বর্ণবৈষম্য বনাম শ্রেণিবৈষম্য তর্কের সমাপ্তি

কিছুদিন আগে প্রকাশিত একটি স্টাডিতে বিতর্কটি আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে―বর্ণবাদ কি অর্থনৈতিক অসাম্যের আরেক রূপ নয়? আমরা যদি অর্থনৈতিক কাঠামোতে শ্রেণিবিভেদ কমাতে পারি, রেসিজমের সমাধানও কি সম্ভব হবে না?


র‍্যালফ রিচার্ড ব্যাংকস
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২১ মার্চ ২০১৮


স্ট্যানফোর্ডের অর্থনীতিবিদ রাজ শেঠি, হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ ন্যাথানিয়েল হেনড্রেন ও তার সহকর্মীরা ‘দি ইকুয়ালিটি অব অপরচুনিটি প্রোজেক্ট’ নামে একটি স্টাডি করেন। আমেরিকার ব্ল্যাক প্যারেন্টদের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে গবেষণা করার পর যে সব অবজারভেশনের কথা তারা বলেন, সেগুলি আমরা ব্ল্যাক কমিউনিটির মানুষেরা আগে থেকেই জানি। একাধিক প্রজন্ম ধরে আমরা দেখে আসছি, জীবনে সফলতা অর্জন হোয়াইটদের জন্যে যত সহজ, আমাদের জন্যে তত নয়। কালোদের মধ্যে কেউ যদি সফলও হয়, সেই অবস্থান ধরে রাখা তার জন্যে বাকিদের চেয়ে কঠিন। আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, এমনই হয়ে আসছে। ল্যাটিনো কিংবা এশিয়ান আমেরিকানদের জন্যেও এ কথা সত্য।

র‍্যালফ রিচার্ড ব্যাংকস  (জন্ম. ওহায়ো, ১৯৬৩)

মি. শেঠি আর হেনড্রেন এই রিসার্চটি করেন আগে করা নিজেদেরই আরেকটি রিসার্চের দুটি ফাইন্ডিংসের ওপর ভিত্তি করে। প্রথম ফাইন্ডিংসে তারা বলেন, মানুষের আর্থিক অবস্থার বদল সহজে ঘটে না। স্বচ্ছল পরিবারের শিশুরা স্বচ্ছলতার মধ্যে বেড়ে ওঠে এবং বড় হয়েও সে অবস্থা ধরে রাখতে পারে। অপরদিকে, গরিব ফ্যামিলিতে বেড়ে ওঠা বাচ্চাদের আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হওয়ার সম্ভাবনা কম।

দ্বিতীয়টি হলো, হয়ত গরিব কমিউনিটির কেউ নিজ চেষ্টায় অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করতে পারে। কিন্ত এই উন্নতির পেছনে যে পূর্বশর্তগুলি থাকে তা সমাজ থেকে ঠিক করে দেয়া। যেমন উন্নত এলাকায় যারা বড় হয়, তারা ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ পায়। তারা এমন একটা সোসাইটি পায় যেটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পথে তাদের নানাভাবে সাহায্য করে।

কিন্ত ব্ল্যাক কমিনিউনিটির জন্যে এই বাস্তবতা অনেক নির্মম।

আমরা সবাই জানি, ব্ল্যাক ফ্যামিলিতে আর্থিক নিরাপত্তার ব্যাপারে একটা জেন্ডার বিভেদ দেখা যায়। কিন্ত এ বিষয়টা নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। আফ্রিকান-আমেরিকান ফ্যামিলির মেয়েরা অনেক দিক থেকেই ফ্যামিলির ছেলেদের চেয়ে ভালো করে। এমনকি লাইফের অ্যাচিভমেন্টের দিক থেকে তাদের অনেকের অবস্থান সমবয়সী হোয়াইট মেয়েদের সমকক্ষ।

