“তবে আমাকে দেখাতে হয়েছে চার্লস কীভাবে নারীদের মোহাবিষ্ট করে। আমি দৃশ্যগুলিকে খুব হালকা ভাবে দেখি না।”—পরিচালক প্রাওয়াল রামন

ভারত রাজপুরোহিত ওরফে চার্লস সোবরাজ (জন্ম. ১৯৪৪, ভিয়েতনাম) ইন্ডিয়ান ও ভিয়েতনামিজ বংশোদ্ভূত কুখ্যাত ফরাসি সিরিয়াল কিলার। প্রুফরিডার নামেও তিনি পরিচিত। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে ১৯৭২ থেকে ৭৬ সালের মধ্যে চার্লস সোবরাজ ১২ থেকে ২৪ জনকে খুন করেছেন। তার দ্বারা খুন হওয়া সাঁতারের পোশাক পরা এক নারীর মৃতদেহ উদ্ধারের পর সোবরাজকে প্রথম ‘বিকিনি কিলার’ ডাকা শুরু হয়।

১৯৭০ এর দশকে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কয়েকজন পশ্চিমা ট্যুরিস্টকে হত্যা করেছেন। তার ধূর্ততা এবং অদ্ভুত কৌশলে পালিয়ে যাওয়ার কারণে তার নাম হয়েছিল ‘দ্য স্প্লিটিং কিলার’ এবং ‘দ্য সারপেন্ট’ (সাপ)। ইন্ডিয়াতে সোবরাজ ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত জেলে বন্দি ছিলেন।

charles-12
১৯৭৭ সালের এপ্রিলে নয়াদিল্লীর তিহার জেলে নেওয়া হচ্ছে চার্লস সোবরাজকে।

মুক্তির পরে তিনি অবসর নিয়ে অনেকটা সেলিব্রিটি ধরনে প্যারিসের শহরতলীতে বসবাস শুরু করেন। এ সময়ে তিনি একজন পাবলিসিটি এজেন্ট নিয়োগ দেন। এবং তার ইন্টারভিউ বা ফটোগ্রাফের জন্যে চড়া পয়সা নিতে শুরু করেন।

সোবরাজ ২০০৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর নেপাল ভ্রমণে যান। সেখানে একজন সাংবাদিক তাকে দেখতে পেয়ে নেপালি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের কাছে রিপোর্ট করেন। দুদিন পরে নেপালের ইয়াক অ্যান্ড ইয়েতি হোটেলের ক্যাসিনো থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

সোবরাজ এখনও নেপালের জেলে বন্দি আছেন। ২০০৪ সালে নেপালের সুপ্রীম কোর্ট সোবরাজকে খুনের দায়ে অভিযুক্ত করে এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

এই কিংবদন্তীর চার্লস সোবরাজকে নিয়ে ছবি বানিয়েছেন প্রাওয়াল রামন।  ৩০ অক্টোবর (২০১৫) মুক্তি পাওয়া ছবি ‘ম্যায় অউর চার্লস’-এ (Main Aur Charles) চার্লস সোবরাজের নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অভিনেতা রণদীপ হুদা।

উল্লেখ্য, লেখক-পরিচালক প্রাওয়াল রামন তার ক্যারিয়ারের শুরুতে বিখ্যাত পরিচালক রাম গোপাল ভার্মার সহকারী হিসাবে কাজ করেছেন। ২০০৩ সালে ‘ডরনা মানা হ্যায়’ দিয়ে তার ছবি পরিচালনার আরম্ভ হয়। ৬টি আলাদা গল্প দিয়ে বানানো হরর মুভি ছিল সেটি।  এর পর আরো ছবি বানিয়েছিলেন তিনি। এ ছাড়া ২০১২ সালে স্কুলছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে আত্মহত্যা  বেড়ে গেলে তিনি অ্যান্টি-সুইসাইড ক্যাম্পেইনে যোগ দেন। তার সে কাজে তখন রণদীপ হুদাও তার সঙ্গী হয়েছিলেন।

charles-3456
ছবির দৃশ্য

‘ম্যায় অউর চার্লস’ ছবিটি মুক্তির আগেই বেশ আলোচনায় এসেছে। কেন্দ্রীয় চরিত্রের শিল্পী রণদীপ হুদাকে প্রায়ই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তিনি সোবরাজের সঙ্গে দেখা করেছেন কিনা। রণদীপ জানিয়েছেন, তিনি চার্লসের সঙ্গে কখনো দেখা করেন নি এবং ইনভেস্টিগেটিং অফিসার আমোদ কান্ত তাকে দেখা না করার উপদেশই দিয়েছেন।

ছবিতে রণদীপকে ‘ধূর্ত এবং উচ্চবুদ্ধির’ চার্লস সোবরাজের চরিত্রে দেখা যাবে। আর আদিল হুসাইনকে দেখা যাবে তিহার জেলপালানোর ঘটনার তদন্তকারী অফিসার আমোদ কান্তের চরিত্রে। চার্লস সোবরাজের তিহার জেল পালানোর (মার্চ, ১৯৮৬) ঘটনা নিয়ে ফিকশন ছবি এটি।

