১৯৮৯ সালে বিজ্ঞানীরা কানাডার অ্যালবার্টা প্রদেশে ডাইনোসর প্রভিন্সিয়াল পার্কে খনন কাজের সময় ডাইনোসরের একটি ফসিল আবিষ্কার করেন। ফসিলটি ছিল ‘সেন্ট্রোসরাস’ নামের একধরনের শিংওয়ালা ডাইনোসরের।

বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, ফসিলটির পায়ের একটি হাড় বিকৃত। তারা তখন সিদ্ধান্তে আসেন যে, হাড়টা ভেঙে যাওয়ার পর নতুন করে জোড়া লাগার সময় বিকৃত হয়ে গিয়েছিল।

তবে গত ৩ আগস্ট ২০২০ সোমবারে হাড়টি নতুনভাবে পরীক্ষা করে গবেষকরা আগের সিদ্ধান্ত বাদ দিয়ে নতুন সিদ্ধান্তে এসেছেন। তাদের মতে হাড়টি বিকৃত হয়েছে অস্টিওসারকোমা নামের হাড় ক্যান্সারের কারণে।

এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো প্রমাণ পাওয়া গেল, ডাইনোসরদেরও ক্যান্সারে হত। ৭৬ মিলিয়ন বছর আগের সেন্ট্রোসরাস ডাইনোসরের এই ফসিলই তার প্রমাণ।

দৈর্ঘ্যে সেন্ট্রোসরাস প্রায় ২০ ফুট বা ৬ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতো। প্রায় ১৪৫ মিলিয়ন বছর আগের ক্রেটেশাস যুগে বেঁচে থাকা এই প্রাণী পুষ্টি পেত উদ্ভিদ থেকে। এদের নাকের ওপর একটা লম্বা শিং থাকতো। এছাড়া ঘাড়ের ওপরে খাঁজকাটা অংশেও ছোট একজোড়া বাঁকানো শিং ছিল।

সম্প্রতি ল্যানসেট অনকোলজি জার্নালে এই বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। গবেষকদের অন্যতম একজন ডেভিড ইভান্স। বর্তমানে তিনি কানাডার টরেন্টো শহরের রয়্যাল অন্টারিও যাদুঘরে জীবাশ্মবিদ হিসেবে কাজ করছেন। তার মতে, “গ্রন্থিযুক্ত এই টিউমার সাইজে আপেলের চাইতেও বড় ছিল।”

তিনি বলেন, “ক্যান্সারের কারণে এই সেন্ট্রোসরাসটি সম্ভবত মৃত্যুর আগে পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল, অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এটা সত্যি যে, কয়েক প্রজাতির ডাইনোসর আকারে অনেক বড় আর শক্তিশালী ছিল। এই গবেষণার ফলাফল থেকে বোঝা যাচ্ছে, ক্যান্সারের মতো যেসব রোগ আজ আমরা মানুষ আর অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি, ডাইনোসররাও এমন অনেক রোগে আক্রান্ত হত। ডাইনোসর নাম শুনলে আমাদের পৌরাণিক এক ধরনের প্রাণীর কথা মনে হয়। তবে তারা অন্যান্য পশুর মতোই শ্বাস নিত আর চলাফেরা করত। বিভিন্ন রোগে ভুগতো।”

বেশিরভাগ ক্যান্সারই হয় দেহের সফট টিস্যুতে। আর প্রাণিদেহের এই অংশ সহজে ফসিলে পরিণত হয় না। তাই জীবাশ্ম বা ফসিলের মধ্যে ক্যান্সারের প্রমাণ পাওয়াটা একটা দুর্লভ ব্যাপার।

এই গবেষণাপত্রের অন্যতম আরেকজন লেখক ডক্টর মার্ক ক্রাওদার। তিনি কানাডার অন্টারিও প্রদেশের ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন, প্যাথলজি এবং মলিকিউলার মেডিসিনের অধ্যাপক। তার মতে, “এই গবেষণা থেকে আমরা নতুন কোনো বিষয়ে জানিনি। বরং গবেষণার ফলাফল থেকে আমরা ক্যান্সারের ইতিহাসের ব্যাপারেই জানলাম। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় সব ধরনের প্রাণীর শরীরেই ক্যান্সার থাকার সম্ভাবনা আছে।”

ক্রাওদারের মতে, “অস্টিওসারকোমা সাধারণত দ্রুত বাড়তে থাকা হাড়ে ঘটে। শিশু আর অল্প বয়স্কদের মধ্যে এই রোগের দেখা পাওয়া যায়। তবে ডাইনোসররা যেহেতু আয়তনে অনেক বড় হত, তারাও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল।”

ক্রাওদার আরো জানান, এই ধরনের টিউমার হাড়কে ধ্বংস করে শরীরের অন্যান্য টিস্যুতেও ছড়িয়ে পড়ে। এই ক্যান্সার মানুষের মধ্যে দেখা দিলে চিকিৎসা হিসেবে কেমোথেরাপি আর সার্জারি করা হয়। আবার অনেক সময় আক্রান্ত রোগীর অঙ্গচ্ছেদ জরুরি হয়ে পড়ে।

ফসিল হয়ে যাওয়া হাড় হাই-রেজোল্যুশনের সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে আর মাইক্রোস্কোপের নিচে রেখে সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। এরপরেই গবেষকরা নিশ্চিত হন, এটা একটা টিউমার।

ডেভিড ইভান্স জানান, “আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি, হাড়ের টিস্যুর মধ্যে অস্টিওসারকোমার স্পষ্ট বৈশিষ্ট্য আছে। এর বাইরেও হাড়টির কর্টেক্সের মধ্যে দিয়ে এই ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ছিল। এরপরেই আমরা নিশ্চিত হই, এই বিকৃত হাড় ভেঙে যাওয়ার কারণে তৈরি হয়নি।

তবে সম্ভবত আক্রান্ত এই সেন্ট্রোসরাসটি ক্যান্সারে মারা যায়নি। ইভান্স জানান, এই ডাইনোসরের ফসিল শত শত সেন্ট্রোসরাসের হাড়ের সাথে পাওয়া গেছে। আর এক জায়গায় এত পরিমাণ ফসিল পাওয়ার একটা কারণ হতে পারে, এই ডাইনোসরগুলি বন্যার কারণে মারা গেছে।

তবে ক্যান্সারের কারণে হয়ত ডাইনোসরটি অনেক দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। সে গর্গোসরাস অথবা ডাসপ্লেটোসরাসের মতো শিকারি ডাইনোসরদের শিকারে পরিণত হতে পারত।

তবে ইভানের মতে, সেন্ট্রোসরাসদের কোনো পালের সঙ্গে চলাফেরা করার কারণেই হয়ত আক্রান্ত প্রাণিটা শিকারিদের হাত থেকে নিরাপদে ছিল। তাই ক্যান্সারের কারণে দিন দিন দুর্বল হতে থাকলেও শিকারি প্রাণীরা সেন্ট্রোসরাসটিকে আক্রমণ করতে পারেনি।

Write A Comment