুয়ারির ১২ তারিখে, যেটা নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। নিকসেনের ব্যাপারে বলতে গিয়ে মেকিং তার লেখাতে বার বার ক্যারোলিক হ্যামিং এর রেফারেন্স দিয়েছেন।

হ্যামিং একজন স্ট্রেস বা বার্নআউট কোচ। নেদারল্যান্ডে তার একটি প্রতিষ্ঠান আছে ‘সিএসআর সেন্ট্রাম’ নামে, যাদের কাজ স্ট্রেসে থাকা মানুষদের লাইফস্টাইল পরিবর্তনে সাহায্য করা।

কোচ ক্যারোলিন হ্যামিং নিকসেন এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, “উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো কাজ করাই হচ্ছে নিকসেন। বিষয়টা এতটাই সোজা। যেমন এটা হতে পারে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকা, আকাশে তারা দেখা, আড্ডা মারা, গান শোনা।”

ক্যারোলিন হ্যামিং

প্রশ্ন আসতে পারে আড্ডা মারা বা গান শোনা কীভাবে কাজ না করা হয়! এটা বুঝতে হলে আমাদের ডাচদের লাইফস্টাইল ও কালচার বুঝতে হবে। যদিও ডাচদের জীবনধারা আমেরিকানদের মত সুপার ফাস্ট না, তবুও জাতি হিসেবে তাদের অলস বলা যাবে না। অলস বসে থাকাকে ডাচ কালচারে খুবই অপমানের চোখে দেখা হয়। তাদের এমনকি প্রবাদও আছে এ নিয়ে। “Niksen is niks” যার অর্থ  “Doing nothing is good for nothing”। বাংলায় বললে—কিছু না করা কাজের কিছু না। আরেকটা প্রবাদ আছে “Doe Gewoon Normal”—অর্থাৎ নরমাল থাকো। নরমাল থাকা মানে, কাজের মধ্যে থাকাটাই তাদের কাছে নরমাল থাকা।

এসব কারণে শিশুকাল থেকেই ডাচরা শেখে সবসময় কাজের মধ্যে থাকতে। তাদের কালচারে অলসদের লজ্জা দেয়া হয়। বিষয়টা তাদের মাথায় এমনভাবে ঢুকে যায় যে তারা আর বিশ্বাস করতে পারে না, কিছু না করে বসে বসে রিল্যাক্স করাও সম্ভব।

তাই অলস সময়ে ডাচ লোকেরা প্রেশার ফিল করে কিছু না কিছু প্রোডাক্টিভ কাজ করার জন্য। অবসরে তারা সাইকেল চালায়, জগিং করে বা বন্ধুদের বাসায় যায়। খেয়াল করবেন হ্যামিং কিন্ত এগুলিকে ‘নিকসেন’ বলছেন না।

‘নিকসেন’ হলো সব সময় প্রোডাক্টিভ থাকতে চাওয়ার পেরেশানি থেকে নিজেকে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি দেয়া। বলা যায় নিকসেন একপ্রকার উদ্দেশ্যশূন্যতা। ওলগা মেকিং যেমন কাব্যিক ভাষায় এটাকে বলেন, “নিকসেন হলো কিছু না করার একটা বর্ণাঢ্য ব্যাপার।”

শুনতে যত সোজা মনে হচ্ছে আসলে কিন্ত ওই সব দেশের কালচারে এটা এত সোজা বিষয় না। যেমন আমেরিকার কথা আপনি ধরেন। যেখানে Hustle তাদের কালচারের বড় অংশ। তারা বলে Hustle Harder। আমেরিকায় কেউ যদি উইকেন্ডেও অলস সময় কাটায়, অন্যরা তাকে Uncool এর তকমা দিয়ে দেয়।

কোচ ক্যারোলিন হ্যামিং বিষয়টা ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমাদের ভেতরের মানুষটা সব সময় তাড়না দিতে থাকে—কিছু একটা করো, নিজেকে ব্যস্ত রাখো, একটা কাজের কাজ করো। যেটা করলে তোমার উপকার হয়, তোমার ফ্যামিলি, তোমার চারপাশের সবার উপকার হয়। এই তাড়না গ্রাহ্য না করে নিকসেন মেনে চলা বেশ কঠিন কাজ।”

