মুদ্রালজেন্স: বাংলাদেশি মুদ্রার জয়জয়কার

এক বেনসন সিগ্রেট ৯ টাকা হবার বহু আগে থেকেই এই মুদ্রার প্রচলন। তবে এর পরিপূর্ণ বিকাশে বেনসনের ৯ টাকা ভূয়সী অবদান রাখতে পেরেছে। যখন বেনসন ৮ টাকা তখনো ঢাকা শহরের বেশ কিছু জায়গায় চায়ের দাম ৬ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। একটা চা + একটা সিগ্রেট রাস্তার পাশের দোকানে সাকুল্যে গিয়ে দাঁড়ায় (দাঁড়াত) ১৪ টাকা। দোকানিকে ২০ টাকা দিলেও ভেজাল, ১৫ টাকা দিতে পারলেও ভেজাল। অবধারিতভাবে দোকানি আপনাকে ১ টাকা না-দিতে পারবে। দোকানির অব্যর্থ মুদ্রা তখন লজেন্স।

বেনসন ৯ টাকা হবার পর, বলাই বাহুল্য, দোকানি ও সিগ্রেটখোর উভয়েই চায়ের গুরুত্ব নতুন করে টের পেলেন। ৯+৬=১৫। সোজা হিসেব। লজেন্সমুদ্রার আর কোনো দরকার পড়ে না। টেনশনবিহীন সোজাসাপ্টা বিকিকিনি।

নতুন মুদ্রার পক্ষে দোকানিকে কোনো প্রমাণ সাইজের হাসি রাখতে হচ্ছে না। ‘লজেন্স খাই না’ বলে সাধারণ সত্যভাষণ দিয়ে ক্রেতার আরও খানিকক্ষণ সকল পক্ষকে স্থবির করে বিমূঢ় দাঁড়িয়ে থাকা লাগে না। দোকানির কোনো লজেন্স-খোর পুত্র বা কন্যা আশপাশে ঘুরঘুর করছে কিনা, নিরুপায় উপহার দেবার জন্য সে রকম খোঁজ লাগানো দরকার পড়ে না। ফলে, বেনসনের ১০ টাকায় উত্তরণ একই রকম আরামদায়ক পরিস্থিতি পুনর্সৃষ্টি করলেও ক্রিয়েটিভ মুদ্রা বাজারের ক্ষতিও কম করে নি।

চারপেয়ে সিগ্রেট-চা কিংবা ছয়পেয়ে পান-বিস্কুটের দোকান কিংবা নষ্ট-চাকার এসবকিছুর দোকান—এগুলোকেই মুদ্রালজেন্সের প্রধান উদ্ভাবনকারী ও চর্চাকারী মনে হতে পারে। সেটা সঠিকও বটে। তবে মুদ্রালজেন্সের বিকাশ এত পরিসীমিত নয়।

সাধারণ মুদি দোকান, মানে অপেক্ষাকৃত রকমারি পণ্যবিক্রেতা, এই মুদ্রা আবিষ্কারের কিছু কাল পর এর গুরুত্ব বিবেচনা করে দোকানে থাকা লজেন্সের একাংশকে এক টাকার মুদ্রা বানিয়ে ফেলল। করল্লা-কুমড়া-কচু-কদু বিক্রেতা থেকে শুরু করে লাউ-লালশাক-লতি-লেবু বিক্রেতা পর্যন্ত নতুন এই মুদ্রার সামর্থ্য নিয়ে নিশ্চিত হতে শুরু করলেন।

তবে এ কথা সত্য যে বিস্কুট-চা-সিগ্রেটওয়ালার তুলনায় করল্লা-লাউওয়ালার পক্ষে এই মুদ্রার ওকালতি করা খুব দুরূহ। এমন নয় যে চা বা সিগ্রেট-ভোক্তার তুলনায় করল্লা বা কদু-ভোক্তার লজেন্সপ্রীতি কম থাকবার কোনো ন্যায্য বা যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। তারপরও এ ধরনের বিক্রেতারা এই মুদ্রার স্বপক্ষে জোরাল ভূমিকা রাখতে তৎপর থাকেন না। এঁদের তুলনায় আরও অসুবিধাজনক অবস্থায় থাকেন মাছ বিক্রেতারা। হয়তো বসে-থাকা চটের নিচে আগেকার মুদ্রা রাখার তুলনায় মুদ্রালজেন্স রাখা অধিকতর অনারামদায়ক বলে।

ঢাকার নানান প্রান্তের নানান রাস্তার পাশের নানান রকম দোকানে গত কয়েক বছর ধরে এই মুদ্রালজেন্সের ধুন্দুমার প্রচলন।

লজেন্স
১ টাকার কাগজের মুদ্রা

শুরুতে হতভম্ব গ্রহীতাগণ কালক্রমে অত্যন্ত তুষ্টচিত্তে এই ১ টাকার মুদ্রা গ্রহণ করে থাকেন। ইদানীংকার অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এমনকি, দরকার পড়লে, ২ টাকার জায়গায় দুটি, ৩ টাকার জায়গায় তিনটি লজেন্স নিতেও তাঁদের বড়সরো বাধা নেই।

মুদ্রাগ্রহীতাদের বিহ্বলতা কেটে যাবার, কিংবা সন্তুষ্টি অর্জিত হবার, লক্ষণ হিসেবে দেখতে হবে লজেন্সের রকমফের বিষয়ে পছন্দ ব্যক্ত করতে থাকার মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ, এখনকার কোনো ১ টাকার মুদ্রালজেন্স গ্রহীতা একটা লাল প্যাকেটের মিষ্টি একটা বস্তু পেয়ে থাকেন, তিনি অনায়াসেই ওটা ফেরৎ দিয়ে সবুজ রঙের প্যাকেটের টক স্বাদের একটা বস্তু চাইতে পারেন।

