এটি সফল হলে কেবল মহাকাশযানেই চাষাবাদের দরজা খুলবে না, পৃথিবীতেও যেসব জায়গায় প্রাকৃতিক সম্পদ খুব সীমিত, সেসব জায়গাতেও চাষাবাদের পথ পাওয়া যাবে।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের বিজ্ঞানীরা ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন এ সপ্তাহে। প্রথমবারের মতো তারা এমন তাজা সবজি খেতে যাচ্ছেন, যা মহাকাশ স্টেশনেই চাষ করা। তার মানে, এই প্রথম পৃথিবীর বাইরে শূন্য অভিকর্ষে চাষাবাদ।

নাসার এই সবজি চাষের পরীক্ষাটির নাম ‘Veg-01’। এর আওতায় মহাশূন্যে লাল লেটুস চাষ করা হয়েছে। মহাকাশচারীরা শিগগিরই তা চেখে দেখতে যাচ্ছেন।

তারা ফসলের অর্ধেকটা একবেলায় খাবেন, স্যানিটাইজিং ওয়াইপ দিয়ে থালাবাসন ধোবেন, তারপর বাকি অর্ধেকটা রেখে দেবেন ফ্রিজে। সেটা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হবে গবেষণার জন্যে।

পরীক্ষা পুরোপুরি সফল হলে মহাকাশ অভিযানে একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটবে বলা যায়। এখন থেকে দীর্ঘ মহাকাশ অভিযানের কথা ভাবতে পারবেন বিজ্ঞানীরা।

নাসা বলছে, দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে মহাকাশযাত্রীরা বাগান করতে পারবেন। একদিকে তাতে খাদ্যের যোগান মিলবে। আরেকদিকে কাটবে দীর্ঘ যাত্রার একঘেয়েমি।

কেনেডি স্পেস সেন্টারের অ্যাডভান্সড লাইফ সাপোর্ট একটিভিটিজ বিভাগের প্রধান ড. রে হুইলার বলছেন, “মহাকাশে এ ধরনের তাজা খাবার পাওয়া গেলে যাত্রীদের মুডেও একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাছাড়া মহাশূন্যে রেডিয়েশনের হাত থেকে এটা সুরক্ষা দেবে।”

নাসার পেলোড বিষয়ক গবেষক ড. জিওইয়া মাসা বলেছেন, “বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকে যত দূরে যাবেন বা যত দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে বেরোবেন, ততো খাদ্যের জন্যে শূন্যে চাষাবাদের দরকার পড়বে। সেটা আবহাওয়ার রিসাইক্লিংয়েরও উপকারে লাগবে, আবার মনস্তাত্ত্বিক সুবিধাও পাওয়া যাবে।’

martha-7
ড. জিওইয়া মাসা

ভেজি প্রকল্পটি একটি স্বচ্ছ ভাজ করে রাখার উপযোগী হাপরকে গ্রিনহাউসের মতো করে ব্যবহার করে। তার ভেতরে শেকড়বাকর দিয়ে বানানো ম্যাট আর এলইডি আলো ব্যবহার করে চাষ করা যায় ফসল। বিজ্ঞানীরা দেখতে চান পৃথিবীর বাইরে রোমেইন লেটুস কতোটা নির্বিঘ্নে বাড়তে পারে। আর এই চাষে ব্যবহৃত এলইডি স্পেস স্টেশনে অন্য গবেষণার কাজেও লাগে।

তাজা সবজি চাষের এসব উপকরণ মহাকাশ কেন্দ্রে আনা হয়েছে গত এপ্রিলে। স্পেস এক্সথ্রি মিশনে কেপ ক্যানাভেরাল থেকে এগুলি আনার পর সংরক্ষণের জন্য স্থানান্তর করা হয় কলম্বাস মডিউলে। কক্ষপথে চাষের কাজ শুরু করার আগ পর্যন্ত সেখানেই সংরক্ষণ করা ছিল এগুলি।

মে মাসের ৭ তারিখে ভেজি প্রকল্পের উপকরণগুলি পরীক্ষার জন্যে সক্রিয় করেন এক্সপেডিশন থার্টি নাইন-এর ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার এবং নাসার মহাকাশচারী স্টিভ সোয়ানসন এবং রিক মাসত্রাচ্চিয়ো। তারা একটি পরীক্ষণ র‌্যাকে এগুলি স্থাপন করেন।সানগ্লাস পরা অবস্থায় গত ৮ মে লাল, নীল আর সবুজ এলইডি লাইট সক্রিয় করেন তারা। চেম্বারের মধ্যে ঢোকানো হয় একটি রুট ম্যাট আর ছয়টি বিশেষ ‘বালিশ’ যার মধ্যে পুরে দেওয়া লাল লেটুস পাতার বীজ।

plant-pillow-3
ভেজি চাষের ছোট ছোট বালিশ আকৃতি জমিতে লেটুস, শালগম, সুইস চার্ড, চাইনিজ বাঁধাকপি গাছ।
nasa-457
ফ্লোরিডায় নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টারে শুরুর দিককার ‘ভেজি এক্সপেরিমেন্ট’-এর একটি হার্ডঅয়্যার পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
plant-pillow-1
আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রে ‘ভেজি প্রকল্পে’ গজানো লাল লেটুস পাতা।

চারা জন্মাবার জন্যে প্রত্যেক বালিশে একশ মিলিলিটার করে জল সিঞ্চন করা হয়েছে। চারপাশের হাপরের মতো স্বচ্ছ দেয়াল উঁচু করে তোলা। প্রত্যেকটি বালিশ গাছের জন্য নিয়ন্ত্রিতভাবে সার ছাড়ে। এগুলোর ভেতর বেসবলের মাঠের মতো কেলসিয়ামযুক্ত কাদা পুরে রাখা, যা গাছের গোড়ার বাতাস চলাচলে সহায়তা করে।

ভেজি-ওয়ান পদ্ধতিতে ২৮ দিনে বীজ থেকে পরিপূর্ণ লেটুস জন্মাবার কথা। প্রতি সপ্তাহে এগুলোর বেড়ে ওঠার ছবি তোলা হয়েছে। পরিমাণমতো জল দেওয়া হয়েছে। চারা একটু বেড়ে উঠতেই বালিশের ওপরের আবরণ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে সেগুলো মাথা তুলতে পারে। গাছ আরেকটু বড় হলে ঘনত্ব কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রতি বালিশে একটি করে লেটুস গাছ। গাছের মধ্যে কোনো মাইক্রোব্যাকটেরিয়া জন্মেছে কিনা সে গবেষণার জন্যেও স্যাম্পল নেওয়া হয়েছে।

উইসকনসিনের ম্যাডিসনভিত্তিক অরবিটাল টেকনোলজিস করপরেশনের সহায়তায় নাসা চালু করেছে এই বিশেষ চাষ প্রকল্প। এটি সফল হলে কেবল মহাকাশযানেই চাষাবাদের দরজা খুলবে না, পৃথিবীতেও যেসব জায়গায় প্রাকৃতিক সম্পদ খুব সীমিত, সেসব জায়গাতেও চাষাবাদের পথ পাওয়া যাবে।

ইউটিউব ভিডিও:

Space Station Live: Veggie Harvest Shows Promise