ডোপামিন যেভাবে মস্তিষ্কের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে

বিশেষ ধরনের এমআরআই সেন্সরের মাধ্যমে মস্তিষ্কের নিউরাল অ্যাক্টিভিটির উপর নিউরোট্রান্সমিটারের প্রভাব দেখা গেছে

এমআইটি’র কয়েকজন স্নায়ুবিজ্ঞানী ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং (এমআরআই) সেন্স ব্যবহার করে আবিষ্কার করেছেন মস্তিষ্কের গভীর থেকে নিঃসৃত মস্তিষ্কের নিকট ও দূরবর্তী নানা অংশে ডোপামিন কীভাবে কাজ করে।

ডোপামিন মস্তিষ্কে বিভিন্ন রকমের ভূমিকা পালন করে। বিশেষত চলাফেরা, মোটিভেশন এবং রিইনফোর্সমেন্ট অব বিহেভিয়রের এর ক্ষেত্রে। তবে, ডোপামিন পরিমাণে বেশি ক্ষরণ হলে মস্তিষ্কের স্নায়বিক কার্যকলাপ কীভাবে প্রভাবিত হয় তা এখনো পরিষ্কারভাবে জানা যায়নি। নতুন কলাকৌশল ব্যবহার করে এমআইটির স্নায়ুবিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মোটর কর্টেক্সসহ মস্তিষ্কের কর্টেক্সের দুটি অংশকে ডোপামিন বিশেষভাবে প্রভাবিত করে।


আ্যন ট্র্যাফটন
এমআইটি নিউজ, ১ এপ্রিল ২০২০


এমআইটি’র বায়োলজিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রফেসর, ‘ব্রেইন অ্যান্ড কগনিটিভ সায়েন্স’ ও নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রফেসর আ্যলান জেসানফ বলেন, ডোপামিন নিঃসরিত হওয়ার সাথে সাথে কোষীয় পর্যায়ে কী কী ঘটে তা নিয়ে অনেক কাজ হয়েছে। কিন্তু, এখানে আমরা যেটা করছি মস্তিষ্কজুড়ে আরো বিস্তৃত পরিসরে ডোপামিন আরো কী করছে তা দেখার চেষ্টা করছি। অধ্যাপক হওয়ার পাশাপাশি, জেসানফ এমআইটি’র ম্যাকগভার্ন ইন্সটিটিউট ফর ব্রেইন রিসার্চের একজন এক্সিকিউটিভ সদস্য এবং এই গবেষণার সিনিয়র লেখক।

এমআইটির স্নায়ুবিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মোটর কর্টেক্স ছাড়াও মস্তিষ্কের দূরবর্তী যে অংশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা হলো—ইনসুলার কর্টেক্স। মস্তিষ্কের এই অংশটি শরীরের অভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ রাখা, তাছাড়াও শারীরিক ও মানসিক অবস্থা সংক্রান্ত কগনিটিভ ফাংশনের জন্যে দায়ী। এমআইটি থেকে পোস্ট ডক্টোরাল ন্যান লি এই রিসার্চের মূল লেখকের দায়িত্ব পালন করেন। গবেষণাটি নিয়ে ১ এপ্রিল ২০২০ এ ‘নেচার’ ম্যাগাজিনে একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। 

ডোপামিনের আদ্যোপান্ত
অন্যান্য নিউরোট্রান্সমিটারের মত ডোপামিনও, কিছুদূর পর পর একটা নিউরন থেকে আরেকটা নিউরনে সংযোগ ঘটাতে সাহায্য করে। আমাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন ধরনের নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ যেমন পারকিনসন ডিজিস বা হাতকাঁপা রোগ, কিংবা মানসিক প্রণোদনা জোগানো বা কোনো কিছুতে আসক্তি তৈরি করা ইত্যাদির পিছনে ডোপামিন মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তাই স্নায়ুবিজ্ঞানীদের কাছে ডোপামিন দারুণ আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ ডোপামিনই আমাদের মধ্য মস্তিষ্কে উৎপন্ন হয়। মধ্য মস্তিষ্কের যে নিউরনগুলি স্ট্রায়েইটাম এর সাথে যুক্ত থাকে সেগুলি থেকেই নিঃসৃত হয় ডোপামিন।

“আমাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন ধরনের নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ যেমন পারকিনসন ডিজিস বা হাতকাঁপা রোগ, কিংবা মানসিক প্রণোদনা জোগানো বা কোনো কিছুতে আসক্তি তৈরি করা ইত্যাদির পিছনে ডোপামিন মুখ্য ভূমিকা পালন করে।”

নিউরোট্রান্সমিটারের কারণে মস্তিষ্কের ভেতরে হওয়া সকল আণবিক ক্রিয়াকলাপ পর্যবেক্ষণের জন্য বহু বছর ধরে জেসানফ তার গবেষণাগারে কিছু টুল তৈরির চেষ্টা করছিলেন। আণবিক পর্যায়ে বিদ্যমান কৌশলগুলিই দেখাতে পারে ডোপামিন প্রতিটা কোষকে কীভাবে প্রভাবিত করে। এবং সমগ্রভাবে পুরো মস্তিষ্কে, ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং (এফএমআরআই) দেখাতে পারে ব্রেইনের কোনো একটা নির্দিষ্ট অংশ কতটুকু সক্রিয় আছে। তবে একক কোষের কার্যক্রমের সাথে সম্পূর্ণ মস্তিষ্কের কার্যপদ্ধতি কীভাবে জড়িয়ে আছে তার উত্তর খুঁজে বের করাটা স্নায়ুবিজ্ঞানীদের জন্য এখনো একটা বড় চ্যালেন্জ।

জেসানফ বলেন, পর্যাপ্ত সরঞ্জামের অভাবে ব্রেইনের নিউরোকেমিক্যাল এবং ডোপামিনার্জিক ফাংশনগুলি নিয়ে খুব কমই গবেষণা হয়েছে, এই ঘাটতিটা আমরা পূরণের চেষ্টা করছি।

প্রায় ১০ বছর আগে তার ল্যাব এমআরআই সেন্সর আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। এটা এমন একটা সেন্সর যাতে ডোপামিন বাইন্ড করার জন্য উপযুক্ত ম্যাগনেটিক প্রোটিন আছে। ডোপামিন যখন এই ম্যাগনেটিক প্রোটিনের সাথে যুক্ত হয় তখন আশেপাশের টিস্যুর সাথে চৌম্বকীয় মিথষ্ক্রিয়া দুর্বল হওয়া শুরু করে এবং এম আর আই সিগনালও ক্ষীণ হয়ে আসতে থাকে। মস্তিষ্কের কোন জায়গায় ডোপামিনের লেভেল কেমন রিসার্চাররা তা এই পদ্ধতিতে এখন সহজেই বুঝতে পারেন।

আরো পড়ুন: বানরদের আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকায় যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল অন্তত দুইবার

লি এবং জেসানফ তাদের নতুন গবেষণায় স্ট্রায়েইটামে নিঃসরিত ডোপামিন কীভাবে নিউরাল ফাংশন, মস্তিষ্কের ওই অঞ্চলসহ অন্যান্য অঞ্চলকে কীভাবে প্রভাবিত করে তা বিশ্লেষণ করার জন্যে প্রস্তুত। প্রথমে তারা স্ট্রায়েইটামে ডোপামিন সেন্সর ইনজেক্ট করেন। (স্ট্রায়েইটামে হল মস্তিষ্কের গভীরে থাকা একটা অংশ যা চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।) তারপর তারা বৈদ্যুতিকভাবে মস্তিষ্কের ল্যাটারাল হাইপোথ্যালামাস নামের একটি অঞ্চলকে উদ্দীপিত করেন। আচরণগত পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে এবং মস্তিষ্ককে ডোপামিন তৈরিতে সাহায্য করার ক্ষেত্রে এটা একটা প্রচলিত এক্সপেরিমেন্টাল কৌশল।

