১.
দিব্যি দেখতে দুধে আলতার মতো রং, আলবার্ট ফ্যাশানে চুল ফেরানো, চীনের শূয়রের মতো শরীরটি ঘাড়ে-গদ্দানে, হাতে লাল রুমাল ও পিচের ইস্টিক, সিমলের ফিনফিনে ধুতি মালকোঁচা করে পরা, হঠাৎ দেখলে বোধ হয়, রাজারাজড়ার পৌত্তর; কিন্তু পরিচয়ে বেরোবে ‘হৃদে জোলার নাতি!’, কালীপ্রসন্ন সিংহের সেই বিবরণ মনে পড়ে?

ইংরেজ শাসন চালু হবার পর বঙ্গদেশে ‘বাবু’ নামে যে এক দোআশলা সঙ শ্রেণীর উদ্ভব হয়, তাদের ভঙ নিয়া কালীপ্রসন্নর বিবরণ এইটা। বাবু, মানে ফিরিঙ্গি আমলের ফিরিঙ্গি মারানি উদ্ভট ভদ্রলোকেরা, ইংরেজ শাসনের শুরু দিয়ে যার শুরু, আঠার শতকের শেষদিকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদার শ্রেণীর চিরস্থায়ী ক্ষমতায়নের মাধ্যমে যার বিকাশ হইছে।

তো, সেই বাবু পোশাকে আশাকে ও কালচারে আর একটু ভদ্র হইছেন, ক্রমে ঋষি হইছেন, বহু পরে। মাত্র ষাট বছর পরের একটি বিবরণ শুনুন। হুতুম পেঁচার নকশা প্রকাশিত হয় ১৮৬১ সালে। এই পরের বিবরণটির সময়, অনুমান করা যায়, ১৯২২ সালের কোনো এক সময়। সত্যেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে সত্যেন্দ্র-স্মৃতিসভার বিবরণ। আবুল কালাম শামসুদ্দিনের জবানিতে। বাবু এখানে ক্রমে পৌরাণিক যুগের ঋষি। পাঠক-দর্শকের মন শ্রদ্ধায় আপ্লুত হয়ে ওঠে:

“যথাসময়ে সভামঞ্চে আপন আসন থেকে রবীন্দ্রনাথ উঠে দাঁড়ালেন। দুগ্ধ ফেনশুভ্র ধুতি-পাঞ্জাবী-চাদর পরিহিত শ্বেতশশ্রুমণ্ডিত রবীন্দ্রনাথকে যেনো এক পৌরাণিক যুগের ঋষির মতোই মনে হচ্ছিল। রবীন্দ্রনাথকে আগে কখনো দেখি নাই। প্রথম দর্শনেই আমার মন শ্রদ্ধা-ভক্তিতে আপ্লুত হয়ে উঠলো। হঠাৎ নারীকণ্ঠ শুনে চমকিত হলাম। কোথা থেকে নারীকণ্ঠের কবিতার আবৃত্তি ভেসে আসছে বুঝতে না পেরে চারিদিকে চাইতে লাগলাম। মনে হলো, সভামঞ্চ থেকে এ স্বর ভেসে আসছে। নজরুলকে জিজ্ঞেস করলাম, কবিতা আবৃত্তি করছেন কে?…”

(অতীত দিনের স্মৃতি/ আবুল কালাম শামসুদ্দীন/ পৃষ্ঠা. ৬৪-৬৫/ খোশরোজ কিতাব মহল, প্রথম প্রকাশ. সেপ্টেম্বর ১৯৬৮)

কিছু অদরকারি অংশও টানলাম, নজরুল পর্যন্ত, কারণ এইটাতে ইতিহাসের সময়টারে অনুমান করতে, ধরতে পারবেন আপনি। বিবরণটি পড়ুন, পর্যাপ্ত সময় ও বিশ্রাম নিয়া। দুগ্ধ ফেনশুভ্র ধুতি-পাঞ্জাবি-চাদর আর পৌরাণিক যুগের ঋষি, এই শব্দগুলি কেমন? এদেরে নিয়া আপনার মুগ্ধ হইতে সমস্যা হয় কি? কোনো আপত্তি জাগে? কেন জাগে না? আনমনেই মনে কি হয়, যে, এইসবই সাহিত্যিক ব্যাপার?