প্রাওয়াল রামন পরিচালিত এই ছবিটিতে নিউজ আর্কাইভ এবং কান্তের কাছে থেকে পাওয়া অনেক সত্য তথ্য থাকায় ছবিটি বিনোদনমূলক এবং আগ্রহোদ্দীপক। ছবিটির প্রযোজক রাহুল মিত্র ও রণদীপ হুদা দুজনই জানিয়েছেন কীভাবে এই ছবির প্রযোজক খুজে পেতে পাঁচ বছর সময় লেগেছিল। শুরুতে পূজা ভাট প্রযোজনা থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা জানিয়েছেন ছবিটি হিট হলে অবশ্যই এর সিক্যুয়েল নির্মাণ করবেন তারা।

চার্লস শোভরাজের ভূমিকায় রণদীপ হুদা (জন্ম. ১৯৭৬)।
চার্লস শোভরাজের ভূমিকায় রণদীপ হুদা (জন্ম. ১৯৭৬)।

চার্লসের সাথে রণদীপের চেহারার অদ্ভুত সাদৃশ্য থাকায় তিনি এ স্বপ্নের চরিত্রটি পেয়েছেন বলে জানান রণদীপ। তিনি বলেন তিনি চার্লস নন, কিন্তু চার্লসের মধ্যে তার অনেকটাই রয়েছে।

রণদীপ বলেন, আমি তার মত অত ম্যানিপুলেটিভ নই, কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে তাকে আমি অনেক চ্যালেনজিং হিসাবে দেখি। একটা ছদ্ম ও মিথ্যার জীবন কাটিয়েছেন তিনি। এই চরিত্রের সত্যটা আমি কোথায় বলব? আমি তার মহত্ত্ব ও জাকজমকের গল্প শুনেছি, নারীদের পছন্দ করার মত একজন মানুষ যার কোনো আসল পাসপোর্ট বা পরিচয় ছিল না, তিনি অজ্ঞাত কিন্তু বিখ্যাত ছিলেন। তার বাবা ছিল ইন্ডিয়ান সিন্ধি এবং মা ছিল ভিয়েতনামিজ। তার শৈশব ছিল ঝামেলাপূর্ণ। তিনি একটা ছায়া, একটা রহস্য, একজন মোহাচ্ছন করার মত ব্যক্তিত্ব।

রণদীপ হুদা চার্লসের চরিত্রটিকে সাইলেন্স অব দি ল্যাম্বস সিনেমার হ্যানিবাল লেকটারের সাথে তুলনা করেন। তিনি বলেন কীভাবে হিন্দি সিনেমার ডন চরিত্রটি চার্লসের চরিত্র থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে।

ranadip-huda-23

randip-743
চার্লসের চেহারায় রণদীপ

চার্লস শোভরাজের মত দেখানোর জন্য অনেক কিছু করতে হয়েছে রণদীপ হুদাকে। তার ম্যানারিজম থেকে শুরু করে তার সৌন্দর্য আনার জন্য রণদীপকে চার্লসের চরিত্র আত্মস্থ করতে হয়েছে। রাহুল মিত্র বলেন, হুদা চার্লস হয়েছেন এবং কখনো কখনো তাদের সাদৃশ্য ছিল ভয়ঙ্কর, যদিও ইন্ডিয়ান দর্শকদের কথা চিন্তা করে আমরা উচ্চারণে একটু ভিন্নতা এনেছি।

শৈশবে সোনেপাত নামক জায়গার কাছে একটি হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করার সময় রণদীপ প্রায়ই ‘সাপ’ ও ‘নাগরাজ’ সম্পর্কে গল্প শুনতেন। তিনি বলেন, আমার দশ বছর বয়স ছিল, আমি তখন চার্লস সোবরাজের কাহিনী শুনি। ফলে, যখন আমাকে চরিত্রটিতে অভিনয় করার প্রস্তাব দেওয়া হয়, সাথে সাথেই আমি রাজি হই।

‘ম্যায় অউর চার্লস’ নিয়ে পরিচালকের ইন্টারভিউ

ছবির পরিচালক প্রাওয়াল রামন বলেছেন, ম্যায় অউর চার্লস অনেক সাহসী ছবি কিন্তু আমি সীমা অতিক্রম করব না। এটা সাহসী কারণ এটার কাহিনী ‘বিকিনি কিলার’কে নিয়ে।

ছবির ট্রেলারে দর্শক আটকাতে সেক্স এবং ড্রামার প্রাচুর্যের আভাস পাওয়া গেছে। ইন্ডিয়ানএক্সপ্রেস ডটকমের সাথে একটি সাক্ষাতকারে প্রাওয়াল এই ছবিটি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন, এখানে সেই আলাপের উল্লেখযোগ্য অংশ থাকছে।

প্রশ্ন: আপনার ছবির মাধ্যমে আপনি কি চার্লস সোবরাজকে রোমান্টিসাইজ করছেন?

