সিনামারে কাহিনীনির্ভর বা তাত্ত্বিক, কনস্ট্রাকটিভ কইরা তোলার যে মূলধারা চলতেছে বাংলাদেশে তার পক্ষে আমার সমর্থন নাই।

কোনো বিষয় সম্পর্কে ‘সমালোচনা’ একটা অনুমানই। বা যারে প্রস্তাবনাও বলা যায়। ছহি বয়ান সাধারণ মানুষ দিতে পারার কথা না। তারা ছহি মানে, নিজের অথবা অন্যের অনুমানে পথ চলে। আমার মতে, আর্ট যেমন একটা অনুমান এর সমালোচনাও তাই।

সমালোচনা বা ক্রিটিক নিয়া এই ভণিতা করলাম কারণ যে বিষয়ে আমি বলব ঠিক করছি সেটা আমার দেখা হয় নাই। রুবাইয়াত হোসেনের সিনামা ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ আমি দেখি নাই। এর সম্পর্কে তারপরও অনুমানভিত্তিক একটা সমালোচনা আমার খাড়া হইছে। এর আগে যখন এনার ‘মেহেরজান’ নিয়া হৈ চৈ হইছিল, তখনও স্পটলাইটের বাইরের আলোচনায় আমি শামিল ছিলাম। পলিটিক্যালি এর পক্ষে না থাকলেও এই সিনামা নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে বলছিলাম। তো দেখা হয় নাই সিনামার প্রচার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা একটা নৈতিক জায়গা থিকাই নিছিলাম। এখন না-দেখা সিনামার সমালোচনাও করা যাইতে দোষের কিছু দেখতেছি না।

salahuddins1

এই সিনামার একটা নারীবাদী ট্যাগ প্রচার পাইছে। সেটা পরিচালক নিজে বা তার বন্ধুরা করছেন বোধকরি। এর বিপুল প্রশংসাও হইছে। এর আগে পয়লায় বিদেশে দেখানো সিনামা না দেখতে দেশি দর্শকদের আহবান জানাইছিলাম আমি। বিদেশীদের আগে দেখানোতে আমার আপত্তি আছে। তখন ব্যাপারটা আমদানি আমদানি লাগে। এইটা ‘আর্ট’-এর বাইরে একটা প্রজেক্ট হয়া ওঠে। এই সন্দেহ থিকা মুক্তি পাইতে এবং দেশি দর্শকদের অগ্রাধিকার আছে দাবি করে আমি বিদেশে মুক্তি পাওয়া সিনামা টাকা দিয়া না-দেখতে কইছিলাম।

এরপর কোন খবরে এই ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ নারীদের জন্য বিনা পয়সার শো আয়োজন করছে দেখে এর ক্রিটিকও করছিলাম। বলতে চাইছিলাম, এখানে একটা দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক পরিচালক বা তার টিম নিজ ক্ষমতাবলে তৈরি করতে চান। যিনি শরীরে নারী, তার টাকা দিয়া দেখার ইচ্ছা এক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ে যায়। টাকা বিষয়টারে এখানে গৌণ কইরা তোলা হয়। অথচ সিনামার বাজারে কত ফকির পরিচালক টাকা তুলতে পারতেছেন না। ফলে এই সিনামা ‘পাবলিক’ হওয়ার আগেই আমি সমালোচনা করে রাখছি দেখা যাইতেছে।

