বানরের ওপর কার্যকর অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন, ব্যাপক উৎপাদনে যাবে ইন্ডিয়া

  • প্রথমে ছয়টি প্রাণির উপরে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়। এর ২৮ দিন পরে প্রাণিগুলির শরীরে ভাইরাস প্রবেশ করিয়ে দেখা গেছে তারা কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়নি
  • চলতি বছরেই ভ্যাকসিনটির প্রায় ৬ কোটির মত ডোজ উৎপাদন করতে পারে সেরাম ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়া

প্রাণিদের উপরে কোভিড-১৯ এর সম্ভাবনাময় একটি ভ্যাকসিন পরীক্ষা করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, পরীক্ষাটির ফলাফল আশা জাগানোর মত। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ভারতে এর ব্যাপক উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পরিমাণের দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হলো, সেরাম ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়া। প্রতিষ্ঠানটি গত মঙ্গলবার জানিয়েছে, এই বছরের মধ্যেই তারা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভাবিত কার্যকর একটি ভ্যাকসিনের প্রায় ৬ কোটি ডোজ উৎপাদন করবে। ব্রিটেনে এখনো ভ্যাকসিনটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে।

ভ্যাকসিনটির নাম দেয়া হয়েছে ‘ChAdOx1 nCoV-19’। কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে ভ্যাকসিনটির কার্যকরিতা এখনো শতভাগ প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু সেরাম ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আদার পুনাওয়ালা জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিনটি উৎপাদন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। কারণ ইতিমধ্যেই প্রাণিদের উপরে ভ্যাকসিনটি সফলভাবে কাজ করেছে আর মানুষের উপরেও এই টিকা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

আদার পুনাওয়ালা, সিইও, সেরাম ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়া

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা অঙ্গরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অফ হেলথ এর রকি মাউন্টেন ল্যাবরেটরিতে ভ্যাকসিনটি পরীক্ষা করা হয়েছিল। রিসাস ম্যাকাক প্রজাতির ছয়টি বানরের শরীরে প্রথমে এই ভ্যাকসিন প্রবেশ করানো হয়।

প্রাসঙ্গিক পোস্ট: কোভিড-১৯: বানরের শরীর সার্স-কোভ/সিওভি-২ সংক্রমণে প্রতিরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি করে

পত্রিকাটির গবেষক ভিনসেন্ট মানস্টারের বরাত দিয়ে তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। মানস্টারই বানরদের উপরে এই পরীক্ষাটি করেছিলেন। প্রতিবেদন অনুসারে, টিকা দেয়ার ২৮ দিন পরে বানরদের শরীরে প্রচুর পরিমাণে নভেল করোনা ভাইরাসের জীবাণু প্রবেশ করানো হয়। দেখা গেছে, জীবাণু প্রবেশ করানোর পরেও বানররা সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল।

করোনা ভাইরাসের ফলে এখন পর্যন্ত সারাবিশ্বে ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এছাড়াও ভাইরাসটির কারণে দেহে ছড়িয়ে পড়া শ্বাসযন্ত্রের রোগ কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ২১০,০০০ এরও বেশি মানুষ।

ফোনে গ্রহণ করা একটি সাক্ষাৎকারে আদার পুনাওয়ালা রয়টার্সকে বলেন, “তারা [অক্সফোর্ডের] অত্যন্ত যোগ্য এবং দুর্দান্ত বিজ্ঞানীদের একটা দল… এজন্যেই আমরা বলেছিলাম, তাদের এই আবিষ্কার নিয়ে কাজ করে যাব। এ নিয়ে অনেক আত্মবিশ্বাসী।”

পুনাওয়ালা আরো জানান, “আমরা একটা বেসরকারি লিমিটেড কোম্পানি। সাধারণ বিনিয়োগকারী কিংবা ব্যাংকারদের কাছে আমরা দায়বদ্ধ নই। এজন্যে আমি সামান্য ঝুঁকি নিতেই পারি। আর এজন্যে আমাদের বর্তমান ব্যবস্থায় উৎপাদন করার জন্যে পরিকল্পিত অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্য এবং প্রকল্পগুলি এখন স্থগিত রাখতে পারি।”

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন বায়োটেক কোম্পানি এবং গবেষক দলের অধীনে কোভিড-১৯ এর সম্ভাব্য প্রায় ১০০টি ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। এবং এগুলির মধ্যে কমপক্ষে ৫টি ভ্যাকসিন মানুষের শরীরে প্রাথমিক পরীক্ষা বা প্রিলিমিনারি টেস্টিং এর পর্যায়ে রয়েছে। এই পর্যায়কে সাধারণত বলা হয় ফেইজ ওয়ান ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল।

