তৈরি করা হলো সুপারসেন্টেনারিয়ান বা ১১০ ঊর্ধ্বদের কোষ থেকে উদ্ভূত স্টেম সেল

১১০ বছরের বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকা মানুষদের বলা হয় সুপারসেন্টেনারিয়ান। তাদের এই দীর্ঘায়ুর জন্যেই তারা কেবল অসাধারণ নন, তাদের অবিশ্বাস্যরকম ভাল স্বাস্থ্যের ব্যাপারটাও বেশ চমকপ্রদ। এরকম মানুষদের মাঝে কঠিন সব রোগব্যাধি যেমন আলঝেইমার, হার্ট ডিজিজ, ক্যানসার এসবের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য বিশেষ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে যা কোনো কোনো শতবর্ষী ব্যক্তির মাঝেও থাকে না। কেউ কেউ সুপারসেন্টেনারিয়ান হতে পারলেও সবার কেন এই ক্ষমতা নেই তা এখনো অজানা।

এই প্রথম বিজ্ঞানীরা ১১৪ বছরের একজন বৃদ্ধার শরীর থেকে একটা অ্যাডাল্ট সেল নিয়ে ইনডিউসড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল (আইপিএসসি) বা ভ্রুণীয় পর্যায়ের স্টেম সেলের মত পুনরায় প্রোগ্রাম করেছেন। স্ট্যানফোর্ড ব্যার্নহ্যাম প্রিবাইস এবং এইজ এক্স থেরাপিউটিক্স নামের জৈবপ্রযুক্তি সংস্থার বিজ্ঞানীদের কাজের অগ্রগতি গবেষকদের জন্য সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছিল। সুপারসেন্টেনারিয়ানরা কীভাবে এমন সুস্বাস্থ্য আর দীর্ঘায়ুর অধিকারী হন এ নিয়ে ধোয়াশা কাটানোর জন্যে গবেষকরা জোরালোভাবে গবেষণা চালান।

‘বায়োকেমিকাল ও বায়োফিজিক্স রিসার্চ কমিউনিকেশন’ নামের জার্নালে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। স্ট্যানফোর্ড বার্নহ্যাম প্রিবাইসে অবস্থিত ‘সেন্টার ফর স্টেম সেল অ্যান্ড রিজেনারেটিভ মেডিসিন’ গবেষণাগারের পরিচালক ও প্রভাষক এবং উদ্ভাবক ইভান ওয়াই স্নিডার (এমডি, পিএইচডি) বলেন যে, তারা একটা জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন। সেটা হল, বৃদ্ধ হয়ে যাওয়া কোষগুলি থেকে কি পুনরায় নতুন কোষ তৈরি করা সম্ভব? তিনি বলেন, এখন আমরা এমনটা করতে পারি। আমাদের কাছে উন্নত প্রযুক্তির এমন সব যন্ত্র আছে যা দিয়ে সেই জিনগুলি খুঁজে বের করা সম্ভব যারা বয়স ধরে রাখার জন্য দায়ী।

তারা একটা জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন। সেটা হল, বৃদ্ধ হয়ে যাওয়া কোষগুলি থেকে কি পুনরায় নতুন কোষ তৈরি করা সম্ভব?

এই গবেষণায় ৩ জন আলাদা ব্যক্তির শরীর থেকে কোষ সংগ্রহ করে রক্তকোষগুলি ইনডিউজড প্লুরিপোটেন্ট সেলে পুনরায় প্রোগ্রাম করা হয়। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ১১৪ বছর বয়সী বৃদ্ধ মহিলা, আরেকজন ৪৩ বছর বয়সী সুস্থ স্বাভাবিক ব্যক্তি। তৃতীয়জন ছিল ৮ বছর বয়সী প্রোজেরিয়া রোগে আক্রান্ত এক শিশু। এটা এমন একটা রোগ যার কারণে বৃদ্ধ না হলেও চেহারা বৃদ্ধদের মত দেখায়। পরবর্তীতে নতুনভাবে প্রোগ্রাম করা এই কোষগুলিকে মেসেনকাইমাল স্টেম সেলে রূপান্তর করা হয়। এটা এক ধরনের স্টেম সেল যা আমাদের শরীরের গাঠনিক বৃদ্ধি ঘটায় এমন টিস্যু—যেমন অস্থি, তরুণাস্থি এবং চর্বি—তৈরি ও মেরামত করে।

বৈজ্ঞানিকরা গবেষণা করে দেখেন, বাকি দুইজনের নমুনার চেয়ে সুপারসেনটেনারিয়ান নারীর নমুনা কোষ দ্রুত রূপান্তরিত হয়। এমনকি টেলোমিয়ারে থাকা ডিএনএ’র ওপরে সুরক্ষার জন্য যে টুপির মত গঠন থাকে সেটাও পুনর্নির্মিত হয়। এই ডিএনএ’র মাথার ওপরে থাকা ক্যাপ বা টুপির মত গঠনটি বয়সের সাথে সাথে সংকুচিত হয়। কিন্তু চমৎকার বিষয়, সুপারসেন্টেনারিয়ানদের ইনডিউজড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেলে থাকা টেলোমিয়ারগুলি একদম নবজাতকের কোষে থাকা টেলোমিয়ারের মত করে ফেলা গিয়েছিল।

তবে বাকি নমুনার তুলনায় এই পুনর্গঠনের কাজটি ঘন ঘন না হয়ে একটু ধীর প্রক্রিয়াতে ঘটে।

কোষগুলির বয়স অতিরিক্ত হওয়ায় এর কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা যায় যা কোষের পুনর্গঠনের জন্য অসুবিধাজনক ছিল। সূক্ষ্মভাবে কোষের রিসেটিং-এর জন্য এগুলি অতিক্রম করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইতিমধ্যে জটিল যান্ত্রিক অসুবিধা কাটিয়ে ওঠায় সুপারসেন্টেনারিয়ানদের দীর্ঘায়ুর পেছনের মূল কারণ বা ‘সিক্রেট সস’ বের করার জন্য বিশদ গবেষণা এখন শুরু করা যেতে পারে। যেমন সুস্থ ব্যক্তির ইনডিউজড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল, সুপারসেন্টেনারিয়ান এবং প্রোজেরিয়ায় আক্রান্ত শিশুটির স্টেম সেল থেকে সংগ্রহ করা পেশিকোষের তুলনা করে দেখা যেতে পারে যে সুপারসেন্টেনারিয়ানদের জিন বা মলিকিউলার প্রসেসে কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় কিনা। পরবর্তীতে এ থেকেই জানা যাবে, এমন কোনো ঔষধ তৈরি করা সম্ভব কিনা যা এই অনন্য বৈশিষ্ট্য ব্যাহত করবে বা সুপারসেন্টেনারিয়ানদের কোষে পাওয়া প্যাটার্নগুলি অনুকরণ করতে পারবে।

স্নিডার বলেন, সুপারসেন্টেনারিয়ানরা এত ধীরে কেন বৃদ্ধ হন, আমরা এমনভাবে এই প্রশ্নের উত্তর বের করেছি যেটা এর আগে কেউ কখনো দিতে পারেনি।

সূত্র. সায়েন্স বুলেটিন ডটঅর্গ