এই সিনামা আদর্শ বা শিক্ষা বিলানোর একটা এজেন্ডা হাতে নিছে—এমন কিছু অনুমানে আসতেছে। এই থিকাই কি মিশনারি বা এনজিও কায়দায় ফ্রি দেখানোর ভাবনা তার মাথায় আসছে? হইতে পারে। এই অনুমানের ভিত্তি, ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’-এর প্রচার-প্রচারণা, সেগুলাও ইডিওলজিক্যাল। একটা ফেমিনিন শভিনিস্ট অ্যাপ্রোচ আছে। বিনা টিকিটের বন্দোবস্তের মধ্যেও তা আছে আঁচ করি। সিনামার মেকিংয়েও থাকতে পারে। একটা স্যুডো এলিটিজম আছে মনে হয়। ট্রেলার দেখে এমন কথা বলতেছি। ভিতরে ভিতরে মিডলক্লাস সেন্টিমেন্টে আক্রান্ত আর উপরি মানে পোশাক, বাসস্থান, কথাবার্তায় এলিটিজম আরোপ হইছে হয়ত।

এর ট্রেলারে দেখলাম বয়স্ক একজন রয়ারে (এই সিনেমার কিছু খোঁজখবর তো এমনেই পাওয়া যায়) বলতেছে, অ্যাক্ট্রেস বা অভিনেত্রীদের বেশ্যা বলে। এতে রয়ার আপত্তি আছে দেখলাম। মানে বেশ্যাবৃত্তিতে আপত্তি আছে। শরীর বিষয়ে রয়া খুব দেমাগি হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ আছে। সে যে মা হইতে চাইতেছিল না, ট্রেলার বা রিভিউতে এমন একটা কাহিনীর অংশ আছে, তাতেও এমনটা আন্দাজ করি। এইটা শভিনিস্ট মাইন্ড সেটআপ। বিয়ার পর বাচ্চা নেওয়ার একটা বন্ড থাকে। এটা দায়বদ্ধতার সম্পর্ক। ব্যক্তিস্বাধীনতা মানে নিজের মতো একটা ডিসিশন নিয়া বসা না। এইটা যৌথ হইতে পারলে ভালো। বিষয়টা সোশ্যাল। বাচ্চা না নেওয়ার ইউরোপীয় মেয়েদের মুভমেন্টও সোশ্যাল ছিল। এটা তো সেটেলমেন্টের আলাপ। একার কিছু করার আলাপ না।

শিল্প কি এমন হেকটিক কাজ যে মা না হইলে আরও ভালো শিল্পী হওয়া যায়। আমি জানি না। আর্টের এই বোহেমিয়ান ভাব এনার্কির আমলে ছিল। তবে আমাদের এখানেও আর্ট বলতে মিডলক্লাস যা বোঝে তার মধ্যে একটা বাউলিয়ানা থাকে। এখানে এনার্কির সর্বোচ্চ প্রয়াস এইটা। ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশনে’ বিষয়গুলা কীভাবে আছি জানি না। তবে শিল্পীর আবজারবেশন ক্ষমতা আমি পছন্দ করি।

ব্যক্তির ডিসিশন নেওয়ার সার্বভৌমত্ব বিয়ার পরে খারিজ হয়। সার্বভৌম স্বাধীনতার রোগ আমার ধারণা টুয়েন্টিজের দিকে খুব দেখা যাইত। এখন মানুষ অনেক গ্লোবাল আর পলিটিক্যাল বলে ইনডিভিজুয়্যাল ক্রাইসিসের দিকে একাগ্র থাকতে পারে না। রয়া যে পারল কেমনে সেই প্রশ্ন এই সিনামায় আছে কিনা জানি না।

এই সোশ্যাল আর পারসোনালের ডিলেমায় ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ পথ হারাইয়া থাকতে পারে। যতদূর বুঝছি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্ত করবী’ নাটকের নন্দিনীরে রিকনস্ট্রাকশনের একটা ব্যাপার এই সিনামায় আছে। পাতালপুরীতে নন্দা বা নন্দিনী ‘আলো’। তিনি সিডিউস করেন অন্যদের। তার রূপ, রঙ, গান ইত্যাদি সিডিউসিভ। পুরুষরা এতে ‘লালায়িত’ হন। রবীন্দ্রনাথে এই প্রলুব্ধ হওন দোষের না, বরং মুক্তির উপায়। রবি ঠাকুরে যৌনতাও নাই তেমন। রুবাইয়াতে থাকতে পারে। সেটা অভিনয়ে, পোশাকে, কোনো দৃশ্যে থাকতে পারে। আমি যতদূর বুঝি, ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশনে’ সিডাকশন আছে। তবে সিনামাটা সিডাকশন ছাড়ায়া ‘পবিত্রতার’ দিকে বা তা যদি নাও হয় একটা হিউম্যানিটারিয়ান, শুকনা দাবি-দাওয়ার দিকে যাইতে চাইছে হয়ত।