অনেকে ড্যানিশদের হিউগো লাইফস্টাইলের সাথে নিকসেন এর মিল খুঁজে পান। ওলগা মেকিং অবশ্য ভিন্ন মত দেন। তার মতে ড্যানিশদের হিউগো মেন্টালিটির প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে কমফোর্ট বা আরাম। এর কারণ, ডেনমার্কে শীতকাল অনেক লম্বা হয়। শীতের এই লম্বা সময়ে মানুষের সামাজিকতা কমে যায়। তাদের বেশির ভাগ সময় ইনডোরে থাকতে হয়। যেটা অনেকের মধ্যে নেগেটিভ মুড তৈরি করে। এই নেগেটিভিটি কাটাতে হিউগো লাইফস্টাইল মানুষকে সাহায্য করে।

হিউগোতে ড্যানিশরা আসলে কী করে? তারা ঘর এমনভাবে সাজায় যাতে ফাঁকা স্পেস কম থাকে। ফাঁকা স্পেস মানে শূন্যতা, যেটা মন খারাপ করে দিতে পারে। ছোট ঘর, অনেক আসবাব দিয়ে গুছানো, আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা আছে—এভাবে সাজানো হয় হিউগো স্টাইলের ঘর।

হিউগো খাবারে থাকে হট চকোলেট, চকোলেট কুকিজ, গরম পরিজ। মানে কোজি (Cozy), আরাম আরাম একটা ব্যাপার আনার চেষ্টা করা হয় লাইফস্টাইলে। নরম কাউচে বসে কম্বল মুড়ি দিয়ে হাতে হট চকলেটের মগ নিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া—এক কথায় এটাই হচ্ছে হিউগো।

মেকিং বলেন, “আমার কাছে হিউগো কমফোর্টিং লাগলেও এটাতে অনেক সময় ব্যয় হয়। ধরুন আপনাকে উষ্ণ আলোর পরিবেশ তৈরি করতে অনেক মোমবাতি জ্বালাতে হবে, তারপর সবার জন্য কম্বলের ব্যবস্থা করতে হবে, ঘরে পরার জন্য আরামদায়ক জামাকাপড় লাগবে। এইসব আয়োজন করে তারপর আপনি বন্ধুদের সাথে হিউগো সময় কাটাতে পারবেন। এর চেয়ে নিকসেন সহজ। এত সব প্রিপারেশনের দরকার নেই, নিজের সাথে নিজে সময় কাটানো, আমার মত ইন্ট্রোভার্ট মানুষের সাথে নিকসেন বেশি ভালো যায়।”

এ কারণেই নিকসেনের সাথে মাইন্ডফুল থাকার সম্পর্ক দেখেন কেউ কেউ। একা একা নিজের সাথে থাকা, মনকে চিন্তাহীন করে ভাসতে দেয়া যেগুলি মাইন্ডফুলনেসের মূল কথা, নিকসেনের বেলায়ও তাই। তবে মাইন্ডফুল থাকা যেমন একটা প্র্যাকটিসের ব্যাপার, নিকসেন তেমন না। নিকসেন হচ্ছে গতিময় জীবনকে ক্ষণিকের জন্য বিরতি দেয়া, একটা পজ বাটন।

নিকসেন হচ্ছে গতিময় জীবনকে ক্ষণিকের বিরতি দেয়া, একটা পজ বাটন।

নিকসেনের সময় যা ইচ্ছা ভাবুন, যা ইচ্ছা করুন। তা কাজের কিছু হতে হবে না। এমনকি এই যে সময় ব্যয় করলেন এজন্য নিজের উপর কোনো চাপ দেয়া যাবে না, দোষ দেয়া যাবে না। যেমন কেউ যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করে এই উইকেন্ড কী করে কাটালেন? বলুন, কিছুই করি নি। যখন সংকোচ ছাড়া এভাবে বলতে পারবেন, তখন নিকসেনের মূলভাবটা আপনি ধরতে পারবেন। কোচ হ্যামিং যেমনটা বলেছেন, “নিজেকে শ্রান্তি দেয়া, ক্লান্ত মনকে শান্ত করা, জেগে জেগে ঘুমোনোর জন্যে কিছু সময়—এটাই নিকসেন।”

৩.
কিছু না করে অলসতা করার উপকারি দিকের কথা যে কেবল ডাচরাই বলে তা না, অনেক কালচারেই এর কথা বলা আছে। যেমন ইতালিতে একটা প্রবাদ আছে, “Dolce far niente”—ইংলিশে যার অর্থ “Sweetness of Doing Nothing” (কিছু না করার মিষ্টতা)। বলা হয় ক্লান্ত অবসাদ অবস্থায় কাজ করার চেয়ে ব্রেক নিয়ে কাজ শুরু করলে প্রোডাক্টিভিটি বাড়ে।