সাহিত্য, শিল্প, সন্ত, ঋষি, এইসবের একটা সমার্থক, মান, বাবুয়ানা পোশাক তাহলে হাজির করা হইছিল বেশ আগেই। আমরা দেখেছি, লিট ফেস্টে ধুতি-পাঞ্জাবি-শার্ট-প্যান্ট ইত্যাদি পোশাক বেশ কদর নিয়া চলে, কিন্তু লুঙ্গিতে ইতস্তত, নানান প্রশ্ন, জেরা। মানে, কেবল লুঙ্গিতেই আপত্তি। কেন? কারণ, এখানে আপনার আর আর সব সাহেবি পোশাক কলকাতার বাবুদের ধুতি-পাঞ্জাবির প্রতিনিধি।

ঢাকা লিট ফেস্টে ঢুকতে পারেন নাই লুঙ্গি পরার কারণে, তাই ছবি তুলে ফিরে এসেছেন লুঙ্গি পরাগণ

কারণ, বাংলাদেশে আমাদের মডার্নিজম ও এর খোল-ছাবড়াগুলি আঠার শতকের বাবু পর্যন্ত আইসা থমকে গেছে। আর কিছু দেখে না। এই বাবু হল প্রথমে কালিপ্রসন্ন সিংহের সেই আলবার্ট ফ্যাশনে সঙ হইয়া থাকা ‘ঋদে জোলার নাতি’, পরে আর একটু ভদ্রস্থ হয়ে আইসা ঋষি হয়ে বইসা আছেন, রবিঠাকুর, বিশ শতকের জমিদার। আর আমরা তার গরিব, মুসলমান প্রজা। লুঙ্গি হইল এই বঙ্গে ঠাকুরের প্রজাগো পোশাক। যেহেতু এইটারে আপনি ভুলতে পারেন না, ফুলবাবু আপনি, আপনার বাবুমানস বাবুদের ধুতি, নেংটির বিপরীতে লুঙ্গিরে হাজির করে, আর জায়গা না দেয়ার বর্ণবাদী উদ্যোগ নেয়। আর এইভাবেই তৈরি হইছে আপনাগো শিল্পমানস। ভাবটা এমন, ধুতি হচ্ছে কালচারাল পোশাক, যেইটা সাহিত্য ও কালচারের সাথে যায়। আর লুঙ্গি একে তো কৃষকের পোশাক, তার উপরে মুসলমান, যাদের অনেক কিছুই আমাদের এখানকার লোকাল না, এই ধরনের একটা ভাব থিকা শিল্পকলাকেন্দ্রিক চর্চায় লুঙ্গিকে এভয়েড করে ধুতিকে সামনে রেখে আরবান রুচি প্রডিয়ুস করা হইছে। কলোনিয়ালাইযেশনের পরে বাবু ও পাতিবাবু হয়ে এখন ইসলামোফোবিয়া, এই রুটটা খেয়াল করতে হবে।

খেয়াল করলেই দেখবেন, এই বঙ্গে লুঙ্গি নিয়া বাংলাদেশী বাবুদের বর্ণবাদ চরম। পূর্ববঙ্গের প্রজা কৃষক ও মুসলমানদের প্রতি তখনকার জমিদার বাবুদের একটা প্রজাসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, এখনকার, বাংলাদেশী সাহেব-বাবুদেরও ভাব ও ভঙ তাই। একটুও বদলায় নাই, যদিও ওরা জমিদার নয়।

যেহেতু বাবু, এই বাংলার মডার্নরা নিজেদের আর্য সংস্কৃতির বাহক মনে করেন। কলকাতায় ওরা বাবুসংস্কৃতি পার হইছে। বাংলাদেশে সেকুলাররা এখনো বাবুতেই, তার যাবতীয় শ্রেণিঘৃণাসহ আটকে আছে। এই ক্লাবে নিষেধ তো অই মাহফিলে হারাম। কারণ, লুঙ্গি বাবু পোশাক নয়। প্রজার পোশাক। লুঙ্গি দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড়, আর এই বাংলায় গরিব মুসলমান কৃষক প্রজার পোশাক। ফলত একদিকে আর্য অহম, আর দিকে প্রজার পোশাকে অনীহা। প্রজা যেহেতু মুসলমান, সেহেতু ইসলামোফোবিয়া। ইসলামোফোবিয়ার সাথে জাতপাতভেদের সম্পর্ক আছে। নমঃশুদ্র ও বাঙালি মুসলমানের নাম এক কাতারে রাইখা আলাপ করা হয়। তাই, ইসলামোফোবিয়ার সাথে লুঙ্গিফোবিয়ার সম্পর্ক ঐতিহাসিক। ফলত এই বঙ্গে ভাসানির লুঙ্গি ও ওই বঙ্গে গান্ধীর ধুতি একই অর্থ বহন করে না। যেমনটি ‘সাবঅলটার্ন’ আর ‘আমজনতা’ কাছাকাছি মানে হলেও এক না। এর একটা রাজনৈতিক দিক এবং ক্ষমতাসম্পর্কও আছে।

