তারপর ওদেরকে একদিন ফেলায়া দেওয়া হইল। ওদের মায়ের ও আমার অনুপস্থিতিতে। পরিবারের সবাইকে আলাদা আলাদা ভাবে।

এখন আমরা অপেক্ষা করে বসে থাকব। কখন তার তাকিয়ে থাকা শেষ হয়। আর শক্ত দাঁত খানিক নরম হয়।

বিড়াল আমার ভাল লাগে নাই কখনো। একবার আমাদের নিচতলার বাসায়, আমার রুমের জানলা দিয়া এক গর্ভবতী বিড়াল আমার পড়ার টেবিলে কেসের পিছনে বাচ্চা দিছিল। তাদের নাম দিছিলাম চিকু, পিকু, লিকু, মিকু।

ওদের মধ্যে সবচেয়ে দুরন্ত ছিল মিকু। সে সবার আগে থরো থরো পায়ে কেসের পিছন থেকে বের হয়ে আসছিল। সবার আগে আমার আম্মার লাইজল দিয়ে মোছা আয়নার মতো কালো ফ্লোরে নিজেকে দেইখা ভয় পাইছিল। সে’ই সবার আগে খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমাইতে যাইত হেঁটে হেঁটে কেসের পিছনে। তার ভাই ও বোনেরা তার পরে পরে। গিয়া সবাই একসাথে পরিবার হয়ে ঘুমাইত। ওদের দেখে মনে হইত, ঘুম এভাবেই ঘুমাইতে হয়।

পরে মা আসলে উইঠা বা ঘুমের মধ্যে মাকে বুঝতে পাইরা চোখ বন্ধ করেই দুধ খাইত।

আমি স্কুল থেকে আইসা জামা না বদলায়া সেই বাচ্চাদের দেখতাম বিছনার উপর শুইয়া। ওরা আমার ভিন্ন দুনিয়া। আমার ছোটবেলার হৃদয়, ছোটবেলার মন তাদের নিয়া ভাবত। ঘুমের ঘোর কাটায়া কখনো কখনো ভাবত—মিকু আবার বের হইল কিনা! মিকু, বড় বড় চোখ করে তাকায় আমার মিকু। তাকে নিজের মনে হইত।

তারপর ওদেরকে একদিন ফেলায়া দেওয়া হইল। ওদের মায়ের ও আমার অনুপস্থিতিতে। পরিবারের সবাইকে আলাদা আলাদা ভাবে।

এত একা আমার কখনোই লাগে নাই। যেন মিকু কোথাও কানতেছে। কোনো চালের বস্তার ছোট ফাঁকে চোখ দিয়া জীবনে প্রথম বার ভয় পাইতেছে রিকশা যাওয়া দেইখা। সেই দেখা নিয়া আমার কত খা খা করত ভিতরটা।

বহুদিন করত।

তার মায়ের ফিরা আসা ছিল আরো ভয়ানক যন্ত্রণার। আমি মনে-প্রাণে অভিশাপ দিতাম যারা বাচ্চাগুলিকে ফালায়া দিছিল।

এরপর আবারো আরেক দোতলা বাসায় আমার বারান্দায় এক বিড়াল তিনটা বাচ্চা দিল। একজন অবিকল মিকুর মত দেখতে। আরেকজন কালো রঙের, শুধু তাকায়া থাকে। তার তাকানো দেখলে আমার আগের হাহাকার ফিরা আসত। সে কেন মিকুর মত? মিকু কি আছে এখনো? সেই বস্তার উপর দিয়া কোনো রিকশা যায় নাই তো? কেউ তাকে অন্য বস্তায় আবারো কোনো অন্যত্র ফেলায়া দেয় নাই তো? সবাই তাকে ফেলায়া দেয় কেন? কেউ কেন দেখে না সে কী সুন্দর নিজের ছায়া দেখে ভয় পায়?

ওরে মিকু!

আমার প্রিয় বন্ধু তার পোষা বিড়ালদের ছবি পোস্ট করছিল কতদিন আগে। আমি আমার টাইমলাইনে ‘সুন্দরী’ বলে সেই ছবি শেয়ার করছিলাম। বাদামি সোনালি এক বিড়াল মাথায় সাদা ফুল দিয়ে রোদ পোহায়। অত ছোট না। বা সে’ই মিনি কিনা কে জানে। আমার বন্ধু বলছে, ওরে সুন্দরী বলছ ক্যান, ও পোলা!

মিনি তার আরেকটা বিড়াল। সাড়ে পাঁচ মাস। আজকে তার মৃত্যুর দিন। আমরা অপেক্ষা করতেছি। আমি যেন নিজের মিকুকেই শেষ হইতে দেখতেছি।

মিনি খায় না কয়দিন। কান জইমা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। কিছু বলে না, নড়ে কম, শুধু তাকায়া থাকে।

তার স্যালাইন লাগত। আজকে তার দাঁত লাইগা গেছে। বহু লোকের সঙ্গে কথা বললাম। সবাই ভেটের কাছে নিতে বলল, আর বলল ও মারা যাবে।

ওরা থাকে মধুপুর। ওদের ভেট অর্থকরী প্রাণীদের দেখে। বিড়াল-কুকুর দেখে না। আমাকে আমার পরিচিতরা বিভিন্ন জিনিস খাওয়াইতে বলল। সবই বললাম। কিন্তু দাঁত লেগে আছে একসঙ্গে। অনেক চেষ্টায়ও ছোটানো গেল না।

মিনির চেষ্টা তো নাই, সে তাকায়া থাকে। যেন ছোট মিনি বলতেছে, চেষ্টা কেন করো?

মিনি তার খাঁচায় শুইয়া ছিল। এখন খাঁচা থেকে গিয়া ময়লায় শুয়ে আছে। থরো থরো পায়ে উঠছে নিশ্চয়ই, মিকুর হাঁটতে শিখার মত। সে ময়লাতেই থকতে চায়। গায়ে গরম কাপড় দেয়া। সে গরম বুঝতেছে কিনা কে জানে, শুধু তাকায়া আছে।

বন্ধুর অভিজ্ঞ পিসি আসছিল, দাঁত খোলার চেষ্টা করে পারে নাই। বলল আজকে রাতেই মারা যাবে ও। আমার বন্ধু বলল, চোখের সামনে বড় হইছে ও, খারাপ লাগতেছে অনেক।

আমি ওর বন্ধ দাঁত ভাবতে পারতেছি না। ওর চোখ, ও তাকায়া আছে দেখতেছি শুধু। আমাদের নিচতলার বাসায় ফিরা গেলে এখন হয়ত জানলা দিয়ে পথ চিনা চিনা মিকু লাফ দিয়া উইঠা আসবে আমার কাছে। আমরা মিনির মৃত্যুর অপেক্ষায় আছি।

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১