‘মহামারি বিদ্যার জনক’ জন স্নো ও কলেরার কারণ আবিষ্কার

'আ কোর্ট ফর কিং কলেরা', ১৮৫২। সেই সময়কার লন্ডন বস্তির সাধারণ দৃশ্য।

অধ্যাপক পল ফাইন লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিকাল মেডিসিনে এপিডিমিওলজি বিষয়ক কোর্সের অধ্যাপনা করেন। তিনি সাধারণত কোর্সের শুরুর দিনই শিক্ষার্থীদের জন স্নো’র গল্পটা বলেন। স্নো ছিলেন ভিক্টোরিয়ান আমলে লন্ডনের একজন ডাক্তার। মানুষ বলে, তার নামের মতোই একজন খাঁটি লোক ছিলেন তিনি। নিরামিষভোজী, চিরকুমার। এমনকি তিনি মদও খেতেন না কখনো। রাণী ভিক্টোরিয়া যখন তার অষ্টম সন্তান প্রিন্স লিওপল্ডের জন্ম দিচ্ছিলেন, অ্যানাসথেসিয়া দেয়ার জন্য তখন স্নো তার পাশে ছিলেন।


যেভাবে ‘মহামারি বিদ্যার জনক’ রোগ এবং ভূগোলের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন

ডেইরড্রে মাস্ক
টাইম, ১৪ এপ্রিল ২০২০


তবে স্নো’র জীবনের দুইটা দিক ছিল। বাকিংহাম প্যালেস থেকে অনেক দূরে লন্ডনের বস্তিতে আর রাস্তাঘাটে তিনি এমন একটা উদ্দেশ্য নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, যা তার পেশার সাথে সম্পর্কিত না। তিনি সেসব জায়গায় ঘুরে ঘুরে কীভাবে কলেরা ছড়িয়ে পড়ছিল তা বোঝার চেষ্টা করতেন।

ধারণা করা হয়, মধ্যপ্রাচ্য আর রাশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার আগে সর্বপ্রথম ভারতে কলেরার উদ্ভব হয়েছিল। তবে ইংল্যান্ডে কলেরার প্রাদুর্ভাব প্রথম শুরু হয় ১৮৩১ সালে। সেই সময় জীবাণু বা অণুজীবদের রোগ ছড়ানোর কারণ মনে করা করা হত না। বরং চিকিৎসা বিজ্ঞানী আর ডাক্তারদের মধ্যে ‘মিয়াজমা থিওরি’ নামের একটা তত্ত্ব জনপ্রিয় ছিল। সেই তত্ত্ব অনুযায়ী মনে করা হত, রোগাক্রান্ত জায়গা থেকে গন্ধ বা বাষ্পের মাধ্যমে রোগ ছড়ায়। সোজা কথায়, গন্ধকে শুধুমাত্র রোগের লক্ষণ হিসেবেই বিবেচনা করা হত না। বরং ধরা হত, গন্ধ জিনিসটা আসলে রোগ।

চিকিৎসক হওয়ার আগে একজন ডাক্তারের অধীনে শিক্ষানবিশ হিসেবে স্নো নিউক্যাসলের কলেরা রোগাক্রান্ত কয়লা খনি শ্রমিকদের চিকিৎসা করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি জানতেন, কলেরার লক্ষণ প্রথমে নাকে নয়, বরং পেটে বা পাকস্থলিতে দেখা দেয়। তিনি একটা বিষয়ে সঠিক অনুমান করেছিলেন। তার অনুমান ছিল, রোগটা মূলত দূষিত পানি পান করা এবং অপরিষ্কার হাত দিয়ে খাবার খাওয়ার মাধ্যমে ছড়ায়।

স্নো মূলত তার চারপাশের পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এই অনুমানে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি তার কলেরা আক্রান্ত প্রতিবেশীদের সম্পর্কে আরো কিছু জানতেন। এমন কিছু জানতেন, যা তিনি মেডিকেল স্কুলে শিখেননি। স্টিভেন জনসন তার অসাধারণ বই, ‘দ্য ঘোস্ট ম্যাপ’-এ লিখেছেন, “স্নো কেবল পাবলিক হেলথ ট্যুরিস্ট ছিলেন না। সকল দুর্দশা আর মৃত্যু চেয়ে দেখে তারপর নিজের সুরক্ষার জন্য ওয়েস্টমিনস্টার বা কেনসিংটনে ফিরে যাচ্ছেন না।”