under5432
“নন্দিনী সোশ্যালিস্ট, সবার জন্য তার সমান আহবান ও ডাক। রয়াও কি তেমন? মনে হয় না। রয়া পারসোনাল। তার নিজের একটা হিসাব আছে।”

রবীন্দ্রনাথের নারীর মধ্যে একটা ‘নতুন’ কনসিভড অবস্থায় আছে। পুরুষদের পাপ স্খলনের উপায় নন্দিনী। বা এইটা প্রেমও। নারীর পবিত্রতার দিকে পুরুষের প্রেম। এটা ভিক্টরিয়ান আদি ইউরোপিয়ান মডার্নিটিতে আছে দেখছি। রবীন্দ্রনাথেও ছিল, রুবাইয়াত তা বহাল রাখার কথা। তবে রয়া এত বড় আইডিয়া কিনা জানি না। নন্দিনী সোশ্যালিস্ট, সবার জন্য তার সমান আহবান ও ডাক। রয়াও কি তেমন? মনে হয় না। রয়া পারসোনাল। তার নিজের একটা হিসাব আছে। জীবনের ঘটনাবলি বিচারের মডার্নিস্ট পদ্ধতি আছে। নন্দিনীর লগে তার বার্গেনিংয়ের ব্যাপারও আছে বলে ট্রেলারে দেখছি। তবে এই বিরোধ রবীন্দ্রনাথের কাছ থিকা দূরে যাওয়ার না বা সইরা আসার না। এইটা মনে হয় আপ টু ডেট করা রবী ঠাকুরেরে। ‘আন্ডার কন্সট্রাকশন’ মাস্টবি রাবিন্দ্রিক। এর বাইরে তার যাওন নাই। বাংলাদেশে স্যুডো এলিটিজম রবীন্দ্রনাথ আর লালনেরে ফেলতে পারবে না, পারে নাই অর্থে বলতেছি আর কি।

বাংলাদেশি মডার্নিটির দোষ এই সিনামায় হাজির থাকার কথা। মানে এই যে পারসোনাল হইতে চাওয়ার ইচ্ছা, সেটা । যারা সিনামাটা দেখছেন তারা ভালো বলতে পারবেন। আমি আন্দাজে বলি। যদি রয়া প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হইতেন, তাইলে তো সিনেম্যাটিক এসব সমস্যা তিনি ভিন্নমাত্রায় নিয়া যাইতে পারতেন। মানে রয়ার টাকা, পারসোনালিটি যদি থাকত, পরিবার তেমন থাকত—তাইলে তিনি স্বামীর পরাধীনতায় কিম্বা হ্যারাসমেন্ট ফেস করতেন না। রয়ার তার ক্রাইসিস কাটায়া উঠার বিভিন্ন পথ বাইছা নিতে পারতেন। আমাদের সময়ের শাহবাগপন্থী হয়ে যাইতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা হইলেন না। গেলে নারীত্বের বঞ্চনা বা নিগৃহ পাওয়ার সুযোগ কমত, সাপোর্ট পাইতেন। বাংলাদেশে অনেক ছেলেও চাকরি বাদ দিয়া শিল্প করতে গেলে কথা শোনে। তারেও কোনো একটা পতিত পেশার লগে তুলনা দেওয়া হয়। এটা মিডলক্লাস ক্রাইসিস। এটা থাকবে। এটা মূল ক্রাইসিসও না।

এগুলা সলভড বিষয় সামাজিক ভাবে। মডেলিং, নাটক ইত্যাদির প্রতি মিডলক্লাস অন্তত ঢাকার মিডলক্লাসের আর তেমন শুচিবাই নাই। কিন্তু আমাদের আর্টে এসব রয়ে যাইতেছে কেন যে?

