ভ্যাকসিনের ইতিহাস

মাত্র কয়েক প্রজন্ম আগেও মানুষের মধ্যে স্মল পক্স, পোলিও বা হেপাটাইটিসের মত মারাত্মক সব সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে আতঙ্ক কাজ করত। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে বৈপ্লবিক সব পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রেখেছে ভ্যাকসিন। মানুষ আর এসব রোগে ভুগে মারা যাচ্ছে না।

এখান থেকে গত এক হাজার বছরের সবচাইতে ভয়াবহ সংক্রামক রোগগুলি সম্পর্কে জেনে নিতে পারেন, তাতে বুঝতে সুবিধা হবে, সেইসব মহামারি প্রশমিত করতে বা নির্মূল করতে ভ্যাকসিন কী ধরনের ভূমিকা রেখেছে। যা ঠিক এই সময়টাতে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা প্রতিরোধে দরকার।

১৫০০ সালের আগে
এক হাজার বছর আগেও মানুষ বুঝতে পারত, রোগ প্রতিরোধ করা এবং সেই রোগের সংস্পর্শে আসার মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। প্রাচীন কালে চাইনিজ অধিবাসীরা স্মল পক্স বা গুটিবসন্ত থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্যে অসুস্থদের আক্রান্ত অংশের শুকনো চামড়া নিয়ে সেগুলি গুঁড়া করে নিজেদের শরীরে মাখত। এই উপায়ে টিকা দেওয়ার ধরন আফ্রিকা থেকে শুরু হয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শেষ পর্যন্ত ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়ে।

১৬ শতক
গুটিবসন্ত, হাম ও হুপিং কাশি সে সময় অনেক কমন ছিল। সারা বিশ্বেই বেশ কিছু মহামারি হয়েছিল এসব রোগের। বিশেষ করে জনবহুল ও অপরিষ্কার শহরগুলিতে এসব সংক্রামক রোগ ছড়াত বেশি। বাচ্চারা বেশি ঝুঁকিতে থাকত। ইংল্যান্ডে ষোড়শ শতাব্দীর রেকর্ড থেকে জানা গেছে, সেসময়কার ৩০% শিশু ১৫ বছরের আগেই হুপিং কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া, গুটিবসন্ত, স্কারলেট জ্বর, আমাশয় ইত্যাদি রোগে মারা যেত।

১৭ শতক
ক্রিস্টোফার কলম্বাস যখন ১৪৯২ সালে আমেরিকা আবিষ্কার করলেন। তিনি ও তার পরে আসা ইউরোপিয়ানরা সেই অঞ্চলে নিজেদের সাথে করে গুটিবসন্ত, জলবসন্ত, হাম, হুপিং কাশি, টাইফাস, ম্যালেরিয়া, প্লেগ ইত্যাদি রোগও নিয়ে আসে। এসব ইউরোপিয়ান অভিযাত্রীর সংস্পর্শে এসে সেখানকার আদিবাসীরা দলে দলে মারা যেতে থাকে। তাদের আগে কখনো এসব রোগ হয়নি, ফলে তাদের শরীরে এই রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতাও ছিল না। ১৫০ বছর ধরে তাদের ওপর এই মহামারির আক্রমণ চলে। আদিবাসীদের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

১৮ শতক
অষ্টাদশ শতক ছিল ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সন্ধিক্ষণ। ইউরোপিয়ানরা বুঝতে পারে, বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়েও যারা রেহাই পেয়ে গেছে, তারা ভবিষ্যতে সেই রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে নিরাপদ। ফলে চিকিৎসাবিদরা একেবারে প্রাথমিক স্তরের টিকার ব্যবস্থা করেন—নিজেদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো রোগে আক্রান্ত করে শরীরে তার প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