ড. স্যান্ডি মান

২০১২ সালে ইউনিভার্সিটি অফ সেন্ট্রাল ল্যানকাশায়ারের রিসার্চার স্যান্ডি মান তার রিসার্চে দেখান, বোরডম-এ থাকা অবস্থায় মানুষের স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ডে-ড্রিমিং হয়। এইসব আকাশ-কুসুম ভাবনা থেকে অনেক ক্রিয়েটিভ আইডিয়া বের হয়। আবার অনেক প্রবলেমের সমাধানও বের হয়ে আসে। ড. স্যান্ডির মতে, “যখন আপনি একই চিন্তার মধ্যে আটকে যান, সমাধান পাওয়ার জন্য তখন বিষটিকে আপনার অন্য দৃষ্টিতে দেখতে হবে।” নিকসেন ঠিক সেই সুযোগটাই করে দেয়।

আবার বার্ট্রান্ড রাসেলের মত দার্শনিকরা বলেন অলসতা বা বোরডম-এ থাকার পর মানুষের মধ্যে ক্রিয়েটিভিটির স্ফূরণ দেখা দেয়। যেটা ওলগা মেকিং-এর ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। তিনি ভালো কিছু গল্পের আইডিয়া পেয়েছেন এই নিকসেনের সময়ে। তিনি বলেন, নিকসেনের মধ্যে কিছু ইউরেকা মোমেন্ট আসে, যখন জীবনের কোনো গূঢ় একটা ব্যাপারে আপনার উপলব্ধি তৈরি হবে। যেটা পরে ক্রিয়েটিভ কাজে আপনাকে সাহায্য করবে।

নিকসেন লাইফস্টাইল আইডিয়া হিসাবে নতুন হতে পারে, তবে বিষয়টা আমাদের চারপাশে সব সময়ই ছিল। তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হ্যামিং প্রকৃতির উদাহরণ দেন—“প্রকৃতির দিকে তাকান, জীবজন্তুদের দেখুন, তারা দিনের তিন ভাগের দুই ভাগ সময় কিছুই করে না। এদিকে ওদিক ঘুরে বেড়ায়, এটা সেটা দেখে, হাই তোলে আর এর মধ্যে যদি কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা হয় তাহলে সেটা খায়। প্রকৃতিতে নিকসেন একটা সাধারণ বিষয়।”

ডোরিন ডজেন-ম্যাগি

নিকসেন আয়ত্তে আনা যদিও সময়ের ব্যাপার। নতুন কিছু শিখতে ধৈর্য তো লাগেই। যেমন ব্যায়ামের কথাই ধরুন। দীর্ঘদিন যদি ধৈর্য নিয়ে লেগে না থাকেন তাহলে সুফল পাবেন না। নিকসেনের ব্যাপারটাও তেমন। তবে এজন্য আপনার কিছু পরিবর্তন আনতে হতে পারে লাইফস্টাইলে। যেমন নিকসেনের সময়ে ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস দূরে রাখা, ঘরের সাজসজ্জায় কিছুটা পরিবর্তন আনা। যেমন, জানালার পাশে একটা আরামদায়ক চেয়ার রাখলেন, এরকম খুঁটিনাটি।

অনেকে বাসা থেকে বেরিয়ে পার্কে যেতে পছন্দ করে নিকসেন করতে। কেউ আবার স্পা করেন। এমনকি বোরডম পার্টিরও আয়োজন করেন অনেকে। যেখানে হোস্ট তার বন্ধুদেরকে দাওয়াত করে ডেকে এনে সবাই মিলে একসাথে বোর হয়!

সাইকোলজিস্ট ডোরিন ডজেন-ম্যাগি নিকসেনকে তুলনা করেন এমন গাড়ির সাথে যে গাড়ির ইঞ্জিন চলছে কিন্ত কোথাও যাচ্ছে না। কিছু সময়ের জন্য এমন গাড়িতে চড়লে পরে অনেক দূরে যাওয়ার জন্য আপনার কিছুটা ফুয়েল বেচে যাবে নিশ্চয়ই।

মূল লেখা. এলিসিয়া অ্যাডামচেক (Alicia Adamczyk)
Woolly Magazine ও The New York Times অবলম্বনে