মনোযোগ একবার নষ্ট হলে ফিরে পেতে সময় লাগে গড়ে ২৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ড

একটা হিসাব করে দেখুন তো, অ্যাভারেজ দিনে কাজ করার টাইমে মোট কত বার আপনার মনোযোগ নষ্ট হয়। যে সংখ্যা আসবে সেটাকে ২৫ দিয়ে গুণ করুন। গবেষকরা বলেন কাজের সময় প্রতিবার মনোযোগ অন্যদিকে গেলে তা আমাদের ২৫ মিনিটের মনোযোগ নষ্ট করে।

তার মানে ৫ বার মনোযোগ নষ্ট হলে আপনার টোটাল কাজের টাইম থেকে মোট ১২৫ মিনিট নষ্ট হয়!

ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার ডিজিটাল ডিস্ট্রাকশন বিষয়ের রিসার্চার গ্লোরিয়া মার্ক তার গবেষণা থেকে এই রেজাল্ট বের করেন।

তার হিসাব মতে, কাজের সময় একবার মনোযোগ চলে গেলে আবার সেই মনোযোগ আনতে আমাদের ২৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ড (প্রায় ২৫ মিনিট) এর মত সময় লাগে।

মনোযোগ নষ্ট হওয়ার নেট লস নিয়ে আরো অনেক স্টাডি আছে। গবেষকরা বলেন, ডিস্ট্রাকশন শুধু যে আমাদের কাজের সময় নষ্ট করে তা না, একবার ডিস্ট্রাক্টেড হলে কাজ শুরুর পরেও আধা ঘণ্টা পর্যন্ত এর প্রভাব থাকে।

তার মানে কাজের মাঝখানে ফেসবুক দেখতে গিয়ে যদি আপনি ৩০ সেকেন্ড নষ্ট করেন তাহলে আসলে আপনার ২৫ মিনিট ৩০ সেকেন্ড নষ্ট হচ্ছে।

এরকম ডিস্ট্রাকশন আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও খারাপ। ‍”রিসার্চে আমরা পেয়েছি, অ্যাটেনশন লস হলে প্রোডাক্টিভিটি কমার সাথে মানসিক চাপও বাড়ে, এমনকি এটা আপনার মধ্যে নেগেটিভ মুড তৈরি করে।”—নিউইয়র্ক টাইমসে গ্লোরিয়া মার্ক ‘ইমেল ব্যবহার, প্রোডাক্টিভিটি ‌ও স্ট্রেস’ বিষয়ে তার রিসার্চ থেকে এ কথা বলেন।

“রিসার্চে আমরা পেয়েছি, অ্যাটেনশন লস হলে প্রোডাক্টিভিটি কমার সাথে মানসিক চাপও বাড়ে, এমনকি এটা আপনার মধ্যে নেগেটিভ মুড তৈরি করে।”

কীভাবে গবেষকরা ডিসট্রাকশন মাপেন
রিসার্চটি করার জন্য কিছু টেক ও ফিন্যান্স কোম্পানিতে পরিদর্শক পাঠানো হয়। তারা ৩ দিনের বেশি সময় ধরে সেখানকার অফিসের কর্মচারীদের পর্যবেক্ষণ করেন। প্রতিটি কর্মী কী কাজ করছে এবং কত সময় ধরে সেই কাজটি করছে এগুলির সব রেকর্ড রাখা হয়। ওই রেকর্ডগুলি অ্যানালিসিস করে তারা বের করেন, অ্যাভারেজে প্রতি ৩ মিনিট ৫ সেকেন্ড পর পর কর্মীরা এক কাজ থেকে অন্য কাজে শিফট করেছেন। এই রিসার্চ অবশ্য ২০০৪ সালের।

টকস অ্যাট গুগল ভিডিওতে গ্লোরিয়া মার্ক, ১২ জানুয়ারি ২০১৮ । লিংক

পরবর্তীতে গ্লোরিয়া মার্ক নতুন কিছু তথ্য দেন এ বিষয়ে, আজা রাসকিনের সাথে তার এক পডকাস্টে:

“আমাদের সবশেষ যে ডেটা আছে সেখানে আমরা দেখেছি কমপিউটার স্ক্রিনে মানুষের অ্যাটেনশন ধরে রাখার মেডিয়ান সময় মাত্র ৪০ সেকেন্ড।”

চিন্তা করুন, মাত্র ৪০ সেকেন্ডের বেশি সময় যদি ফোকাসড থাকতে না পারেন তাহলে কাজ কীভাবে আগাবে!