কিন্ত ব্ল্যাক ফ্যামিলির ছেলেরা অত ভালো করতে পারে না। তারা ভালো পরিবেশে থাকুক বা খারাপ, ফ্যামিলি ধনী হোক বা দরিদ্র, ব্ল্যাক ছেলেরা কখনোই তাদের বয়সী হোয়াইট ছেলেদের সাথে সমান তালে আগাতে পারে না। এমনকি ধনী ফ্যামিলিতে জন্মালেও দরিদ্র হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা হোয়াইট পুরুষদের চেয়ে ব্ল্যাক পুরুষদের দ্বিগুণ। দরিদ্র ব্ল্যাক ফ্যামিলির অর্ধেক ছেলেই নিজেরদের অবস্থান চেঞ্জ করতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে ৩ জন হোয়াইট ছেলের ২ জনই যুবক বয়সেই নিজেদের ভাগ্য বদলে ফেলতে পারে।

ব্ল্যাক ফ্যামিলির মেয়েরা নিজেদের ইনকাম নিয়ে যদিও ভালো অবস্থায় থাকে কিন্ত তারা পিছিয়ে পড়ে পরিবারের ইনকামের কারণে। ফ্যামিলির পুরুষেরা তাদেরকে ইকোনমিক সাপোর্ট তো দিতে পারেই না, বরং তাদের ওপর বোঝা হয়ে থাকে। এ কারণে মেয়েরা সঙ্গী করার মতো উপযুক্ত ছেলে খুঁজে পায় না। সন্তানেরাও পায় না দায়িত্বশীল পিতা।

এভাবে এক জেনারেশনের বোঝা পরের জেনারেশন টানতে থাকে। ছেলেরা জীবনে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় কারণ তাদের বাবারা তাদের জন্যে ব্যবস্থা করে দিয়ে যেতে পারেনি। এটা যেসব পরিবারে পিতা সন্তানদের সাথে থাকে না তাদের জন্যে আরও বেশি সত্য।

রাজ শেঠি

মি. শেঠি তার রিসার্চে দেখান, কেবলমাত্র ফ্যামিলিতে বাবার উপস্থিতির কারণেই অনেক ব্ল্যাক ছেলের জীবনের গতিপথ বদলে যায়। এটা এমনই গুরুত্বপূর্ণ এক ফ্যাক্টর।

তাই আফ্রিকান-আমেরিকান কমিউনিটির সেপারেটেড ফ্যামিলির সন্তানদের অসুবিধা আরো বেশি। যেই আর্থিক টানাপোড়েনে তাদের বাবাদের জীবন কাটে, সেই একই সংগ্রামের ভার পরের প্রজন্মেরও বহন করতে হয়।

রেসিজম দূর করতে আমাদের আসলে যে সমাধানটা খুঁজতে হবে তা হলো―এই পিছিয়ে পড়া আফ্রিকান-আমেরিকানদের কীভাবে আমরা এই অর্থনৈতিক সংগ্রাম থেকে মুক্ত করতে পারি।

এটা যদি একটা চক্র হয়, তাহলে সব চক্রের মত এরও একটা শুরু আর একটা শেষ আছে। আমরা দেখি, ব্ল্যাক কমিউনিটির মেয়েরা সিভিল রাইট মুভমেন্টের পূর্ণ সুবিধা ব্যবহার করতে পেরেছে। কিন্ত ছেলেরা সেটা পারেনি। বরং আমেরিকায় যখন শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়া শুরু করল, তারাও একের পর এক ব্লু কালার জব হারাতে লাগল এবং বেকার হয়ে গেল। বেকারত্বের কারণ এদের অনেকেই অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল। তাই গত কয় বছরে আমেরিকায় কয়েদিদের সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে, যা কোনো গণতান্ত্রিক দেশের জন্যেই স্বাভাবিক না। এই কয়েদিদের মেজরিটিই ব্ল্যাক পুরুষ। তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া এই ট্র্যাজেডির কথা বাকি আমেরিকানরা কখনোই তোলে না।