অক্সফোর্ডের এই ভ্যাকসিনের পরীক্ষা সেপ্টেম্বর মাসের দিকে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। পুনাওয়ালা বলেন, তিনি আশা করছেন পরীক্ষাগুলি সফল হবে। গত সপ্তাহে অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানীরা বলেছেন, শুধুমাত্র ভ্যাকসিন কাজ করছে কিনা তা দেখাটাই তাদের প্রাথমিক এই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য না। বরং একইসাথে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালোভাবে সাড়া দিচ্ছে কিনা এবং অযাচিত কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে কিনা, এই পরীক্ষার মাধ্যমে সেইসব বিষয়গুলিও তারা লক্ষ্য করবেন।

সেরাম ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়া প্রতিষ্ঠানটির মালিক ২০০৫ সালে পদ্মশ্রী প্রাপ্ত পুনাওয়ালা গ্রুপের চেয়ারম্যান ভারতীয় বিলিয়নেয়ার সাইরাস এস. পুনাওয়ালা। ভারতের পশ্চিম অঞ্চলের শহর পুনেতে তাদের দুটি উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সেখানেই এই ভ্যাকসিন তৈরির পরিকল্পনা করছে। আদার পুনাওয়ালা জানান, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছরের মধ্যেই তারা এই ভ্যাকসিনের ৪০ কোটি ডোজ উৎপাদন করতে চান।

আদার পুনাওয়ালা বলেন, “বিদেশে রপ্তানি করার আগে অন্তত প্রাথমিক অবস্থায় এই ভ্যাকসিনগুলির বেশিরভাগ আমাদের দেশের মানুষরাই পাবেন। কোন দেশ কখন, কতটা ভ্যাকসিন পাবে, সেই সিদ্ধান্ত তারা ভারত সরকারের হাতে ছেড়ে দেবেন।”

সেরাম ইন্সটিটিউট প্রতিটি ভ্যাকসিনের মূল্য নির্ধারণ করেছে ১,০০০ রূপি বা ১৪.৭০ মার্কিন ডলার। কিন্তু পুনাওয়ালা বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে জনগণকে বিনামূল্যেই এই সেবা দেয়া হবে।

তিনি আরো বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কার্যালয় ভ্যাকসিন উৎপাদনের এই কার্যক্রমের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। আর তাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে, এই টিকা তৈরির ক্ষেত্রে ব্যয় যাতে কম হয়, সেজন্যে সরকার তাদেরকে সহায়তা করবে।

আরো পড়ুন: মানুষ ও বানরের জেনেটিক মিশ্রণ—বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ

আগামি ৫ মাসের মধ্যে তাদের প্রতিষ্ঠান ৩০ থেকে ৫০ লক্ষ ভ্যাকসিন তৈরি করবে। আর সেজন্যে তাদের ব্যয় হবে ৩০ থেকে ৪০ কোটি রুপি বা ৪.৪ থেকে ৫.৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আদার পুনাওয়ালা জানান, “সরকার আমাদের সাথে কিছু ঝুঁকি আর সাহায্য শেয়ার করে নিতে আগ্রহী। কিন্তু আমরা এখনো চূড়ান্তভাবে কিছুই হিসাব করিনি।”

টিকা দেয়ার ২৮ দিন পরে বানরদের শরীরে প্রচুর পরিমাণে নভেল করোনা ভাইরাসের জীবাণু প্রবেশ করানো হয়। দেখা গেছে, জীবাণু প্রবেশ করানোর পরেও বানররা সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল।

তিনি বলেন, সেরাম ইন্সটিটিউট ইতিমধ্যেই মার্কিন বায়োটেক প্রতিষ্ঠান কোডাজেনিক্স এবং অস্ট্রেলিয়ান প্রতিষ্ঠান থেমিসের সাথে কোভিড-১৯ এর আরো দুইটা সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। এছাড়াও চতুর্থ আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তির ব্যাপারে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ঘোষণা আসবে।

আদার পুনাওয়ালা জানান, সেরাম ইন্সটিটিউটের পরিচালকদের বোর্ড গত সপ্তাহে ৬০০ কোটি রুপি খরচ করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে শুধুমাত্র করোনা ভাইরাসের টিকা উৎপাদনের জন্যে একটা কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হবে।

সূত্র. সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
অনুবাদ. ফারহান মাউদ