রিসার্চাররা আরও দেখেন, অর্ধেক সময় মানুষ নিজের ইচ্ছাতেই মনোযোগ নষ্ট করে। যেমন কাজের মাঝখানে ফেসবুকের নোটিফিকেশন দেখতে গিয়ে মনোযোগ নষ্ট করা। কোনো কোনো সময় অবশ্য অফিসের কলিগেরা মনোযোগ নষ্ট হওয়ার কারণ হয়ে দাড়ায়।

আমরা যেন নিজেদের চিন্তাশক্তির সাথে টেনিস বলের মতন খেলি। একবার এইদিকে মারি আবার অন্যদিকে। তফাৎ হল আমাদের ব্রেন টেনিস বলের মত এত জলদি রেসপন্স করতে পারে না। এক কাজ থেকে অন্য কাজে সুইচ করতে আমাদের ব্রেনের এক্সট্রা সময় লাগে।

অফিসে কারো যদি এরকম স্বভাব থাকে অন্যদের কাজের মাঝখানে ডিস্টার্ব করার, তাহলে এর নেগেটিভ প্রভাব একজন থেকে পুরো অফিসে ছড়িয়ে পড়ে।

“অফিসে কারো যদি এরকম স্বভাব থাকে অন্যদের কাজের মাঝখানে ডিস্টার্ব করার, তাহলে এর নেগেটিভ প্রভাব একজন থেকে পুরো অফিসে ছড়িয়ে পড়ে।”

পডকাস্টে গ্লোরিয়া মার্ক আরও বলেন, তারা স্টাডিতে দেখেছেন কর্মীরা কাজের মধ্যে অ্যাভারেজে ৭৪ বার ইমেইল চেক করে! এদের মধ্যে এমন লোকও আছেন দিনে যাদের ৪৩৫ বার পর্যন্ত ইমেইল চেক করার রেকর্ড আছে!

“একবার কাজে বাধা পাওয়ার পরে আমাদের ব্রেনকে আবার সেই আগের চিন্তায় আনতে জোর খাটাতে হয়। ব্রেনে এজন্য এক্সট্রা চাপ পড়ে। নিজেকে বার বার জিজ্ঞেস করতে হয় তখন কী ভাবছিলাম।”

এসবের কারণে যে কেবল সময় নষ্ট হয় তাই না, অনেক ভাল ভাল চিন্তাও মাথা থেকে হারিয়ে যায়।

“মানুষ যখন সাড়ে দশ মিনিট পর পর তার চিন্তার বিষয় শিফট করে তখন তার পক্ষে গভীরভাবে কিছু ভাবা আর সম্ভব হয় না। এটা তার কাজের ফ্লো নষ্ট করে দেয়।”

নিজেকে মাল্টিটাস্কার ভাববেন না
আমরা অনেকই এরকম ভাবি, মাল্টিটাস্ক করলে আমাদের মনোযোগ বুঝি নষ্ট হয় না। বরং অনেকে এরকম ভাবেন যে এভাবে কাজ করেই তারা বেশি প্রোডাক্টিভ থাকতে পারছেন। এই চিন্তা ভুল।

বিখ্যাত ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট এবং লেখক পিটার ড্রাকার ১৯৬৭ সালে তার ‘দা ইফেক্টিভ এক্সিকিউটিভ’ বইয়ে এই ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, “মোজার্ট যেমন একসাথে কয়েকটা কম্পোজিশন নিয়ে কাজ করতে পারতেন এবং তিনি মোজার্ট বলে এর সবগুলিই হত মাস্টারপিস। কিন্ত বাকিদের পক্ষে এমনটা করা সম্ভব ছিল না। অন্যান্য বিখ্যাত কম্পোজার যেমন বাখ, হ্যান্ডেল, হেইডন বা ভার্দি তারা কেবল একটা কাজ শেষ করার পরেই আরেকটাতে হাত দিতেন। যদি কাজ বাকি থাকত তখন দুই কাজের মাঝখানে একটা সময় গ্যাপ দিতেন। তাই এক্সিকিউটিভরা এটা ভাবলে ভুল করবে যে তারা সবাই মোজার্টের মত।”

এখন প্রশ্ন তাহলে কীভাবে আমরা কাজের সময় পুরো ফোকাসড থাকতে পারি?