এইসব কারণে আমেরিকায় ব্ল্যাক পুরুষেরা ক্রমেই একটা ঘৃণ্য জাতি হিসেবে পরিচিত হয়ে গেছে। বেকার থাকা, জেল খাটা, স্কুল থেকে ড্রপ আউট হওয়া এগুলিই যেন তাদের পরিচয়। ব্ল্যাক ছেলে বললে আমেরিকান সমাজ এই ছবিটাই দেখায়। আমি আমার সন্তানদের কথা বলতে পারি। টিনএজ বয়সের কোমলতা ছেড়ে দিয়ে তারা এখনই কঠিন, শক্তিশালী পুরুষ হতে চায়। তাদের এই কঠোরতা অন্যদের আতঙ্কিত করে। তখন মানুষ আরো রেসিস্ট আচরণ করে। সেটা এই ব্ল্যাক টিন এজারদের আরো উগ্র করে তোলে। চক্রটা তাই আর শেষ হয় না।

কিন্ত সব সময় যে এভাবেই চলতে থাকবে এমন কোনো কথা নেই। আমাদের সুবিধা বঞ্চিত করে রাখা এই শেকল আমরা ভেঙে দিতে পারি। আমাদের দরকার চেষ্টা করা। অদম্য চেষ্টা, যেটার অভাব সব সময় ছিল। আমরা এতদিন ভেবে এসেছি, দারিদ্র্য থেকে আমরা কখনো বের হতে পারব না। আমাদের সন্তানরা এমন সব স্কুলে যায় যেখানে অন্যেরা নিজেদের সন্তানকে পাঠানোর কথা চিন্তাও করে না। এমন সব এলাকায় বড় হয়, যেখানে কেউ নিজেদের সন্তানদের রাখতে চায় না। এভাবে শিশুকাল থেকে আমরা নিজেরাই আমাদের সন্তানদের জন্যে একটা বিভেদ তৈরি করে রাখি। ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা শুরুর আগেই আমরা ভাগ্যের কাছে পরাজিত হয়ে আছি।

অনেক আমেরিকান আছে যারা রেসিজম নিয়ে কথা বলতে চায় না। তারা যেন এসব দেখেও দেখে না। তাদের চিন্তা এক জায়গাতেই সীমাবদ্ধ―অন্যেরা যেন তাদেরকে রেসিস্ট না বলে। বর্ণবাদের পেছনে যে দাসত্ব ও বঞ্চনার চক্র সেটা ভাঙার দায়িত্ব তারা নিতে চায় না। তাদের এই অসাড় আচরণের কারণে রেসিজম সমাজে আরো প্রকটভাবে টিকে থাকে।

আমরা যদি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে চলমান এই বর্ণবাদ ভেঙে দিতে চাই, আমাদের কঠিন সংকল্প নিতে হবে। সেই সংকল্প তখনই করতে পারব যখন আমরা বুঝতে পারব এর সাথে অগণিত পরিবার ও সেই পরিবারগুলিতে বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েদের ভাগ্য জড়িত। এদের সবাইকে বাদ দিয়ে কি আমাদের আমেরিকান ড্রিম কখনো স্বার্থক হবে?

অনুবাদ. আমিন আল রাজী

– – – – –
লেখক পরিচিতি
র‍্যালফ রিচার্ড ব্যাংকস ১৯৯৮ সাল থেকে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর হিসেবে আছেন। তিনি বর্ণ, বৈষম্য এবং আইন পড়ান। জন্ম ১৯৬৩ সালে আমেরিকার ওহায়োতে। বর্তমানে বসবাস করেন সান ফ্রান্সিসকোতে। তিনি নিজে পড়াশুনা করেছেন হার্ভার্ড ল’ স্কুল ও স্ট্যানফোর্ডে। পড়াশুনা শেষে স্ট্যানফোর্ডেই প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন। এ পর্যন্ত তার দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে:Is Marriage for White People?: How the African American Marriage Decline Affects Everyone (২০১১) ও Racial Justice and Law: Cases and Materials (২০১৬) নামে। ওপরের নিবন্ধটি ২০১৮ সালের ২১ মার্চ দি নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত হয়।