এ পদ্ধতিতে ঝুঁকি অনেক বেশি থাকলেও এর মাধ্যমেই ভ্যাকসিন তৈরির মূল সূত্র খুঁজে পান গবেষকরা। ফলে ব্রিটিশ ডাক্তার অ্যাডওয়ার্ড জেনার বিশ্বের প্রথম সফল ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে পারেন। তাকে প্রতিষেধক বিদ্যার প্রবর্তক মনে করা হয়। ১৭৯৬ সালে তিনি বুঝতে পারেন, গুটিবসন্তের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে হলে মানুষকে কাউপক্স বা গবাদি পশুর বসন্তরোগের ভাইরাস দিয়ে আক্রান্ত করতে হবে, তা ভ্যাকসিন হিসাবে কাজ করবে। ‘ভ্যাকসিন’ শব্দটার বর্তমান ব্যবহারও শুরু হয় সেসময় থেকেই।

ছবিতে একজন চিকিৎসক ১৮৭২ সালে দরিদ্র নিউ ইয়র্কবাসীদের গুটিবসন্তের টিকা দিচ্ছেন ।

১৯ শতক
এরপর অ্যাডওয়ার্ড জেনারের ব্যবহৃত পদ্ধতি ভ্যাকসিনেশনের জন্যে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তার প্রায় ৮৫ বছর পরে ভ্যাকসিন তৈরি বা আবিষ্কারে ব্যাপক অগ্রগতি হয়। যখন লুই পাস্তুর ব্যাকটেরিয়াকে বিভিন্ন রোগের মূল কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেন। এই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তিনিই প্রথম ল্যাবরেটরিতে ভ্যাকসিন তৈরিতে সক্ষম হন।

২০ শতক
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে হলুদ জ্বর ও পোলিওর মত সংক্রামক রোগবালাই ইউরোপ এবং আমেরিকা জুড়ে প্রাণনাশ করতে থাকে। এই শতাব্দীতেই বিজ্ঞানীরা পূর্ববর্তী সব প্রতিষেধক বিদ্যার ফলাফল কাজে লাগিয়ে প্রধান ২৭টি সংক্রামক রোগের ভ্যাকসিন তৈরি করে ফেলে। ২০০০ সালের মধ্যে শত শত বছর পুরানো হাম ও গুটিবসন্তের মত মহামারি পৃথিবী থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। সেই সাথে প্রায় নির্মূল করা হয় পোলিও ও হলুদ জ্বর।

২১ শতক
১৯৯৫ সালের পর থেকে আমেরিকায় শিশুদের টিকার তালিকায় আরো ৫টি নতুন ভ্যাকসিন যুক্ত করা হয়ে, যা কয়েক হাজার জীবন বাঁচিয়েছে। নবজাতকদের ফুসফুস, রক্ত ও ব্রেইনে ইনফেকশন সৃষ্টি করে নিউমোকক্কাল রোগ। সেখান থেকে পরিত্রাণের জন্য ২০০১ সালে নিউমোকক্কাল কনজুগেট ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয় আমেরিকায়, এতে প্রায় ১৩ হাজার শিশুর জীবন রক্ষা পায়। ২০০৬ সালের রোটাভাইরাস ভ্যাকসিন সেখানে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ হাজার মানুষকে হসপিটালে ভর্তি হওয়া থেকে রেহাই দেয়।

হামের ভ্যাকসিন আন্তর্জাতিকভাবে সফলতার সাথে ছড়িয়ে যাওয়ার কারণে ২০০০ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্যে এ রোগ থেকে মৃত্যুর হার প্রায় ৭৯ শতাংশ কমে গেছে।

ভ্যাকসিনের ভবিষ্যৎ
তবে এখনো এইচআইভি, ম্যালেরিয়া বা যক্ষ্মার কোনো কার্যকরী ভ্যাকসিন বের করা যায়নি। যক্ষ্মার প্রতিষেধক শিশুদের জন্য থাকলেও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যে নেই। যার কারণে এসব রোগে ভুগে সারা পৃথিবীতে এখনও লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। এছাড়া, ক্যানসার ভ্যাকসিনের নতুন একটি প্রজন্ম এখনো তৈরির শুরুর দিকে আছে, যা ক্যান্সারের বিরুদ্ধে আপনার শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তুলবে।

সূত্র. পাবলিক হেলথ ডটঅর্গ