মহামারির কেন্দ্রস্থল ব্রড স্ট্রিটের মাত্র কয়েকটা রাস্তা পরেই তার বাসা ছিল। যদিও পেশাগত জীবনে রাণীর চিকিৎসক হওয়ার মত অবস্থানে পৌঁছেছিলেন, কিন্তু ছোটবেলা থেকে তিনি দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছেন। আর তাই অধিকতর স্বচ্ছল পরিবার থেকে উঠে আসা অনেক চিকিৎসকের মত রোগের জন্যে তিনি নিম্ন শ্রেণির মানুষদের অভ্যাসকে দোষ দিতেন না। জনসন তার বইয়ে যেমনটা লিখেছেন, সেই সময় দরিদ্রদের মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ তাদের নৈতিক অধঃপতন ছিল না। বরং তারা মারা যাচ্ছিল, কারণ তাদেরকে আক্রান্ত করে ফেলা হচ্ছিল।

অধ্যাপক পল ফাইনকে তার অতি উৎসাহী ভক্তরা জন স্নো’র নাম অনুসারে স্নো-ফ্লেইক বা তুষারকণা নাম দিয়েছে। লন্ডনে স্যাকভিল স্ট্রিটে অবস্থিত জন স্নো’র পুরনো বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক ব্লক দূরেই তার অফিস। ফাইন জানান, কীভাবে স্নো ‘এপিডেমিওলজি’ বা মহামারি সংক্রান্ত বিদ্যার জনক হয়ে উঠেছিলেন।

আরো পড়ুন: ফ্যাশন দুনিয়ায় প্যারিস-বার্লিন কি আসলেই ট্রেন্ড সেটার

‘এপিডেমিওলজি’ হলো চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটা শাখা, যেখানে বিভিন্ন রোগ এবং মানুষের রোগাক্রান্ত হওয়ার কারণ নিয়ে গবেষণা ও অধ্যয়ন করা হয়। স্নো’র মতো সব এপিডেমিওলজিস্টরা হলেন ‘রোগের গোয়েন্দা’। কীভাবে, কেন এবং কোথায় রোগ ছড়াচ্ছে তা নিয়ে গবেষণা করেন তারা। আর জনস্বাস্থ্যের কল্যাণে তাদের গবেষণালব্ধ তথ্য ব্যবহার করা হয়।

জন স্নো (১৮১৩-১৮৫৮)

সেই সময়ের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা ব্যবস্থার পক্ষ থেকে স্নো’র যুক্তিগুলিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি নিজের এই দাবিতে অটল ছিলেন যে, দূষিত পানির মাধ্যমেই কলেরা ছড়িয়ে পড়ছিল। স্নো’র আমলে টয়লেটের যাবতীয় মল আর বিষ্ঠা সেসপিট নামের একটা কূপে গিয়ে জমা হত, যেগুলির আকার থাকত সাধারণত বেজমেন্টের চাইতে কিছুটা বড়। কখনো কখনো এই ধরনের বর্জ্য বাসার বাইরে স্টোরেজ ট্যাঙ্কে জমতে থাকত। সেই ট্যাঙ্কগুলি এমনভাবেই নকশা করা হত, যাতে বর্জ্যগুলি থেকে তরল অংশ ঝরে পড়ে। আর এভাবে দিনে দিনে শুকিয়ে কঠিন হয়ে আসা বর্জ্যগুলি ‘নাইট-সয়েলম্যান’ নামে পেশাজীবী মানুষরা সংগ্রহ করে নিয়ে যেত। তারপর তারা সেইসব বর্জ্য কৃষকদের কাছে সার হিসেবে বিক্রি করত। আবার অন্যদিকে সেসপিটগুলি নর্দমার সাথে যুক্ত থাকতো, যেগুলি সরাসরি টেমস নদীতে গিয়ে পড়ত। আবার টেমস নদীই ছিল তখন লন্ডনের পানীয় জলের মূল উৎস। এতে করে নর্দমার পানির সাথে খাবার পানি একসাথে মিশে যেত।

