ক্লোয়ি বেনজামিন এর ‘দ্য ইমমরটালিস্টস’—উইয়ার্ড উপন্যাস

দ্য ইমমরটালিস্ট আসলে কেমন ধরনের বই বা উপন্যাস? এই প্রশ্ন করলে রিফ্লেক্স হিসেবে আমার উত্তর হবে, উইয়ার্ড। জাস্ট এই একটা শব্দই। তবে এখানে ‘উইয়ার্ড’ শব্দটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমি একেবারেই জাজমেন্টাল না। উইয়ার্ড মানেই এই উপন্যাস অখাদ্য কিছু না, আবার উইয়ার্ড মানেই এই উপন্যাস অসাধারণ কিছু না। এটা নিশ্চয়ই যার যার টেস্টের উপর নির্ভর করবে।

উইয়ার্ড কেন মনে হইল আমার, সেটা একটু প্র্যাক্টিক্যালি বলি। ফিকশনের অনেকগুলি সাবজনরা—ফ্যান্টাসি, স্পিরিচুয়ালিজম, ফিলোসফি, ফ্যামিলি-ড্রামা ইত্যাদির বিভিন্ন উপাদান এই উপন্যাসে আসছে, এবং এগুলির কোনো একটাও এই উপন্যাসকে নিজের ডিরেকশনে নিয়ে যাইতে পারে নাই। সবকিছুর সম্মিলিত অবদানে এটা অন্য একটা দিকে গেছে এবং যা হওয়ার কথা সেটাই হইছে। এটা আরেকটা সাবজনরা, ‘লিটারারি ফিকশন’-এর দিকে গেছে। এবং লিটারারি ফিকশনের প্রতি সাধারণত আমার কোনো ভালো লাগা নাই।

‘মৃত্যু’ ব্যাপারটাকে ফিলোসফিক্যাল জায়গা থেকে দেখে একটা থট এক্সপেরিমেন্টকে এই উপন্যাসের কাহিনি বানিয়েছেন লেখিকা ক্লোয়ি বেনজামিন। প্রতিটা মানুষই জানে সে মারা যাবে, তবে এই মৃত্যু কখন ঘটবে তা সে জানে না। এখন কেউ যদি আগেই জেনে ফেলে সে নির্দিষ্ট কোন দিনটাতে মারা যাবে, সেটা কি তার জীবনের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে দেয়? তার সম্পূর্ণ জীবন কেমন হবে, সে জীবনকে কীভাবে দেখবে ও বিভিন্ন ঘটনার সাথে কীভাবে ইন্টার‍্যাক্ট করবে, তার ডেসটিনি কী হবে—মৃত্যু কখন হবে সেটা জানতে পারলে কি তা এই সবকিছুকে প্রভাবিত করে? এই প্রশ্নটাই দ্য ইমমরটালিস্ট উপন্যাসের প্রিমাইজ।

বুক রিডিং ও সাইনিং অনুষ্ঠানে ক্লোয়ি বেনজামিন

লেখিকা ক্লোয়ি বেনজামিনের দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য ইমমরটালিস্টস। কাহিনি শুরু হয় ১৯৬৯ সালে নিউইয়র্কের একটা অ্যাপার্টমেন্টে। সিমন, ক্লারা, ড্যানিয়েল, ভারিয়া—এই চার ভাইবোনের গল্প। সবচেয়ে বড়জন ভারিয়ার বয়স ১৩ এবং সবচেয়ে ছোটজন সিমনের বয়স ৭। ড্যানিয়েল এর বয়স ১১ এবং ক্লারার বয়স ৯। সামার ভ্যাকেশনের সময় তাদের এলাকায় একজন মহিলা আসে। সে ফরচুন টেলার, অর্থাৎ মানুষের ভাগ্য বলতে পারে। আরো নির্দিষ্টভাবে বললে, এই ফরচুন টেলার কোনো মানুষ এক্সাক্টলি কবে মারা যাবে সেই ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে।