prawal-r
পরিচালক প্রাওয়াল রামন

প্রাওয়াল: প্রথমত, আমি চার্লস সোবরাজের ওপর কোনো জীবনীমূলক ছবি তৈরি করছি না। ১৯৮৬ সালে তিহারে জেল থেকে পালানোর যে ঘটনা ঘটেছিল, তা নিয়ে এই ছবি। তখন কয়েকজন পুলিশ তাকে ধরেছিল এবং তারা তাকে আবার বিচারের অধীনে ফিরিয়ে নেয়। মুম্বাই পুলিশের মাধুকর জেন্ডে তাকে গোয়া থেকে গ্রেফতার করেছিলেন। দিল্লী পুলিশের আমোদ কান্ত খুব দক্ষতার সাথে এই কেসটি পরিচালনা করেছিলেন। আমি আমোদের অনুমতি নিয়েছি এবং চরিত্রটিকে কাল্পনিকভাবে তৈরি করেছি। রোমান্টিসাইজ বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে বলব, হ্যাঁ, আমি জানি বলিউড সবসময় অপরাধ ও অপরাধীদের গ্ল্যামারাইজড করেছে। একজন মোনা ডার্লিংকে সবসময়ই গোসল করতে দেখা যাবে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি ‘ম্যায় অউর চার্লসে’ এরকম কিছুই করি নি। আমি রোমান্টিসাইজ করি নি। সাতজন লোক, যাদের চার্লস সোবরাজের সাথে দেখা হওয়ার পর তাদের জীবন বদলে গেছে, তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে আমার গল্প। আমি তার সাথে একই সেলে থাকা বন্দিদের সাথে দেখা করেছি, তাদের ধারণা সে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মত জাদুকর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তিনি খুব নেতিবাচকভাবে একজন কিংবদন্তী হয়ে গেছেন এবং আমরা তা দেখিয়েছি।

প্রশ্ন: কিন্তু এর আগে মূল চরিত্রে সঞ্জয় দত্তের অভিনয়ের কথা ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল না?

প্রাওয়াল: আমি প্রথমে যে স্টুডিওগুলির সাথে চুক্তিতে গিয়েছিলাম তাদের কারণে এটা হয়েছিল। আমি যেখানে রণদীপকে চাইছিলাম তারা প্রথমে ঘোষণা দিয়েছিল যে সঞ্জয় দত্ত করবে এবং পরে আরেকটি স্টুডিও সাইফ আলী খানের কথা ঘোষণা করে।

প্রশ্ন: কিন্তু রণদীপও কি একটা জনপ্রিয় নাম নয়?

স্ত্রী নিহিতা বিশ্বাসের সঙ্গে চার্লস শোভরাজ।
স্ত্রী নিহিতা বিশ্বাসের সঙ্গে চার্লস সোবরাজ। চার্লসের দাবি ৯ অক্টোবর ২০০৯ তারিখে নেপালি বাদা দাশাইন উৎসবের সময় জেলখানায় তারা বিয়ে করেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এই বিয়ে স্বীকার করতে রাজি নয়। উল্লেখ্য, নেপালি নাগরিক নিহিতা ইন্ডিয়ান রিয়ালিটি শো বিগ বস ৫-এ অংশ নিয়েছিলেন।

প্রাওয়াল: স্টুডিওগুলি এটাকে প্রচারণার জন্য তৈরি করা চমক মনে করেছিল, এবং এটা আমার জন্য উদ্বেগের বিষয় ছিল। আমি এটার পক্ষে ছিলাম না এবং আমার সম্মতি ছাড়াই এটা করা হয়েছিল। সে কারণে আমি সরে আসি।

প্রশ্ন: সেক্সুয়াল কন্টেন্টের কথা বিবেচনা করলে ছবিটা কতটা সাহসী?

প্রাওয়াল: এটা অনেক সাহসী, কিন্তু আমি সীমা অতিক্রম করব না। এটা সাহসী কারণ এটার কাহিনী ‘বিকিনি কিলার’কে নিয়ে। সুতরাং আমি কেন শুধু শুধু যৌনতার দৃশ্য দেখাব?

প্রশ্ন: তাহলে আপনি কি ছবিতে একটিও যৌন দৃশ্য রাখেন নি?

প্রাওয়াল: একেবারে যৌনতার দৃশ্য ছাড়া না। এটা হলো, যৌনতার দৃশ্য থাকার পরেও সেগুলি নিয়ে আমার সংকোচবিহীন অবস্থান। ছবিটাতে ‘বেসিক ইনস্টিংক্ট’ ছবির মত দৃশ্য নেই কারণ আমার বিষয় ও রকম ডিমান্ড করে না। তবে আমাকে দেখাতে হয়েছে চার্লস কীভাবে নারীদের মোহাবিষ্ট করে। আমি দৃশ্যগুলিকে খুব হালকা ভাবে দেখি না। এই সিনেমার কোনো কিছুই হালকা নয়।


‘Main Aur Charles’ Official Trailer | Randeep Hooda, Richa Chadda