দুটি আলাদা ভাইরাস মিলেই হয়ত তৈরি হয়েছে করোনা—জিনোম অ্যানালিসিস এমন আভাসই দিচ্ছে

গত কয়েক সপ্তাহে Covid-19 সম্পর্কে অনেক তথ্যই জানা গেছে। যে ভাইরাসটির মাধ্যমে এটা মানব দেহে সংক্রমিত হচ্ছে তা হলো Sars-CoV-2।

এর মধ্যে ভাইরাসটি নিয়ে অনেক গুজবই ছড়িয়েছে। অনেক বৈজ্ঞানিক লেখালেখি হলেও এর উৎপত্তি নিয়ে অনেক তথ্য এখনো পরিষ্কার না। কোন প্রজাতির প্রাণিতে প্রথম এটা পাওয়া গিয়েছিল? বাদুড়, বনরুই নাকি অন্য কোনো বন্য প্রজাতির প্রাণিতে? কোন জায়গা থেকে ভাইরাসটা ছড়িয়েছে? কোনো গুহা, চায়নার হুবেই প্রদেশের কোনো জঙ্গল নাকি অন্য কোনো জায়গা থেকে?


আলেকসন্দর হাসানিন
দ্য কনভারসেশন, ১৯ মার্চ ২০২০


২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে, ৪১ জন আক্রান্ত মানুষের মধ্যে প্রথম ২১ জনকেই হসপিটালে ভর্তি করতে হয়েছিল। তারা প্রত্যেকেই হুবেই প্রদেশের উহান শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত একটি বাজারে গিয়েছিলেন। তবে, উহান হসপিটালের একটা গবেষণা বলে, প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তি ওই বাজারের আশপাশ দিয়েও যাননি।

পরবর্তীতে, Sars-CoV-2 ভাইরাসের জিনোমিক সিকোয়েন্সের ওপর ভিত্তি করে আণবিক মিউটেশনের হার বা ‘মলিউকিউলার ডেইট’ হিসাব করে দেখা গেছে, এর প্রথম প্রকাশ ঘটে নভেম্বর মাসে। এই সূত্র থেকেই Covid-19 এর মহামারি আকার নেওয়ার পিছনে বন্যপ্রানির সাথে কোনো যোগসূত্র আছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

 

জিনোমিক ডেটা

চাইনিজ গবেষকরা খুব দ্রুত Sars-CoV-2 ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স তৈরি করে ফেলেন। এই ভাইরাস ১৫টি জিন সংশ্লিষ্ট ৩০,০০০ বেজের সমন্বয়ে গঠিত একটি RNA অণু। এতে একটা S জিন আছে যা ভাইরাল এনভেলপের পৃষ্ঠে থাকা প্রোটিনের জন্য কোড করে। এটাকে ৩০,০০০ জিন সংশ্লিষ্ট ৩ বিলিয়ন বেজের সমন্বয়ে গঠিত ‘ডাবল হেলিক্স ডিএনএ’র গঠনের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

জিনোমিক গবেষণা থেকে আরো জানা গেছে, ভাইরাসটি বিটাকরোনাভাইরাস গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। যা SARS CoV ভাইরাসের সাথে অনেকাংশেই মিলে যায়। ২০০২ সালের নভেম্বরে চীনের গুয়ানহং প্রদেশে এই SARS-CoV ভাইরাসটির কারণে মহামারি আকারে তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত এক রোগের উদ্ভব হয়। যা পরবর্তীতে ২০০৩ সালে আরো ২৯টি দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

মোট ৮,০৯৮টি কেসে ৭৭৪ জনেরই মৃত্যু হয়েছিল। জানা যায়, রাইনোলোফাস গোত্রের বাদুড়ের (যারা মূলত গুহাবাসী প্রজাতি) মাধ্যমেই ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয় এবং পাম সিভেট (পাগুমা লারভাটা) নামের একটা ছোট্ট মাংসাশী প্রাণি মানুষ আর বাদুড়ের মধ্যবর্তী বাহক ছিল। তখন থেকেই বিটাকরোনাভাইরাস গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত আরো অনেক ভাইরাস আবিষ্কৃত হতে থাকে যাদের মূল বাহক ছিল বাদুড়।