শুধু তাই নয়, বহু জায়গায় দেখা যাবে, স্যোৎসাহে তিনি নিজের হাতে বয়াম খুলে পছন্দের বস্তুটি, মানে মুদ্রাটি, বের করে নিচ্ছেন। খুশি মনে, হাসিমুখে, দোকানির সঙ্গে চোখাচোখি করতে-করতে। এর থেকে অবশ্যই বুঝতে পারা যায় এই নবতর মুদ্রাপ্রস্তাব যেসব উৎকণ্ঠা কিছুকাল আগেও তৈরি করেছিল, সেগুলো ক্রমাগত লুপ্তপ্রায়।

বোঝা যায়, মুদ্রালজেন্স যে পক্ষেরই আবিষ্কার হয়ে থাকুক না কেন, যতদিনই তা একতরফা জোরাজুরি থেকে থাকুক না কেন, ধীরে ধীরে তা দ্বিপক্ষীয় আস্থা ও বিশ্বাসের স্মারক হয়ে উঠছে। বিভিন্ন জায়গায় লজেন্সগ্রহীতাকে অত্যন্ত ঝানুমুখে পাল্টাপ্রস্তাব করতে শোনা যায়, “আমিও ১ টাকার বদলে এখন তোমাকে একটা লজেন্স দিই?!”

একপক্ষের নিস্পৃহ ও গোঁয়ার মুদ্রা প্রচলনের জায়গায় দুই পক্ষের সার্বভৌমত্ব সৃষ্টি হওয়া মুদ্রাবাজারে নতুন দিগন্ত এনে দিয়েছে। ডলারের দাতা-গ্রহীতার মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রেষারেষি থাকতে পারে, কিন্তু স্থানীয় বাংলাদেশের লজেন্সপ্রবাহে শান্ত সংহতি বিরাজ করছে। এই নতুন মুদ্রাপ্রবাহের সঙ্গে তুলনা চলে কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়কালে বৈপ্লবিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বব্যাঙ্কের উদ্ভবকে।

লজেন্স
Perfetti Van Melle কোম্পানির আলপেনলিবে লজেন্সের জার। আগে প্রায় সব চা সিগারেটের দোকানে এই জার দেখা যেত। এই কোম্পানি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কনফেকশনারি সামগ্রী তৈরিকারক প্রতিষ্ঠান। Mondelēz International এবং Mars, Incorporated-এর পরেই এর অবস্থান। এর কর্মীসংখ্যা ১৭০০০ এবং ১৩০টি দেশে পণ্য সরবরাহ করে এই কোম্পানি। ইন্ডিয়ায় আলপেনলিবে উৎপাদন শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। – বি.স.

গোড়াতে মুদ্রালজেন্স হিসেবে ভারতীয় লজেন্সের একচ্ছত্র আধিপত্য লক্ষ্য করা যেত। আমি নানান প্রকারের মুদ্রা তথা লজেন্স মুখস্ত করতে শুরু করেছিলাম। এখন বলতে গিয়ে দেখি প্রায় কিছুই মনে পড়ে না। তারপরও ‘আলপেইন’ বা এরকম নামের কোনো একটা ভারতীয় লজেন্স/ক্যান্ডি/টফি প্রস্তুতকারীর অজস্র ধরনের মুদ্রাসাপ্লাই ছিল বাজারে। এদের পিপারমিন্ট স্বাদের অন্তত দুটো মুদ্রা (ছিল/আছে)—এয়ার আর মেন্টুস। আবার মেন্টুস সদৃশ নানাস্বাদের মুদ্রা (ছিল/আছে)—কমলা, স্ট্রবেরি আরও কী কী যেন। কফি স্বাদের অন্তত একটা। আরও কী কী যেন। এর বাইরে ওদের খুচরা দুই টাকা মূল্যের বস্তুপিণ্ড (ছিল/আছে)। কিন্তু মুদ্রা হিসেবে এগুলো অভিষিক্ত হয়ে ওঠে নি। ভারতীয় মুদ্রা তথা লজেন্সের এরকম জয়জয়কারের মধ্যে বাংলাদেশি মুদ্রা তথা লজেন্স কুণ্ঠিতভাবে বিরাজ করছিল।

যেটা বলার জন্য এই অবতারণা, বাংলাদেশের লজেন্স-মুদ্রার সেই দিন আর নেই। কাঁচা আম থেকে তেঁতুল স্বাদের নানাবিধ মোড়ক-মুদ্রাপিণ্ড সারা দেশে সয়লাব হয়ে গেছে। টক, ঝাল, মিষ্টি, আচারস্বাদু, মিল্কক্যান্ডি নামের চিনির ডেলা সকল কিছুর বিস্তর বিকাশ, বিস্তর প্রচার। ক্রমাগত ভারতীয় মুদ্রার (লজেন্সের) মুদ্রামান বাংলাদেশী মুদ্রা (লজেন্স) খোলাবাজারে দখল করে নিচ্ছে। ভারতীয় মুদ্রালজেন্স ক্রমাগত কোণঠাসা। আমার ধারণা কিছু লজেন্স কোম্পানি ইদানীং তৈরি হয়েছে একেবারেই মুদ্রাবাজারে মুদ্রা যোগান দেবার জন্য। এবং এগুলোর উৎপাদন-খর্চা আরও কম। হয়তো।

কভার. মানস চৌধুরী; ছবি. জয়দ বাংগালী  (২০১৫)