তারপর রিসার্চাররা তাদের ডোপামিন সেন্সরের সাহায্যে স্ট্রায়েইটামের ডোপামিন লেভেল মেপে দেখেন। তাছাড়াও, স্ট্রায়েইটামের প্রতিটা অংশের নিউরাল আ্যাক্টিভিটি পরিমাপ করতে তারা একটা ট্রেডিশনাল এফএমআরআইও করেন। তারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন, উচ্চ ঘনত্বের ডোপামিন নিউরনগুলিকে অ্যাক্টিভ করেনি। অর্থাৎ, উচ্চ মাত্রার ডোপামিন নিউরনগুলিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য সক্রিয় করে তুলতে পারেনি।

“তারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন, উচ্চ ঘনত্বের ডোপামিন নিউরনগুলিকে অ্যাক্টিভ করেনি। অর্থাৎ, উচ্চ মাত্রার ডোপামিন নিউরনগুলিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য সক্রিয় করে তুলতে পারেনি।”

জেসাফন বলেন, যখন ডোপামিন নিঃসরিত হলো, অধিক সময় ধরে কাজকর্ম দেখা যাচ্ছিল। যেমন, রিওয়ার্ডের (আমাদের অনুপ্রেরণা দেয় এমন যেকোনো কিছুই রিওয়ার্ড। যার কারণে আমরা কোনো কিছু শিখি, বা আনন্দ প্রকাশ করি।) প্রতি অধিক সময় ধরে প্রতিক্রিয়া জানানো। এটা কোনোভাবে ডোপামিন কীভাবে আমাদের নতুন কিছু শিখতে সাহায্য করে তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। যেটা তার মূল কাজগুলির একটা।

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবসমূহ
স্ট্রায়েইটামের নিঃসরিত ডোপামিন আ্যানালাইসিসের পরে, গবেষকরা এটাও নির্ধারণ করতে কাজে নেমে গেলেন যে ডোপামিন হয়ত মস্তিষ্কের আরো দূরবর্তী অংশগুলিকেও প্রভাবিত করে। এর জন্যে তারা মস্তিষ্কে ট্রেডিশনাল এফএমআরআই করেন, একই সঙ্গে স্ট্রায়েইটামে ডোপামিন নিঃসরণের ম্যাপিংও করেন। জেসানফ বলেন, কৌশলগুলি সব একসাথে ব্যবহার করে আমরা হয়ত এই ঘটনারগুলির কারণ এমনভাবে বের করতে পারব যা আগে কখনো করা হয়নি।

ডোপামিনের প্রতি সাড়া দেওয়ার কার্যক্রমে সবচেয়ে বড় তরঙ্গটি দেখা গেছে যেই অঞ্চলে তা হলো মোটর কর্টেক্স এবং ইনসুলার কর্টেক্স। অ্যাডিশনাল গবেষণাগুলিতেও যদি এই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, তথ্যগুলি মস্তিষ্কে ডোপামিনের প্রভাব কী গবেষকদের তা বুঝতে সাহায্য করবে। সঙ্গে মানুষের আসক্তি এবং শেখার ব্যাপারেও।

আরো পড়ুন: জিজেক এর নতুন বই ‘প্যানডেমিক’ এর সারাংশমূলক আলোচনা

জেসানফ বলেন, আমাদের পাওয়া ফলাফলগুলি আমাদেরকে বায়োমার্কারের (প্রাকৃতিকভাবে ঘটা অণু, জিন বা বৈশিষ্ট্য যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো প্যাথোলজিকাল বা শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, রোগ ইত্যাদি শনাক্ত করা যায়।) দিকে নিয়ে যেতে পারে যেটা এফএমআরআই ডেটাতে দেখা যাবে। এবং ডোপামিনার্জিক ফাংশনের এই কোরিলেটগুলি মানুষ এবং প্রাণিদের এফএমআরআই বিশ্লেষণে সাহায্য করবে।

এই রিসার্চটির ফান্ড দিয়েছে ন্যাশনাল ইন্সটিটিউটস অব হেলথ এবং পারকিনসন ডিসিজ ফাউন্ডেশনের স্ট্যানলি ফান রিসার্চ ফেলোশিপ।