চার ভাইবোন সেই ফরচুন টেলারের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা একজন একজন করে মহিলার ঘরে ঢোকে এবং নিজেদের মৃত্যু সম্পর্কে সেই ‘নিষিদ্ধ জ্ঞান’ নিয়ে বের হয়ে আসে। তবে তারা জিনিসটা কেউ কারো সাথে শেয়ার করে না। এবং পরবর্তীতেও দীর্ঘদিন এটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কোনো কথাই বলে না।

৯ বছর পরে, একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবে তাদের বাবা মারা যাওয়ার পরে তারা জিনিসটা একজন আরেকজনের সাথে শেয়ার করে। একজন আরেকজনকে বলে ফরচুন টেলার মহিলা তাদের মৃত্যুর তারিখটা কী হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল।

উপন্যাসের কাহিনি চারটা ধাপে এগিয়েছে। ফরচুন টেলারের বলা চারটা মৃত্যুর তারিখের ক্রম অনুসারে চার ভাইবোনের চারটা স্টোরি। প্রথমে সিমন। তার ব্যাপারে ফরচুন টেলার বলেছিল সে তার ২০তম জন্মদিনের অল্প কয়েকদিন পরেই মারা যাবে। সিমনের বয়স এখন ১৬। অর্থাৎ তার কাছে বেশি সময় আর নেই, অল্প কয়েকটা বছর। যদি ফরচুন টেলারের ভবিষ্যদ্বাণী আসলেই সত্য হয়? সিমনের কাছে সবকিছু খুব জরুরি মনে হয়। প্রতিটা মুহূর্ত মূল্যবান। সে একটা মুহূর্তও নষ্ট করার ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। সে এবং ক্লারা নিউইয়র্ক ছেড়ে স্যান ফ্রান্সিসকোতে চলে যায়। স্যান ফ্রান্সিসকোতে যাওয়ার পরে সিমন অবাধ সমকামী সম্পর্কে জড়ায় এবং এর পরিণতিতে সে এইডস-এ আক্রান্ত হয়।

ক্লারার প্রচণ্ড আগ্রহ ম্যাজিকের প্রতি। সে খুব সিরিয়াসলি ম্যাজিকের স্কিল ডেভেলপ করতে থাকে। এবং এই ম্যাজিকের এই স্কিলই তাকে স্যান ফ্রান্সিসকো থেকে লাস ভেগাসে নিয়ে যায়।  ক্লারার মৃত্যু সম্পর্কে ফরচুন টেলার ভবিষদ্বাণী করেছিল বয়স ত্রিশের কোঠায় যাওয়ার পরে সে মারা যাবে।

সিমন ও ক্লারা নিউইয়র্ক ছেড়ে যাওয়ার পরে ভারিয়া ও ড্যানিয়েল তাদের মায়ের সাথে নিউইয়র্কেই থেকে যায়। ড্যানিয়েল মিলিটারির ডাক্তার হয়। আর ভারিয়া বিজ্ঞানী হয়, তার গবেষণার বিষয় কীভাবে প্রাণের আয়ু বাড়ানো যায়। সিমন ও ক্লারার জীবনে আসলে কী ঘটল সেটা জানার জন্য ড্যানিয়েল সবসময় প্রচণ্ড উদ্বেগের মধ্যে থাকে। ফরচুন টেলার, রোমানিয়ান সেই মহিলা ভারিয়ার ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল সে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে। কিন্তু ভারিয়া সাইকোলজিক্যালি খুব একটা স্ট্যাবল থাকে না। অবসেসিভ কমপালশন ডিসঅর্ডারে ভুগতে থাকে।

হ্যাঁ, সিমনের ক্ষেত্রে ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়। এইডস আক্রান্ত সিমন ফরচুন টেলারের ঘোষণা করা সেই নির্ধারিত দিনেই মারা যায়। অদ্ভুত ব্যাপার হল, সিমন যে সময়ে মারা যায় এই অসুখটা তখনো এইডস হিসেবে চিহ্নিত হয় নি।

