প্রিয় মানুষ হারানো লোকেরা আমাকে কষ্ট দেয়

আমি তখন ভাবি একটা মানুষের কথা। যাকে আমি দেখি সবসময়। উঠে বসে, খায়, আমার সামনে আঙুল নাড়ে। তার আঙুলগুলি আমি চিনি, তার নখগুলি চিনি, তার চুলগুলি কেমন, কপালের কতটুকু আসে তা জানি। তার জামা কাপড়, বিছানা, কীভাবে সে খায়, কী কী খাইতে পছন্দ করে, ঘরের কোথায় বসতে পছন্দ করে সে সবই আমি নিঁখুতভাবে জানি। তার চেয়ে বেশি জানি।

অথচ হঠাৎ এমন হবে, এমন হবে সেই লোকটা তার পর মুহূর্তে আর নাই। সে আর আঙুল নাড়তেছে না। সে আর কখনোই কথা বলবে না আমার সাথে। মানে কখনোই না।

এই অনুভূতি জীবনের প্রতি আমার রাগ তৈরি করে। বাঁইচা থাকাকে আমার অতি পরিহাসের বস্তু মনে হয়।

আমার এক ফ্রেন্ড। অত ফ্রেন্ড না। তবে খুব ভালো পরিচয় আছে। তার প্রেমিক কয়দিন আগে মারা গেল ক্যান্সারে। অনেক কষ্ট পাইয়া মরল ছেলেটা। দীর্ঘদিন ভুগল। সঙ্গে আমার সেই বান্ধুবী। ওকে দেইখা মনে হয় নাই কষ্ট তার প্রেমিক পাচ্ছে। চোখ দেখে মনে হইছে শারীরিক কষ্টটা ওরই। ভিতরে ভিতরে মেয়েটার প্রতি মুহূর্তে শুধু ভয় বাড়ছে, এই না জানি খারাপ কিছু হয়, এই না জানি খবর আসে ও আর নাই!

অথচ বাইরে সে হাসতেছে। দুপুরের ভাত বসে খাইতেছে ফ্যামিলির সঙ্গে।

ছেলেটা মারা গেল।

এখন ও মাঝে মাঝে ছবি দেয় ওদের আগের কাটানো সুন্দর সময়ের ছবি। আমার বুকটা ধক করে ওঠে। প্রতিবার। সেই বেলাটা আমি আর কিছু করতে পারি না। ভয়ানক কান্না পায়। ও কী করতেছে এখন? এই ছবিটা যখন ও পোস্ট করতেছে ওর মনে কী চলতেছে, আমি ভাবতে পারি না। তারও আগের কথা যখন তাকে সংবাদটা দেওয়া হইল, ও আর নাই, সেইটা আমি ভাবতেই চাই না।

আমার নতুন ফেসবুক ফ্রেন্ড হইলেন একজন। তিনি তার সন্তানকে হারাইছেন। প্রোফাইল জুইড়া তার মেয়ের ছবি। একটা ভিডিও পরশু বা গতকালকে দেখলাম উনি আপলোড করছেন। কোথাও ঘুরতে গেছিলেন ওনারা। মেয়েটা মায়ের ভিডিও করতেছে। তা নাকি সে প্রায়ই করত ওনাকে না জানায়া। উনি অনেক কিছু বলতেছিলেন ভিডিওতে। শিশুর মত আনন্দিত হইয়া মেয়েকে অন্যদের কথা বলতেছিলেন। মেয়েটার গলা দুয়েকবার শোনা যায়।

অসাড় বোধ করতেছিলাম ওনার ভিডিওটা দেইখা। মেয়েটা ছিল ওইখানে। এখন আর নাই। তবু ওনাকে ঘরের ভিতরের সবগুলি ঘরে হাঁটতে হয়। মেয়ের ঘরেও।

মেয়েটার নিশ্চই জামা-কাপড় আলমারিতে তেমনই আছে। বিছানা, খাতা কলম। উনি সব দেখেন, এগুলি ধরার মানুষটা আর নাই। সে আর কখনোই আসবে না।

এই ভাবনা সত্যি আমাকে কষ্ট দেয়। শুধু এই লোকগুলির জন্য আমার কষ্ট হয় না। কষ্ট হয় মানুষের জন্যে যে, সম্পর্ক আর ভালোলাগার স্পর্শগুলির মত জিনিসকে কীভাবে জীবন থেইকা এক মুহূর্তে নাই কইরা দেওয়া হয়!

তারপরও মানুষ বাঁচে নিশ্চয়ই। কিন্তু, যখন যার হঠাৎই আবার মনে আসে, ও তো এখানে বসত, এই অনুভূতির স্বাদ দেওয়া কতটা নিষ্ঠুর, নিজের জীবন তো আছে এমন ভাবনা দিয়া এই ব্যথা দূর করা যায়?

১২ জুলাই ২০২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here