Subscribe Now
Trending News

Blog Post

নিউরন কী?
সায়েন্স

নিউরন কী? 

আপনার শরীরে রয়েছে ৮৬ বিলিয়ন নিউরন, কিন্তু এই সংখ্যাটা হিসাব করে বের করা কতটা কঠিন তা কি বুঝতে পারছেন?

নিউরন হলো মানুষের ব্রেন এবং নার্ভাস সিস্টেমের (মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুতন্ত্রের) মধ্যে অতি ক্ষুদ্র গঠনমূলক ও কার্যকরী একক।

আমাদের মস্তিষ্কে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন রয়েছে। আর সমস্ত শরীর জুড়ে রয়েছে আরও অনেক অনেক নিউরন। এগুলি বিস্ময়কর রকমের অতি পাতলা ক্যাবল বা স্নায়ুতন্তুর মাধ্যমে ইলেক্ট্রিক্যাল এবং কেমিক্যাল সিগন্যাল (বৈদ্যুতিক এবং রাসায়নিক সংকেত) দিয়ে যোগাযোগ করে।

যখনই আমরা আমাদের চারপাশের জগৎকে দেখি, শুনি বা নতুনভাবে উপলব্ধি করি, ঠিক তখনই হাজার হাজার সংবেদনশীল নিউরন আমাদের মেরুদণ্ড এবং মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। এবং অন্যান্য নিউরনের সাহায্য আমরা সেসব অনুভূতি উপলব্ধি করতে এবং সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম হই।


মাইকেল ট্যাব, আন্দ্রিয়া গাওরিলেভস্কি, জেফরি ডেলভিসিও
সায়েন্টিফিক আমেরিকান, ৮ জুন ২০২১


বিজ্ঞানীরা হাজার বছর ধরে মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করছেন। এমনকি এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে পুরনো বৈজ্ঞানিক ডকুমেন্টটি হলো মস্তিষ্কের আঘাত সংক্রান্ত ৪,০০০ বছরের পুরনো একটি অ্যানাটমিক্যাল রিপোর্ট।

গবেষণা করার জন্যে ব্রেন বা মস্তিষ্ক অত্যন্ত জটিল একটি অঙ্গ। এমনকি নমুনা হিসেবে একটি মস্তিষ্ক যদি মাইক্রোস্কোপের নিচে রাখা হয়, তখন মূলত কোষের একটা জটবদ্ধ জালিকা দেখতে পাওয়া যাবে।

১৮৭৩ সালে ইতালীয় চিকিৎসক ক্যামিলো গলজি মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশকে দাগ কেটে চিহ্নিত করার উপায় বের করেন। এতে করে ব্রেনের টিস্যুগুলিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি খুঁটিনাটি সহ দেখানো সম্ভব হয়। এ পদ্ধতি ব্যবহার করে স্প্যানিশ গবেষক সান্তিয়াগো রামন কাহাল (Santiago Ramón Cajal) আবিষ্কার করেছিলেন যে, যদিও প্রতিটি কোষ সংযুক্ত, তবুও এগুলির স্বতন্ত্র কাঠামো রয়েছে। যা পরবর্তীতে নিউরন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

কাহাল নার্ভাস সিস্টেম বা স্নায়ুতন্ত্রকে এর ক্ষুদ্রতম উপাদানে ভাগ করে ফেলেন এবং এর মাধ্যমেই পরবর্তী শতাব্দীর স্নায়ুবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি এবং গলজি ১৯০৬ সালে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার ভাগ করে নেন।

নিউরন হলো একটি বিশাল সিস্টেমের অতিশয় ক্ষুদ্র অংশভাগ। এ কারণে এগুলির শক্তি নির্ভর করে অন্যান্য নিউরনের সাথে যোগাযোগের উপর। নিউরনগুলির মধ্যে সামান্য কিছু গ্যাপ বা ফাঁক থাকে, যা সিন্যাপস নামে পরিচিত এবং এই ফাঁকা জায়গাটিতেই একটি নিউরনের সাথে অন্যান্য নিউরনের যোগাযোগ ঘটে থাকে। অর্থাৎ, দুটি নিউরনের সংযোগস্থলকে সিন্যাপস বলা হয়। যখন নিউরনগুলি ঘন ঘন সংকেত আদান-প্রদান করে, তখন এগুলির মাঝে অবস্থিত সিন্যাপসগুলি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, ফলে ভবিষ্যতের সংকেত পাঠানো আরও সহজ হয়।

এই সংকেত আদান-প্রদান সর্বদা ঘটছে, সমস্ত মস্তিষ্ক জুড়ে। এই প্রক্রিয়া লক্ষ্য করলে আমরা কোনো কিছু কীভাবে শিখি এবং আমাদের স্মৃতি কীভাবে গঠিত হয়, তা বুঝতে পারা যায়। আমরা আক্ষরিক অর্থেই আমাদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মস্তিষ্ককে পুনর্নির্মাণ করতে থাকি। ব্রেনের প্রতিনিয়ত চেঞ্জ হতে পারার এই মৌলিক ক্ষমতাকে বলা হয় “নিউরোপ্লাস্টিসিটি”।