সিনেমার চরিত্ররে উদ্যোক্তা ভূমিকার দিকে ঠেইলা দেওয়া, ইন্ডিভিজুয়ালিস্টিক ডিপলিটিসাইজেশন ঘটানো, আদর্শমূলক হইতে থাকা, সিনেমার মধ্যে সোসাইটিতে ‘অগ্র’ এবং ‘পশ্চাৎ’ এই দ্বিবিভাজনের প্রতি পারস্পরিক বিরাগ তৈরি, ভিক্টিমের রাইটস এবং সাফারিংসরে টোটালিটারিয়ান জায়গা থেকে দেখা, উন্নয়নমুখী সমাধান ইত্যাদি মিলায়া একটা এনজিও কালচার তৈরি হয়। যারে এনজিও মনে হয় না সহসাই বা সেটা পুরাপুরি এনজিও নাও। একটা পপুলার ধারার সিনামায় মারামারি ইত্যাদি ফ্যান্টাসি থাকে। এনজিও ভাবধারার সিনামায় ফ্যান্টাসি লোপাট হয়। এনজিও চিন্তা মিথ, গসিপ, সংস্কার ভাইঙ্গা দেয়।

পলিটিক্যালি ‘নিও লিবারালিজম’ পশ্চিমা আর্টে বিশেষত সিনামায় খুব পাওয়া যায়। ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ পলিটিক্যালি তাই হওয়ার কথা, ‘মেহেরজান’ও এমনটা ছিল।

under-897
“আমার কাছে মেটাফোরেরও রুচি আছে। সাপে অভক্তির জন্য না, বরং সস্তা আর মোটা দাগের বলে বলতেছি। রয়া অন্য স্বপ্ন দেখলে আরও ভালো হইত।”

ট্রেলারের এক জায়গায় দেখলাম রয়ার পাশে অজগর শুয়া আছে। অজগরের চারিত্রিক দোষ কী আছে তা জানি না, তবে রয়ার জামাইয়ের যদি থাকেও কিছু এমন সে জন্য অজগরেরে কতটা দায়ী করা যায় কে জানে? এই মেটাফোর আমাদের এখানে মডার্নিস্টরা খুব করেন দেখছি। সাপ এখানকার শিল্পচর্চায় বেশ গুরুত্ব পায়। আমার কাছে মেটাফোরেরও রুচি আছে। সাপে অভক্তির জন্য না, বরং সস্তা আর মোটা দাগের বলে বলতেছি। রয়া অন্য স্বপ্ন দেখলে আরও ভালো হইত। সংলাপে কেমন করছেন রুবাইয়াত দেখনেওয়ালারা জানাবেন। তবে তার রিভিউয়াররা এই সিনামারে কাহিনী সর্বস্ব করে ফেলছেন। সিনামায় রয়ার সফলতা যেন সিনামারও সফলতা হয়ে গেছে।

সিনামারে কাহিনীনির্ভর বা তাত্ত্বিক, কনস্ট্রাকটিভ কইরা তোলার যে মূলধারা চলতেছে বাংলাদেশে তার পক্ষে আমার সমর্থন নাই। ভালোর, শুদ্ধতার, পরিমার্জিত শিল্পের যে জোর দাবি একমেবাদ্বিতীয়ম হওয়ার তার বিপক্ষেই আমি বরং। সে জন্য এমন সিনামা কেউ বানাবেন না তা না। তবে তার সমালোচনাটাও থাকা দরকার আর কি। আমার পন্থী সিনামারও। যারা দেখেন নাই তাদেরও সমালোচনায় দোষ কি?