লেখকদের ফেলে আসা গ্রাম ও মফস্বল সমস্যা

বেশিরভাগ লোকই নিজের গ্রামের, শৈশবের, মফস্বলের গল্প করতে গিয়া ‘শহর থেইকা আসা এক অধিক স্মার্ট ব্যক্তি তার কম স্মার্ট গ্রামের কম স্মার্ট লোকেদের নিয়ে বলতেছে’ এমন ভঙ্গীতে গল্প রচনা করেন।

এই ভঙ্গি বাজে সাহিত্য ও অভিনয়ের নমুনা।

প্রথমত, সে যে আর ওই পরিবেশের লোক না তা দেখাইতে হয়। যেইটা করতে গিয়া স্টোরির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না, এমন অনেক অহেতুক ও বাড়তি এক্সপ্রেশন সে আমদানি করে।

যেইটা থাকে তার গ্রামের বর্ণনায়, গ্রামের লোকেদের বর্ণনায়, গ্রামের লোকেদের ক্রিয়াকলাপের বর্ণনায় ও তাদের সঙ্গে কথোপকথনে।

এমনকি সে যখন ওইখানকার ভাষা টানবে, যেমন ধরা যাক একটা ক্যারেক্টারকে সে ওই অঞ্চলের ভাষায়’ই বলতে দিচ্ছে―সে বলবে ওই গ্রামের লোককে সুযোগ দেওয়া বা স্নেহ করার ভঙ্গিতে।

এরই একটা ভার্শন হচ্ছে সেই ভাষাভঙ্গিকে হাস্যরসের মাধ্যমে উপস্থাপন করা।

অর্থাৎ, এতই দুরবস্থা যে একটা ক্যারেক্টারকে সে স্টোরির প্রয়োজনে নয় বরং নিজের প্রয়োজনে কাস্টোমাইজ করে।

এই সমস্যার স্পষ্ট রূপ দেখতে পাবেন কলকাতার দুই বিখ্যাত লেখকের দুই বিখ্যাত বইয়ে। মণীন্দ্র গুপ্তের অক্ষয় মালবেরি, এবং পরিতোষ সেনের জিন্দাবাহার-এ।

মণীন্দ্র গুপ্ত এক তৃতীয়াংশ পড়তে পড়তেই মনে হইল তিনি আসলে তার শৈশবের কথা বলতেছেন না। তার দেখা ওই ঝোপঝাড় লতাগুল্মকে তিনি স্মরণ করতেছেন আজকের পরিবেশে বইসা। তিনি বর্ণনা করতেছেন এক উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের চোখে গ্রামের তুচ্ছ জিনিসগুলি যেভাবে ধরা দিছে, গ্রামের ছেলেপেলেদের সঙ্গে মিশতে গিয়া।

পরিতোষ সেনের জিন্দাবাহার বই শুরুতে ভালো লাগছে। পার্ট পার্ট কইরা তিনি শৈশবে দেখা তার এলাকার স্মরণীয় ব্যক্তিদের গল্প বলতে চাইছেন। শুরুর দিকে পারছেনও। কয়েকটা গল্প পরে তিনি যখন তার বাবার গল্পে ঢুকলেন, আমি যেন দেখতে পাইলাম একটা গ্রামের ছেলে, সাধারণ ছেলে নয় অবশ্যই, ধনী বা বলা ভালো জমিদারের ছেলে, বলতেছে গ্রামীণ আকাশে উদ্দেশ্যহীন গোল গোল ঘুরতে থাকা পাখির কথা, এই বিপুল অর্থের মাঝে একটা বোকা কিছু না বোঝা পাখির উড়া, খালি গা ছেলের খেলাধুলা কতই না অর্থহীন। বইটা তখন পড়া বন্ধ করে দিছি।

বইলা রাখা ভালো, গুরুত্বপূর্ণ এই দুই লেখকেরই শৈশব কাটছে গ্রামীণ বা মফস্বল বা একটু কম উন্নত পরিবেশে। শৈশবের পরে তারা তুলনামূলক উন্নত পরিবেশে ঢুকছেন।

এই ধরনের এক্সপ্রেশন গল্পের ব্যাপক ক্ষতি করে। লেখকরা নতুনভাবে শহুরে, উন্নত বিদেশী পরিবেশের পার্সপেক্টিভে চরিত্র সাজাইতে গিয়া এইসব ক্ষেত্রে বদলায়া ফেলেন।

চরিত্র বাস্তবে যা, গ্রামের বা শৈশবের কম উন্নত পরিবেশ দেখাইয়াও তার সঙ্গে আরো যুক্ত হয় লেখকের স্বর। তাতে চরিত্রের অতি অভিনয় ঘটে, অর্থাৎ বিকৃতি। নিজের ও অন্যের। যাতে ওই গ্রামের লোকটি কখনোই থাকে না। বরং, পূর্বের অবস্থানের সঙ্গে নিজের যুক্ততা নাই এমন হীনম্মন্যতার প্রকাশ ঘটে লেখাগুলিতে।

এমন পরিবর্তন ঘটনাগুলিতেও আনা হয়, ভাষা ব্যবহারে প্রয়োগ করা হয়। ফলে, পুরা লেখাটাই অতি অভিনয় সর্বস্ব লেখা হইয়া ওঠে।

অতি অভিনয় করতে কেউ পারবে না তা না। এমনকি স্মৃতিচারণ মূলক লেখাতেও মিথ্যা গল্প বলতে পারে কেউ চাইলে।

কিন্তু তাতে স্টোরি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জিন্দাবাহার বা অক্ষয় মালবেরি-তে তার নমুনা আছে।