তবে মানুষের মধ্যেও এদের দেখা পাওয়া যেত। উদাহরণস্বরূপ, চীনের উহান প্রদেশে পাওয়া RaTG13 ভাইরাসের কথা উল্লেখ করা যায়। যেটা রাইনোলোফাস গোত্রের বাদুড়ের শরীর থেকেই এসেছে। এই ভাইরাসটি SARS-CoV-2’র সাথে এতটাই সাদৃশ্যপূর্ণ যে এদের জিনোমিক সিকোয়েন্সে প্রায় ৯৬% মিল পাওয়া যায়। এ থেকে অনুমান করা যায় SARS-CoV এবং SARS-CoV-2 ভাইরাস দুটির বাহক রাইনোলোফাস গোত্রের বাদুড়।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে বাহক কী? বাহক হল এক বা একাধিক প্রজাতির প্রাণি যারা কোনো একটা ভাইরাসের প্রতি অতি সংবেদনশীল না হলেও অন্যদের মাঝে সেটা ছড়িয়ে দিতে সক্ষম। তারা নিজেরা আক্রান্ত না হলেও তাদের মাধ্যমে অন্য প্রাণি বা মানুষ সংক্রমিত হয়। ভাইরাস বহন করলেও শরীরের বিশেষ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে রোগের কোনো উপসর্গ তাদের মধ্যে দেখা যায় না।

 

রিকম্বিনেশন পদ্ধতি

২০২০ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি জানা যায়, প্যাঙ্গোলিন (বনরুই) নামের একটি প্রাণির শরীরে SARS-CoV-2 এর মতই একটি ভাইরাস পা্ওয়া গেছে। এর জিনোমিক সিকোয়েন্সে ৯৯% মিল দেখে ভাবা হয়েছিল যে শুধু বাদুড় নয়, প্যাঙ্গোলিনও হয়ত এই ভাইরাসের অন্যতম বাহক। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি মালয়েশিয়ান প্যাঙ্গোলিনের শরীর থেকে পাওয়া করোনা ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্স SARS -CoV-2 ভাইরাসের সাথে মাত্র ৯০% মিলে। তাই ধরে নেওয়া হয়েছে বর্তমান করোনা ভাইরাসের মহামারির পিছনে প্যাঙ্গোলিন তেমন ভাবে দায়ী নয়।

তবে, প্যাঙ্গোলিনের শরীর থেকে যেই করোনা ভাইরাসটি আলাদা করা হয়েছিল সেটার S প্রোটিনের একটি নির্দিষ্ট অংশের সাথে একদম ৯৯% মিলে যায়। যা কিনা  ACE (অ্যানজিওটেনসিন’কে রূপান্তর করার এনজাইম) রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইনে থাকা ৭৪টি আ্যমাইনো অ্যাসিডের সাথে মিলিত হয়ে মানবদেহে ভাইরাসটির সংক্রমণ ঘটায়।

অপরদিকে রাইনোলোফাস গোত্রের বাদুড়ের শরীরে পাওয়া RaTG13 ভাইরাসটির S প্রোটিনের এই নির্দিষ্ট অংশে বৈচিত্র্য দেখা যায়। এবং এটা SARS-CoV-2 ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সের সাথে মাত্র ৭৭% মিলে। এর অর্থ হলো, প্যাঙ্গোলিনের শরীরে থাকা করোনা ভাইরাস মানবদেহে সংক্রমণ করতে পারলেও রাইনোলোফাস গোত্রের বাদুড় থেকে এই ভাইরাসের সংক্রমণ হয় না।

এই দুটি ভাইরাসের জিনোমিক তুলনা থেকে বলা যায়, দুটি ভিন্ন ভাইরাসের রিকম্বিনেশন থেকে SARS-CoV-2 ভাইরাসের সৃষ্টি। এদের মধ্যে একটির মিল আছে RaTG-13 ভাইরাসের সাথে। অপরটির প্যাঙ্গোলিনের ভাইরাসের সাথে।

তাই অনুমান করা হচ্ছে, পূর্বসৃষ্ট দুটি ভাইরাসের সমন্বয়েই হয়ত উদ্ভব হয়েছে করোনা ভাইরাসের।

রিকম্বিনেশন ঘটানোর জন্যেই হয়ত এই ভিন্ন ভাইরাস দুটি কোনো প্রাণির শরীরে প্রবেশ করে বার বার সংক্রমণ ঘটিয়েছে।

তারপরও, দুটি প্রশ্নের উত্তর অজানা থেকেই যায়— ১. কোন জীবে প্রথমে এই রিকম্বিনেশান ঘটেছিল? বাদুড়ে, প্যাঙ্গলীনে নাকি অন্য কোনো প্রজাতির প্রাণিতে? এবং ২. সর্বোপরি কোন পরিস্থিতিতে ঘটেছিল এই রিকম্বিনেশন?

অনুবাদ. লুবনা ফেরদৌস প্রমা