ফলে এই জায়গা থিকা নতুন বাবুদের ‘এপিস্টেমিক ভায়োলেন্স’রে প্রশ্ন ও ঝামেলায় ফেলা জরুরি।

২.
কিন্তু এরপর ১৯৪৭ আর ১৯৭১ দুইটা মহা ইতিহাস গেছে এই ভূখণ্ডের উপর দিয়া। এর আগে, তিতুমীর দুদুমিয়াদের রেডিক্যাল মুভমেন্ট। আর চইলা গেছে ফিরিঙ্গি। এতসব ঢেউয়ের ভেতরে, বাংলার কালচারাল মহলে কেন এখনো জাতপাত ও বর্ণবাদী বাবুসংস্কৃতির ভূত? চিন্তা, চেতন, পোশাক সবটিতে ফিরিঙ্গি থাকার চেষ্টা, যেইটারে উনারা মডার্নিজম বইলা থাকেন। যেন উনারা বাবুসাহেব, এইখানে বেড়াতে আসছেন। আর অন্য সকলে নেটিভ, ফলত এলাউড না।

কেন দুনিয়ার আর কোনো ঘটনাই এদেরে আর নাড়া দেয় না? এর মধ্যে উনিশ শ একাত্তরের যে মহা ইতিহাস, এইটারে আমরা নমঃশূদ্র ও বাঙালী মুসলমানের বাংলাদেশ বিপ্লব বলি। এদেশের কৃষক, নমঃশুদ্র ও বাঙালী মুসলমানের মহা ঘটনা হল গণ মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু দেখা গেল, আনিসুজ্জামান প্রমুখ ওপারের বাবুরা আইসা তার দখল ঘোষণা করল, একাত্তরের পর পর। হিন্দু প্রভাবিত, কলকাতার বাবুসংস্কৃতির উত্তরাধিকার নিয়া বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষমতাকেন্দ্র দখল করছেন উনারা। ফলত ফ্যাসিবাদ গেড়ে বসতে পারছে।

কেন এমন হল, তার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী ইন্টালিজেনশিয়ার একটা পর্যালোচনা হাজির করা যায়। সম্পর্ক, বন্ধুত্বও রাজনীতির ভূমিকা থেকে কোট করছি:

“১৯৭১ সালে বাংলাদেশের উত্থানপর্ব আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলির একটি। কিন্তু গণ-মুক্তিযুদ্ধের পরের হঠকারি নেতৃত্ব নিজেদের দুর্বৃত্তপনা, ক্ষমতা ও অক্ষমতার প্রয়োজনে এই বিপ্লবকে আত্মসাৎ করেছেন এবং একটি প্রতিবিপ্লবী রাষ্ট্র ও নাগরিকসমাজ কায়েম করেছেন। এই প্রতিবিপ্লবী নাগরিকসমাজের প্রতিনিধি হিশেবে বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত শ্রেণীর ভাবনা-চিন্তার একটা বড় স্রোত একাত্তর থেকে এ পর্যন্ত সুবিধাবাদী। ফলত, স্বাধীনতার পরে রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ে মৌলিক ভাবনা ও বুদ্ধির চর্চা অনুপস্থিত এখানে। আবার যারা এই সুবিধাবাদের বাইরে, তারা সিরিয়াসলি ভাবতে ইচ্ছুক নন, সরল ও অবিকশিত থেকে গেছেন। যে যার রোমান্টিক জায়গায় সীমাবদ্ধ, কুপমণ্ডুক। রাষ্ট্রের কোনো ঐতিহাসিক পর্যালোচনা দাঁড় করাতে অক্ষম। যার কারণে আমরা সব সময় অতীতচারি, স্মৃতিকথক, কোনো বোঝাপড়ায় নেই। এই শ্রেণীর রাষ্ট্রবাসনার জায়গায় যে গোলযোগ তৈরি হয়ে আছে, তার ফলে রাষ্ট্রের পরিণত, মৌলিক, গতিশীল ও অবজেক্টিভ ক্রিটিক দাঁড়ায় নাই। মূলত বাংলাদেশের উত্থান মুহূর্তে ভূমিকা পালনকারী দৃশ্যমান দুটি শ্রেণী, বুর্জোয়া (সরলীকৃত অর্থে) মধ্যবিত্ত শ্রেণী-উদ্ভূত পলিটিক্যাল এলিট এবং পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাকারী ইন্টালেকচুয়াল এলিট; উভয়ের পাকিস্তানি হেজিমনির বিরুদ্ধে যে দৃশ্যত অবস্থান ছিল, তা বাংলাদেশ-বিপ্লব পরবর্তী সময়ে তার চরিত্রের মৌলিক কোনো ট্রান্সফরমেশন ঘটাতে পারে নি। ফলে এই উভয়বিধ শ্রেণী বাংলাদেশ-বিপ্লবের অন্তর্নিহিত মর্মার্থ—হাজার বছরের লড়াই, সংগ্রাম ইত্যাদির ভেতরকার নানা বাঁক, টানাপোড়েন ও শক্তির জায়গাগুলি—ধরতে ব্যর্থ হয়েছে।”