ফরচুন টেলারের ভবিষ্যদ্বাণী যেন সত্য প্রমাণ করার জন্যই ক্লারাও নির্ধারিত সময়ে মারা যায়।

ড্যানিয়েল ও ভারিয়ার ভাগ্যে কী ঘটে সেটা এখানে না বললেও চলে। মেজর স্পয়লার এড়ানো যাবে।

এই উপন্যাসের শুরুটা হয়েছে একটা ফ্যান্টাসির আবহ নিয়ে। পরে মনে হয়েছে এটাতে একটা সায়েন্স ফিকশনের ছায়াও আছে। কিন্তু শেষপর্যন্ত রাইটার ক্লোয়ি বেনজামিন সবকিছুর উপরে একটা ফিলোসফিক্যাল প্যারাডক্সকে নিয়ে আসছেন। এই প্যারাডক্সে পৌঁছানোটাই ছিল এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য। কাহিনি যত জমাট বাঁধতে থাকে, মনে হয়, তারা কি ফরচুন টেলারের নির্ধারণ করা সেই ডেটেই মারা যাবে কারণ এটাই তাদের পূর্বনির্ধারিত নিয়তি ছিল? নাকি, ফরচুন টেলারের সেই ভবিষ্যদ্বাণীর কারণেই তাদের জীবনকে এই পথে নিয়ে গেছে?

তারা যদি ফরচুন টেলারের কাছে সেদিন না যেত, তাহলে তারা পরবর্তীতে যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেসব সিদ্ধান্ত তাদের জীবনকে এই পথে নিয়ে গেছে, সেই সিদ্ধান্তগুলি তারা নিত কিনা?—দ্য ইমমরটালিস্টস এর কাহিনি এই প্রশ্নটার কাছেই আসে শেষপর্যন্ত। এবং এটার মাধ্যমে রাইটার ক্লোয়ি বেনজামিন একটা দার্শনিক প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। মানুষের ডেসটিনি বা ভাগ্য বলে আসলেই পূর্বনির্ধারিত কিছু আছে যেটা সে এড়াতে পারে না? নাকি, মানুষের জীবনের বিভিন্ন সময়ে নেয়া ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্তগুলিই আসলে তার ডেসটিনি তৈরি করে দেয়?

তবে এই জিজ্ঞাসা বা ফিলোসফি তো অনেক পুরাতন। এবং এই ফিলোসফি নিয়ে অনেক কাজও আছে। দার্শনিক সেনেকা বলেছিলেন, ‘উই আর নট গিভেন এ শর্ট লাইফ বাট উই মেইক ইট শর্ট। লাইফ ইজ লং ইফ ইউ নো হাউ টু ইউজ ইট।’ অর্থাৎ, আমাদেরকে সংক্ষিপ্ত জীবন দেয়া হয় নি, আমরাই এটাকে সংক্ষিপ্ত করে ফেলি। যদি আপনি এটাকে ব্যবহার করতে জানেন তাহলে জীবন বড়। সেনেকার এই দার্শনিক সিদ্ধান্তই সম্ভবত দ্য ইমমরটালিস্টসের কাহিনিতে প্রমাণ করে দেখালেন ক্লোয়ি বেনজামিন। চার ভাইবোন সেদিন সেই ফরচুন টেলার মহিলার কাছে যাওয়ার কারণেই তাদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে অল্টারনেটিভ সিদ্ধান্তগুলি নেয়, এবং এই সিদ্ধান্তগুলিই তাদেরকে একটা পরিণতিতে পৌঁছে দেয়। ফলে তাদের এই পরিণতি কতটা ডেসটিনি, আর কতটা তাদের কর্মফল এই প্যারাডক্সে এই বইয়ের রিডারকে পড়তেই হবে।

