রবার্ট চালডিনি, পারসুয়েশন ও একটা স্ক্যাম স্টোরি

রবার্ট চালডিনি সোশাল সাইকোলজিস্ট, মার্কেটিং এর প্রফেসর এরিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির। তিনি বেশি ফেমাস পারসুয়েশন এবং ইনফ্লুয়েন্স নিয়ে তার বইয়ের জন্য। মানুষকে নিজের ফেভারে আনার তার দেয়া ৬টা শর্টকাট আছে। এমন না যে এগুলো নতুন কিছু।

প্রথমবার পড়ে আহামরি কিছুই মনে হয় নাই। দ্বিতীয়বার যখন পড়লাম মানে আরেকটু বেশি যখন এনালাইসিস করলাম, তখন একটা তবদা খাই। কারণ ঠিক এগুলা ইউজ করে আমার উপরে একটা স্ক্যাম করা হয়। এটা সেই স্টোরি।

স্টোরি বলার আগে শর্টকাটে ঐ ছয়টা শর্টকাট বলে রাখি যারা জানেন না তাদের জন্য।

১. রেসিপ্রোসিটি—যাকে পটাতে চান তার মতো করবেন। আপনারা যেন টুইন, এত মিল আপনাদের!

২. স্কারসিটি—ওই যে গান আছে না, আমাকে আর পাবে না। মানে এ কথা বললেই অপর জনের মধ্যে আপনাকে চাওয়ার বাসনা বেড়ে যাবে। লস খাওয়ার কারণে কনকর্ড ফ্লাইট যখন বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিল, তখন রাতারাতি এর লাস্ট কয়েকটা ফ্লাইটের টিকেটের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়। জাস্ট হুজুগে!

৩. অথরিটি—বিশ্বাসযোগ্যতা দেখানো, আপনি যে ফেইক না এটা বোঝানো। যে দারোয়ান লুঙ্গি পরে থাকে তাকে আমরা পাত্তা কম দিই। এজন্য তাদেরকে পুলিশ-আর্মি টাইপের ইউনিফর্ম পরতে হয়। অথরিটি রিয়েলি ইম্প্রেসেস পিপল।

৪. কনসিসটেন্সি—পল্টি না মারা। আমি আছি থাকবো ভালোবেসে মরবো—ঠিক আছে? ইনকনসিসটেন্সি কেউ পছন্দ করে না। মাথা খারাপ হয়ে যায় ইনকনসিসটেন্ট মানুষ ডিল করতে গেলে।

৫. লাইকিং—আপনি যদি কাউকে পছন্দই না করেন, তাকে তো অ্যান্ট্রিই দিবেন না কথা বলার জন্য। আর কথা না বললে পারসুয়েড করবে কেমনে! নিজেকে পছন্দসই করতে হবে তাই অন্যের চোখে।

৬. কনসেনসাস—মুখে বলি কোয়ালিটি ম্যাটারস, মনে মনে বিশ্বাসও করি হয়তো আমরা। কিন্ত যার পোস্টে ৫০টা লাইক সেই পোস্টই আগে পড়ি, ৫টা লাইকের পোস্টের চেয়ে। কোনো এক মুভি ডিরেক্টর বলেছিলেন, যে মুভি বেশি মানুষ দেখে তা অবশ্যই ভালো মুভি। যেখানে সবাই সায় দেয়, সেটাতে অটো পক্ষপাত চলে আসে আমাদের।

রবার্ট চালডিনি (জন্ম. উইসকনসিন, ইউএসএ, ১৯৪৫)

বলে রাখি, চালডিনি এই ৬টা টেকনিক ইউজ করতে বলেছিলেন ইথিকালি কাউকে পারসুয়েড করতে। আমি শিওর ওই স্ক্যামার চালডিনির বই থেকে শিখে নাই। শিখলে এটা আনএথিকালি ইউজ করতো না। এনিওয়ে হেয়ার ইজ দা স্টোরি:

নরমাল অফিস দিন। লাঞ্চবক্সের জন্য ওয়েট করছি, রিল্যাক্সিং টাইম। এমন সময় উনি আসলেন। অফিস ওপেন স্পেস। কে ফ্লোরে আসছে আমার সিটে বসে দেখতে পারি। পরিচিত কেউ হলে আই কন্ট্যাক্ট করি। অপরিচিত হলে পিসির দিকে ভাবলেশহীন তাকায় থাকি। তো পিসিতে ফোকাসড চোখের আড়ে দেখলাম আমার দিকেই আসতেছে।

“স্যার আসসালামু আলাইকুম। একটু সময় নিতে পারি আপনার।”

অবশ্যই নিতে পারেন। লাঞ্চ এখনো আসে নাই আর এ সময়ে আমি বসে বসে বিরক্ত হচ্ছি। আপনি চাইলে আমার পুরো এই সময়টা নিয়ে যান প্লিজ। আমি সানন্দে নষ্ট করার জন্য আমার সময় তাকে দিয়ে দিলাম। কিন্ত সে যে সময় ছাড়াও পকেট থেকে আমার টাকা নিয়ে যাবে তা যদি জানতাম!

তখন অফিসে মিটিং না থাকলে সেমি ফরমাল পরে যেতাম। সেদিনও তেমন, ইভেন জুতাও পরা ছিলাম না মনে হয়। লোকটা যখন “স্যার” “স্যার” করছিল আমি ভাবছিলাম এত স্মার্ট একটা লোক, কী রেসপেক্ট দিয়ে কথা বলছে।

ও হ্যাঁ, হি ওয়াজ এ ভেরি স্মার্ট গাই! চালডিনির থিওরি অনুযায়ী লাইকিং ছিল তার প্রথম ফ্যাক্টর। তাকে এক দেখায় আপনার পছন্দ হবে। সুদর্শন, লম্বা, পরায় সাদা শার্ট, নাইস ডেনিম, নাইস জুতা। প্রথমেই তো আমরা দর্শনদারী, চেহারা দেখেই তো মানুষদের আমরা পয়েন্ট দিয়ে ফেলি। চালডিনি বলেন, আমাদের এত টাইম নাই সবসময় সব মানুষকে খুঁটায় খুঁটায় দেখা। প্রথম পরিচয়ে মেক্সিমাম সময়ই আমরা পাঁচ-সাত সেকেন্ডে কারও ব্যাপারে একটা ভালো-মন্দ ডিসিশনে চলে আসি।

অথরিটি প্রমাণের জন্য ভালো কাজে দেয় ভয়েস। এবং ভয়েস ডেলিভারির স্টাইল। কথা বলতে কতটা জোর দেন আপনি। লোকটার কনফিডেন্ট ভয়েস। আর সে কী বলতেছে, সেটার ব্যাপারে তার ধারণা স্পষ্ট। মানে কনভার্সেশনের কন্ট্রোল তার হাতে। সে কোন কথা বললে আমি কোন কথা বলবো, দাবার চালের মতো আগে থেকেই মাথায় সব তার ছক কষা। হয়তো ইয়ার্স অফ প্র্যাকটিস। অথবা তার সহজাত গুণ, কে জানে। কথা অনর্থক তাড়াতাড়ি বলে না। অনেকে ভাবে তাড়াতাড়ি কথা বললে কনফিডেন্ট শুনায়। আসলে মানুষ নার্ভাস থাকলেই তাড়াতাড়ি কথা বলে।