ফলত, বিভিন্ন রকম উপনিবেশের বিরুদ্ধে দীর্ঘ জেহাদের পর অর্জিত সাংবিধানিকভাবে সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রেও আপনি কিছু বাবুস্থান পাবেন, যেখানে শুধু সাহেব ও বাবুমারানিরা যাবে, লুঙ্গি পইরা যাইতে পারবেন না। যেমন, ঢাকা ক্লাব। যেমন, আরো দেখা গেল, ঢাকা লিট ফেস্ট। এইসব জাগায়, ব্লাডি নেটিভস আর নট এলাউড। বা, দুই হাজার পাঁচ সালে মতিঝিলে যে ক্র‍্যাকডাউন করা হইছিল, হেফাজতের গেঁয়ো মানুষদের শহর ছাড়া করা হইছিল, আর তার জন্য বঙ্গদেশের এলিটবাবুবাহিনি, যার সাথে এন্থনিও গ্রামশীর সেই গৃহপালিত বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়েরও মিল আছে, রাষ্ট্রীয় সশস্ত্রবাহিনিকে সাধুবাদ জানাইছিল, তার কারণরে পোশাকেই আইডেনটিফাই করা যায় বেশি। লুঙ্গি, টুপি, পাঞ্জাবি। মানে, গ্রাম থেকে আসা, শহরের মালকিনদের কেউ নয়। তাই তাদের এই তল্লাটে অধিকার নেই।

আমাদের এই প্রশ্ন করাটা উচিত হবে, যে, বিভিন্ন রকম উপনিবেশের বিরুদ্ধে দীর্ঘ জেহাদের পর অর্জিত সাংবিধানিকভাবে সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রে আমরা এইসব কলোনিয়াল চরিত্রের প্রতিষ্ঠান, ঘটনাগুলিকে আদৌ বেড়ে উঠতে বা ঘটতে দেব কি, বা সেইসবের অস্তিত্ব মেনে নেবো কি-না। যদি ড্রেসকোড নিয়া আলাপ করতে চান, আমরা অবশ্যই আর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও এখানে তুলতে পারি যে, লুঙ্গি কেন বাংলাদেশের মত একটি দেশ—যার অধিকাংশ মানুষের সাধারণ পোশাক—সেই দেশের একটি ক্লাবের ড্রেস কোডে অন্তর্ভুক্ত হবে না, যেখানে আজিব নিয়মে একটি কলোনিয়াল ড্রেসই সব জায়গায় ড্রেসকোড হিসেবে রাখা হয়?

৩.
এলা বর্তমানে আসি। আমরা মডার্ন সময়ে বাস করছি। উনারা বাবু কালচার ফেলতে পারলেন না, বাবুদের বর্ণবাদ, তার সাথে যোগ হল মডার্নিজম। দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রে নাগরিক সমাজ বইলা ‍উনারা যে কল্পকাহিনি রচেন, উহাতে ‘শিক্ষিত’ এলিট শ্রেণী ছাড়া গাঁও গেরামের গরিব হিন্দু-মুসলিম কৃষক ও খেটে খাওয়া শ্রেণীর, তাদের কথার, পোশাকের, কালচারের কোনো স্থানই নেই, সকলেই সংখ্যালঘু। এই যে সংখ্যালঘু হয়ে থাকা এবং ক্ষমতাকেন্দ্রে তাদের নাই হয়ে থাকা—এর সাথে যোগ হল, নাইন ইলেভেনের পরের দুনিয়ার দেখার চোখ থেকে পাওয়া ইসলামোফোবিয়া ইত্যাদি। তাই, ধুতি, পাঞ্জাবিতে সমস্যা নেই বাংলাদেশী বাবুদের। এইসব কিছুর একটা কমন গ্রাউন্ড, ফ্যাসিবাদ। আমরা এখন ফ্যাসিবাদের সময়ে বাস করছি।

ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৮ আয়োজকগণ

এই ফ্যাসিবাদ কীভাবে এল, তার ইশারা উপরে দিয়েছি। উপরে আমরা যে বর্ণবাদ ও শ্রেণিঘৃণার কথা বললাম, তার সাথে ফ্যাসিবাদের সখ্য চরম। বর্ণবাদ ও শ্রেণিঘৃণা পাশাপাশি থাকে। চিন্তা, মননে ও রাষ্ট্রে। আবার, ফ্যাসিবাদ রেজিম মাত্র নয়। এইটা একটা দেখার ভঙ্গি। লাইফস্টাইলও। গভীর বর্ণবাদ, ভয় ও গণহিস্টিরিয়া এই লাইফস্টাইলের একটি কালচারাল প্রপোজিশন। গুম-খুন ও জননিপীড়ন এর পুলসিরাত। এইটা আছর করে। ছড়ায়। আর সহজেই ঢুকে পড়ে পুতু পুতু সাহিত্যসভায়। ফলত, এই সাহিত্যসভা, লাইফস্টাইল ও দেখার ভঙ্গিরে প্রশ্ন করা, ঝামেলায় ফেলা, বিব্রত করা জরুরি।

ফ্যাসিবাদের ক্ষমতাকেন্দ্র হল আরবান রুচি ও কালচার। ফলত ক্ষমতা ও আরবান রুচি পরস্পর সহযোগী, কম্প্রোমাইজ কইরা চলে। আরবান রুচি ক্ষমতাকে প্রয়োজনীয় রসদ ও বৈধতা দেয়। কারণ, কেবল আরবান রুচি ও কালচারই হেজিমনি ও ডিসকোর্স তৈরি করতে সক্ষম। বিপরীতে, এখন পর্যন্ত গ্রাম সমাজ বা কৃষক ডিসকোর্সের দুনিয়ায় গরহাজির। ফলত ক্ষমতার এই ঘেরাটোপে আরবান রুচির বাইরের কোনো জিনিস যখন আরবানের, শহরের ভেতরে ঢুকে পড়ে, শহরের লোকজন, আরবান রুচির যারা প্রপাগেটর, তারা বিচলিত হয়ে পড়ে। তারা কথা কইতে দিতে চায় না ওদেরে। এই বিচলিত হওয়াটা হচ্ছে তাদের যে ক্ষমতা ও রুচিব্যবস্থা, রুচিকে কেন্দ্র করে যে ক্ষমতাব্যবস্থা, এইগুলি ভেঙে যাওয়ার ভয়।

দেখা যাচ্ছে, পোশাক, বিশেষত লুঙ্গি, টুপি এই রুচি ব্যবস্থায় বড় ঝামেলা তৈরি করে।

ফলত, শহরে লুঙ্গি পইরা হাঁটা গুরুত্বপূর্ণ।

ঢঙ? ঢঙ বা স্টাইল গুরুত্বপূর্ণ। লুঙ্গি বাইরের লোকেরাও পরেন বটে, কিন্তু আমাদের নিজের ঢঙ হইয়াই আছে এইটা, বহু কাল ধরেই। এইটা আমাদের জলবায়ু, জীবন ও যাপনের ভাবের সাথে জড়িত। আপনেরা ভঙ কইরা কুটি, ফতুয়া পাঞ্জাবি পরেন, সাহিত্যসভায় যান, আমরা মানা করি না। আপনেরা চাইলে প্যান্ট পইরাই সাহিত্য করেন। কিন্তু লুঙ্গি পইরা বিশেষ অঞ্চলে ঢুকতে পারবে না কেউ, এই আপত্তি বেআদবি। এই বেআদবি মানা হবে না। আমরা ঢঙ করেই লুঙ্গি পরব। লুঙ্গি পইরাই সাহিত্য, রাজনীতি ও কবিতা করব।

এতে আরবান এলিটদের সহযোগিতা, সমর্থন ও ভঙ এর উপরে ভর কইরা ফ্যাসিবাদের যে ক্ষমতা ও হেজিমনি, তা ভাইঙ্গা পড়ে।

শহরে লুঙ্গি মার্চ হওয়া দরকার।

Recommended Posts

No comment yet, add your voice below!


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *