মানুষ ও বানরের জেনেটিক মিশ্রণ—বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ

মানুষের সাথে অন্যান্য প্রাণির জেনেটিক মিশ্রণের নৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে অনেক আগে থেকেই। এইবার তাতে  নতুন সম্ভাবনা আনলো বিজ্ঞানীদের তৈরি বানর ও মানুষের প্রথম কাইমেরা।

কাইমেরা হলো একটা একক প্রাণিসত্তা যা গঠন করা হয় দুইটা ভিন্ন প্রাণির সমন্বয়ে। কাইমেরা শব্দটা এসেছে গ্রিক মিথোলজি থেকে; যেখানে সিংহের মাথা, ছাগলের শরীর ও সাপের লেজওয়ালা এক দানবের নাম ছিল কাইমেরা।

২০১৯ সালের জুলাই মাসে আমেরিকার সল্ক ইন্সটিটিউটের প্রফেসর হুয়ান কার্লোস বেলমন্টের নেতৃত্বে বিজ্ঞানিদের একটা দল বানর ও মানুষের প্রথম কাইমেরা তৈরিতে সফল হয়। রিপোর্ট মোতাবেক, এ গবেষণাটি চীনে করা হয়েছে আইনি জটিলতা এড়ানোর জন্য।

বিজ্ঞানিরা কাইমেরা উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় আরো দক্ষ হয়ে উঠতে পারলে অরগ্যান ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব পরিবর্তন চলে আসবে। যে মানুষের দেহে অঙ্গ প্রতিস্থাপন করতে হবে, তার সাথে জেনেটিক্যালি ম্যাচ করে এমন সব অঙ্গ অন্যান্য প্রাণির দেহেই উৎপাদন করা যাবে তখন।

পিছনে প্রফেসর হুয়ান কার্লোস বেলমন্ট

প্রথমে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের শরীর থেকে কোষ নিয়ে তা রি-প্রোগ্রামিং করে স্টেম সেলে রূপান্তর করা হয়। তারপর সেই স্টেম সেল অন্য প্রাণির ভ্রুণে অনুপ্রবেশ করানোর মাধ্যমেই কাইমেরা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু।

প্রফেসর কারলোস বেলমন্টে ও অন্যান্য বিজ্ঞানি মিলে এর আগে মানুষের কোষসম্পন্ন শূকর ও ভেড়ার ভ্রুণ উৎপাদন করেছেন। তবে সেগুলিতে মানবকোষের অনুপাত ছিল অল্প—প্রতি দশ হাজার কোষের মধ্যে মাত্র একটা ছিল মানুষের। কিন্তু মানুষের সাথে মিশ্রণের দিক থেকে বানর ও ভেড়া ব্যবহার করে কাইমেরা বানানো বেশি কার্যকরী ভূমিকা রাখবে, কারণ আকৃতির হিসাবে ভেড়া এবং বানরের শরীর মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় অঙ্গ ধারণ করতে পারে সহজেই।

এছাড়া কোনো জটিল রোগের প্রকৃতি বোঝা ও সেই রোগের চিকিৎসা আবিষ্কারের জন্য বিজ্ঞানিদের সাধারণত একটা প্রাইমেট মডেলের প্রয়োজন হয়। মডেলটা হতে পারে অন্য কোনো প্রাণি কিংবা নির্দিষ্ট কোষগুচ্ছ। সেই মডেলে মানুষের কোনো রোগের কার্যবিধি লক্ষ্য করে ওই অনুযায়ী বিজ্ঞানিরা তাদের গবেষণা এগিয়ে নিতে পারেন।

কিন্তু অনেক ব্যাধির ক্ষেত্রেই উপযুক্ত মডেল পাওয়া দুষ্কর। যেমন আলঝাইমার্স রোগের গবেষণায় এমন কার্যকর মডেলের অভাবেই সম্ভবত বিশ বছরে প্রায় ১৫০টা ট্রায়াল ব্যর্থ হয়েছে। বানর-মানুষের কাইমেরা এ ধরনের নিউরোলজিক্যাল ও মানসিক রোগের গবেষণা ও পরীক্ষার জন্য নতুন সব পদ্ধতি নিয়ে আসবে।

এখন একটা কাইমেরাকে আপনি কত দূর পর্যন্ত বেড়ে উঠতে দিবেন, সেখানেই আসলে নৈতিকতার প্রশ্ন চলে আসে। বিজ্ঞানিদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, যেহেতু কাইমেরাগুলিকে এত দূর পর্যন্ত বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া হয় না যাতে তাদের একটি পরিপূর্ণ স্নায়ুতন্ত্র গড়ে ওঠে, তাই এতে নৈতিক বাধা থাকার কথা না। কারণ এগুলি তো আসলে একগুচ্ছ কোষ ছাড়া আর কিছু না।

কিন্তু কাইমেরাদেরকে যদি আরো বেড়ে ওঠার সুযোগ দেয়া হয়, তখন বিষয়টা দায়িত্বশীলতার দিক থেকে জটিল হয়ে উঠতে পারে৷ ধরেন, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য আপনার একটা হার্ট কিংবা কিডনি দরকার। কাইমেরার মাধ্যমে সেই হার্ট বা কিডনি ডেভেলপ করা হলো—কিন্তু সেক্ষেত্রে কাইমেরার বেড়ে ওঠা ওই একটা অঙ্গেই সীমাবদ্ধ রাখা নিশ্চিত করতে হবে। সেই কাইমেরা যদি পূর্ণাঙ্গ এক প্রাণিসত্তা হিসেবে জন্ম নেয়, তখন নতুন এই সত্তার বৈশিষ্ট্য কেমন হতে পারে সে ব্যাপারে আগে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে না।

২০১৯ সালের মার্চে জাপানের জাতীয় এক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়৷ সেখানে এখন সরকারি সহায়তায় ইঁদুর-মানুষের কাইমেরা উৎপাদনের কাজ চলছে। জাপানে চাইলে এখন কাইমেরার ভ্রুণ ১৪ দিনের বেশি সময় ধরে বেড়ে উঠতে দেওয়া যাবে এবং সেই সাথে তা জরায়ুতে স্থাপনও করা যাবে। ফলে বিজ্ঞানিরা চাইলে কাইমেরাগুলিকে পূর্ণাঙ্গ প্রাণি হিসেবে জন্ম নেওয়ার সুযোগ করে দিতে পারবেন। তবে তাদের অত দূর পর্যন্ত যাওয়ার প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন না জাপানিজ বিজ্ঞানিরা।

যদিও মানুষ-বানরের পূর্ণাঙ্গ কাইমেরা এখনো পুরাপুরি তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এমনকি শুধু ইঁদুরের দুইটি আলাদা প্রজাতি থেকেও স্বয়ংসম্পূর্ণ কাইমেরা উৎপাদিত হয় নাই এখনো।

২০১৯ সালের এপ্রিলে চায়নায় প্রকাশিত একটা গবেষণাপত্র থেকে জানা যায়, বিজ্ঞানিরা মানুষের ব্রেইনের একটা জিন সফলভাবে বানরে স্থাপন করতে পেরেছেন। এতে করে বানরগুলির শর্ট-টার্ম মেমোরি বেড়ে গেছে আর কোনো ঘটনার বিপরীতে সেই বানরদের প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতায় এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। তবে জাপান কিংবা ইংল্যান্ডে বানর-মানুষের পূর্ণাঙ্গ জীবিত কাইমেরা তৈরির অনুমোদন পাওয়া যাবে না বলেই জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র. গার্ডিয়ান  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here