ফোকাসড থাকার নন মোজার্ট স্টাইল
কাজের সময়টা সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখতে হবে। ওই সময়ে অন্য কোনো কিছুর ডিস্টার্বেন্স নেয়া যাবে না। সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট লোকেরাও পুরো ফোকাস ছাড়া তাদের বেস্ট কাজটা করতে পারেন না। তাই এক কাজের সময় অন্য কাজের কথা ভাবা একেবারেই উচিত না।

অবশ্য মোজার্টের সময়ের সাথে আমাদের সময়ের পার্থক্য অনেক। তখনকার সময়ে আপনি সবকিছু শিডিউল করে রাখতে পারতেন যে আমি ৩টা পর্যন্ত কাজ করব, কাজ শেষ হলে তারপর আমার মেইলবক্স চেক করব। সে সময়ের মানুষের এমনও হত, কাজে ডুবে থেকে শেষ পর্যন্ত হয়ত মেইলবক্স চেক করার কথাই ভুলে গেছে। এখন অবশ্য সমস্যা ভিন্ন। এখন মেইল চেক করতে গিয়ে আমরা কাজ করার কথা ভুলে যাই।

কর্মীদের জন্য ‘থিংক টাইম’
ইন্টেলের সফটওয়্যার এবং সার্ভিস গ্রুপ তাদের টিমে ঠিক এই সমস্যাটা দেখতে পায়। তারা দেখে টিম মেম্বাররা ডিপ চিন্তা করতে পারছে না এবং নতুন কোনো আইডিয়াও দিতে পারছে না। তখন তাদের ম্যানেজাররা সব কর্মীর জন্য ‘থিংক টাইম’ শিডিউল করেন। থিংক টাইমে একজন কর্মী কেবল তার কাজের সমস্যাগুলি নিয়ে ভাববে। এই সময় বাকিরা অন্য কোনো কাজের জন্য তাকে বলবে না। প্রোগ্র্যামটা এতটাই ভাল কাজে দেয় যে, পেটেন্ট করার মত ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়াও অনেক কর্মীর মাথা থেকে বের হয়েছে থিংক টাইমে।

Wistia-র সিইও ক্রিস স্যাভেইজ তার কোম্পানিতেও এরকম থিংকিং টাইম চালু করেন। তিনি বলেন, “নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, সেলফি স্টিক আবিষ্কারের কথা কি কখনো ভেবেছিলেন? বা কখনো ভেবেছিলেন এরকম জিনিস যে দরকার? উত্তরটা যদি না হয়, তাহলে এটাই প্রমাণ করে আপনি চিন্তা করার জন্য নিজেকে যথেষ্ট সময় দিচ্ছেন না।”

নিজেকে মনোযোগী করার আরো কিছু উপায়
এটা তো স্বীকার করতেই হবে টেকনোলজি আমাদের ফোকাস আর প্রোডাক্টিভিটির ওপর অনেক প্রভাব ফেলেছে। এমনকি টেকনোলজি ব্যবহারের সাথে ডিপ্রেশনের সম্পর্ক নিয়েও অনেক স্টাডি হয়েছে। কিন্ত আমরা এই টেকনোলজি ব্যবহার করেই নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারি। চারপাশে অনেক প্রোডাক্টিভ অ্যাপ আছে যেগুলি আমাদের ফোকাসে থাকতে সাহায্য করবে।

আপনি যদি আইটি প্রফেশনাল হন তাহলে হয়ত অথোরাইজেশন নোটিস দেখতে গিয়ে প্রচুর সময় নষ্ট করেন। এক্ষেত্রে অটোমেটিং টুল ব্যবহার করতে পারেন যেটা সময় বাঁচিয়ে দিবে।

আবার কিছু অ্যাপ আছে কাজ করতে করতে যখন ক্লান্ত হয়ে যাবেন, আপনাকে রিমাইন্ডার দিবে কিছুক্ষণ ব্রেক নিয়ে ধ্যান করার জন্য। মেডিটেশনের পরে যখন কাজ শুরু করবেন, সেটা আপনার কাজের ফোকাস বাড়িয়ে দিবে।

“এখন থেকে কাছের মানুষদের আপনার কাজের শিডিউল জানিয়ে রাখুন। তাদেরকেও বলুন যেন নিজেদের শিডিউল আপনাকে জানায়। তাহলে আপনি কাজের সময় ডিস্ট্রাকশন ছাড়া পুরো ফোকাসড থাকতে পারবেন।”

গ্রেট হতে চাইলে ফোকাসড থাকতে হবে
কাজে ডিস্ট্রাকশন হওয়ার আসল ক্ষতি কত ব্যাপক সেটা সবারই জানা উচিত। তখন ডিসট্রাকশন ছাড়া কীভাবে কাজ করা যায়, কীভাবে চিন্তা করা যায় আমরা সেই উপায় বের করতে পারব। এখন থেকে কাছের মানুষদের আপনার কাজের শিডিউল জানিয়ে রাখুন। তাদেরকেও বলুন যেন নিজেদের শিডিউল আপনাকে জানায়। তাহলে কাজের পুরোটা সময় আপনি ডিস্ট্রাকশন ছাড়া ফোকাসড থাকতে পারবেন।

এতে করে, সময়ের মধ্যে অনেক জরুরি কাজ শেষ করতে পারবেন।

মূল. ব্লেইক থর্ন (অনুবাদ. আমিন আল রাজী