১৮৫৪ সালে যখন কলেরা লন্ডনের সোহো এলাকায় আঘাত হানে, তখন খুব দ্রুতই রোগটা ছড়িয়ে পড়ে। সেই মহামারির ফলে শেষ পর্যন্ত প্রায় ছয় শতাধিক মানুষ মারা যায়। স্নো সেই সময় কলেরা সংক্রান্ত অন্য একটা তদন্তের মাঝামাঝি পর্যায়ে ছিলেন। তিনি পানি সরবরাহের ব্যবস্থার সাথে রোগটির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তবে সোহো এলাকাটা ছিল তার বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক ব্লক দূরে। তাই বিশেষ করে মহামারির এই ঘটনাটার সাথে তার জীবন খুব শীঘ্রই জড়িয়ে যায়।

স্নো’র ভাগ্যই বলতে হবে, তিনি বেঁচে থাকতে থাকতেই ইংল্যান্ডে শান্তভাবে আরেকটা নতুন ধরনের বিপ্লব ঘটছিল। ১৮৩৭ সালে দেশটার সরকারী প্রতিষ্ঠান জেনারেল রেজিস্টার অফিস নাগরিকদের জন্ম এবং মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করা শুরু করে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদের ভাগ বাটোয়ারা যাতে আরো সহজে করা যায়, সেজন্য সংসদ থেকে এই উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু এর ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবেই এর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়। কেন্দ্রীয়ভাবে নাগরিকদের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করার ফলে নাটকীয়ভাবে শহরের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিও উন্নত হয়। এর ফলে লন্ডনের মানুষ কীভাবে মারা যাচ্ছিল, তা প্রথমবারের মত যে কারোর জানার সুযোগ তৈরি হয়।

সেই সময়কার যেসব সূক্ষ্ম আর নির্ভুল পরিসংখ্যানগুলি পাওয়া যায়, সেগুলি কেবল নাগরিকদের রাস্তার ঠিকানা জানার কারণেই সম্ভব হয়েছিল। অনেক আগ থেকেই সতর্কতার সাথে লন্ডনের মানচিত্র তৈরি করা ছিল। তবে তখন পর্যন্ত বাড়ির নাম্বারিং করার ধারণা ছিল না।

১৭৬৫ সালের একটা সংসদীয় আদেশে সব বাড়ির জন্য নাম্বার বরাদ্দ করার ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া হয়। সেই আদেশে বলা হয়, সব বাড়ির দরজায় সেই বাড়ির নাম্বার স্পষ্ট করে লিখে রাখতে হবে। এতে করে জেনারেল রেজিস্টার অফিস কে বা কারা মারা গেছে শুধু তা-ই জানত না, বরং কোথায় তারা মারা গেছে, সেটাও তাদের জানা ছিল। আর কারো মারা যাওয়ার ‘জায়গা’ সম্পর্কে জানাটা জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। ঠিকানা জানা থাকার ফলে রোগের আবাসস্থল জানা সম্ভব হয়।

আরো পড়ুন: ডোপামিন যেভাবে মস্তিষ্কের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে

কোনো এক মঙ্গলবারে গোল্ডেন স্কয়ারের মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ডেথ সার্টিফিকেটগুলি নীরিক্ষা করতে স্নো রেজিস্টার অফিসে যান। প্রতিটা সার্টিফিকেটে তারিখ, মারা যাওয়ার কারণ আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে তাদের ঠিকানা উল্লেখ করা ছিল। তিনি খুব দ্রুতই বুঝে যান, সবগুলি মৃত্যুর ঘটনাই ব্রড স্ট্রিটের কাছাকাছি জায়গাতেই ঘটেছিল।