প্রতিটা মানুষকে প্রতিটা মুহূর্তে অনিশ্চয়তাকে ফেস করতে হয়। মানুষ একটা স্টেপ নেওয়ার পরেও জানে না এর পরবর্তী স্টেপটা কী হবে, তাকে কোথায় নিয়ে যাবে। ভদ্রমহিলা, ক্লোয়ি বেনজামিন, দেখালেন, ফিলোসফিক্যাল জায়গা থেকে জিনিসটাকে দুইভাবে দেখা যেতে পারে। এক, মানুষকে  প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তাকে ফেস করে এমন সব ডিসিশন নিতে হয় যেগুলি তার জন্য একটা আনএভয়েডেবল ডেসটিনি তৈরি করে, যেটা আসলে তার কর্মফল। দুই, অথবা, মানুষের একটা পূর্বনির্ধারিত ডেসটিনি আছেই, যেটার কারণে সে অনিশ্চয়তার সামনে তার নেওয়া অল্টারনেটিভ ডিসিশনগুলিকে এড়াতে পারে না।

রাইটার এই বইয়ে অনেক জিনিস নিয়ে এসেছেন। অনেক কিছু করার চেষ্টা করেছেন। তবে সবকিছুই যে কাজ করেছে এমন না। অনেক এলিমেন্ট দিয়ে প্যারাডক্সটাকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছেন। তবে কথা একটাই, এই প্যারাডক্স, এই ফিলোসফি, এই সেইম জিজ্ঞাসা অনেক পুরাতন। উনি জাস্ট নতুনভাবে, নতুন কাহিনির মধ্য দিয়ে জিনিসটা রিপিট করলেন।

ক্লোয়ি বেনজামিন

দ্য ইমমরটালিস্টসের একটা জিনিস মজার। চার ভাইবোন সেই রোমানিয়ান ফরচুন টেলারের কাছে থেকে তাদের ভবিষ্যৎ মৃত্যুর ডেট জেনে আসার পর থেকেই একটা সূক্ষ্ম থ্রিল শুরু হয়ে যায়, যে, তাদের জন্য এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হবে কি হবে না। মজাটা এইখানে যে, এই থ্রিলের একটা প্রোটাগনিস্ট এই বইয়ের ক্যারেক্টাররা, অর্থাৎ ওই চার ভাইবোন। আরেকটা প্রোটাগনিস্ট, প্রকৃতি, দ্য নেচার। এই বইয়ের ক্ষেত্রে, এই জিনিসটাও আসছে একটু আধ্যাত্মিকভাবে। ইহুদী কাব্বালিস্ট বা আধাত্মবাদীরা এই ইউনিভার্সকে, এই টাইম এবং স্পেসকে আগে থেকে তৈরি হওয়া কোনো জিনিস হিসেবে দেখে না। একটা নির্দিষ্ট নকশা অনুযায়ী, প্রতিটা মানুষের জন্য তার টাইম এবং স্পেস তৈরি হতে থাকে। সেই নকশাটা হচ্ছে, ‘দ্য ট্রি অব লাইফ’। বাইবেল এবং কোরআনে যে ট্রি অব লাইফের উল্লেখ আছে। এই ট্রি অব লাইফের বিন্যাস অনুযায়ী প্রতিটা মানুষের ইউনিভার্স, অর্থাৎ টাইম এবং স্পেস তৈরি হতে থাকে।

এটা ক্লোয়ি বেনজামিনের দ্বিতীয় বই। ২০১৮ এর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয়েছে।

এই বইয়ের কাহিনির ব্যাকগ্রাউন্ডের ফিলোসফিক্যাল প্যারাডক্স, এবং সেই প্যারাডক্সকে অবশ্যসম্ভাবী করে তোলার জন্য বিভিন্ন এলিমেন্টের কম্বিনেশন ঘটানোর জন্য এই বইটা পাওয়ারফুল আছে। এবং ইন্টারেস্টিং অ্যাজ ওয়েল।

এই বইয়ে আমার সবচেয়ে প্রিয় লাইনটা শেয়ার করি। এটা অবশ্য একটু ফানি। কমিকাল, ইন এ ডার্ক ওয়ে।

‘ইউ ওয়ানা নো দ্য ফিউচার?—লুক ইন দ্য মিরর।’