সে তার নাম পরিচয় দিয়েই একগাদা ব্রশিউর বের করে দিলো এবং ভিজিটিং কার্ড দিলো। গলায় তো আইডি কার্ড ছিলই। আচ্ছা, ধরে নিই তার রিসোর্টের নাম দি অ্যালিগেন্ট কক্স বাংলা রিসোর্ট। এই রিসোর্টের এক্সক্লুসিভ মেম্বারশিপ অফার দেওয়ার জন্যই তার এই অফিসে আগমন। সে আমাকে রিসোর্টের প্রেসিডেন্সিয়াল সুইটের ছবি দেখায়, যেটাতে মেম্বারদের জন্য অফ সিজনে ৫০% ডিসকাউন্ট। আনলিমিটেড পুল অ্যান্ট্রি, ফ্রি ব্রেকফাস্ট। বোমবার্ডেড উইথ অফার্স। ঐ যে বলে না—বেশি ভালো, ভালো না। কিন্ত এসব তো এখন ভেবে লাভ নাই। বুদ্ধি বাড়ে তো চোর পালালেই। বাট এই যে এত সব ডকুমেন্টস যে আমাকে দেখালো এটা জরুরি ছিল। এগুলা তাকে সামওয়ান ফ্রম দা অথরিটি প্রমাণ করে।

এরপর সে আমাকে বলে আপনাকে দেখে তো মনে হয়, ঘোরাঘুরি করতে পছন্দ করেন। কক্সবাজার তো নিশ্চয়ই যাওয়া হয়। বেশ কয়েকবার গিয়েছেন মনে হয়। কোন হোটেলে ছিলেন? খরচ কেমন ছিল? ফ্যাসিলিটি কেমন? সে আমার মুখ থেকে শুনতে চাচ্ছিল, হোটেলের পিছে যে এতগুলা টাকা চলে যায় কিন্ত মন মতো সার্ভিস পাওয়া যায় না। যেন সেও আমার মতো ক্রেতা। এটা কী করছে সে? রেসিপ্রোসিটি।

রেসিপ্রোসিটি আরেক জায়গায় ইউজ করেছে সে। পুরোটা সময়ই তার আচরণে এমন বিনয়। যে আপনার সাথে বিনয় দেখায় তার সাথেও ভালো আচরণ দেখাতে আপনি এক প্রকার বাধ্য হয়ে যান। এজন্য বিনয়ী লোকদের চেয়ে দুর্বিনীত লোকদের বিশ্বাস করা বেশি যৌক্তিক। একটা রিসার্চেও আছে, যেসব বন্ধু যত বেশি মুখ খারাপ করে তারা বন্ধু হিসেবে তত লয়াল!

চালডিনি বলছে কনসিসটেন্সি দেখানোর জন্য বার বার আসতে হয়। স্ক্যামার কি বার বার আসতে পারে! না, অলির মতো বার বার ফিরে আসে না স্ক্যামার। তবে সে দাবি করছিল, গত সিজনেও সে এসেছিল। আমি অবশ্য ক্রসচেক করে দেখি নাই। কনসিসটেন্সি অবশ্য উলটা দিক দিয়েও কাজ করে। ফুট ইন দা ডোর টেকনিক বলে এটাকে। সেলসম্যানদের প্রিয় টেকনিক।

ধরেন প্রথমে কোনো সেলসম্যান আপনার কাছে এসে সময় চাইলো। তারপর বসতে চাইলো। তারপর পানি খেতে চাইলো। আপনি সবগুলা রিকোয়েস্টই রাখলেন। এরপর যখন সে আসল রিকোয়েস্ট করবে তখন আপনি আর না করতে পারবেন না। না করাটা আপনার জন্য ডিফিকাল্ট হয়ে যাবে, কারণ আপনি নিজের কাছে কনসিসটেন্ট থাকতে চান। তাই টেকনিকটা হলো প্রথমে ছোট ছোট রিকোয়েস্ট করা। হি ডিড দ্যাট অলসো।

কিন্ত আমার ডিসিশন মেইকিং এ সবচেয়ে ইম্প্যাক্ট পড়েছিল সে যখন কনসেনসাস অ্যাপ্লাই করে। দ্যাট ওয়াজ দা ফাইনাল নেইল ইন দা কফিন।