সোহো’তে কলেরা আঘাত হানার ৬ দিনের মাথায় এলাকাটির তিন চতুর্থাংশ বাসিন্দা পালিয়ে যায়। বাকিরাও যখন এলাকা ছাড়ার উপক্রম করছিল, তখন স্নো সেখানে যারা মারা গেছে তারা কোথা থেকে পানি সংগ্রহ করত, তার তদন্ত করছিলেন। আক্রান্তদের মধ্যে যারা ব্রড স্ট্রিট থেকে কিছুটা দূরে বসবাস করতেন, তাদের পরিবারের কাছ থেকে জানা যায়, তারা কিছুদূর গিয়ে একটা পাম্প থেকে খাবার পানি নিয়ে আসত। কারণ সবাই ভাবত, পাম্পের পানি পরিষ্কার। আরো জানা যায়, কিছু হতভাগ্য শিশু তাদের স্কুলে যাওয়ার পথে পাম্পের পানি খেয়ে মারা গেছে। অন্য যারা আক্রান্ত হয়েছিল, তারা না জেনেই সেই পানি খেয়েছিল। আশেপাশের পাবগুলিতে বারটেন্ডাররা পাম্পের পানিতে স্পিরিট মিশিয়ে বিক্রি করত। আর কফি শপগুলি সেই পানিতে শারবাট গুড়া মিশিয়ে কোমল পানীয় হিসেবে বিক্রি করত। শারবাট ছিল সেই সময়কার জনপ্রিয় পাউডার, যেটা পানিতে মিশিয়ে বিভিন্ন ফ্লেভারের পানীয় তৈরি করা যেত।

কিন্তু পাম্পের পানিতেই যদি কলেরা থাকত, তাহলে পাম্পের আশেপাশে যারা ছিল, তারা কেন আক্রান্ত হলো না? স্নো’র কাছে এই প্রশ্নেরও একটা উত্তর ছিল। পোল্যান্ড স্ট্রিটের একটা কারখানায় পুরুষরা উল ছাড়াতেন আর মহিলারা তা বুনতেন। কারখানাটার চারপাশের অনেকগুলি বাড়িতেই কলেরা আক্রান্ত রোগী ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে মারা গিয়েছিল মাত্র ৫ জন। স্নো সিদ্ধান্তে আসলেন, যদি কারখানার আশেপাশে বাস করা মানুষদের মৃত্যুর হার ব্রড স্ট্রিটের তিন দিকে বাস করা মানুষদের মৃত্যুহারের সমান হত, তাহলে প্রায় ১০০ জনের বেশি মানুষের মারা যাওয়ার কথা ছিল। আরো খোঁজখবর নেয়ার পরে স্নো জানতে পারেন, কারখানাটার নিজস্ব পাম্প আছে।

বৃহস্পতিবারে, অর্থাৎ তদন্ত শুরু করার দুইদিন পরে স্নো একটা সভায় অংশগ্রহণ করেন। সেই সভায় মহামারি তদন্তের জন্য গঠিত একটা বিশেষ কমিটির সদস্যদের সাথে তার আলোচনা হয়। তিনি সভায় সেই পাম্পের হ্যান্ডেলটা খুলে ফেলার প্রস্তাব দেন, যাতে করে পাম্পটা কার্যত অচল হয়ে যায়। কিন্তু পাম্পটার পরিষ্কার পানির উপরে অধিবাসীদের আস্থা এতই বেশি ছিল, তারা কেউ’ই এই সিদ্ধান্তে খুশি হতে পারেননি। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত তারা পাম্পটার হ্যান্ডেল সরিয়ে ফেলার ব্যাপারে সম্মত হন। এর ফলে মহামারির প্রকোপ কমতে থাকে। আর খুব দ্রুতই সেই এলাকা থেকে কলেরা দূর হয়ে যায়।

জন স্নো’র ব্যাপারে প্রোফেসর ফাইনের গল্প শেষে তিনি স্নো’র লেখা বই ‘অন দ্য মোড অফ কম্যুনিকেশন অফ কলেরা’র একটা কপি বের করে দেখান। বইটা প্রকাশ করতে স্নো’র প্রায় ২০০ পাউন্ড খরচ হয়েছিল। অথচ বইটা বিক্রি হয়েছিল মাত্র ৫৬ কপি। তিনি সতর্কতার সাথে বইয়ের মাঝখান থেকে একটা জীর্ণ মানচিত্র বের করেন। মানচিত্রটা একটা স্বচ্ছ টেপ দিয়ে জোড়া লাগানো ছিল। এটা ছিল ব্রড স্ট্রিট এলাকায় ঘটে যাওয়া সেই মহামারির মানচিত্র। যদিও মানচিত্রটি তৈরির উদ্দেশ্যে ভিন্ন ছিল, কিন্তু স্নো এটাকে নিজের ব্যবহারের জন্য বানিয়েছিলেন। সাবধানে তিনি প্রতিটা মৃত্যুর জায়গাকে যোগ করে মোটা আর কালো রেখা টেনেছিলেন। ম্যাপটার দিকে তাকালে দেখা যায়, মৃত্যুর সেই ভয়ানক কালো রেখার বেশিরভাগ অংশই পাম্পটার আশেপাশে জড়ো হয়ে আছে। খুব স্পষ্ট আর যুক্তিগতভাবে ম্যাপটা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, পাম্পটাই মহামারি ছড়ানোর মূল উৎস ছিল।

১৮৫৪ সালে জন স্নো’র বানানো ব্রড স্ট্রিটের বিখ্যাত ম্যাপ

একজন মেডিকেল জিওগ্রাফার বা চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ের একজন ভূগোলবিদ হিসেবে টম কচ জানান, স্নো’র আমলে কোনো রোগ নিয়ে গবেষণা করার সময় মানচিত্রের ব্যবহার একটা বিরল ঘটনা ছিল। ভ্যালেন্টাইন সিম্যান যুক্তরাষ্ট্রে স্মল-পক্সের টিকার উদ্ভাবনে সহায়তা করেছিলেন। তিনি ১৭৯৫ সালে নিউ ইয়র্ক সিটিতে ইয়েলো ফিভারের সমস্ত ঘটনা একটা মানচিত্রে চিহ্নিত করেছিলেন। এরপরে তিনি সেই মানচিত্রে শহরের সবগুলি ময়লা ফেলার জায়গা চিহ্নিত করেন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে আসেন, এই দুটি বিষয় পরস্পরের সাথে কোনো না কোনোভাবে জড়িত। দুর্ভাগ্যক্রমে, তিনি সেই মানচিত্র দিয়ে রোগটির আসল কারণ, অর্থাৎ মশার সাথে ইয়েলো ফিভারের সম্পর্ক তুলে ধরতে পারেননি।

১৮৩২ সালে শুধুমাত্র সময় কাটানোর জন্যে গ্লাসগো’র একটা মানসিক আশ্রমের বাসিন্দারা মিলে ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির একটা মানচিত্র তৈরি করেন। কিন্তু রোগ সংক্রান্ত মানচিত্র যারা তৈরি করেন, পরবর্তীকালে কলেরার মানচিত্র তৈরি করতে তারা অনেক বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। কারণ এই রোগটা ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সেজন্যেই হয়ত অনেকে বলেন, কলেরাই সত্যিকার অর্থে প্রথম বিশ্বব্যপী ছড়িয়ে পড়া রোগ।

এপিডেমিওলজিস্ট হিসেবে অধ্যাপক ফাইন রোগের ম্যাপিং করার ক্ষেত্রে নিজের কর্তব্য যথাসাধ্য পালন করেছেন। যেমন, আফ্রিকায় কুষ্ঠরোগের বিস্তার অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি তার জীবনের অনেকগুলি বছর ব্যয় করেছেন। চকচকে লাল ফাইল ক্যাবিনেটের একটা সারি থেকে তিনি আকাশ থেকে তোলা পূর্ব আফ্রিকার দেশ মালাউই’র অনেকগুলি ছবি বের করে টেবিলের উপর ছড়িয়ে দেন। রাস্তার ঠিকানা বা দেশটার বেশিরভাগ এলাকার সঠিক মানচিত্র না থাকাতে গবেষণা করার জন্যে তাকে এগুলোর উপরই নির্ভর করতে হয়েছিল।

তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কাজ করার সময় মানুষের ঠিকানার সাথে রোগের সংযোগ নিয়ে তার মনে কখনো সন্দেহ জেগেছে কিনা। সাবধানতার সাথে মানচিত্রগুলি গোটাতে গোটাতে তিনি উত্তর দেন, এটা সংশয়ের অতীত একটা ব্যাপার। আমার আইডিয়াতে মৌলিক কিছু ছিল না। স্থান আর রোগ একেবারে অবিচ্ছেদ্য জিনিস।

অনুবাদ. ফারহান মাসউদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here