মানুষের শরীরের বেশিরভাগ নিউরন আমাদের জন্ম থেকেই থাকে। নিউরন প্রাথমিক পর্যায়ে যাত্রা শুরু করে স্টেম সেল হিসাবে, তারপরে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে যায় এবং সেখানে তারা নির্দিষ্ট ভূমিকা গ্রহণ করে। আমাদের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে মস্তিষ্ক অতিরিক্ত নিউরন এবং সেগুলির মধ্যে থাকা সংযোগ ছাটাই করে দেয়। শুধুমাত্র শক্তিশালী নিউরনগুলিই টিকে থাকে। যেগুলি থেকে যায়, সেগুলির মধ্যে কিছু আমাদের গন্ধের অনুভূতি (সেন্স অফ স্মেল) এর, এবং অন্যগুলি আমাদের চলাফেরার ক্ষমতা বা অন্যান্য মোটর স্কিল পরিচালনার ক্ষেত্রে দক্ষতার অংশ হয়ে ওঠে।

শরীরের অন্যান্য যেসব কোষ রয়েছে, সেগুলি একটা সময়ের পরে পুনরুজ্জীবিত হয় এবং একসময় মারা যায়। কিন্তু নিউরনের ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটে। বেশিরভাগ নিউরন সারা জীবন স্থায়ী হয়।

মানুষের মস্তিষ্কের কোনো একটি অঞ্চলের ব্যবহার যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলেই সেখানকার নিউরনগুলি কার্যকারিতা হারাবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি আর কখনো বাসা থেকে বাইরে বের না হন, তাহলে আপনি সম্ভবত স্পেশিয়াল নেভিগেশনের (spatial navigation) সাথে জড়িত মস্তিষ্কের যে অঞ্চল, সেখানকার নিউরন হারাবেন।

নিউরন মরে গেলে মস্তিষ্কের বেসিক ফাংশন এবং মোটর স্কিল-এ সমস্যা হতে পারে। অ্যালঝাইমার এবং পারকিনসন্স ডিজিজের মতো ডিজেনারেটিভ অসুখের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটে; নিউরনগুলি সঠিকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয় এবং মারা যায়। কিছু প্রমাণ আছে যে, এই রোগগুলি মস্তিষ্কে আটকে থাকা প্রোটিন ক্ল্যাম্পের ফলে ঘটে। বিজ্ঞানীরা এখনও ঠিক কীভাবে এটি ঘটে, তা বের করার জন্যে কাজ করছেন।

এসব রোগের কার্যকর চিকিৎসার জন্যে এই তথ্যটি জানা অপরিহার্য, যা এখনো অধরাই রয়ে গেছে। স্নায়বিক পরিবর্তনগুলি স্থায়ী হবে, এমন নয়। মস্তিষ্কের সাধারণ নিউরোপ্লাস্টিসিটির পাশাপাশি, “নিউরোজেনেসিস” প্রসেসের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্করাও যে নতুন নিউরন তৈরি করতে সক্ষম, তার শক্ত প্রমাণ রয়েছে।

গবেষকরা এখনও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে নিউরোজেনেসিস কতটা কাজ করে, তা নিয়ে গবেষণা করছেন। মস্তিষ্কের সুস্থ কার্যকারিতার জন্যে এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে তারা মনে করছেন ।

এবং যেহেতু নিউরন ইলেক্ট্রিক্যাল সিগন্যালের মাধ্যমে যোগাযোগ সম্পন্ন করে, এর ফলে সরাসরি ইলেক্ট্রিক্যাল সিমুলেশনের সাথে ব্রেনের সার্কিট পরিবর্তন করা যায়। বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডকে উদ্দীপিত করার উপায় খুঁজে পেয়েছেন। এতে করে প্যারালাইজ হয়ে যাওয়া পেশীগুলিকে পুনরায় সচল করা যায় এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা উপশম করা সম্ভব হয়।

বর্তমানে প্রাইভেট কোম্পানিগুলিও এই ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করার চেষ্টা করছে। অনেকেই দাবি করছে যে, তাদের ব্রেন সিমুলেশন প্রোডাক্টগুলি স্মৃতিশক্তি বাড়াতে পারে এবং দক্ষতা অর্জনের হার বৃদ্ধি করতে পারে।

কিন্তু গবেষকরা এখনও খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন যে, কোন প্রভাবকগুলি আসল এবং কোনটি প্লাসিবো। এবং যেহেতু জোর করে আমাদের নিজেদের মস্তিষ্কে পরিবর্তন আনলে সেটা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে, তাই নিউরনগুলিকে পুরাতন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেয়াই আপাতত সবচেয়ে ভালো।

অনুবাদ: জুবায়েদ দ্বীপ

Related posts

সাম্প্রতিক © ২০২১ । সম্পাদক. ব্রাত্য রাইসু । ৮১১ পোস্ট অফিস রোড, বাড্ডা, ঢাকা ১২১২