“স্যার গত সিজনের মতো এবারও তো ১২ তলার অমুক স্যার, তমুক ম্যাডাম আমাদের অফার নিয়েছেন। আরও অনেকে আছেন এই যে দেখেন লিস্ট। আমি লিস্ট দেখলাম। আসলেই তো। ফিন্যান্সের অমুক ভাই নিলো! তিনি তো অনেক প্রুডেন্ট মানুষ। উনার জাজমেন্টে তো ভরসা রাখাই যায়।

তার মানে অফারে ঠকলাম কি জিতলাম সেটা বিষয় না। অন্যরাও যেহেতু নিচ্ছে, ঠকলে আমি একা ঠকবো না। এই যে একটা গ্রুপ থিংকিং করে ফেললাম, এটা যে কত ভুল। অনেক ভুল আমরা এভাবে করে ফেলি। আমি অন্য ব্রোকারদেরও দেখেছি। তারা ইনফ্লুয়েন্স করতে অন্য ক্লায়েন্টদের রেফারেন্স দেয়। এটা সব সময় কাজ করে।

স্কারসিটি দেখানো তো আরও কমন। সুযোগ সীমিত, স্টক লিমিটেড। সেও আমারে উসকায় দিলো আর ৬টা মেম্বারশিপ স্লট খালি আছে। স্যার দেরি করলে কিন্ত লেইট হয়ে যাবে।

মানে বেসিক কাজ প্যানিকে ফালানো। চিন্তা ভাবনার জন্য সুযোগ না দেয়া। লোকটা তার রুলস মতো গেইম চালাতে থাকে। একটার পর একটা স্ট্র্যাটেজি দিয়ে সাজানো তার এই পুরো পারসুয়েশন গেইম চলছে দশ মিনিটের মতো।

তারপর আমাকে বললো, অফার নিয়ে আর কোনো জিজ্ঞাসা আছে আপনার স্যার? তাহলে স্যার আমি ধরে নিচ্ছি আপনি মেম্বারশিপ নিচ্ছেন। পেমেন্ট কীভাবে করবেন স্যার। কার্ড না ক্যাশ। ক্যাশ? ওকে স্যার। আমি আপনার ফর্ম রেডি করে দিচ্ছি। আপনি জাস্ট এখানে এখানে সাইন করে দিন। এই যে স্যার আপনার মেম্বারশিপ কার্ড। আসি স্যার। স্লামালাইকুম। গন আমার হাজার টাকা। ঝড়ের মতো হয়ে গেল সব।

ঝড়ের পর বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শনের মতো আমি এবার ব্রশিউরটা উল্টায় দেখলাম। ডিল তো খারাপ হয় নাই। ভালো ডিল। পাঁচ হাজার টাকার সুবিধা অর্ধেক টাকায় পাবো। বছরে যত বার যাই ততবার। কিন্ত কক্সবাজার তো চাইলেই যাওয়া যায় এমনও তো না। আচ্ছা, এই অফার এভেইল করতে না হয় বেশি বেশি গেলাম এই বছর। বা অন্য কাউকে দিয়ে দিলাম কার্ড। অত খারাপ হয় নাই ডিল। আমি লাঞ্চবক্স খুলে খাওয়া শুরু করলাম।

একটু পর পেছন থেকে কলিগ শামীম ভাই বললো, “রাজী ভাই, এই আপনি নাকি ওই রিসোর্টের অফার নিছেন। আরে ওই লোক তো থার্ড পার্টি! রিসোর্টের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নাই। তাদের রিসোর্টের নাম্বারে ফোন করে শুনি কনস্ট্রাকশনই এখনো শেষ হয় নাই। এ সমস্ত থার্ড পার্টির মেম্বারশিপ তারা এন্ডোর্স করে না। ধরা খাইলেন তো মিয়া। কত টাকার মেম্বারশিপ নিছিলেন?”

“শামীম ভাই ভাত খাইতেছি। খাওয়া শেষ করে কথা বলি?”